সহানুভূতি ও সংবেদনশীল সমাজ-রাষ্ট্র গড়ে তোলাই শিশু অধিকার সংরক্ষণের পথ

বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২০ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
94

৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুশ্রমে জড়িত। নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে ১৩ শতাংশ কিশোর-কিশোরী। আবার ১৫ বছরের আগেই বিয়ে হচ্ছে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ কিশোরীর। জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ পাচ্ছে না ৫৩ শতাংশ শিশু। সিজারিয়ানে (অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসব) জন্মগ্রহণ করছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু। আর পিতা-মাতার সহিংস আচরণের শিকার ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু। এছাড়া ইন্টারনেটের বাইরে এখনো ৬২ শতাংশ ও কম্পিউটার নেই ৯৪ শতাংশ পরিবারে। “মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-২০১৯” শীর্ষক প্রতিবেদনে এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এ জরিপ পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এ খবর প্রকাশিত হয়।
আমাদের দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা নতুন কোন বিষয় নয়। প্রায়শ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তথা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন জরিপেও এ সম্পর্কিত তথ্য উঠে আসে। উপরোক্ত প্রতিবেদনেও শিশুর প্রতি সহিংসতা ও নির্মমতার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুই সহিংস আচরণের শিকার। এ পরিসংখ্যান যদি সঠিক হয় তাহলে বলতে হয়, মাত্র ১১ শতাংশ শিশুই সহিংস আচরণ থেকে রক্ষা পায়। অর্থাৎ আমরা নিয়ত যেসব শিশু দেখি তারা প্রায় সকলেই সহিংসতার শিকার। এই ভীতিপ্রদ অবস্থা নিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র চলতে পারে না। কারণ দেশের সম্মুখদর্শী অর্থনৈতিক অগ্রগমনে আজকের শিশুই হবে ভবিষ্যতের কাণ্ডারি। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তি মানুষের কর্মকালীন নৈপুণ্য ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে নিরাপদ শৈশবের নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। আরো দেখা গেছে, শৈশব বা কৈশোরে বহুমাত্রিক সহিংসতার শিকার হওয়া ব্যক্তির তুলনায় নিরাপদ শৈশব পাওয়া ব্যক্তির কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। তাদের সার্বিক বিকাশও অনেক ইতিবাচক। একক মানুষের কর্মদক্ষতার সম্মিলনেই জাতীয় বা সামষ্টিক উৎপাদনশীলতা বাড়ে; অর্থনীতিতে সংযোজিত হয় বাড়তি সুফল। আমাদের দেশে কর্মীর নিম্ন উৎপাদনশীলতার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এর সঙ্গে কিছুটা হলেও দায়ী অনিরাপদ ও সহিংসতায় বেড়ে ওঠা সুনির্দিষ্ট কমিউনিটির শৈশব। নিশ্চয়ই নিরাপদ শৈশবের সুযোগ পেলে তার কর্মনৈপুণ্য কয়েকগুণ বেড়ে যেত। সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য যার প্রভাব বিপুল। সেই বিবেচনায় পরিবার-সমাজ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র-সব পরিসরেই প্রতিটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য নিরাপদ ও সহায়ক মনোসামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, আমরা এখনো শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে পারিনি। কেউ পারিবারিকভাবে, কেউ সামাজিকভাবে বা কমিউনিটিতে, কেউ সহিংসভাবে প্রহৃত হচ্ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেত্রাঘাতে। আবার কেউবা সহিংসতার শিকার হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে। শিশুশ্রম আইনত নিষিদ্ধ হলেও কার্যত বন্ধ হয়নি।
দারিদ্র্যের কারণে কাজ করতে গিয়ে কর্মস্থলে প্রতিদিন সহিংসতার শিকার হচ্ছে শিশুদের একাংশ। এভাবে আর চলতে দেওয়া কোনক্রমেই উচিত হবে না। প্রতিটি শিশুর অধিকার রক্ষা ও তাদের জন্য সহিংসতামুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতেই হবে। শিশু অধিকার সুরক্ষা একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ-১৯৮৯-এর অনুচ্ছেদ ১৯ অনুযায়ী, ‘সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে শিশুকে রক্ষা করতে হবে।’ আবার টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) ১৬.২ লক্ষ্যমাত্রায় শিশুর প্রতি সব ধরনের শারীরিক সহিংসতা বন্ধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সব রাষ্ট্রকে শিশুর প্রতি সহিংসতা শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশ এসডিজি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেদিক থেকে শিশু অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সামান্যতম খাটো করে দেখার ও হেলায় নেওয়ার সুযোগ নেই।
অবশ্য বাংলাদেশ শিশু অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট নয় বলা যাবে না। শিশুর অধিকার বাস্তবায়নে দেশে আইনগত উন্নয়ন অনেক হয়েছে। শিশুশ্রম বন্ধ করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে করা হয়েছে শিশু ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন। এ বিষয়ে নীতিমালাও রয়েছে। এসব আইনে কঠোর শাস্তির বিধানও সংযোজন করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও শিশুর প্রতি নির্মমতা বন্ধ হচ্ছে না। বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ না হওয়া। শুধু আইন থাকলে হবেনা; আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুর প্রতি নৃশংসতা বন্ধে জোরালো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একটি সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল সমাজ-রাষ্ট্র গড়ে তোলাই শিশু অধিকার সংরক্ষণের সর্বোত্তম পথ। আমাদের প্রত্যাশা- আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে এই পথে এগিয়ে যাবো।