সিঙ্গাপুরে কুড়িয়ে পাওয়া ৬ লাখ টাকা ফিরিয়ে দিলেন প্রবাসী বাংলাদেশী

প্রবাসে সততার পরিচয়

শাহাদাত রাসেল চৌধুরী, সিঙ্গাপুর থেকে

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৭:২৪ অপরাহ্ণ
208

প্রবাসে সততার পরিচয় দিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করলেন শরীয়তপুরের রহমত উল্লাহ রাজীব৷

উমর ফারুক শিফনের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে জানা যায় রাজীব সিঙ্গাপুরের টাউন কাউন্সিলে গত ৯ বছর ধরে কাজ করছেন৷ কয়েক মাস আগে তিনি কর্মস্থলের কারপার্কিংয়ে ১০ হাজার ডলার সহ একটি মানিব্যাগ কুড়িয়ে পান যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৬ লাখ টাকার বেশি।

এতগুলো টাকা হাতে পেয়েও লোভ রাজীবকে বশিভূত করতে পারেনি৷ রাজীব টাকাসহ মানিব্যাগটা মালিকের কাছে ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন৷ তাই তিনি কার পার্কিংয়ে অপেক্ষা করলেন ৪ থেকে ৫ ঘন্টা কিন্তু ওই মানিব্যাগের মালিকের সাক্ষাৎ পেলেন না।

তখন তিনি টাকাসহ মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে বাসায় ফিরে যান কিন্তু তার ঘুম হয় না।

প্রকৃত মালিকের কাছে টাকাটা ফেরত দেয়ার জন্য তিনি অস্থির হয়ে উঠেন৷ তিনি মোবাইল ফোন হাতে বসে আছেন কারণ ব্লকে কিছু হারানো গেলে হয়ত টাকার মালিক তার বসকে কল দেবেন এবং বস তাকে কল দিয়ে টাকার কথা জিজ্ঞেস করবেন কিন্তু কারো কল আসে না৷ মালিকের কাছে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে সময় পার করতে থাকেন রহমত উল্লাহ রাজীব৷

এরপর দুইদিন সময় করে কার পার্কিংয়ে এসে বসে থাকেন মালিকের সন্ধানে কিন্তু কারো দেখা পান না।

নিরুপায় হয়ে অফিসের বসকে টাকা পাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেন। বস তার কথা শুনে অবাক হন৷

বস তাকে নিয়ে পুলিশ স্টেশনে হাজির হন। পুলিশ সব শুনে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ।

তিনি বলেন, ‘আমার কর্মজীবনে এই প্রথম কাউকে দেখছি এতগুলো টাকা ফেরত দিতে৷ তোমার ১০ মাসের বেতন এই টাকা। এই টাকা দেশে পাঠিয়ে তুমি কিছু করতে পারতে কিন্তু তুমি তা না করে ফেরত দিতে এসেছো। তোমার সততাকে স্যালুট জানাই৷’

পুলিশ টাকার সাথে থাকা পরিচয়পত্র থেকে টাকার মালিকের নম্বরে কল দেন কিন্তু কেউ কল রিসিভ করে না।

দ্বিতীয় নম্বরে কল দিলে একজন মহিলা কল রিসিভ করে জানান, তিনি টাকার মালিকের বোন৷ পুলিশের কাছে সব শুনে মহিলা কেঁদে ফেলেন।

ওই নারী জানান, এই টাকা তার ভাই সংগ্রহ করেছিল তার মায়ের চিকিৎসা করানোর জন্য৷ টাকা হারানোর পর ভাই আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। ভাই ভেবেছে আমি তার টাকাটা চুরি করেছি৷ শুধু এই টাকার জন্য ভাই-বোন একে অপরের শত্রু হয়েছি৷

ওই নারী আনন্দে কেঁদেই ফেলেন৷ তার অশ্রুসিক্ত কথা শুনে রাজীবও আনন্দে কেঁদে ফেলেন৷

তার অনুভব হয় যাক জীবনে একজনের আনন্দের কারণ হতে পেরেছেন তিনি। এই আনন্দ টাকা দিয়ে কিনতে পাওয়া যায় না।

পরের দিন টাকার মালিক পুলিশ স্টেশনে এসে টাকা সংগ্রহ করে রাজীবের বসকে কল করেন৷

রাজীবের বস রাজীবকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ স্টেশনে হাজির হন৷ তখন টাকার মালিক রাজীবকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন।

তার চোখেমুখে আনন্দ দেখে সুখানুভূতি অনুভব করেন রাজীবও৷ এই সুখ পৃথিবীতে কোটি টাকার বিনিময়েও পাওয়া যায় না। অপরের মুখে হাসি ফুটানো আসলেই খুব আনন্দের আর সেই সুখের পিছনে যখন দেখবেন আপনি তখন পৃথিবীর সেরা সুখানুভূতি অনুভব করবেন৷

রহমত উল্লাহ রাজীবের সততার পুরস্কার স্বরুপ টাউন কাউন্সিলের পক্ষ থেকে তাকে সততার সার্টিফিকেট তুলে দেন সিনিয়র স্টেট মিনিস্টার হেং চী হাউ।

উল্লেখ্য, রহমত উল্লাহ রাজীব শরীয়তপুর জেলার জাজিরা থানার গফুর মোল্লার কান্দি গ্রামের বাসিন্দা।

তার বাবার নাম আবদুল মোতালেব মোল্লা। তারা দুই ভাই ও এক বোন।

এ ব্যাপারে রাজীব বলেন, ‘ভাই টাকা-পয়সা আজ আছে কাল নেই কিন্তু আমি এই যে তাদের মুখে হাসি ফুটাতে পারলাম এটাই আমার জীবনের সেরা অর্জন। আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই৷ আমি অন্যের মুখে হাসি ফুটাতে চাই কিন্তু কোন প্লাটফর্ম পাচ্ছি না৷’

তিনি আরো বলেন, ‘এর আগেও আমি একজনকে ৫০ গ্রাম স্বর্ণ ফিরিয়ে দিয়েছিলাম৷ তখন সেই স্বর্ণের মালিক তার হারানো স্বর্ণ ফিরে পেয়ে আনন্দে কেঁদেই ফেলেন। এই যে মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারছি এটাই আমার জীবনের সেরা পাওয়া।’

রাজীবের এই সততার খবর সিঙ্গাপুরের কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷ সংবাদে তাকে বাংলাদেশী হিরো বলে আখ্যায়িত করা হয়৷ টাকার মালিক তার সততার পুরস্কার স্বরুপ তাকে ৪শ’ ডলার পুরস্কৃত করেন৷

রাজীব মনে করেন, ‘প্রবাসে আমরা একেকজন প্রবাসী একেকটা বাংলাদেশ। কেউ খারাপ কিছু করলে তার সব দায়ভার বাংলাদেশের সকলের হয়৷ আর ভালো কিছু করলেই পুরো দেশ ও জাতির সুনাম হয়৷’

তিনি প্রবাসী সবাইকে সৎ কাজের মাধ্যমে দেশ ও জাতির নাম উজ্জ্বল করার আহ্বান জানান৷

x