সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম ও দৈনন্দিন টুকিটাকি

সাখাওয়াত হোসেন মজনু

সোমবার , ২১ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৪৯ পূর্বাহ্ণ
43

: চট্টগ্রামের ছেলে জামর এবং ফরাসি বিপ্লবের কিছু কথা।
: কেমন করে চট্টগ্রামের ছেলে জামর ফরাসি বিপ্লবের নায়ক হলেন সে তথ্য পেয়েছিলাম একুশে পত্রিকা পড়ে। এই জামর চট্টগ্রামের কোন অঞ্চলের ছেলে সে তথ্য পাইনি। তবে সাগর উপকূলে তার বাস ছিলো তা স্পষ্ট। চেহারায় ছেলেটি ছিলো কালো, কোকড়ানো চুল। অনেকটা আফ্রিকার কালো মানুষের মতোই। ছেলেটা সাগর উপকূলে বিচরণে ছিলো, আর সেই সময় ছেলেটিকে ধরে জাহাজে তুলে নেয় অসভ্য ইংরেজ দাস ব্যবসায়ীরা। সেই প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবী জুড়ে দাস প্রথা চালু ছিলো। গরিবদের সন্তানদের ধনীরা দাস হিসেবে কিনে নিতো, অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে দাস জনগোষ্ঠী কখনো মানুষের স্বীকৃতি পেতো না। কিন্তু এই শিশু দাস জামরের জীবনটা ছিলো ভিন্ন। সে কথা বলছি। চট্টগ্রামের সাগর উপকূল থেকে ইংরেজ দাস ব্যবসায়ীরা ধরে জাহাজে তুলে নিয়ে যায়। সময়টা বোধকরি ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ। ছেলেটির বয়স তখন ১০ কি ১১ হবে। সাগর জল, বাড়িঘর, আত্মীয় পরিজনদের স্মৃতিকে পেছনে ফেলে ছেলেটি জাহাজের অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো। কেউ জানলো না কোথায় গেলো ছেলেটি, আচমকা অসভ্য দাস ব্যবসায়ীর হাতে আটকা পড়ার কারণে সে কাউকে জানাতে পারলো না নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনা। নিয়তি চট্টগ্রামের এই ছেলেটিকে অজানার উদ্দেশ্যে নিয়ে গেলো। তথ্যে জানা গেলো এই ছেলেটিকে প্রথমে নিয়ে গেলো মাদাগাস্কার দ্বীপে। সেখানে তার স্থান হলো আরো অনেক দাসের সাথে। গরু, ছাগলের মতোই দাসদের বাজারে তোলা হলো তাকে। নতুন মনিবের সাথে সে এলো ফ্রান্সে।
: এবার বলছি ফ্রান্স জীবনের গল্প।
: সে সময় ফ্রান্সের রাজা ছিলেন সম্রাট পঞ্চদশ লুই। এই সম্রাট ১০ বছরের জামরকে দাস হিসেবে কিনেছিলেন। এই রাজার বান্ধবী ছিলেন মাদাম দি বারি। সম্রাট প্রিয় বান্ধবীকে প্রেমের নিদর্শন হিসেবে উপহার দিলেন বিভিন্ন দেশ থেকে আনা কুকুর, পাখি, বানর ও কিছু গৃহপালিত প্রাণী। একই সাথে সম্রাট তার বান্ধবী মাদাম বারি-কে উপহার দিলেন এই ১০ বছরের জামরকে। মাদাম ভেবেছিলেন এই বালক আফ্রিকার কোন অঞ্চলের হবে। তাই তিনি এই ক্রীতদাসকে নতুন নামে চিহ্নিত করলেন। নাম রাখলেন লুই বেনেডিকট জামর। কেন জানি জামরের প্রতি মাদামের মমতার জন্ম হলো। তিনি তাকে ভালো কাপড় ও পোশাকে সাজালেন, মানব শিশুর মর্যাদা দিলেন। অনেকটা পুত্রস্নেহে তাকে পড়ালেখা শেখানোর উদ্যোগ নিলেন। খ্রিস্টান ধর্মের দীক্ষা দিলেন। এই সময় তিনি সম্রাটের উপাধির সাথে যুক্ত করে তার নাম পুনঃ নির্ধারণ করে রাখলেন লুই বেনোয়া জামর। রাজপরিবারে থেকে জামর শিক্ষার নির্যাস গ্রহণ করলেন এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেন শিক্ষা জ্ঞান আহরণ করেই। নিজের মনের জ্বালা কখনো কাউকে প্রকাশ করেননি এবং নিজের জন্মভূমির পরিচয় প্রথম দিকে প্রকাশ করেননি। মনের ভেতরে পুশে রেখেছিলেন সকল যন্ত্রণা, স্বজন-পরিজন, বাংলার প্রকৃতি ও সাগর উপকূলের কথা। এদিকে তিনি পুত্র স্নেহ পেয়ে জ্ঞানের সরোবরে এগুতে থাকলেন। বিশ্ব সভ্যতা, অসহায় মানুষের ওপর অভিজাত জালেমদের অত্যাচার নির্যাতন এবং মুক্তির উপায় খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলেন অমর একটি গ্রন্থ। অমর এই গ্রন্থটির লেখক ছিলেন মনীষী রুশো, নাম ছিলো ওহংঃরঃঁঃরড়হং চড়ষরঃরয়ঁবং. এই গ্রন্থ পড়ে এবং অন্তস্থা করে তিনি নিজেই নিজের মনে বিপ্লবী মন্ত্র দীক্ষা নিলেন। পড়তে ও জানতে শুরু করলেন বিশ্বের দেশগুলোর কথা, শাসক শোষকের চরিত্রের কথা, অভিজাত শ্রেণির মানসিক চরিত্রের কথা। এগুলো জেনে তিনি নিজেকে তৈরি করলেন একজন বিপ্লবী হিসেবে। রাজ প্রাসাদে থেকেই জামর অগ্নি শপথে এগুতে থাকলেন, বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হলেন। রুশোর এই গ্রন্থ তাকে জাগিয়ে দিলো এবং তিনি পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক সচেতন হয়ে রাজনীতির বিষয়গুলো জানতে শুরু করেন। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন বিপ্লবী রাজনীতির সতীর্থ এবং দলের। দীর্ঘ চেষ্টা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি খুঁজে পেলেন গোপন বিপ্লবীদের, তাদের সাথে মিশতে শুরু করলেন, জানলেন তাদের পথ চলার দর্শন কি? কয়েক বছর দেখে শুনে এবং জেনে জামর যোগ দিলেন কমিটি অব পাবলিক সেফটি-নামক বিপ্লবী এই প্রতিষ্ঠানে। জামরকে রাজপরিবারে আশ্রয় দিলেও পরিবারটি ছিলো সে সময়কার অভিজাতদের প্রতিনিধি। তাই জামর বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষা নেয়ার পর মানসিকভাবেই ঠিক করলেন তিনি শোষক ও অভিজাতদের পক্ষে থাকবেন না। যেহেতু তিনি রাজপরিবারে থেকে সাধারণ মানুষের বিপক্ষে যাবেন না তাই তিনি রাজশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৯ বছর। বিপ্লবী জামর ইংরেজ বিপ্লবী জর্জ গ্রিভের সান্নিধ্যে আসেন এবং এই সময় তিনি ভার্সাই বিপ্লবী সংগঠনের সচিব হিসেবে নির্বাচিত হলেন। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে জামর রাজ পরিবারের গোপন তথ্য ফাঁস করে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ালেন। বিপ্লবে সম্রাটের পতন ঘটলো এবং মাদাম দি বারি রাজপ্রাসাদ থেকে বিতাড়িত হলেন। প্রথম দিকে মাদামকে গ্রেপ্তার করে পরে ছেড়ে দেয়া হলো। ছেড়ে দেয়ার পর মাদাম ইংরেজ অভিজাতদের সাথে মিলে বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলেন এবং পরে পুনরায় তাকে গ্রেপ্তার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো। মৃত্যুদণ্ড দেয়ার আগে মাদামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো তিনি বছরে দু’বার ইংল্যান্ড যেতেন পলাতক ফরাসি অভিজাতদের সাহায্য করতে এবং বিপ্লব যেন ব্যর্থ হয় সে সংগঠন গড়তে। সে বিচারের সাক্ষী হলেন বিখ্যাত বিপ্লবী জামর।
: এবার জানা প্রয়োজন জামর আত্মপরিচয় কেমন করে দিলেন।
: বিপ্লবী জামর লেখাপড়া ও জ্ঞান অর্জনের পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি এই পেশায় থাকতে। মাদামের বিচারে তিনি ছিলেন অন্যতম সাক্ষী। জামর এতোগুলো বছর অর্থাৎ চট্টগ্রাম থেকে ইংরেজ দাস ব্যবসায়ীদের দ্বারা ধৃত হওয়া থেকে শুরু করে আফ্রিকার মাদাকাস্কা দ্বীপে আসা, ফ্রান্সে দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া, সম্রাটের বাড়িতে দাস হিসেবে থাকা, মাদাম কর্তৃক পুত্রস্নেহ পাওয়া, লেখাপড়া শেখা, বিপ্লবে যোগ দেয়া এতোগুলো বছরের মধ্যে তিনি কখনো নিজের পরিচয় প্রদান করেননি। সাক্ষীর কাটগড়ায় দাঁড়িয়ে ৬ ডিসেম্বর ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ তিনি আদালতের সামনে বলেন, আমার নাম লুই বেনেডিকট জামর, আমি আফ্রিকান নই, ভারতের অন্তর্গত চট্টগ্রামের ছেলে। এখন আমি ভার্সাই কমিটি অব পাবলিক সেফটির আশ্রয়ে আছি। এই দেশে আমি দাস হিসেবে এসেছি। এক জাহাজের অধ্যক্ষ আমাকে প্রথমে কেনেন এবং তিনি আমাকে ফ্রান্সে নিয়ে আসেন। এখানে এসেই আমি মাদাম বি বারির গোলাম হই। (সূত্র : একুশে পত্রিকা, ১ মে ২০১৫) জামরের জীবনের শেষ পরিণতি ছিলো করুণ। নানা ঘাত প্রতিঘাতের পর জামর প্যারিস শহরে ছিলেন অনেকটা নির্বাসিতের মতোই। থাকতেন শহরের এক জীর্ণ ঘরে। অনাদর অবহেলা এবং অনেকটা অনাহারে কেটেছিলো তার শেষ জীবন। মাত্র ১০ বছর বয়সে সে দাস হিসেবে ধৃত হয়ে বন্দরে বন্দরে ঘুরতে হয়েছিলো পানির জাহাজে করে। পেরিয়েছিলেন সাগর, মহাসাগর। ওপরে নীলাকাশ ও নিচে সাগরের নীল জলেই ভেসে গেলো তার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের সময়টা কেটেছে বিপ্লবী দীক্ষায়। এই বিপ্লবী জামরকে নিয়ে এখন প্রচুর লেখা হচ্ছে। তাকে নিয়ে বেরিয়েছে উপন্যাস, তার ছবি ল্যুভর মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। তাকে নিয়ে এখন মেতেছে অনেকে। ভারতের দ্য টেলিগ্রাফ লিখেছে, চাইল্ড ফ্রম চিটাগাং (অমিতগুপ্ত) দ্য হিন্দুতে ‘ফর লিবার্টি অ্যান্ড ফ্রেটারনিটি’ (সরোজা সুন্দরারাজন) আনন্দ বাজার ‘বাঙালি এক দাসের কথা’ (অভিমন্যু সারথি) ক্রিস্টোফার এল মিলারের বই দ্য ফ্রেঞ্চ অ্যাটলান্টিক ট্রায়াঙ্গল : লিটারেচার অ্যান্ড কালচার অব স্লেভ-বিভিন্ন লেখায় চট্টগ্রামের জামরের নাম উঠে এসেছে এবং লেখা হয়েছে ফ্যান্স বিপ্লবে তাঁর অবদানের কথা।
: এই বিপ্লবীর নাম ফ্যান্সে জামর হলেও ধারণা করা হচ্ছে সে চট্টগ্রামের জমির। জমিরকেই মাদাম জামর হিসেবে তার নামকরণ করেছিলেন। লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

x