সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকে সুফিসাধক লালন শাহ ও তাঁর ধর্ম ভাবনা

এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ

শুক্রবার , ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ
77

বাউল সমপ্রদায়ের উদ্ভব হিন্দু-কুল থেকে। আর্যস্বামী দয়ানন্দ সরস্বতির বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ গ্রন্থে তিনি কর্তাভজা, বাম মার্গী, বীজ মার্গী, ছুলি মার্গী, আপা পন্থি, অঘোরী বাউল-সমপ্রদায় সমূহের কথা উল্লেখ করেছেন,তারা সবাই অমুসলিম। তাঁর কথিত বাউলতত্ব বা বাউল সাধনায় যে দেহতত্ত্বের নামে যৌন নোংরামির কলঙ্ক কালিমার কথা রয়েছে, তাতে কুত্রাপি মুসলমান লালন শাহের বা তাঁর অনুসারীদের নাম নেই। অথচ লালন শাহকে নিকৃষ্ট অধঃপতিত বাউল দলে ফেলে আজ তাঁর চরিত্রকে কলুষিত করা হচ্ছে। তাঁর সুফি সাধনাকে বাউল সাধনা বলে প্রচার করে তাঁকে তাঁর ইসলাম ধর্ম থেকে বিচ্যুত করে কথিত ‘মানবধর্ম’ বাদী বানানো হচ্ছে। যা সুফি সাধক, মরমী কবি লালন শাহ তথা সুফিবাদকে হেয় প্রতিপন্ন করার এক জঘন্য চক্রান্ত।
প্রশ্ন জাগে, ইসলাম ধর্ম থেকে বড় কোন মানবতার ধর্ম আছে এ জগতে? যে ধর্মে বলা হয়েছে,’ তুমি যতবড় ইবাদতকারী হওনা কেন, যদি তুমি পেট পুরে খেয়ে ঘুমাও আর তোমার প্রতিবেশী (যে ধর্মের হোকনা কেন) অভুক্ত থাকে, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত হারাম।
লালন খাঁটি মুসলমান। যশোর জেলার হরীনাকুন্ড থানার কুলবেড়ে-হরিশপুর গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা গরীবুল্লাহ দেওয়ান ও মাতা আমীনা খাতুন। সুফি সিরাজ সাঁই, সাধক পাঞ্জু শাহ ও লালনশিষ্য দুদ্দু শাহ’র বাড়িও একই গ্রামে।
সিরাজ সাঁইজি, পাঞ্জু শাহ ও দুদ্দু শাহ, শুক্কুর শাহ ও লালন শাহ সবাই ছিলেন বিবাহিত। লালন শাহ ছাড়া সবাইর অধস্তন পুরুষেরা রয়েছেন। শুধু লালনের পুত্র কন্যা নেই।কিন্তু তাঁর ভাই কলম শাহ’র উত্তর পুরুষেরা হরিষপুরে রয়েছেন। তাঁর বসতবাড়ির হদিস আছে।এখানে লালন একাডেমী স্কুল রয়েছে। আমাদের তথাকথিত গবেষকেরা লালনের জন্মস্থান কুলবেড়ে হরিষপুর না আসার কারণ কি? তাঁরা বসন্ত পালের মনগড়া ইতিহাস পড়ে মুসলমান লালন শাহকে তারা হিন্দু বানিয়ে ছেড়েছেন।
লালন-শিষ্য দুদ্দু শাহ’র রচিত পুঁথিতে তার বিশদ বিবরণ আছে।তাঁর জন্ম মৃত্যুর সঠিক তারিখ উল্লেখ আছে।
“এগারো শ উনআশি কার্তিকের পহেলা,
হরিষপুর গ্রামে সাঁইর আগমন হৈলা।
যশোহর জেলাধীন ঝিনাইদহ কয়,
উক্ত মহকুমাধীন হরিষপুর হয়।
গোলাম কাদের হন দাদাজি তাহার,
বংশ পরস্পরা বাস হরিষপুর মাঝার।
দরীবুল্লা দেওয়ান তার আব্বাজির নাম,
আমিনা খাতুন মাতা এবে প্রকাশিলাম।
০ ০ ০ ০
বারশত সাতানব্বই বাংগালা সনেতে,
পহেলা কার্তিক শুক্রবার দিবা অন্তে।
সবারে কাঁদায়ে মোর প্রাণের দয়াল,
ওফৎ পাইল মোদের করিয়া পাগল। (লালন পরিচিতি – মুহাম্মদ আবু তালেব)
সমপ্রতি লালন- সিরাজের সিজরানামা বা গুরু-কুল-লিপি উদ্ধৃত হয়েছে। তদ্বারা জানা যায়,তিনি চিশতি- নিজামী তরিকাপন্থী ফকির ছিলেন। সুফি সাধক সিরাজ শাহ’র শিষ্য বা খলিফা হিসেবে তিনি বিখ্যাত সুফি শাহ আমানত শাহ (রঃ)র (চট্টগ্রাম)খিলাফতী সিলসিলা ঘরানার আধ্যাত্মবাদী সাধক।
(প্রাগুক্ত গ্রন্থে সিজরানামা দেয়া আছে)
(লালন শাহ ও লালনগীতিকা- মুহাম্মদ আবুতালিব সহ বহু মুসলিম লেখকের লেখায় সত্য তথ্য রয়েছে)।
অধম কাঙ্গাল তাঁর ‘সহি আক্কেল নামা’য় উল্লেখ করেন,
“ছেরাজ সাঁই দরবেশের তালেব
লালন শাহ তার নাম,
মুল্লুুকে যার ছন্দ গান রচনা তামাম।।”
বিখ্যাত গবেষক ডক্টর উপেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য স্বয়ং শ্রী বসস্ত কুমার পাল মহাশয় কথিত ভাঁড়ারা গ্রামে গিয়ে তাঁর কথিত লালন চন্দ্র দাস বা মায়ের নাম পদ্মাবতী কাহিনীর কোন সত্যতা খুঁজে পাননি। তিনি তাই স্পষ্টই বলেছেন,”লালনের জীবনবৃত্তান্ত সম্বন্ধে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা যায় নাই। আমি কয়েক বছর চেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু তাঁহার সম্বন্ধে যে সমস্ত বিভিন্ন কথা শোনা যায়, তাহা প্রায়ই জনশ্রুতি।” এ’কথার সূত্র ধরে অধ্যাপক মুহাম্মদ আবু তালিব বলেন,” দুঃখের বিষয় ভাড়ারার মত হরিশপুরে গিয়ে লালন সম্বন্ধে তথ্যানুসন্ধানের সুযোগ তাঁর হয়নি, ফলে হরিশপুর সম্পর্কিত কথা কিংবদন্তীর মধ্য থেকে প্রাপ্ত লালনজীবনীর সত্যাসত্য নির্ণয়ের সুযোগ থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। অনুরূপভাবে বঞ্চিত হয়েছেন বসন্ত কুমার পালও। বর্তমান নিবন্ধকারের নিকট লিখিত এক পত্রে বসন্ত কুমার বাবু এ’কথা স্বীকারও করেছেন যে পূর্বোক্ত দুদ্দু শাহ বা আবদুল ওয়ালির পূর্বলিখিত ও প্রকাশিত বিবৃতির কথা তিনি ইতিপূর্বে জানতে পারেন নি বা কোথাও দেখেনও নি।”
অধ্যাপক মুহাম্মদ আবু তালিব তাঁর ‘লালন চারিতের উপাদান তথ্য ও সত্য’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন,” বলা বাহুল্য, এতদিন ধরে লালনের ব্যক্তিজীবন, ধর্ম ও সময়কাল নিয়ে যে সব বাক বিতর্ক চলছিল, দুদ্দু শাহের পুঁথিখানি প্রাপ্তিতে তার প্রায় সকল সমস্যারই সমাধান হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রচলিত জীবনকাহিনীর জট উন্মোচনের সহায়ক প্রাসঙ্গিক বিবিধ দলীল দস্তাবিজও সমপ্রতি উদ্ধৃত হয়েছে।” (লালন শাও ও লালন গীতিকা, ১ম খণ্ড, ২য় খণ্ড–বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৬৮)
বিশিষ্ট গবেষক (একদার ঝিনাইদহের শৈলকূপার সাবরেজিস্টার) ও দুদ্দু শাহ’র সমসাময়িক মরহুম আবদুল ওয়ালি লালন শাহ সম্বন্ধে তাঁর ঙহ ংড়সব পঁৎরড়ঁং ঞরহবঃং ধহফ ঢ়ৎধপঃরপব ড়ভ পবৎঃধরহ পষধংংবং ড়ভ ঋধশরৎং রহ ইবহমধষ প্রবন্ধে লেখেন,”অহড়ঃযবৎ ৎবহড়হিবফ ধহফ সড়ংঃ সবষড়ফরড়ঁং াবৎংরভরবৎ যিড়ংব উঁযধ ধৎব ঃযব ৎধমব ড়ভ ঃযব ষড়বিৎ পষধংংবং ধহফ ংঁহম নু নড়ধঃসবহ ধহফ ড়ঃযবৎং ধিং ভধসবফ খধষধহ ঝযধয. ঐব ধিং ফবংপরঢ়ষব ড়ভ ঝবৎধল ঝযধর ধহফ নড়ঃয বিৎব নড়ৎহ ধঃ ঃযব ারষষধমব ঐধৎরংযঢ়ঁৎ, ঝঁনফরারংরড়হ ঔযবহরফযধ, উরংঃৎরপঃ ঔবংংড়ৎব. (ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ ঃযব অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মরপধষ ঝড়পরবঃু ড়ভ ইড়সনধু,১৯০০-ঠ ঘড়.৪) এখানে গবেষক হরিষপুরকে শুধু লালনের বাসস্থান নয়, ‘জন্মভূমি’ বলেছেন।
বিশিষ্ট লালন গবেষক অধ্যাপক আনোয়ারুল করিম, যাঁর বাড়ি যশোর জেলায়, তিনি বহুদিন ঝিনাইদহ মহকুমায় ছিলেন; নিজে কুলবেড়ে হরিশপুর গিয়ে মহাত্মা লালন সম্পর্কে খোঁজ নেন।
তিনি হরিশপুর নিবাসী সাধক মরহুম পাঞ্জু শাহ’র মধ্যম পুত্র জনাব রফি উদ্দিন, ফকির অটল শাহ, ১২০ বছর বয়সী আহাদালী, ৭০ বছরের আবদুল আজিজ সাহেবের সাথে আলাপ করে নিশ্চিত হয়েছেন যে,লালন শাহ কুলবেড় হরিশপুরের অধিবাসী।এবং একটি বংশলতিকা প্রকাশ করেছেন।
দরিবুল্লাহ শাহ (পিতা)–> তিনপুত্র, আলম ,কলম ও জামাল (লালন)।
আলম ও লালন নিঃসন্তান। লালনের ভাই কলম –>ময়না বিবি –>সাগর বিবি –>ছবিরুন নেছা বিবি–> ক্ষেপা। “তিনি যে মুসলমান ছিলেন এবং তাঁর বাড়ি যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার কুলবেড়ে হরিশপুরে ছিল, সে সম্বন্ধে আজ সন্দেহ নেই” (বাউল কবি লালন শাহ– অধ্যাপক আনোয়ারুল করিম)
লালন শাহ ছিলেন খাঁটি সুফি সাধক। চিশতিয়া, কাদেরিয়া, কলন্দরিয়া সহ অনেক সুফি তরিকার সুফিগণ তাঁদের সাধনমার্গে সংগীতকে আধ্যাত্মবাদের অনুসঙ্গী করে নিয়েছিলেন।তাঁরা সংগীতে বিশ্বাসী ছিলেন। খাজা মঈন উদ্দিন চিশতী, কুতুব উদ্দিন দেহলবী, ফরিদ উদ্দিন শকরগঞ্জী, জালাল উদ্দিন পানিপথি, নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, শেখ সলিম উদ্দিন ফতেহপুরী এবং হযরত আমীর খসরু- এরা সবাই সংগীতকে সাধনার মাধ্যম করেছিলেন। সুফি সাধক লালন শাহও এই দলভুক্ত। তাঁদের মতই ছিলেন ‘পীরপন্থী’। তাঁরও বাণী-‘ জিন্দাপীর আগে ধররে….’।এ’সব সংগীতের বিষয়বস্তু আল্লাহ প্রেম,রাসুল পরস্তি, সৃষ্টিতত্ত্ব, মানবপ্রেম,বিশ্বভ্রাতৃত্ব। ভারতীয় মরমীয়াবাদে মুসলিম সুফি সাধকদের অবদানের কথা ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন। সুফিদের মরমীসংগীত বিষয়ে ডক্টর মাখনলাল রায় চৌধুরী হজরত ইমাম গাজ্জালীর (রঃ) ‘কিমিয়া’ আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন,” ইমাম গাজ্জালীর (রঃ) মতে কিমিয়া সংগীত হচ্ছে পাষাণে নিহিত সুপ্ত আগুনের মত।ঘর্ষণে শিলা থেকে যেমন আগুন বের হয় এবং তা গোটা অরণ্য দগ্ধ করে তেমনি সংগীতের স্পর্শে আত্মার আগুন জ্বলে উঠে। সোনা যেমন আগুনে পুড়ে বিশুদ্ধ ও রূপবান হয়, তেমনি হৃদয়কে সংগীতের আগুন মুকুরে পরিণত করে, যার মধ্যে প্রতিবিম্বিত হয় জগতের সৌন্দর্য।”
ফকির লালন শাহ সুফি সাধক, কিন্তু তাঁর প্রতিভা গীতিকবির। সাহিত্যের উদ্দেশ্য সৌন্দর্য সৃষ্টি। এর উৎস ভাব। অন্তরের অনুভূতি ভাবে পরিস্ফূটিত হয়ে রসে রূপ লাভ করে। জাগে আনন্দ। আনন্দ বাঙময় হয়ে সাহিত্যে ফুল হয়ে ফুটে।… সংগীতে যা কেবলই রস, সাহিত্যে তার উদ্ভাবন রূপে। লালনের গানে রূপ ও রসের অপূর্ব মিলন ঘটেছে। তাই তাঁর গান সংগীত হয়েও সাহিত্য, যা আত্মবোধকে আনন্দে পূর্ণ করে তোলে।”-(লালনের গান-ডঃ আনোয়ারুল করিম)
লালনের গান বাণীপ্রধান। এ’গান আধ্যাত্মিক। তাঁর গানের পরিবেশনায় তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সংযোজিত হয়েছে। কথিত বাউল সংগীতের ইতিহাসে লালনের গান স্বতন্ত্রভাবে গণমনে রেখাপাত করে আছে।” এর কারণ, তিনি তাঁর গানে নিপীড়িত মানুষের বেদনার কথা ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
সমাজের বর্ণবৈষম্য, ধর্মীয়,অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়ন ইত্যাদির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁর গানে তিনি মানুষকে সকল সংকীর্ণতা,স্বার্থপরতা এবং সামপ্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি মানতেন, সব মানুষই এক আল্লাহ’র সৃষ্ট। খলিফাতুল্লাহ। এক আদমের সন্তান। ভাই ভাই।কিন্তু জন্মের পরে মানবসৃষ্ট নানান ধর্মে গোত্রে বিভাজিত হয়ে নানান নামে পরিচিতি লাভ করে। মূলে সবই এক। তাই লালন শাহ বলেন, ‘কুপে গেলে কুপজল হয়
গংগায় গেলে গংগাজল কয়, মূলে একজল ভিন্ন জানায় পাত্র অনুসারে’।
এমনকরে লালনের পূর্বে এত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অন্য কোন সাধক, দার্শনিক, কবি, গীতিকার বলতে সক্ষম হয়নি এবং তাই লালনের গান সাধারণ থেকে অসাধারণ মানুষের মন সহজেই জয় করে নিয়েছে।
যারা তাঁর ‘সবলোকে কয় লালন কি জাত সংসারে…… গানকে ভিত্তি করে বলতে চান,তিনি জাত পাত মানেননা, ধর্ম মানেননা,তাঁর ধর্ম মানবধর্ম- এসব কথা বলার কোন অবকাশ নেই।
প্রসংগত উল্লেখ্য, লালন সংগীত ও লালন জীবন দর্শন একেশ্বরবাদী ব্রহ্ম ধর্মেও উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর একটি গান–
“প্রতিমা গড়ায় ভাস্করে / মূলে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে / আবার গুরু বলে তারে / এমন পাগল কে দেখেছে।
মাটির পুতুল গড়ে নাচায় /একবার মারে একবার বাঁচায়…..”। তুলনীয় ব্রাহ্ম সংগীত —
“আপনি গড়হ যাকে / যে তোমার বসে তাকে /কেমনে ঈশ্বর ডাকে কর অভিপ্রায়?
কখনো ভূষণ দেহ, কখনো আহার / ক্ষণেকে স্থাপন, ক্ষণেকে কর সংহার….”।
তবে ব্রহ্মধর্ম ‘তুহফাত-উল- মুআহহিদীন’ এ কথিত একেশ্বরবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তাঁরা হযরত মুহাম্মদকে (দঃ) নবী হিসেবে না মানায় লালন বলেন, ‘নবী না মানিল যারা, মুয়াহিদ কাফের তারা।
সে কাফের দায়মাল হবে, বেহিসাব দোজখে যাবে,ধাক্কায়’…।
এ’গানে লালন যেমন আল্লাহ’র একত্বে বিশ্বাস ও রাসুলে (দঃ) বিশ্বাস স্থাপনের কথা বলেছেন তেমনি নিজেকেও আল্লাহ, রাসুলে নিঃশর্ত সমর্পণ করেছেন।
আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে ‘খলিফাতুল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ’র প্রতিনিধি / ভাইসরয় করে পাঠিয়েছেন। লালন এই মানব জনমকে সার্থক করে তুলতে লিখলেন,-
“এমন মানব জনম আর কি হবে
মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে।
অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
শুনি মানবের উত্তম কিছু নাই
দেব দেবতা গণ করে আরাধন
জন্ম নিতে মানবে।।…..
নিন্মের এ’গানটিতে সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব আত্মতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে।
“সাঁইয়ের লীলা দেখে লাগে চমৎকার,
ছুরাতে করিল সৃষ্টি আকার কি সে নিরাকার।
আদমেরে পয়দা করে খোদ ছুরাতে পরোয়ার,….
নুরের মানে হয় কোরানে
নুর বস্তু সে নিরাকার প্রমাণে
কেমন করে নুর চুয়ায়ে হয় সংসার।।
আহমাদি-রূপে ছাদি দুনিয়ায় দিয়াছে বার।
লালন বলে মনে দেলে সেওতো বিষম ঘোর আমার।।”
লালন শাহ তাঁর গানে যে সৃষ্টিতত্ত্বের আলোচনা করলেন,তা কোরান শরিফের একটি আয়াতকে স্মরণ করিয়ে দেয়,’ ফাইন্না আল্লাহা খালাকা আদামা আ’লা ছুরাতিহি ফাআ’রেফ নাফছাকা তাআ’রেফু রব্বাকা’। অর্থ-আল্লাহ তায়লা আদমকে নিজের অনুরূপ কর্তৃত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। অতএব তুমি তোমাকে চেন। তোমার রবকে চেন।
সুফি সাধক লালন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (দঃ) প্রতি পূর্ণ ঈমান রেখে নিজেকে সমর্পণ করেছেন।
হযরত মুহাম্মদ’র (দঃ) তীরোধানকে স্মরণ করে লালন লেখেন,’
তোমার মত দয়াল বন্ধু আর পাবোনা,
দেখা দিয়ে ওগো রসুল ছেড়ে যেওনা।
তুমি হও খোদারই দোস্ত, অপারের কাণ্ডারি সত্য
তোমা বিনে পারের লক্ষ্য আর দেখা যায়না।
আসমানি আইন দিয়ে আমাদের আনলে রাহে
এখন মোদের ফাঁকি দিয়ে ছেড়ে যেওনা।”
আবার বলেছেন,’
রসুলকে চিনলে পরে খোদা চিনা যায়’।
লালন আল্লাহকে মনে প্রাণে ভালোবেসে ছিলেন। তাই রচনা করেন-
‘ লা ইলাহা কলেমা পড়….’
‘ ইলাহি আলমিন গো আল্লাহ…. সহ বহু ‘ হামদ’।
আর সে ভালোবাসার উৎসস্থল হচ্ছেন নবী মুহাম্মদ (দঃ) উপর মহব্বত। আল্লাহর প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা ছিল সুফিদের প্রেমাস্পদের প্রতি প্রেমিকের অন্তরনিহিত ভালোবাসা।
লালন শাহ’র কাব্যের আধ্যাত্মবাদ ও তত্ত্বালোচনার সাথে হজরত ইমাম গাজ্জালীর (রঃ) ‘কিমিয়া শাদাত’র অপূর্ব মিল রয়েছে। অর্থাৎ শুধু আল্লার উপর ঈমান আনলে হবেনা,তাঁর রাসুল (দঃ)-এর উপরও ঈমান আনতে হবে। যেমন–
‘মোহাম্মদ মোস্তফা নবী….’
‘রসুল রসুল বলে ডাকি…..’
নবীর আইন পরশ-রতন…. ‘ সহ বহু নবী প্রশস্তি ( নাত-ই-রসুল) রচনা করছেন তিনি।
যারা রাসুল (দঃ) কে মানবেননা তাদেরকে বিনা বিচারে ধাক্কা মেরে মেরে দোজখে ফেলা হবে।
এ’ছাড়াও আল্লাহ রাসুল (দঃ)এর উপর, ঈমান আকিদার উপর তাঁর অসংখ্য সুফিতাত্ত্বিক সংগীত রয়েছে।
লালন শাহের আগে বা পরে এমন আধ্যাত্মিক সুফি সংগীত আর রচিত হয়নি।
” কবি সাহিত্যিকদের অনেকেই তাঁর গীতি-সাহিত্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, অনেকে তাঁর অক্ষম অনুকারীও ছিলেন।….. বিহারীলাল চক্রবর্তী, উনিশ শতকের বাউলগীতির অন্যতম প্রধান প্রচারক ও সাধক কাংগাল হরিনাথ মজুমদার (কুমারখালি, কুষ্টিয়া), সাহিত্য সাধক মীর মোশাররফ হোসেন (১৮৪৮–১৯১২), ঐতিহাসিক গবেষক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সুসাহিত্যিক রায় জলধর সেন এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এই অসাধারণ মরমী কবি-সাধকের বাণীসমুদ্রে অবগাহন করে ধন্য হয়েছিলেন। যার ফলশ্রুতি হিসেবে বাংলাদেশের সুধী-সমাজ লাভ করেছিল বিহারীলালের ‘বাউল বিংশতি ‘ ‘সারদা মঙ্গল ‘, ‘সাধের আসন’ ইত্যাদি কাব্য ও কবিগুরুর ‘ বাউল'(১৯০৫), ‘আত্মশক্তি ‘, ‘জবষরমরড়হ ড়ভ সধহ’ (১৯৩১), ‘মানুষের ধর্ম'(১৯৩৩) ইত্যাদি সাহিত্য ফসল ও ধর্মীয় চিন্তার বিবর্তনমূলক গ্রন্থরাজি”। (লালন-চারিতের উপাদান : তথ্য ও সত্য-অধ্যাপক মুহাম্মদ আবুতালিব)
লালন শাহ তাঁর জীবদ্দশায় কি কোন ধর্মমত প্রচার করেছিলেন? এর এককথায় জবাব, ‘না’। তাহলে আজ ‘ লালন সাঁই’ নামের ধর্মমত চালু করলো কারা?
সুফি সাধক লালনকে হিন্দু-কূলে জন্ম নেয়া ‘বাউল’ এবং ধর্মহীন নাস্তিক বানানোর একটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত শ্রী বসন্ত কুমার পাল যে ‘ লালন জীবনী’ প্রণয়ন করেন, তাতে লালনকে কায়স্থ সন্তান ‘লালন দাস’ নামে উল্লেখ করেন। ডক্টর উপেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্যও পাল মশায়ের মত হরিশপুর না গিয়েই একই মত প্রকাশ করেন। যদিও পরে তিনি ভুল স্বীকার করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লালনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেও তা অস্বীকার করেছেন। তিনি লালনের গান তাঁর কণ্ঠে শুনেছেন।এবং আখড়া থেকে লালনের গানের খাতা নিয়েছেন।অথচ তিনিই লিখেছেন, “বাউলের গান শিলাইদহে খাঁটি বাউলের মুখে শুনেছি এবং তাদের পুরাতন খাতা দেখেছি।”লালনের গানের এই খাতাটি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গিয়ে আর ফিরিয়ে দেননি। যদিও তাঁর জীবনীকারেরা বলেছেন যে, কপি করে ‘গুরুদেব’ ফিরিয়ে দিয়েছেন। অথচ লালন ফকিরের গানের মূল খাতাটি এখন বিশ্ব ভারতীর ‘ রবীন্দ্র সদনে’ রক্ষিত রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্র সাহিত্য পুরোপুরিই লালান শাহ’র প্রভাবে প্রভাবিত। ‘হিন্দু মেলা’র রবীন্দ্রনাথের পূনর্জন্ম হয়েছে লালন সান্নিধ্যে ও লালনের গানের মানবতাবাদ এবং আধ্যাত্মিকতার সংস্পর্শে এসে। ” রবীন্দ্রনাথের সমগ্র গীত রচনায় বাউল তথা লালন ফকির নিভৃতে প্রেরণার উৎস- তাঁর স্মৃতির দোসর” (লালনের গান-অধ্যাপক আনোয়ারুল করীম) আনোয়ারুল করিম তাঁর গ্রন্থে লালন খাঁটি লালন সুরে রচিত অসংখ্য রবীন্দ্র সংগীতের তালিকা দিয়েছেন।বলেছেন,’ শুধু সুরেই নয়, ভাবের দিক থেকেও রবীন্দ্রনাথের প্রায় গানই বাউল ও লালনগীতি পুষ্ট ‘( প্রাগুক্ত)।
তাঁর’নোবেল প্রইজ’ প্রাপ্ত ‘সং অফারিংস’র(গীতাঞ্জলী) সমস্ত গানেই অলক্ষে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন ফকির লালন শাহ। রবীন্দ্রনাথ দেশে বিদেশে মানুষের ধর্ম নিয়ে (রিলিজিয়ন অব ম্যান) অসংখ্য বক্তৃতায় লালনের গানের বহু উদ্ধৃতি দিয়েছেন।লালনের দর্শনে অবগাহন করে নিজেকে ‘রবীন্দ্র বাউল’ বলেছেন, কিন্তু তাঁর সাগর সম সাহিত্যে, আত্মজীবনীতে একবারও ‘লালন’র নামটি উল্লেখ করেননি। কারণ, একজন মুসলমান ফকির তাঁর ‘মানস’ গঠনে গুরুর ভূমিকা পালন করেছেন, তা প্রকাশ হোক, তিনি তা চাননি।
লালন শাহ একজন উঁচুস্তরের আধ্যাত্মিক, মরমীবাদী সুফি-সাধক। লালন ফকিরের গীতকে মরমী গায়িকা ফরিদা পারভীন এবং বিশিষ্ট লালন গবেষক আবদেল মান্নান বলেন,’ লালন সাঁইজির কালাম’। অথচ এই মনীষীর মাথায় ‘ধর্ম প্রবক্তা’র যে কলঙ্ক তিলক লাগিয়ে বাউল ধর্মের প্রচার চলছে, তার কি কোন প্রতিকার নেই? অবশ্যই আছে।এর জন্য লালন জীবনদর্শন ও তাঁর সত্যিকারে গানের উপর যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁদের লেখা পড়তে হবে। এ’ কাজে বর্তমানে এগিয়ে এসেছেন গবেষক আবদেল মান্নান। তাঁর লেখা গবেষণা লব্ধ “লালন দর্শন” এবং ” লালন সঙ্গীত” গ্রন্থে তিনি ফকির লালন শাহের সত্য দর্শন তুলে ধরেছেন। আমরা তাঁর গ্রন্থ “লালন দর্শন” থেকে উদ্ধৃতির মাধ্যমে এ’ প্রবন্ধের সমাপ্তি টানবো। তিনি লেখেন,” লালন সঙ্গীত মোটেও বাউল সঙ্গীত নয়, বিঘোষিত ‘ফকিরী সঙ্গীত’। কারণ, লালন ফকির মোটেও আউল বাউল জাতীয় কিছু নন। নিজেকে তিনি কোনখানে বাউল বলে পরিচয় দেননি ভুলেও। ফকিরকে বাউল সাজালো কোন রাজনীতি, সেটা না বুঝলে বিভ্রান্তির অবসান হবেনা”।

x