সাম্পান সাঁঝবাতি

দীপক বড়ুয়া

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:২০ পূর্বাহ্ণ
18

ওদের নিজের বসতবাড়ি নেই। সবাই বলে যাযাবর। সাম্পানে ওদের সংসার। সাপের খেলা, এটাওটা সওদা করে আয় করে। নদীতে ওদের জীবনযাপন।
আজ এই শহরে,কাল ঐবন্দর, গাঁয়ে, যেখানে ব্যবসা হয়, সেই জায়গা বেছে নেয়। নেই সমাজ, নেই দূরে কোথাও প্রিয় স্বজন। ওদের সন্তান সাম্পানে জন্ম নেয়। কারো লেখাপড়া নেই।
সাপ ধরা,সাপের খেলা দেখা, সাপ বিক্রি করা কাজ। কি অদ্ভুত যাযাবর জীবন। ওদেরও ভালোবাসা,সুখদুখ, চাওয়াপাওয়া আছে। ওদের সব নদীর বুকে সাম্পানে হয়।
জিয়ান ওদের সর্দার। তার কথায় সবাই চলে। দশ-পনেরটা সাম্পানই তাদের সম্বল। পঁচিশ,ত্রিশ জনের একটি দল বা পরিবার। ওখানে ওদের সুখের সংসার। জিয়ানের নির্দেশে সাপ দেখাতে যায় কেউকেউ। কেউ বাজারে, কেউ রান্নায় ব্যস্ত থাকে।
ঝড়বাদলে ভীষণ কষ্ট তাদের।
কাজ নেই। শুধু অবসর। খাওয়া- গাওয়া, প্রিয়জনের সাথে সময় অপচয় করা।
হঠাৎ জিয়ানের ডাক পড়ে।
সবাই সাম্পান থেকে বেরিয়ে আসে। নদীর ধারে সবাই জড়ো হয়। হা করে থাকে সর্দারের কথা শুনতে। কি বলে, কাকে কোথায় যেতে বলে! সর্দারের দারুণ মেধা। টাকা আয় করার ঢের বুদ্ধি। কোথায় গেলে ভালো আয়, সব জানে। সাম্পানে সবাই যখন ঘুমায়, বিশ্রাম নেয়, সর্দার বেরুয় তখন। সারা গাঁ, বন্দর ঘুরবে। কোথায়, কারো বাড়িতে কি হচ্ছে খোঁজ নেয়।
সর্দার বলে,
-মালতি, শিরনি, পিয়াল, দিবানি তোরা মাসুদ চেয়ারম্যানের বাড়ি যাবি। ওর মেয়ের গায়েহলুদ আজ। চেয়ারম্যান বলেছে, এই আনন্দে
গান শুনবে,সাপের নাচ দেখবে। অনেক বখশিষ দেবে।
আর বিভাস, তারা,গোলাপী, হারু তোরা যাবি হাটে। নিঝুমপুর বাজার থেকে যেসব শাড়ি, জামাকাপড়,খেলনাপুতুল নিয়েছিস, ওগুলো বিক্রি করবি। ভালো মুনাফা হবে। যা-যা দেরী করিসনে। শীতকালে তাড়াতাড়ি সন্ধ্যে হয়। দেরী করবিনা।
সবাই বেরিয়ে পড়ে।
জিয়ান সর্দারকে সবাই ভালোবাসে, পছন্দ করে। সর্দার সবার খোঁজ নেয়। ভালোমন্দ ভাবে। সর্দারের এক মেয়ে,ঝুম্পা। বয়স বাড়ছে। বিয়ের সময় ছুঁইছুঁই। সুন্দরী। সাম্পানে বসে বিকেলে স্নো মাখে মুখে। চোখে কাজল পরে। হাত আয়নায় নিজেকে দেখে হাসে। নিজের টগবগে যৌবন শরীর দেখে শ্বাস ফেলে।
সর্দার ঝুম্পার বিয়ে নিয়ে ভাবে। কোথায় বিয়ে দেবে। তার দলের কারো সাথেই বিয়ে দিতে হবে। অনেক বিবাহযোগ্য ছেলে আছে। দেখতে সুন্দর,স্বাস্থ্যবান। কিন্তু কার সাথে বিয়ে দেবে?
জিয়ান যাযাবর সর্দার হলেও তার আধুনিক একটি মন আছে। মেয়ের কাউকে পছন্দের আছে,ভালোবাসে জিগ্যেস করবে ভাবে।শুধু ঝুম্পা নয়, সবাই সর্দারকে ভয় করে, সম্মান করে।
সন্ধ্যায় ওরা ফিরে আসে।
সবার মুখে আনন্দের হাসি। চেয়ারম্যান ভালো বকশিস করেছে। সাথে সবার জন্য নতুন কাপড়, খাবার পাঠিয়েছে। রাতে চুলো জ্বালতে হবেনা। দারুণ খুশি সবাই। সর্দারের মুখেও অনাবিল হাসি।
শাড়ি,জামা,পুতুল সব বেশি দামে বিক্রি দিয়েছে।
একটা হৈহৈ রৈরৈ আনন্দ সাম্পানে।
এখানেও একটি নিয়ম আছে।
এই সাম্পানে সবার মঙ্গলের জন্য সকালে প্রার্থনা করে। সন্ধ্যায় সাম্পাননৌকোয় প্রদীপ জ্বালে। এটা দীর্ঘদিনের নিয়ম। এই নিয়ম সর্দারের বাপদাদার।
পড়ন্ত বিকেল।
জিয়ান সর্দার সাম্পানচালে মাথা ঠেকিয়ে ভাবছে। ঝুম্পার বিয়ে দিতেই হবে। বিয়ের সময় পার হচ্ছে। তখনই নদীরপাড়ের বটগাছের নীচে ঝুম্পাকে দেখে সর্দার। পাশে পিয়াল। ওরা পাশাপাশি বসে কথা বলছে। দূর থেকে সর্দার দেখছে, হাসছে। মনেমনে ভাবছে, আমার ঝুম্পার পাত্রতো ঠিক আছে। শুধুশুধু ভাবছি।
পিয়ালতো খুব ভালো ছেলে। সৎ চরিত্রবান। ভালো স্বাস্থ্য,সুঠাম দেহ। সাহসী,পরিশ্রমী। ভালো সাপ খেলা দেখায়। বন পাহাড় থেকে কত ধরণের সাপ ধরে। বিক্রি করে। ভালো আয় করে। যদি ওদের বিয়ে হয়,নতুন সংসার হবে ওদের। ওদের জন্য নতুন একটি সাম্পান প্রয়োজন হবে। কিনতে টাকা লাগবে। অসুবিধে নেই। টাকাতো জমায় আছে।
সন্ধ্যা নামে। সবাই যারযার সাম্পানে। সর্দার ডাকে,
– এ্যই ঝুম্পার মা, ঝুম্পাকে নিয়ে আয়, কথা আছে।
ঝুম্পার মা ভয় পায় সর্দারকে। স্বামী হউক, মুখের উপর কথা বলার সাহস নেই। ভয়েভয়ে কাছে যায়। সর্দার বলে,
– পাশে বস।
মেজাজটা ভালো মনে হয় সর্দারের। সংকোচ ছেড়ে পাশে বসে কোকিলা। জিগ্যেস করে,
– কিছু বলবে?
– ঝুম্পা বড়ো হচ্ছে, খেয়াল করিস? বিয়ে দিতে হবেনা?
– তো, হবেনা! তুমিতো আছো।
– কোকিলা, তোর সঙ্গে আমার যখন বিয়ে হয়, তখন বয়স কত, মনে আছে তোর?
কোকিলা হাসে। লজ্জায় মাথা নুইয়ে থাকে।
– কি সুন্দরী ছিলি। তোকে খুব ভালোবাসতাম। তুই ছাড়া জীবনটা বৃথা মনে হতো, নারে! কি সুন্দর কোমড়ে বিছা পরে হাঁটতিস। পায়ে নূপুরের শব্দ। ঝুমঝুমঝুম।
কোকিলার মুখে কথা বেরুয়না। লাজুকতায় বসে থাকে।
সর্দার বলে,
– ঝুম্পা কই? ডাক।
কোকিলা ডাকে, ঝুম্পা, ঝুম্পা। সাম্পানের ভেতর থেকে ঝুম্পা আসে। মুখের প্রসাধনী তখনও মুখে। ধোয়নি। কি চমৎকার লাগছে ঝুম্পাকে। সত্যি কথা, মেয়েরা সাজলে অপরূপ লাগে।
সর্দার ঝুম্পাকে সহজ করে বলে,
– ঝুম্পা, পিয়াল ছেলেটাকে কেমন লাগে তোর?
ঝুম্পা ভয় পায় বাবার কথায়। মনেমনে বলে, বাবা কি টের পেয়েছে,পিয়ালের সাথে কথা হয়? আমাদের জায়গাটাতো অত বড়ো নয়। ঐ দশ- পনেরটা সাম্পান। মানুষ আছি জন ত্রিশ। এরই মধ্যে লুকাবার সুযোগ নেই। হয়তো নিশ্চয়ই বাবা আঁচ করেছে। তারপরও ঝুম্পা চুপ থাকে।
কোকিলাকে প্রশ্ন করে সর্দার,
– তুই কিছু জানিস,পিয়ালের সম্পর্কে।
– কি জানবো? কোকিলার ফিরতি প্রশ্ন।
– না, মানে ছেলেটি কেমন?
– খারাপ কি? খুব ভালো।
– ঝুম্পার সাথে পিয়ালের বিয়ে দিতে চাই, কি বলিস! তোর আপত্তি আছে।
ঝুম্পা বাবার কথা শুনে পালিয়ে যায়। চনচন মনটা দোল খায়। রাত বাড়ে। ঝুম্পার চোখের ঘুম দূরে পালিয়ে বেড়ায়। মন ছটপট করে। বারবার ইচ্ছেকরে পিয়ালকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে। পিয়ালতো অন্য সাম্পানে। ঝুম্পা এক সাম্পানে। কি করে সম্ভব কাছাকাছি যাবার।
সর্দার বলে,
– নতুন একটা সাম্পানের প্রয়োজন।
– কেন নতুন সাম্পানের প্রয়োজন? সেতো অনেক টাকা।
– পিয়াল-ঝুম্পার বাসর রাতের জন্য। বিয়ের পর কোথায় থাকবে ওরা! টাকার কথা ভাবিসনা। আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি ভাবিনা মনে করিস?
– তুমি যেটা ভালো মনে করো, করবে। তবে পিয়ালের বাবার সঙ্গে আলাপ করো। তুমিতো সর্দার। তোমার কথার উপর কথা বলবেনা। তারপরও বিয়ের কথা। ওতো বর পক্ষ, ওদের দাম বেশি না?
– ঠিক আছে তাই হবে।
খুব ইচ্ছে করে ঝুম্পার পিয়ালকে দেখার। বাবার কথাটা বলবে। অথচ পিয়াল সকালে বেরিয়ে গেছে বনে। নতুন সাপ ধরবে। বাজারে বিক্রি করবে। অনেক টাকা আয় হবে। ধুত্তুরি টাকা। ঝুম্পার পিয়ালের এই কাজটা পছন্দের নয়। ভয় হয়। যদি সাপে কামড়ায়! বিষাক্ত সাপকামড়ে অঘটন কিছু ঘটে?
নতুন সাম্পান ঘাটে আসে। সবার কি আনন্দ। নানান রঙে রঙিন সাম্পান। সবাই জানে পিয়াল- ঝুম্পার বিয়ে।
বিয়ের দিন তারিখ ঠিক।
আসছে চারই মাঘে বিয়ে। ঐ বিশপঁচিশ জনের খাওয়া। নতুন করে সাজিয়েছে নতুন সাম্পান। ফুলে, রঙিন কাগজে চিকচিক করছে।
সকল সাম্পান থেকে নতুন সাম্পানটা সবার নজর কাড়ে।
বিয়ের ক্থদিন মাত্র বাকী।
সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই!
কোকিলা ঝুম্পাকে ডাকে,
– ঝুম্পা ঝুম্পা এদিকে আয়।
ঝুম্পা মায়ের কাছে এসে জিগ্যেস করে,- মা আমাকে ডাকছো?
– হ্যাঁরে মা। শোন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় নতুন সাম্পানে সাঁঝবাতি দিবি। তোদের সংসারজীবন কল্যাণ,মঙ্গলের জন্য।
-ঠিক আছে মা,দিচ্ছি।
হঠাৎ আকাশে মেঘের ছুটোছুটি। অসময়ে মেঘের ডাক। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যায়। রেডিওতে খবর শোনে, দশ নম্বর বিপদ সংকেত।
চারিদিকে এলোপাথারি বাতাস। সর্দার সবাইকে বলে, ভালোভাবে সাম্পানে নোঙর দিতে। যেন কোন বিপদে পড়তে না হয়।
রাত বাড়ে।
হাওয়া বাড়ে।
সাথে প্রচন্ড ঝড়তুফান।
মেঘের গর্জন।
একশত আশিমাইল বেগে ঝড়োহাওয়ায় সবকিছু লন্ডভন্ডে গুঁড়িয়ে দেয়। বেপরোয়া জলোচ্ছ্বাসে জিয়ান সর্দারের সাম্পান ঘাঁটি তছনছ হয়ে ভেসে যায়। কে কোথায় কেউ জানেনা। যতই রাত বাড়ে ঝড়যুদ্ধ ততই বাড়ে। বাইরে নিকষ কালো জমকালো অন্ধকারের ভৌতিক মরণখেলা! রাতের শেষে বৃষ্টি থামে। তুফানের জোর কমে। জোয়ারের বাড়তি জল বৃষ্টির জলে থইথই নদী মাঠ।
ভোর হয়।
চতুর্দিকে জল ছাড়া কিছু দেখা যায় না। গাঁয়ের অনেক ঘর কোমড় জলে, ঘরের চালে ছুটছে। মানুষজন নেই। কেউ ঘরের চালে, উঁচু গাছে বসে আছে। শতশত গাছ উপরে পরে আছে। অনেক গরু,বাছুর অথৈ জলে ভাসছে। কি ভয়ানক দৃশ্য চারপাশে।
জল জল জল!
জল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। কাছে দূরে দেখে মনে হয়, একটি মহাসাগর।
সূর্যের আলোয় দূরে দেখা যায় একটি নতুন সাম্পান ভাসছে। আশপাশে কিছু নেই। ঐ সাম্পানে কেউ আছে? ওটাতো ঝুম্পা- পিয়ালের বিয়ের জন্য জিয়ান সর্দার এনেছে।
সর্দার কই?
ঝুম্পা- পিয়াল কই?
কারো খবর নেই। তখনও জোয়ারের জল হাঁটে।
সঙ্গে ঐ নতুন সাম্পানটা ও!