সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম ও দৈনন্দিন টুকিটাকি

সাখাওয়াত হোসেন মজনু

সোমবার , ১০ জুন, ২০১৯ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ

পবিত্র ঈদ উল ফিতরের বার্তা ছিলো সবার জন্য সুখ সমৃদ্ধি ও আনন্দের বার্তা বয়ে আনুক। এমন সুন্দর বার্তা কি সত্যিই আনন্দের বার্তা বয়ে এনেছে? নিজ ঘর, বাড়ি এবং আশেপাশের মানুষের সাথে মিশে যে বার্তা পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে এমন বার্তা আমাদের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষের এবং ব্যবসায়ীদের কানে মোটেও পৌঁছায়নি।
: কেন বলছি এ কথাটি তা আপনাদের জানাতে চাই।
১. গৃহকর্মী নুরজাহান। অন্যের ঘরে গিয়ে কাজ করেন। সংসার চালানোর জন্য তাকে অন্ততঃ ৩টি ঘরে কাজ করতে হয়। পবিত্র রমজান আসছে আসছে করছে এবং এসেই গেছে। ঘরের গিন্নি তাকে দিয়ে ঘরের সব কাজ করান। লোভ দেখান ঈদে তোকে এবং তোর পরিবারের জন্য অনেক কিছু দেবো। রোজা রেখে নামাজ পড়ে দেহ চলতে চায় না। তারপরও তাকে কাজ করতে হয়েছে। এদিকে দিন যায়, রোজা ২০ পেরিয়ে গেছে। বেগম সাহেবার কোনো খবর নেই। ২৭ রমজানের পর একটি থ্রি পিস এবং সাথে ৫০০ টাকা দিয়ে বলে, অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। তোকে ঈদের পর তোর বেতন দেবো। মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে : খালাম্মা আমি থ্রি পিস নিয়ে কি করবো, কোন টেইলার সেলাই করে দেবেন, এখন থ্রি পিস সেলাই করতে অন্ততঃ ১২০০ টাকা লাগবে। একথা বলে চোখের জল মুছে বাসায় ফিরলেন।
২. একটি ফ্ল্যাটের দারোয়ান হিরন মিয়া। বিয়ে করেননি। ঘরে মা, ছোট বোন, বাবা নিয়ে সংসার। বেতন পান ৮ হাজার টাকা। ফ্ল্যাটের বসবাসরত মানুষরা মাসিক ইউটিলিটি বিল দেয়ার সময় হয়নি। কারণ এই বিল সবাই দেন ২০ তারিখের পর। বিবেকী মানুষরা মাসের ২ তারিখে দিলেন। ফলে ফ্ল্যাট পরিচালকরা কোনোরকমে বেতন-বোনাসের ব্যবস্থা করে দিলেন। হিরন মিয়া বেতন-বোনাস পেয়ে খুশি হলেন। ছুটলেন সস্তার বাজারে। হাতে সময় মাত্র ২ দিন, ৫ তারিখে ঈদ। বোনের জন্য নতুন জামা কিনতে গিয়ে তো সে মাথায় হাত দিলো। দু’হাজার টাকার নিচে কোনো ড্রেস নেই। ৬/৭শ’ টাকার ড্রেসটির দাম চাইছে দু’হাজার টাকা। জামাটি দেখে ফিরে আসছিলেন হিরন। দোকানি বললেন, কিনবেন না, পছন্দ হয়নি! হিরন বললেন, ভাই সবই হয়েছে তবে এতো দাম দিয়ে কিনতে পারবো না। এবার দোকানি বললেন, আপনি কতো দিতে পারবেন? হিরন আমতা আমতা করে বলেন ৬শত টাকা দেবো। দোকানি কড়া চোখে চোখ রাঙিয়ে ধমকের স্বরে বললেন, পচা কাপড়ে টুকরো কিনে নেন। তার একথা শুনে পাশে বসা এক তরুণ ক্রেতা দোকানিকে দিলেন এক ধমক। তারপর লংকা কাণ্ড। অসংখ্য ক্রেতা জড়ো হলেন। পাশের দোকানের মালিক এলেন। তিনি সব শুনে হিরনের মাথায় হাত বুলালেন। দোকানিকে বললেন, সেই জামাটি বের করতে। জামাটি বের করতেই তিনি চার দোকানের কর্মচারিকে বললেন, এই জামার দাম কতো? দোকানের কর্মচারি জামার মধ্যে লাগানো স্টিকার দেখে বললেন, মিয়া ভাই এই জামাটি আমাদের দোকানে আছে। আমরা বিক্রি করেছি ৬শত টাকা। অবস্থা বুঝুন। এক দোকানে ২ হাজার টাকা, অন্য দোকানে ৬শত টাকা। পরে বকা ঝকা, চড় থাপ্পড়ের পর হিরন মিয়া বোনের জন্য জামাটি কিনতে পেরেছেন ৬শত টাকায়।
৩. মাংস কেনা প্রয়োজন। দাম হাঁকালেন ৭০০ টাকা। কেনার পর দেখা গেলো হাঁড়-আর চর্বি। এক কেজি মাংস কিনে পেলেন ৫০০ গ্রাম, বাকিগুলো হাঁড় ও চর্বি। কোনো প্রতিবাদ করা গেলো না। গরুর মাংস নয়, সবগুলো পুরনো এবং মহিষের মাংস। রক্তের মধ্যে ডুবিয়ে ফ্রেস দেখানো হয়েছে। একই অবস্থা ফার্মের মুরগি। দাম হাঁকলো ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। পেটের ভেতরে অন্ততঃ ২৫০ গ্রাম কাঁকর ভর্তি খাবার। যতক্ষণ ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ততক্ষণ দাম ছিল নিয়ন্ত্রনে। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা। আবার সব কিছুতেই ওজন কম। মাছ সে তো স্বর্ণের চাইতে দামি। মাছের ওপর দিয়ে রাখে পুকুরের নানা ধরনের শ্যাওলা। বুঝাতে চাইছেন এই মাত্র ধরে আনা হয়েছে পুকুর থেকে। মানুষকে ধোঁকা দেয়ার কৌশল। মাছ কেটে রক্ত দিয়ে সাগরের কাটা মাছকে রাঙিয়ে দেয়া হয়, যেন একেবারে তাজা। জীবিত মাছের পানিতে ছিটানো হয় অঙিজেন পাউডার। জীবিত মাছকে আরো জীবন্ত রাখার জন্য। মানুষ দেখছে, বুঝছে কিন্তু প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। খোদ নেতাদের কেউ কেউ এদের রক্ষাকর্তা। ফলে এদের দাপট নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সাগরের মাছের মধ্যে একধরনের পানি দিয়ে ডুবিয়ে তোলা হচ্ছে কিন্তু কে প্রতিবাদ করবে?
: এবার বলি অন্য কথা।
: যে শাড়ি কেনা হলো রমজানের পূর্বে ৯৫০ টাকায়, ঈদের বাজারে সেটা হাঁকা হয়েছে ৪০০০ (চার হাজার) টাকায়। কোনো কোনো দোকানে ৫ হাজার টাকার বেশি। আর গার্মেন্টস কর্মীরাতো চোখের জল ফেলেছেন। এক ডজন কলার মূল্য ২৫০ টাকা, আমের কেজি, পেঁপে সেগুলো সাধারণের ক্রয়সীমার বাইরে। অর্থাৎ একজন সাধারণ মানের ক্রেতার পক্ষে কি এমন অগ্নিমূল্য ডিঙিয়ে ঈদে সুখ সমৃদ্ধি আনা কি সম্ভব? তারওপর তো ভেজাল আছেই। তিন মাস পরও যখন একটি আম পচেনি তখনতো বলার কিছুই নাই। পচা সেমাই, নষ্ট স্থানে তৈরি ঘি, লাচ্ছা সবইতো তদারকিবিহীন খাদ্যদ্রব্য খেয়েইতো আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি। এইতো আমাদের জীবন।
এবার বলুন ঈদ কেমন করে সবার জন্য অনাবিল সুখ আনতে পারে? আমাদের সমাজের কতো শতাংশ মানুষ ঈদের খুশি নিয়ে দিন কাটিয়েছে? কতো শতাংশ মানুষ ঠিকমতো খেতে পেরেছেন? আমার দেখা কিছু ঘরেতো সেমাই বা একটু পোলাও বা একটু মাংস খেতে পেরেছেন? সেই ব্যাখ্যা দেয়া হয়তো সম্ভব নয়। তবে আমাদের কিছু বন্ধু ঈদের পূর্বরাতে অনেকটা গোপনে ঈদের সেমাই, দুটি মুরগি, কিছু পোলাও চাল, সামান্য তেল, মসল্লা নিয়ে বিশেষ বিশেষ ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। সাথে একটি শাড়ি বা লুঙ্গি বা একসেট শিশুর জামা। এটাই ছিলো তাদের জন্য ঈদ উপহার। তারাতো কাজটি করেছেন অতি গোপনে। ঈদের দিন খবর নিয়েছি। শিশুটি আনন্দের সাথে জানিয়েছে, আমি গোস্ত দিয়ে ভাত খাইছি। নতুন কাপড়ে দেখিয়ে বলেছে, নতুন কাপড়-ঈদের কাপড়। এই ছোট্ট শিশু আনন্দটা ছিলো চোখে জল আনার কথা। এটাই ছিলেন ঈদের সবার জন্য বয়ে আনুক আনন্দের বার্তা। যে ব্যবসায়ী কাপড় বেচলেন, যে ব্যবসায়ী জুতা বেচলেন, যে ব্যবসায়ী মাংস বা মুরগি বেচলেন, যে ব্যবসায়ী ঈদের সামগ্রী বেচলেন-এবার উত্তর দেয়ার ব্যাপারটাতো তার। যেখানে খ্রিস্টান সম্প্রদায় বা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান সম্প্রদায় বা ভারতের কিছু স্থানে হিন্দু ব্যবসায়ীরা সব ধরনের নিজ নিজ পণ্যের দাম কমিয়ে দেন যেন স্ব স্ব সম্প্রদায়ের মানুষ কমমূল্যে দ্রব্য কিনে উৎসব পালন করতে পারে। আমাদের বাংলাদেশের কিছু (সব ব্যবসায়ী নয়) ব্যবসায়ী রমজান বা ঈদের সময় পণ্যের দাম এমন স্থানে নিয়ে যায় যেন কেউ প্রকৃত দাম দিয়ে কেনাকাটা করতে না পারে। অনেক ব্যবসায়ীতো মনে করেন ঈদের সময় ব্যবসা মানে পুরো বছরের লাভটা করে নেই। এদের মৃত্যুর কোনো ভয় নেই, সামাজিক লজ্জার কোনো ভয় নেই। এদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে লাভ, শুধুই লাভ। মানুষের কথাতো তারা ভাবেন না-যদি ভাবতেন তাহলেতো এমন আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্যের কোনো কারণ থাকার কথা নয়। সবই যদি কিছু ব্যবসায়ীর কারসাজি হয় তাহলে বুুঝুন-কেমন ঈদ পালন করেছেন সাধারণ মানুষ!
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

x