সার্ধ-শতবর্ষী চট্টগ্রাম কলেজ : প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

আহমদ মমতাজ

শুক্রবার , ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীনতম বন্দর-শহর ও জেলা চট্টগ্রাম। পাহাড়, সমুদ্র, উপত্যকা, বনাঞ্চল ফসলি ভূমি, নদ-নদী ও খাল-বিল নিয়ে গঠিত সুপ্রাচীন এই ভূখণ্ডটিতে সমুদ্রবন্দর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদ যুক্ত হয়ে বিশ্বে অনন্য মর্যাদা লাভ করেছে। এ অঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপনের ইতিহাসও প্রাচীনতম। উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, ফেনীর ছাগলনাইয়া ও চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলায় প্রত্ম অনুসন্ধানে প্রাপ্ত প্রাগৈতিহাসিক যুগের আবিষ্কৃত নিদর্শনাদি মতে, আট থেকে দশ হাজার বছর আগে চট্টগ্রাম ও আসাম অঞ্চলে মানুষের বসতি ছিল। ক্রমান্বয়ে সভ্যতার আলো প্রবেশ করে ও দেশি-বিদেশি মানুষের মহামিলনস্থলে পরিণত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিক্ষায়, সাংস্কৃতিক পরিক্রমায়, ধর্ম প্রচারে এবং সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানবিক মূল্যবোধের চর্চায় বিশ্বে এক অগ্রসর জনপদ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। বিশেষ করে সমুদ্রবন্দর হিসেবে এর পরিচিতি ও গুরুত্ব বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যায়।
এখানে আগত বিভিন্ন দেশ-মহাদেশের পরিব্রাজক, ভূগোলবিদ, ব্যবসায়ী, রাজপুরুষ, সৈনিক, রাজদূত ও কবি-সাহিত্যিক তাদের লিখিত বিবরণে, অংকিত মানচিত্রে এবং প্রবর্তিত মুদ্রায় এ পবিত্র ভূমিকে নানা নামে ও বিশেষণে আখ্যায়িত করেন।১ ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে ‘এখানে মন্দিরে-মসজিদে, ক্যায়াঙে-গীর্জায়, দরগা-আখড়ায়, আশ্রম-খানকায় বিবাদ নেই। এখানকার সাধু-সন্ত, পীর ফকীর, মোল্লা- মৌলবী, রাউলী-পাদ্রী সমভাবে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র।৩ অন্যান্য বিষয়ের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের রয়েছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। প্রাচীনকালে বৌদ্ধদের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল প্রধানত বৌদ্ধ কেয়াং ও বিহারকেন্দ্রিক। সনাতন ধর্মীয় হিন্দুদের জন্য পাঠশালা-টোল-চতুষ্পাঠী এবং মুসলমানদের জন্য মক্তব-মাদ্রাসা, মসজিদ বা সুফী-আলেম-ওলামাদের খানকাহ, বৈঠকখানা ও খ্রিস্টানদের জন্য গির্জাকেন্দ্রীক। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ছিল এসকল ওস্তাদ-গুরু ও প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক।
প্রাচীনকালে পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। তাদের শাসনামলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল প্রধানত বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন শিক্ষা চর্চা ও প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে এবং তা ছিল বৌদ্ধ বিহারকেন্দ্রীক। গবেষকদের মতে, ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত নালন্দায় বহুশত বছর ধরে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। হিউয়েন-সাং নালন্দায় কিছুদিন থেকেছিলেন, সে সময় শীলভদ্র নামে একজন বাঙালি বৌদ্ধ ছিলেন এর অধ্যক্ষ। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমদিকেও নালন্দার অস্তিত্ব ছিল। ধীরে ধীরে এই শিক্ষাকেন্দ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। যুদ্ধসহ নানা কারণে নিপীড়নের শিকার হয়ে বহু বৌদ্ধ পন্ডিত অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত ও আরাকানের বৌদ্ধ শাসিত চট্টগ্রামে চলে আসেন। এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন চর্চাকেন্দ্র-যা পণ্ডিতবিহার মহাবিদ্যালয় নামে পরিচিতি লাভ করে।
এ যাবত প্রাপ্ত তথ্যমতে, চট্টগ্রামের প্রাচীনতম শিক্ষাকেন্দ্রের নাম এই পন্ডিত বিহার। খ্রিস্টিয় অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীতে এই শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয় বলে কথিত আছে। তবে এর অবস্থান কোথায় ও কখন এটি স্থাপিত হয় এবং স্থায়িত্বকাল নিয়েও রয়েছে মতভেদ। বিভিন্ন গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, পণ্ডিত বিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন প্রজ্ঞাভদ্র নামে চক্রশালা নিবাসী বৌদ্ধ পণ্ডিত। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। তিনি পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত হন ও বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শনে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী হন। কথিত আছে যে, দশম শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত, আচার্য অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান একবার পণ্ডিত বিহারে আসেন ও কিছুকাল অবস্থান করেন। এখান থেকে তিনি নেপাল হয়ে তিব্বত গমন করেন ও ১০৫৩ সালে তিব্বতের লাসায় পরলোকগমন করেন। ধারণা করা হয় বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ রচয়িতাদের কেউ কেউ এই পণ্ডিত বিহারের সিদ্ধাচার্য ছিলেন। গবেষকরা চর্যাপদের কিছু কিছু শব্দে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করেছেন। এসকল সিদ্ধাচার্যের একটা দল নেপাল চলে যান, সঙ্গে নিয়ে যান বাংলা ভাষায় রচিত পদাবলী। যা ১৯০৭ মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কার ও প্রকাশ করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে। ১৯২৬ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘হাজার বছরের পুরান বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে গ্রন্থ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত দেয়াঙ পাহাড়ে ১৯৩০-এর দশকে সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী একটি জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি ভারতের মুসলিম শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। একটি জাতীয় আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন মওলানা ইসলামাবাদী এবং মিশর থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বহু দেশ ভ্রমণ করেন ও সেসব দেশের বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ পরিদর্শনপূর্বক ভবিষ্যত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁর ও দেশের, চট্টগ্রামের তরুণ যুবকদের ব্রিটিশ অস্ত্রাগার দখল, ব্রিটিশ সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ ও পরিণতিতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি, বিদ্যমান সশস্ত্র তৎপরতা ও দমন-নিপীড়ন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু ও মওলানা কর্তৃক নেতাজী সুভাষচন্দ্রের পক্ষাবলম্বন ও কারাগারে নিক্ষেপ, অসুস্থতা, পাকিস্তান-ভারত সৃষ্টি ও মৃত্যু-মওলানা ইসলামাবাদীর স্বপ্নের আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশা-সমস্তই নিরাশায় পর্যবসিত হয়। যদিও তাঁর কতিপয় অনুসারী সাধ্যমত ও নিরলসভাবে তাঁদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। মওলানা চেয়েছিলেন আরবি তথা ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাংবাদিকতা ও প্রযুক্তি শিক্ষাসহ যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
মুসলিম শাসনামল ও চট্টগ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থা :
চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম মুসলিম অধিকারে আসে। অন্যান্য বিষয়ের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। সে সময় ফারসি ছিল সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম।৪ তবে স্থানীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পায়। কিছু কম-বেশি ২৪০ বছরের মুসলিম শাসন ও ৮৬ বছরের আরাকানি শাসনের পর চট্টগ্রাম মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। মোগল যুগে ফারসি ভাষার পাশাপাশি আরবি ও উর্দু চর্চা অব্যাহত থাকে। উনিশ শতকে ঐতিহাসিক খান বাহাদুর মৌলবি হামিদুল্লাহ খান কর্তৃক ফারসি ভাষায় রচিত ‘আহাদিসুল খওয়ানিন’ গ্রন্থসূত্রে জানা যাচ্ছে যে, এ সময় পর্যন্ত অর্থাৎ কোম্পানি শাসনের পুরো সময় জুড়ে ফারসি ও আরবি-উর্দুর প্রভাব ও গুরুত্ব অব্যাহত ছিল, যদিও ইংরেজ কোম্পানি তাদের শাসনের ভিত মজবুত করতে উনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের শেষ দিকে ইংরেজি ভাষাকে প্রতিষ্ঠার জন্য ফরমান জারি করে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে চট্টগ্রামে সৈয়দ গদা হোসেন খন্দকারের মাদ্রাসা ও কাছাকাছি সময়ে প্রতিষ্ঠিত কাজীর দেউরিতে মীর আবদুর রশীদের মাদ্রাসা, চান্দগাঁওতে মওলানা আবুল হাসানের নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা (উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে) ও শেষ দিকে মাদ্রাসা পাহাড়ে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা এবং আরো পরবর্তীকালে হাজি মুহম্মদ মহসিন ফান্ডের অর্থে স্থাপিত মাদ্রাসায় মুসলিম শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করতেন। এ সমস্ত শিক্ষাকেন্দ্র ছিল শহরকেন্দ্রিক। তবে গ্রামাঞ্চলেও ছিল শিক্ষাকেন্দ্র, মুসলিম জমিদার, সামন্ত কিংবা শিক্ষিত আলেম-মৌলানাগণ তাদের নিজেদের বাড়ির দেউরি ঘরে বা মসজিদ সংলগ্ন স্থানে মক্তব-মাদ্রাসা খুলে সেখানেই ছাত্রদের বিদ্যা শিক্ষা দিতেন। চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে এমন বহুসংখ্যক প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্রের সন্ধান ও কোনো-কোনোটির অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামপর্যায়ে এমন কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলোর প্রতিষ্ঠাকাল অষ্টাদশ-উনবিশং কিংবা বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে।
ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন :
ইংরেজ অধিকারের পর ভারতবর্ষে শাসনকার্যের সুবিধার্থে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৮৩০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কোর্ট অব ডিরেক্টর এক সরকারি ফরমানের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষাকে নিশ্চিতভাবে অগ্রাধিকার প্রদান করে। ১৮৩৫ সালে কোম্পানি ভারতের সর্বত্র ইংরেজি শিক্ষাদানের প্রতি মনোনিবেশ করে এবং বড়লাট উইলিয়াম বেন্টিংক (১৮২৮-১৮৩৫) ইংরেজি শিক্ষানীতি ঘোষণা করেন। ১৮৩৭ সালের ২০ নভেম্বর সরকারি এক ফরমানে ফারসি ভাষার বিলুপ্তি ঘটানো হয়। ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের জন্য কোম্পানি বাংলার বিভিন্ন স্থানে সরকারিভাবে স্কুল স্থাপন করে। অবশ্য এর আগে থেকে খ্রিস্টান মিশনারিরা গির্জাকেন্দ্রিক স্কুল চালু করে। সেখানে ইংরেজির সাথে বাংলাও শিক্ষা দেয়া হতো।
চট্টগ্রামে জিলা স্কুল স্থাপন ও পর্তুগিজ ভবন : ১৮৩৫ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা গভর্নমেন্ট কলেজিয়েট স্কুল ও ১৮৪১ সালে ঢাকা কলেজ। ১৮৭৮ সালে স্থাপিত হয় রাজশাহী কলেজ। ঢাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠার পরের বছর ১৮৩৬ সালে চট্টগ্রামে জিলা স্কুল স্থাপন করে কোম্পানি। বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন ইংরেজি শিক্ষা এবং একই সাথে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার বিস্তার ঘটতে শুরু করে। এ স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চট্টগ্রামে ইংরেজি শিক্ষার সূচনা হয়। স্কুলটি ছিল চকবাজার প্যারেড মাঠের দক্ষিণে ও মাদ্রাসা পাহাড়ের পুব পাশে একটি ছোট পাহাড়ে অবস্থিত প্রাচীন একতলা ভবনে। বড় বড় থামওয়ালা চুন-সুরকি নির্মিত একতলা বিরাট দালানটি মোগল যুগে কিংবা তার আগে আরাকানি-পর্তুগিজদের দ্বারা নির্মিত হয়ে থাকবে। অনেকে জোর দিয়ে বলেন যে, দালানটি পর্তুগিজদের দ্বারা নির্মিত এবং দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যদিও পর্তুগিজদের চট্টগ্রাম দখল, প্রশাসন পরিচালনা, এবং শহরে দুর্গ তৈরি সংক্রান্ত প্রামাণ্য দলিলপত্র পাওয়া যায় না। তবে দালানটির বর্ণনা প্রাক্তন ছাত্রসহ অনেক লেখকের বক্তব্যে পাওয়া যায়। আলোচিত সে পুরানো দালানটি এখন নেই। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে দালানটি অপসৃত হয়েছে। দালানটির নির্মাণকাল সম্পর্কেও কোনো ঐতিহাসিক তথ্য নেই। জনশ্রুতি মতে, দালানটি পর্তুগিজদের তৈরি। কিন্তু এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। মোগল অধিকারের আগে চট্টগ্রাম আরাকানের অধিকৃত ছিল। কিন্তু পর্তুগিজদের অধিকারের বা পর্তুগিজ শাসনের কোনো দালিলিক তথ্য নেই। প্রতিষ্ঠার পর ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা স্কুলে প্রবেশিকা (এনট্রান্স) স্তর ছিলো না। চট্টগ্রামের উৎসাহী ছাত্ররা ঢাকা, কলকাতা ও হুগলিতে (পশ্চিমবঙ্গ) প্রবেশিকা স্তরে পড়তে যেতো। ১৮৫৭ কালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের জেলা স্কুলটি সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে ও প্রবেশিকা স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়। এরপর শুরু হয় আরেক সমস্যা। জেলা স্কুলে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে এ অঞ্চলের ছাত্রদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের কোনো সুযোগ ছিলো না। তাঁদেরকে পড়তে যেতে হতো কলকাতা, হুগলি ও ঢাকা কলেজে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও ছাত্রদের একটি বড় অংশ উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত থাকে। তাই চট্টগ্রামে একটি উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করেন সমাজহিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা। সেই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামে কলেজিয়েট স্কুলে প্রবেশিকা স্তর খোলা সেই প্রাচীন পর্তুগিজ ভবনে এফ. এ. কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী চার দশকে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় আরও কয়েকটি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, বেশ কয়েকটি মাদ্রাসাসহ ১৯০৮ সালের মধ্যে বালকদের জন্য ৮টি স্কুল ও বালিকাদের জন্য ১টি স্কুল (ডা. খাস্তগীর গার্লস হাই স্কুল) প্রতিষ্ঠিত হয়।৫ উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ ও বিরোধিতা থাকলেও বাস্তব অবস্থার কারণে ধীরে ধীরে আগ্রহ তৈরি হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে স্কুল-কলেজে যে ২/৪ জন করে মুসলিম ছাত্রের দেখা মিলতে লাগল- সেকথা বিভিন্ন মনীষীর স্মৃতিচারণমূলক লেখা পড়ে আমরা জানতে পারি।
এফ. এ. কলেজ প্রতিষ্ঠা ও এক রায় বাহাদুরের অবদান :
১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম জেলা স্কুল। স্কুল ভবনেই জেলা স্কুলকে ১৮৬৯ সালে সেকেন্ড গ্রেড কলেজের মর্যাদা দেওয়া হয়, পড়ানো হতো এফ. এ. স্ট্যান্ডার্ড পর্যন্ত। প্রথম অধ্যক্ষ হন জে সি. বোস। কিছুদিন পর প্লিডারশিপ পরীক্ষার জন্য আইন বিভাগ খোলা হয়। জেলা স্কুলকে কলেজের সাথে যুক্ত করা হলে নামকরণ করা হয় কলেজিয়েট স্কুল। ১৯০৭-১৯০৮ সাল পর্যন্ত একজন অধ্যক্ষ ও ৫ জন অধ্যাপক কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
দুর্ভাগ্যবশত কলেজ প্রতিষ্ঠার পরবর্তী বছরেই চরম অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয় এবং কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৭১ সালে চট্টগ্রামে ডিভিশনাল কমিশনারের “পার্শন্যাল এসিস্টেন” পদে কর্মরত ছিলেন রাউজান নিবাসী কবি নবীনচন্দ্র সেন। তিনি চট্টগ্রাম গভর্ণমেন্ট স্কুলের সেক্রেটারি ছিলেন। একই সময়ে চট্টগ্রামের আরেক কৃতীমান ব্যক্তি পটিয়ার সুচক্রদন্ডি গ্রাম নিবাসী ডা. অন্নদাচরণ খাস্তগীর চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ‘এসিস্ট্যান্ট সার্জন’, পদে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রামের শিক্ষাক্ষেত্রে দুরবস্থায় উভয়ে ব্যথিত ছিলেন। ডা. অন্নদাচরণের অনুরোধে কবি নবীনচন্দ্র চট্টগ্রামের এফ. এ. কলেজটিকে বাঁচাতে উদ্যোগী হন। নবীনচন্দ্র তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন ডা. অন্নদাচরণকে তিনি ‘পিতার মত শ্রদ্ধা’ করতেন। নবীনচন্দ্র লিখেছেন-
‘তখন আমি ‘রায় বাহাদুর’ উপাধির প্রলোভন দেখাইয়া, চট্টগ্রামের উত্তর সীমাবাসী কোনও জমিদার মহাজনকে দশ হাজার টাকা দিতে সম্মত করাইলাম। এ টাকার দ্বারা প্রথমত চট্টগ্রামে ঋ.অ ক্লাস পর্যন্ত কলেজ খোলা হয়। আমি নিজে এক দীর্ঘ মুসাবিদা করিয়া এবং কমিশনার দ্বারা উহা পাস করাইয়া, উক্ত মহাজনকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি দেওয়ার জন্য গভর্ণমেন্টে প্রেরণ করিলাম।’ নবীনচন্দ্রের উক্ত বর্ণনা পাঠ করলে মনে হবে এফ. এ. কলেজটি ১৮৭১ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রকৃতপক্ষে কলেজটি ১৮৬৯ সালেই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭০ সালে যাত্রামোহন সেন এ কলেজ থেকে এফ এ পাস করেন এবং সে সময় অধ্যাপক হিসেবে বৈকুণ্ঠনাথ রায়ের নাম জানতে পারি। কলেজ অধ্যক্ষ ছিলেন মি. ডাইসেন।
প্রতিষ্ঠার পরের বছর বন্ধ হয়ে যাবার পর ডা. অন্নদাচরণের অনুপ্রেরণায় ও অনুরোধে উক্ত মহাজন থেকে দশহাজার টাকা গ্রহণ করে এফ. এ. কলেজকে পুনরায় চালু করেন। পরবর্তীকালে দিল্লির দরবারে উক্ত মহাজনের পরিবর্তে তাঁর পুত্রকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি পাইয়ে দেন। এই নিয়ে ‘আমার জীবন’ গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে যে, ‘উপাধি’ কে গ্রহণ করবেন- পিতা না পুত্র, এই নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। পিতার যুক্তি তিনি সম্পত্তির অধিকারী ও স্রষ্টা তাই তিনিই উপাধি পাবার অধিকারী। পুত্রের যুক্তি-পিতা বৃদ্ধ হয়েছেন, মৃত্যু সন্নিকটে অতএব পুত্রই উপাধি পেতে পারেন। যাক্‌ শেষ পর্যন্ত পিতা হার মানেন- আর পুত্র অর্থাৎ গোলকচন্দ্র চৌধুরী রায় বাহাদুর উপাধি গ্রহণ করেন। মীরসরাই উপজেলার ধুম নিবাসী জমিদার রায় বাহাদুর গোলকচন্দ্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাজার ‘গোলকের হাট’ ও ‘মহাজনহাট’ এই পিতা-পুত্রের স্মৃতির স্মারক। আর তাঁদের অবিস্মরণীয় অবদান আজকের চট্টগ্রাম কলেজ। আজ থেকে ১৫০ বছর আগে নগদ ১০ হাজার টাকা নগদে অনুদান দিয়ে কলেজকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন যিনি, সেই সাধারণ একজন ধনী মহাজনের অবদানের স্বীকৃতি আমাদের সমাজ দিতে পারেনি। চট্টগ্রাম কলেজে রায় বাহাদুর গোলকচন্দ্রের নামে কোনো স্মৃতির স্মারক নেই, না কলেজের কোনো ভবন, লাইব্রেরি, মিলনায়তন কিংবা ছাত্রাবাস। মীরসরাইর মহাজনহাট সংলগ্ন নিজবাড়ির ভিটেও এখন আর অবশিষ্ট নেই। কেবল গোলকের হাট বাজার তাঁর স্মৃতি বহন করছে।
এফ. এ কলেজ হিসেবে চট্টগ্রাম কলেজের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। কয়েক বছর পর্যন্ত কলেজ ও স্কুল একই সাথে কার্যক্রম চালায়। পরে স্কুলটি স্থান বদল করে লালদিঘি মাঠের দক্ষিণে মার্কট সাহেবের পাহাড়ের দক্ষিণ পাশে একটি প্রাচীন ইমারতে স্থানান্তরিত হয়। স্কুলটি ১৮৮৬ সালে আইস ফ্যাক্টরি রোডে বর্তমান স্থানে চলে আসে ও নামকরণ করে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল। ১৯১০ সালে চট্টগ্রাম এফ. এ. কলেজে প্রথমবারের মত স্নাতক স্তর পর্যন্ত খোলা হয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এ কলেজকে প্রথম গ্রেডের কলেজে উন্নীত করে।
প্রথম গ্রেডের ডিগ্রি কলেজ ও সহ শিক্ষা প্রবর্তন :
চট্টগ্রাম এফ এ কলেজ প্রথম গ্রেডের ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হওয়ার পর বিভিন্ন বিভাগ খোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯১০ সালের জুলাই মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, পালি, সংস্কৃত, ইতিহাস ও গণিত-এই ৮টি বিষয়ে অনুমোদন প্রদান করে। একই সাথে গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যাসহ বি.এ, বি.এসসি পাস ও অনার্স কোর্স চালু করে (বাংলা ব্যতীত)। ১৯১২ সালে কলেজের ছাত্রসংখ্যা ছিল ১৩৬ জন, ১৯১৭ সালে ২৭৫ জন ও ১৯২২ সালে ৩৫৩ জনে উন্নীত হয়।১০ ১৯২৪ সালে কলেজে প্রথম মুসলিম অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন শামসুল ওলামা কামালুদ্দীন। তিনি প্রথম চট্টগ্রাম কলেজে সহশিক্ষা প্রবর্তন করেন। ১৯২৬ সালে এ কলেজে একজন মুসলিম ও দু’জন হিন্দু ছাত্রী সর্বপ্রথম ভর্তি হন। এর পূর্বে কোনো মুসলমান মেয়ে কলেজে সহশিক্ষা গ্রহণ করেন নি। এই নিয়ে শামসুল ওলামা কামালুদ্দীন হিন্দু ও মুসলিম-উভয় সম্প্রদায়ের ছাত্র-অভিভাবকের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন। জানা যায় সে মুসলিম ছাত্রীর নাম মিস আছিয়া মজিদ ও হিন্দু মেয়ে দুজন হলেন সাধনা রায় ও সুকৃতি চৌধুরী। চট্টগ্রাম কলেজের প্রাক্তন ছাত্র অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেন যে, কলেজে সহশিক্ষা প্রচলন করায় অধ্যক্ষ কামালুদ্দীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তিনি এক বছর ঈদের জামাতেও জুমার নামাজে যেতে পারেননি। চট্টগ্রাম কলেজে এরূপ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কলেজ অধ্যক্ষের পাশে দাঁড়ান কলেজ ইউনিয়নের (ছাত্র সংসদ) সম্পাদক হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও তাঁর বন্ধুরা। এসব বন্ধুদের মধ্যে বিপ্লবী লোকনাথ বল, পূর্ণেন্দু দস্তিদারসহ আরো অনেকেই ছিলেন যাঁরা ১৯৩০ সালে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে যুববিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী ছিলেন। মাস্টারদা সূর্য সেন, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, বিনোদবিহারী চৌধুরী, কল্পনাদত্তসহ তাঁর সহযোগীদের মধ্যে কয়েকজনই ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র।
১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজে বিরাজিত অসন্তোষের মধ্যে রাজনৈতিক সফরে আসেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট সরোজিনী নাইডু। কলেজ ইউনিয়নের পক্ষ থেকে হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী কলেজ অধ্যক্ষ কামালুদ্দীনের অনুমতি নিয়ে সরোজিনী নাইডু-কে কলেজে আমন্ত্রণ জানান ও সংবর্ধনা প্রদান করেন। এর কিছুদিন পর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম চট্টগ্রাম সফরে আসেন ও হবীবুল্লাহ বাহারের নানা খান বাহাদুর আবদুল আজিজের তামাকুমন্ডী লেনের বাড়িতে উঠেন। হবীবুল্লাহ বাহার কবিকে চট্টগ্রাম কলেজে এনে সংবর্ধনা প্রদান করেন। বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের লেখায় জানতে পারি কবি নজরুল নিজের কণ্ঠে গান ও কবিতা আবৃত্তি করে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রদের দীর্ঘসময় মাতিয়ে রেখেছিলেন।
প্রথম মুসলিম অধ্যক্ষ :
চট্টগ্রাম কলেজে প্রথম মুসলমান অধ্যক্ষ হয়ে এসেছিলেন শামসুল ওলামা কামালুদ্দীন। তাঁর পৈতৃক নিবাস কলকাতার গোড়াচাঁদ দাস রোডে। পিতা মওলানা জুলফিকার আলী একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। তিনি কলকাতা মাদ্রাসা আলিয়ার শিক্ষক ও চট্টগ্রাম সরকারি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। কামালুদ্দীন কলকাতা মাদ্রাসা আলিয়ায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন ও ১৯০৫ সালে আরবিতে এম. এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বিলেতে পাঠিয়েছিলেন প্রাচ্য ভাষাগুলো সেখানে কিভাবে পড়ানো হয়- তা দেখে আসার জন্য। বিলেত থেকে ফিরে এসে আরবির পরিবর্তে ইংরেজির ক্লাস নেয়া শুরু করেন। চট্টগ্রাম কলেজেও তিনি ইংরেজির ক্লাস নিতেন। কর্মজীবনে তিনি চট্টগ্রাম মাদ্রাসায় সুপারিনটেনডেন্ট, লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও চট্টগ্রাম কলেজে (১৯২৫-২৬) অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়ে এ কে ফজলুল হক, সরোজিনী নাইডু ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ পরিদর্শনে আসেন ও তাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। তিনি ১৯২৭ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হন ও একই সঙ্গে ১৯২৮ সালে নদীয়ার কৃষ্ণনগর কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগ ও প্রেসিডেন্সি বিভাগের ইন্সপেক্টর অব স্কুলস পদে চাকরির পর পুনরায় কৃষ্ণনগর কলেজে যান এবং এখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম কলেজের মতো তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার প্রথম মুসলমান প্রিন্সিপাল এবং ব্যক্তিগত জীবনে বাঙালি মুসলিম শিক্ষা বিস্তারের অগ্রপথিক নবাব আবদুল লতিফের জামাতা।
চট্টগ্রাম সরকারি সিনিয়র মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ থাকাকালে তাঁর ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন অধ্যাপক আবুল ফজল। তাঁর স্মৃতিকথা রেখাচিত্রের একাধিক স্থানে গর্বের সঙ্গে শিক্ষক শামসুল উলামা কামালুদ্দীন এর কথা লিখেছেন। আরবি শিক্ষিত হলেও অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন ছিলেন আপাদমস্তক একজন আধুনিক চিন্তা-চেতনার মানুষ। ‘চট্টগ্রামের আদি সংগীত প্রতিষ্ঠান আর্য সংগীত সমিতির তিনিই বোধ করি প্রথম মুসলমান সভাপতি ছিলেন। তিনি নিজেও খুব সংগীতপ্রিয় ছিলেন। বিনা দ্বিধায় হিন্দু ছাত্রদের সরস্বতী পূজায়ও দিতেন মোটা চাঁদা। দিয়ে অবশ্য বলতেন “আমার টাকাটা তোমরা খাওয়া দাওয়ায় খরচা করো।” ইসলামে সুদ দেওয়া-নেওয়া হারাম। তাই দীর্ঘকাল এদেশের মুসলমানরা কোন রকম বেঙ্ক করেনি। চট্টগ্রামের ইসলামাবাদ টাউন বেঙ্কই নাকি বাঙালি মুসলমান প্রতিষ্ঠিত প্রথম ও আদি বেঙ্ক। সমাজের গোঁড়া অংশের প্রবল বিরুদ্ধতা সত্বেও সেদিন যাঁরা এ বেঙ্ক প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছিলেন তার প্রধানদের অন্যতম ছিলেন শামসুল উলেমা কামালউদ্দীন।” চট্টগ্রামকে ভীষণ ভালবেসেছিলেন অধ্যক্ষ কামালুদ্দীন। তাই নিজ কন্যা রাহাত আরা বেগমকে (১৯১০-১৯৪৯) বিয়ে দিয়েছিলেন ফটিকছড়ি নিবাসী খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম এমএ বিএল-এর সঙ্গে। রাহাত আরা বেগম ছিলেন একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক। তিনি বাংলা ব্যতীত আরবি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। রাহাত আরা বেগম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত নাটক ‘ডাকঘর’ উর্দু ভাষায় অনুবাদ করেন ও স্বামীসহ ১৯২৭ সালে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি গিয়ে বিশ্বকবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কবিগুরু এই অনুবাদকর্মে খুবই খুশি হন। তিনি উর্দু ভাষায় বেশ কিছু ছোটগল্প লিখেন। দিল্লি থেকে ‘রাহাত আরা বেগম কী আফছানা নিগারী” নামে একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়। খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম এম.এ,বিএল ও রাহাত আরা বেগম দম্পতির ৪ ছেলে ৪ মেয়ের সকলেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভৌতবিজ্ঞানী ইমেরিটাস অধ্যাপক প্রয়াত ড. জামাল নজরুল ইসলাম তাঁদের সন্তান।
ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী অসহযোগ আন্দোলন, মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে সশস্ত্র যুববিদ্রোহ, ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং পাকিস্তান আন্দোলনে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র-শিক্ষকদের ভূমিকা অগ্রণী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই এই কলেজের ছাত্রদের গৌরবময় অবদান ও অপরিসীম ত্যাগ ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করে। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনের অপরিহার্য পরিণতিতে শহীদ স্মৃতির স্মারক হিসেবে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। চট্টগ্রামে প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনারটি নির্মিত হয় চট্টগ্রাম কলেজে। কলেজ অডিটরিয়ামের সম্মুখে ও কলেজের মেইন ভবনে উঠার সিড়িঁর নিচে তিন স্তরবিশিষ্ট শহিদ মিনার নির্মাণ করে প্রথম ছাত্র-ছাত্রীদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ। তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল শহীদ মিনার তৈরি করা। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয় পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৩ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি রাতে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ভোরবেলায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রনেতৃবৃন্দ যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে শহীদ স্মৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে ও শ্রদ্ধা জানায়।
১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ৬দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র-শিক্ষকদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মমতাজ উদ্‌দীন আহমদ রচিত ও নির্দেশিত স্বাধীনতার সংগ্রাম ও এবারের সংগ্রাম নাটক মঞ্চস্থ হলে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পাকিস্তানিদের প্রতি বাঙালিদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও উপেক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রতিরোধ যুদ্ধে ও পরবর্তীকালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে।
১৮৬৯ সাল থেকে ২০১৯; হাটি হাটি পা পা করে সুদীর্ঘ দেড়শ বছর অতিক্রম করছে চট্টগ্রাম কলেজ। ৬ একর জায়গা জুড়ে ১৬টি প্রাতিষ্ঠানিক ও ৪টি আবাসিক ভবন নিয়ে চট্টগ্রাম কলেজের অবস্থান। ১৮৪১ সালে স্থাপিত ঢাকা কলেজের পর এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় কলেজ। বর্তমানে কলেজে ১৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ১৭টি বিষয়ে পাঠ দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে এম এ শেষ পর্ব খোলা হয়। বিগত দেড়শ বছরে চট্টগ্রাম কলেজে জি.এম বটমুলী, পি সি কুন্ডু, অপূর্ব কুমার চন্দ, পদ্মিনী ভূষণ রায় বাহাদুর, আবু হেনা, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, এ এফ এম মোজাফ্‌ফর আহমদ, আবু রুশদ মতিনউদ্দিন, মো. আবু সুফিয়ান ও ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মত প্রখ্যাত দার্শনিক, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিকরা চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন; অধ্যাপনা করেছেন জনার্দন চক্রবর্তী, ড. সুবোদ চন্দ্র সেনগুপ্ত, ইদ্রিস আলী, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, আহমদ হোসেন, আবুল ফজল, যোগেশচন্দ্র সিংহ, রণজিৎ কুমার চক্রবর্তী, ড. মুহম্মদ ইউনূস, আবদার রশীদ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মমতাজ উদ্‌দীন আহমদ, ড. মনিরুজ্জামান, ড. জাহাঙ্গীর তারেক, ড. হুমায়ুন আজাদ, ড. শামসুল আলম সাইদ, ফেরদাউস খানসহ খ্যাতিমান শিক্ষকরা। ছাত্রদের মধ্যে খ্যাতিমানরা হলেন- ড. আতাউয়ুর হাকিম, আবদুর রহমান, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক, সাংবাদিক আবদুস সালাম, প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম, আসহাব উদ্দিন আহমদ, এএফএম মুজাফ্‌ফর আহমদ, এ কে খান, মাস্টারদা সূর্যসেন, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, কল্পনা দত্ত, নূর আহমদ চেয়ারম্যান, ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বাদশা মিয়া চৌধুরী, ড. বেনীমাধব বড়ুয়া, মাহবুব উল আলম, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ, হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, ওহীদুল আলম, বেলাল মোহাম্মদ, শফিউল আলম, আবুল মোমেন, মনসুর মুসা, মঈনুল আলম, ড. মাহবুবুল হক, ড. আবুল কাশেম, ড. শিরিণ আক্তার ও সুব্রত বড়ুয়ার মতো হাজারো কৃতী শিক্ষার্থী সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

x