সাতকানিয়ায় কয়েকটি কেন্দ্রে গোলাগুলি-সংঘর্ষ, আহত ১৫

নির্বাচন বর্জন জামায়াতের

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া

সোমবার , ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
189

সাতকানিয়ায় কয়েকটি ভোট কেন্দ্রে ব্যাপক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। তবে বেশির ভাগ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে, দুপুর ১২ টার দিকে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াত নেতা আ ন ম শামসুল ইসলাম। প্রার্থী কারাবন্দি থাকায় তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্টও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমীর জাফর সাদেক স্থানীয় সাংবাদিকদের নিকট নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা দেন।
বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন, দলীয় নেতা-কর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাতকানিয়ার ছদাহা ছৈয়দাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব ছদাহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের গরিবারঝিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সোনাকানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সোনাকানিয়া বোর্ড অফিস ও ঢেমশা বোর্ড অফিসসহ বেশ কিছু কেন্দ্রে ব্যাপক গোলাগুলি, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসময় ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ১৫ জন আহত হয়েছে। ছদাহা ছৈয়দাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল থেকে শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট গ্রহন চলে। সকাল ১০ টার দিকে জামায়াত শিবির নেতা-কর্মীরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ভোট কেন্দ্রে আসে এবং ভোটারদের লাইনে দাঁড়ায়। এর কিছুক্ষণ পর তারা জয় বাংলা স্লোগান বাদ দিয়ে হঠাৎ ভোট ছিনতাইকারীদের ধর বলে স্লোগান দিতে শুরু করে। এভাবে স্লোগান দিতে দিতে কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে তারা ব্যালট পেপার ও বাঙ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। তখন কেন্দ্রে উপস্থিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাদেরকে ধাওয়া করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জামায়াত শিবির নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগ নেতাদের উপর হামলা করে এবং গুলি ছুঁড়ে। এতে ভোট কেন্দ্র এলাকায় আতংক সৃষ্টি হলে সাধারন ভোটাররা ভয়ে কেন্দ্র ছেড়ে চলে যায় এবং ভোট গ্রহনকারী কর্মকর্তারা ভোট গ্রহন সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখে। ঘটনার খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি ঘটনাস্থলে গেলে জামায়াত শিবির নেতা-কর্মীরা পালিয়ে যায়। তখন পরিস্থিত স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৭ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছে। আহতরা হলো- ছৈয়দাবাদ এলাকার মৃত ছাবের আহমদের পুত্র ফরিদুল আলম (৪০), একই এলাকার মৃত আসগর আলীর পুত্র ছালেহ আহমদ (৬০), হারুনুর রশিদের পুত্র মোঃ হাসান মুরাদ (২৬), মোঃ হারুনের পুত্র মোঃ তারেক (২১), আবুল হোসেনের পুত্র মিজানুর রহমান (২৫), হামিদুল ইসলামের পুত্র মিনহাজুর রহমান (২১), হাজী মোজাফ্‌ফর আহমদের পুত্র মোঃ মুরাদ (২২)। আহতদের মধ্যে ফরিদুল আলমকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যান্যদেরকে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আহসানুর হক সৈকত তালুকদার জানান, সকাল থেকে সুষ্ঠু ভাবে ভোট গ্রহন চলছিল। পরে হঠাৎ করে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সাথে জামায়াতের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ইট পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনার পর গোলাগুলি শুরু হয়। ঘটনায় অন্তত ২০-২৫ রাইন্ট গুলি বিনিময় হয়। পরে আমরা ভোট গ্রহন সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখি।
এদিকে, সকাল ১১ টার দিকে সোনাকানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এক দল জামায়াত শিবির নেতা-কর্মী প্রথমে লাইনে দাঁড়ায়। পরে হঠাৎ কেন্দ্রে প্রবেশ করে ব্যালট পেপার ও বাঙ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। তখন ভোটার ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ধাওয়া খেয়ে তারা পালিয়ে যায়। এর ১০-১৫ মিনিট পর তারা পুনরায় সংঘটিত হয়ে ভোট কেন্দ্র দখলের চেষ্টা চালায়। এসময় জামায়াত শিবির ব্যাপক গুলি বর্ষণ ছাড়াও পেট্রোল বোমা, ককটেল নিক্ষেপ ও গুলতি ছুঁড়ে মারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পাল্টা গুলি ছুঁেড়। ঘটনার বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ তৌহিদুল ইসলাম জানান, শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট গ্রহন চলছিল। হঠাৎ তারা কেন্দ্রে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। তখন পুলিশ ও ভোটারদের ধাওয়া খেয়ে তারা কেন্দ্র থেকে চলে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ৫ শতাধিক লোকজন জড়ো করে তারা প্রশাসন ও ভোট কেন্দ্র লক্ষ্য করে ব্যাপক গুলি ছুঁড়ে। একই সাথে পেট্রোল বোমা, ককটেল ও গুলতি ছুড়ে মারে। তিনি জানান, এ ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৫ শতাধিক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে। জামায়াত শিবিরও শতাধিক গুলি ছুঁড়েছে।
অন্যদিকে, ঢেমশা বোর্ড অফিস ও পূর্ব ছদাহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও জামায়াত শিবিরের সাথে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে নুরুল ইসলাম (৩০), আবদুস ছাত্তার (২৬), ইমন (২৩), মহিউদ্দিন (২৩) ও রকিবুল ইসলাম (১৮)সহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। আহতদেরকে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করেছে।
এদিকে, গতকাল দুপুর ১২ টার দিকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াত নেতা আ ন ম শামসুল ইসলামের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও চট্টগ্রাম দক্ষিন জেলা জামায়াতের আমীর জাফর সাদেক স্থানীয় সাংবাদিকদের নিকট নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা দেন। ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী কারাবন্দি থাকায় তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা দেন। তিনি জানান, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রত্যেক কেন্দ্রে ৬০ শতাংশের অধিক ভোট নির্বাচনের আগের দিন রাতে নিয়ে নিয়েছে। বাকী ভোট সকাল ১০ টার মধ্যে নিয়ে ফেলেছে। আমাদের প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়নি। যারা প্রবেশ করেছিল তাদেরকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কোন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। ফলে আমরা নির্বাচন বর্জন করালাম।
সাতকানিয়া থানার ওসি মোঃ সফিউল কবীর জানান, কয়েকটি কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কয়েকটি কেন্দ্রে জামায়াত শিবির নেতা-কর্মীরা ভোট কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করলে গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন জানান, অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ভোটাররা উৎসব মুখর পরিবেশে লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

x