সামাজিক অস্থিরতা ও বিচারহীনতার কারণেই যৌন সহিংসতা বাড়ছে

বুধবার , ২৩ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ
42

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ সেন্টারের এক প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক নারী নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল-মে মাসে সহিংস ঘটনা কমলেও বেড়েছে যৌন নির্যাতনের সংখ্যা। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল-মে মাসে যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে ৭৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। ওই সময় নির্যাতনের শিকার হওয়া ২২৫ জনের মধ্যে নিহত হয় ৬ জন এবং আহত হয় ১১৯ জন।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে দেখা যায় এই বছরের এপ্রিল-মে মাসে সহিংস এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২৬০০ টি। এসব ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৮১২ জন, আহত হয়েছে ২৫৬৬ জন। এ সময় যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২২৫ টি। বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে ১০৫ টি এবং আটক করা হয়েছে ৫১০৪ জনকে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত সংবাদসমূহ পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। তবে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের তুলনায় সহিংস এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনার সংখ্যার হার এপ্রিল-মে মাসে কমেছে প্রায় ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সহিংস এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ২৭৫৭ টি। এসব ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৮০০ জন, আহত হয়েছে ৩১৪৫ জন। এ সময় যৌন নির্যাতন ঘটনা ঘটেছে ১১৪ টি। আর বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে ৯১টি এবং এসব ঘটনায় আটক করা হয়েছে ৭১৫৭ জনকে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সহিংস ঘটনার সংখ্যার হার ডিসেম্বর ২০১৮-জানুয়ারি ২০১৯ এর তুলনায় কমেছে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে ঘটা সহিংস এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৩০৫০টি। সহিংস এবং সন্ত্রাসী ঘটনার ঘটনাস্থল হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। এপ্রিল-মে মাসে ঢাকায় এসব ঘটনায় নিহত হয়েছ ২২৯ জন। এরপরের আবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম, নিহতের সংখ্যা ২০৮ জন। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী, নিহতের সংখ্যা ১১১ জন।
নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বিশ্ব যতই সোচ্চার হচ্ছে, সহিংসতার মাত্রা যেন ততই বাড়ছে। বর্বরতার ধরন, নৃশংসতার মাত্রা অতীতের সব উদাহরণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাসের শিশু অথবা সত্তরোর্ধ্ব নারী কেউই বাদ যাচ্ছে না এই সহিংসতা থেকে। নারীর অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে যাঁরা দীর্ঘদিন কাজ করছেন- তাঁরা বলছেন, নারী-পুরুষের বৈষম্য শুধু বাংলাদেশের জন্যই আলোচনার বিষয় নয়, বরং সারা বিশ্বে এখন নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে প্রতিটি দেশ, সমাজ ও সংস্থা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করে চলেছে। নারীর লড়াই এখন শুধু নারী-পুরুষের বৈষম্য নিয়ে নয়, বরং মানুষের গোঁড়ামি, একগুঁয়ে নিয়মকানুনের বিরুদ্ধেও নারীকে লড়াই করতে হয়। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীকে তার প্রাপ্য অধিকারের জন্য লড়াই করতে হয়। কেননা, ছোট-বড় বিভিন্ন ক্ষেত্রেই নারী বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রতিবারই রেকর্ড ছাড়ায়। স্বীকার করতেই হবে, নারীর অগ্রগতি ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে নারী শিক্ষার হার ৫০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। নারীর ক্ষমতায়নে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম। সবকিছুই ঠিক আছে, তবু প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের খবর থাকছেই পত্রিকাতে।
মহিলা পরিষদের এক সমীক্ষায় ধর্ষণের শিকার নারীর বয়স, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, নির্যাতনের প্রভাব, অভিযুক্ত ব্যক্তির বয়স, পেশা, নির্যাতনের স্থান, আত্মীয়স্বজনের ভূমিকা, আইনগত পদক্ষেপসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ আত্মীয়স্বজন বা অভিভাবক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষ না দিয়ে ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর পরিবারকে হুমকি দিয়েছেন, মীমাংসা করতে বলেছেন।
নারীবিষয়ক গবেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ধর্ষণসহ অন্যান্য যৌন নির্যাতনের সংখ্যার পাশাপাশি পাশবিকতা ও ভয়াবহতাও বেড়েছে। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। আগে উত্ত্যক্তকরণ বলতে ওড়না ধরে টান বা বাজে মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন তারা যাচ্ছে ছুরি হাতে। ফলে অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো ঘটছে। সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি সহিংসতা ও সংঘাতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এর পেছনে দায়ী। রাজনৈতিক দল, সমাজ-সব জায়গায় এই সন্ত্রাসীরা আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে। ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না।
আসলে সামাজিক অস্থিরতা ও বিচারহীনতার কারণেই যৌন সহিংসতা বাড়ছে। অপরাধ করে নিষ্কৃতি পাওয়ার সংস্কৃতি যেন চলছে। এ বিষয়ে ভাবতে হবে সবাইকে।

x