সর্বশ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণেই জমে উঠবে একুশের বইমেলা

বুধবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ

গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে অমর একুশের বইমেলা। প্রথমদিনেই মেলা জমে ওঠার ইঙ্গিত প্রত্যক্ষ করা গেছে। পাঠকের ব্যাপক উৎসাহ দেখে আমাদের মনেও আশার সঞ্চার ঘটেছে। জ্ঞান ও মননের আকাঙ্ক্ষা পূরণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই বইমেলা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশকদের অংশগ্রহণে মুজিববর্ষ উপলক্ষে এই মেলা বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করা হয়েছে।
যতদূর জানা যায়, চট্টগ্রামে প্রথম বইমেলার সূচনা হয় ১৯৭৫ সালে। এটির আয়োজক প্রতিষ্ঠান ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। এ উপলক্ষে গঠিত গ্রন্থমেলা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য, সাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ফজল। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত এ গ্রন্থমেলায় ভারত, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ৪৩টি বইয়ের স্টল ছিল। বাংলাদেশের স্টলগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের কয়েকটি পুস্তক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ ঢাকা থেকে কিছুসংখ্যক প্রকাশনা সংস্থা স্টল নিয়েছিল মেলায়। সে বছর জাতীয় গ্রন্থমেলার স্লোগান ছিল ‘বই হোক নিত্যসঙ্গী’। সাপ্তাহিক বিচিত্রার (৩য় বর্ষ, ৪০ সংখ্যা, ৭ই মার্চ ১৯৭৫) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঢাকার বাইরে কোনো শহরে এই প্রথম এ ধরনের মেলা অনুষ্ঠিত হল। সাতদিনব্যাপী এ মেলা বা প্রদর্শনীর মূল মঞ্চে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ কবিতা পাঠ, ছড়া, গান, নাট্যানুষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও কবি গানের আসর বসেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র চট্টগ্রামের পাবলিক লাইব্রেরি ভবনে আরেকটি বইমেলার আয়োজন করে। এটি চট্টগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বইমেলা। চট্টগ্রামের বইপ্রেমী মানুষ রীতিমত টিকিট কেটে মেলায় প্রবেশ করে বই কিনেছিলেন। অভূতপূর্ব এই মেলার পর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র চট্টগ্রামের এম.এ. আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে অন্য একটি বইমেলার আয়োজন করে। ঢাকার শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থাগুলো এ মেলায় অংশগ্রহণ করে। এটি চট্টগ্রামে সর্ববৃহৎ বইমেলা হিসেবে স্বীকৃত হলেও বই বিক্রি, লেখক পাঠকের ব্যাপক সমাগম ও চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকর্মীদের তেমন অংশগ্রহণ না থাকায় আগের বইমেলার জনপ্রিয়তাকে ডিঙোতে পারেনি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় যে শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কেন্দ্রিক স্বল্পপরিসরে বইমেলার আয়োজন শুরু হয় গত শতকের সত্তর দশকের শেষের দিকে। নিয়মিতভাবে না হলেও চট্টগ্রামে অবস্থানরত তরুণ কবি ও লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা মিলে হাতেগোণা কয়েকটি টেবিল সাজিয়ে বইমেলার আয়োজন শুরু করেন। পরে চট্টল ইয়থ কয়ারের উদ্যোগে এবং একুশে মেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় আয়োজন করা হয় একুশ মেলার। একুশে মেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে এই মেলার আয়োজন এখনো পর্যন্ত অব্যাহত আছে। তবে শহীদ মিনারে নয়, ডিসি হিলে। এদিকে চট্টগ্রামের প্রকাশনাগুলোর প্রচার ও প্রসারের লক্ষে ‘চট্টগ্রামের লেখকদের বই, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত বই’ নিয়ে প্রকাশনা সংস্থা ‘শৈলী’ ২০০০ সালে স্বাধীনতার মাসে শুরু করে প্রথম ‘স্বাধীনতার বইমেলা’। পরে এই মেলার আয়োজনের দায়িত্ব গ্রহণ করে চট্টগ্রাম একাডেমি। ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, ‘চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ’ গঠিত হলে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশকদের নিয়ে একুশের বইমেলার আয়োজনের গুরুত্ব অনুধাবন করেন নেতৃবৃন্দ। ফলে ২০০৯ ও ২০১১ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের লেখক, সাংবাদিক ও পাঠকদের সম্পৃক্ত করে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট হল প্রাঙ্গণে ‘চট্টগ্রাম সৃজনশীল বইমেলা’র আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে প্রথম একুশের বইমেলা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে, লালদিঘি মাঠে। পরবর্তীকালে ২০১২ সালে এই মেলার আয়োজন হয় মুসলিম ইনস্টিটিউট হল প্রাঙ্গণে। এতে সহায়তা দেয় চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ। এখনো পর্যন্ত এই মেলার আয়োজন অব্যাহত আছে। এছাড়াও চট্টগ্রামে নানা সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নামের বইমেলা। এর মধ্যে রয়েছে : বৈশাখী বইমেলা, বর্ষাকালীন বইমেলা, শরৎকালীন বইমেলা, নববর্ষের বইমেলা ও ছোটোদের বইমেলা।
গতবছর থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে শুরু হয় একুশের অভিন্ন বইমেলা। এটি চট্টগ্রামের পাঠকদের চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। এবার দ্বিতীয়বারে মতো আয়োজিত মেলাও সবার আগ্রহ ও চাহিদা পূরণে সচেষ্ট হবে বলে আমরা আশা করি। সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে এই মেলা হয়ে উঠতে পারে লেখক-পাঠকদের প্রাণের মেলা।

x