সাধক কবি সুধীর চৌধুরী : চট্টলার এক অতিমানস অভিযাত্রী

জন্ম-শতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

অধ্যাপক স্বদেশ চক্রবর্তী

শুক্রবার , ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
35

সুধীর চৌধুরী একাধারে যোগী, সাধক কবি, সুর স্রষ্টা, সঙ্গীত শিল্পী, মৃদুভাষী, ভাবগম্ভীর, অথচ হাস্যরসিক, ক্রীড়ামোদী, উপরন্তু স্নেহপ্রবণ। তাঁর নানামুখী প্রতিভার দীপ্তি বিকীর্ণ হয়েছে এসবের মধ্যে। অন্তর গহনে তিনি ছিলেন নিভৃতচারী কলাকোবিদ্‌, প্রাত্যাহিকতার অন্তরালে আপনাকে ঢেকে রেখেছেন; কিছুটা যেন নাগালের বাইরে আত্মপ্রচারে পরাম্মুখ। অসংখ্য লেখা তাঁর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানা পত্র পত্রিকা ও সাময়িকীর পাতায়। বিচিত্র বর্ণ ও গন্ধের ফুল মনের আনন্দে তিনি ফুটিয়েছেন নিখিলের মর্মস্থলে। আপনার মনের মাধুরী মিশায়ে আপন মনে গান গেয়ে গেছেন। শ্রী অরবিন্দের প্রবচনে আছে, চেতনা যখন মনের ভূমি পার হয়ে উত্তরমানসে উপনীত হয় তখন সৃজনক্ষম প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। সুরলোকের সৌন্দর্য সুধার সঞ্চার ঘটে তার অনুভবের ভৃঙ্গারে। মর্ত্যের মর্মে সে হয় নন্দনবনের মালাকার।
১৯১৯ সালের ৭ই ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার কধুরখীল গ্রামে সাধক কবি শ্রী সুধীর চৌধুরীর জন্ম। পিতা শশী কুমার চৌধুরী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শশী মাস্টার। শৈশবে সুধীরের ডাক নাম ‘সোনা’। পিতার চার পুত্রের মধ্যে সুধীর তৃতীয়। অগ্রজ সুধাংশু, সুখেন্দু; কনিষ্ঠ অধীর। সঙ্গীতচর্চা ও অনুশীলন এই পরিবারের ঐতিহ্যের অন্তর্গত। গোমদণ্ডী প্রাইমারি স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষালাভ। এই কৈশোরেই বড় ভাই সুধাংশু বিমলের কাছে সুধীর সঙ্গীতের তালিম নেন। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে কধুরখীলের সন্তান যতীন্দ্র লাল চৌধুরীর কাছে শোনেন শ্রীঅরবিন্দের মধুনাম। যতীন্দ্রনাথ নাম শ্রী অরবিন্দ প্রদত্ত।
সে নাম তাঁর কর্ণকুহরের ভিতর দিয়ে মর্মস্পর্শ করেছিল। সত্তার অণু-পরমাণুতে পরতে পরতে সে নাম মিশে গেল। তনু মন-প্রাণে, হৃদয় তন্ত্রীতে অণুরণিত হতে থাকল অনুক্ষণ। মধু বৃন্দাবনে যমুনা পুলিনে রাধা নামের সাধা বাঁশি অহর্নিশি বাজে। সংসারের আন্‌ কাজে নিরবধি ব্যস্ত বহির্মুখী মন বাঁশির ডাক শোনে না, শুনতে চায় না। তবুও আচম্বিতে কচিৎ কখনো সে সুর লহরীর মধু মূর্চ্ছনা কারো শ্রবণে পশে যখন, মাধবের সঙ্গে মিলনের জন্য সে তখন উষ্মন, ব্যাকুল, অধীর হয়ে উঠে।
১৯৩৫ সালে সুধীর দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে হয়তো তাঁর উচ্চতর শিক্ষালাভের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গৃহ-শিক্ষকতার কাজ বেছে নেন এবং সঙ্গে চলতে থাকে মুদ্রাক্ষরিকের শিক্ষানবিশী। পণ্ডিচেরীর টানে তাঁর যোগাযোগ ঘটে মধ্যম শাকপুরা গ্রামের ‘সাধন বাড়ির’ সঙ্গে। শৈল কিরীটিণী সিন্ধু-মেখলা ভূধরস্তনী রম্য চট্টলার অনেক সাধক শ্রী অরবিন্দ-শ্রীমার প্রতি অন্তরের আকর্ষণে সমবেত হন এই সাধন বাড়িতে। পরবর্তীকালে এই ‘সাধন বাড়িই’ পরিণত হয় শ্রী অরবিন্দ মাতৃ-মন্দিরে।
চট্টগ্রামের রাউজান থানার দেওয়ানপুর গ্রামের বীরেন্দ্র শেখর পালিত ছিলেন আশ্রমে। বীরেন পালিতের সঙ্গে পত্রালাপ চলে সুধীরের কেমন করে চিরতরে মায়ের কোলে, জননীর সর্বাশ্রয় প্রেমে ঠাঁই পাওয়া যায়। অবশেষে প্রতীক্ষার হয় অবসান। রাত পোহায়। শুকতারা আঁখি মেলে। বীরেন পালিতের মাধ্যমে দিব্যজননীর নির্দেশ আসে সুধীরের কাছে। আশ্রমে যাবার আগে সুধীর যেন বই বাঁধাইয়ের কাজ শিখে নেয়। চট্টগ্রাম শহরের হাজারী গলিতে হার্ডিঞ্জ প্রেস- বঙ্গ দপ্তরীর বাইন্ডিং এর দোকান। পূর্ব গোমদণ্ডীর বঙ্গচন্দ্র দে এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। এ দোকানে সুধীর তিন মাস ধরে বাইন্ডিং এর কাজ শিখেন। ’৩৮ সালের মার্চ মাসে জ্যোতির্জননী মধুময়ী মায়ের নির্দেশে তিনি কোলকাতার ‘আর্য পাবলিশিং হাউসে’ বাইন্ডার হিসেবে যোগ দিলেন। আর তর সই ছিল না। মনে মনে শুধু গুনতে থাকেন-
‘আর কতকাল আড়াল হয়ে থাকবি মা
আমার হৃদ্‌ মন্দিরে আসন পাতা
হেসে কি আর বসবি না।’
সে বছর জুন মাসে মহালক্ষ্মী স্বরূপা রাজরাজেশ্বরী মায়ের চরণ সমীপে উপনীত হন প্রণত সন্তান। শরণাগতের আর্তি ছিল, ‘চরণ ধরিতে দিও মা আমারে’,- এভাবে তা পূর্ণ হল। জন্ম ও জীবন হল সার্থক।
সুধীর তখন প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর সজীব মনের তরুণ। বয়স মাত্র ঊনিশ বছর। আশ্রমের ফুল বাগানের পরিচর্যায় নিয়োজিত ছিলেন সাধক যতীন্দ্র নাথ দাস; যাঁর দেহত্যাগের পর শ্রীমা’র মন্তব্য, ‘সে সূর্যমণ্ডলে অবস্থান করছে।’ তিনিও ছিলেন কধুরখীল গ্রামের ছেলে। আশ্রম মালঞ্চ থেকে মায়ের জন্য পুষ্পচয়নের ভার পেলেন সুধীর।
ইতিমধ্যে সুধীর সুরসুধাকর ব্রজের পথিক শ্রী অরবিন্দের প্রিয় শিষ্য দিলীপ কুমার রায় এবং শ্রীমার ‘চির কিশোর কবি’ নিশিকান্তের সান্নিধ্যে আসেন। ভাগবতাত্মা দিলীপ কুমার কবি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের একমাত্র পুত্র। সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ দেখে দিলীপ কুমার সুধীরকে সস্নেহে কাছে টেনে নেন। এই মহান সঙ্গীতগুরুর কাছে সুরের সাধনায় দীক্ষা লাভ করেন সুযোগ্য শিষ্য। তারপর সঙ্গীতের উর্ধ্বতর আরোহণী বেয়ে গন্ধর্বলোকের অলকাপুরীতে তাঁর অনুপ্রবেশ। বিশ্বকবি বলেছেন-
“মন দিয়ে যার নাগাল নাহি পাই,
গান দিয়ে তাঁর চরণ ছুঁয়ে যাই।”
গান দিয়ে তাঁর (ভগবানের) চরণ ছোঁয়া যায়। দিব্য জীবনে তা দেখালেন সুধীর চৌধুরী।
একদিন ভাবমগ্ন অবস্থায় সুধীর গান গাইছেন। সঙ্গীতের মধুস্রাবী সুরস্পন্দন পুরুষোত্তম শ্রীঅরবিন্দকে স্পর্শ করে। তিনি অন্তরঙ্গ এক পরিকরকে প্রশ্ন করলেন, “কে এমন মধুর কণ্ঠে গাইছে? অবিকল দিলীপের মত গলা।” আশ্রমের প্রধান ভবনের পাশে আশ্রমিকা সাহানা দেবীর ঘর। কিন্নরকণ্ঠী সাহানা দেবী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ভাগ্নী ‘ঝুনু’। সে কক্ষে সুরলোকের কিন্নর-কিন্নরীরা-সুধী সঙ্গীত গুণী ও সাধক কবিরা সমবেত হন। গানের আসর বসে। সুরের অমিয় ধারায় আপ্লুত হন সকলেই। আশ্রম অধিষ্ঠাত্রী দিব্যজননী সেদিন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তাঁর করুণা-নয়নের অপলক দৃষ্টিকে সৃষ্টির পানে মেলে দিয়েছিলেন। হঠাৎ জনৈক সাধককে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ওখানে বুঝি সুধীর গাইছে?”
ঘোর সংসারী সুধীর চৌধুরী। কিন্তু সংসারে থেকেও কবি শ্রী সুধীর চৌধুরী ছিলেন নিরুদ্বিগ্নমনা সন্ন্যাসীর মত সরল অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী। কারো কাছে তাঁর চাওয়া-পাওয়া ছিল না। অনুযোগও ছিল না কারো প্রতি। যাপিত জীবনে অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন হাসি মুখে। ভগবৎ কৃপার উপর বিশ্বাস ও নির্ভরতায় আজীবন তিনি অবিচল ছিলেন। শোকে, সুখে-দুঃখে, লাভ-অলাভে, তিনি ছিলেন নির্দ্বন্দ্ব, ‘দুঃখেষু অনুদ্বিগ্নমনা, সুখেষু বিগতস্পৃহ।’ তাই বৈদান্তিকের মত তাঁর অমোঘ উচ্চারণ-
“পার্থিব সৌভাগ্য সুখ সম্পদ সম্মান–
এই আছে এই নাই
সবি যে নশ্বর।”
১৯৭৪ সালের ৩রা অক্টোবর, টেরিবাজার কাটাপাহাড় লেনে শান্তি প্রেসের অশোক চৌধুরীর বাসভবনের দোতালায় আশ্রম সম্পাদক কবির্মণীষী শ্রীযুত নলিনীকান্ত গুপ্তের মাধ্যমে জ্যোতির্জননী শ্রীমার সম্মতি ও আশিস নিয়ে সুধীর চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করলেন শ্রী অরবিন্দ সোসাইটি, চট্টগ্রাম কেন্দ্র। ক্রম বর্ধমান বিশ্বজনীন সুসংহতির লক্ষ্যে আধ্যাত্মিক ও জড় জীবনে সুসামঞ্জস্য বিধানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির সমন্বিত বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনের জন্যে এবং একটি সুসংহতি পূর্ণ ও সুসংবদ্ধ বৈচিত্র্যের মধ্যে মানব ঐক্যের বাস্তবায়ন ও সমগ্র জীবনের রূপান্তর সাধনের উদ্দেশ্যে ১৯৬০ সালে মধুময়ী মা এই আন্তর্জাতিক সংগঠনের সৃষ্টি করেন। চট্টগ্রাম কেন্দ্র বিশ্বের একশ ত্রিশটি দেশের অসংখ্য শাখার মধ্যে একটি। পণ্ডিচেরীর পুণ্যভূমিতে শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমার তপস্যায় যে দিব্য অগ্নি প্রজ্বলিত, সেই হোমালন পার্থিব অশুদ্ধির কলুষ কালিমাকে নিঃশেষ করে দেবে। পরিশুদ্ধ পবিত্র করে দেবে অশান্ত পৃথিবীর আবহ মূল।
একমাত্র আধ্যাত্মিকতার অনুশীলনই পারে নানা সঙ্কীর্ণ বিবর্ণ মতবাদের বাদ্‌ বিতন্ডায় বিভক্ত বিশ্বের আপামর জনগোষ্ঠীকে মিলনের মোহনায় পৌঁছে দিতে। সাধক সুধীর চৌধুরী সেই যোগাগ্নির শিখা এনে স্থাপন করলেন চট্টলার মৃত্তিকা গভীরের হোম কুণ্ডে। আজও তা নিভেনি, হয়েছে প্রদীপ্ত-প্রোজ্জ্বল। ব্যাপ্ত হয়ে পড়ছে দিকে দিগন্তে, জলে স্থলে, আকাশে বাতাসে, মানস চেতনায়। সেই অমর জ্যোতি এখনও অম্লান, অনির্বাণ; তমসা বিদীর্ণ করে কালের বুকে অবিচল জেগে আছে।
শুনেছি, তাঁর কণ্ঠ ছিল মধুর, সুললিত, মর্মস্পর্শী, প্রাণের সিন্ধু তটে এক অপার্থিব ভাবের তরঙ্গ তুলে আছড়ে পড়ত। ’৮৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন তিনি সচল। এরপর প্রায় দশ বছর তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। অবশেষে ১৯৯৪ সালের ১২ই এপ্রিল সকাল ৭:১০ মিনিটে মহাভাবাবেশে অদিতি অসীমার কোলে চির নির্বাপিত হল অতি মানসের জ্যোতি সাধক কবি শ্রী সুধীর চৌধুরীর জীবন প্রদীপখানি। যেন প্রতিধ্বনিত হল-
“যাত্রীরা চলো নির্ভয়ে ঐ তমসার পরপারে-
আদিত্য-লোকে জাগরে চিত্তে নাশিয়া মরণ-শঙ্কা।”