সরু রাস্তায় নিত্য যানজট, আছে মাদকসেবীর উৎপাতও

আজাদী প্রতিবেদন

শনিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৪:৫৬ পূর্বাহ্ণ
223

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ড। নগরীর একেবারেই প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই ওয়ার্ডের গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রায় এক বর্গ মাইল আয়তনের এই ওয়ার্ডে লক্ষাধিক মানুষের বাস। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ হাজার ৫শ জন। ওয়ার্ডে পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি উচ্চ বিদ্যালয়, একটি কলেজ ও একটি আলিয়া মাদরাসা রয়েছে। এই এলাকার তিন দিক কর্ণফুলী নদীবেষ্টিত। আর নদীর সঙ্গে ওয়ার্ডের সব নালাকে সংযুক্ত করেছে বদর খাল ও মরিয়ম বিবি খাল। কিন্তু দীর্ঘ দিন খনন না করায় এবং দু’পাশ অবৈধ দখলে চলে যাওয়ায় ছোট হয়ে এসেছে খালের পরিধি। আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে ৯ জন সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

বর্তমান কাউন্সিলর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে ওয়ার্ডের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি মাদক নির্মূলে বেশ তৎপর ছিলেন। শতভাগ নির্মূল করতে না পারলেও অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন বলে আজাদীকে জানিয়েছেন। সরেজমিনে গত কয়েকদিন পুরো এলাকা ঘুরে ওয়ার্ডের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখানে যানজটের সীমাহীন দুর্ভোগের পাশাপাশি মাদকের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সমস্যাও রয়েছে এই ওয়ার্ডে। এখানকার বেশিভাগ রাস্তাই সরু। এসব রাস্তায় যখন তখন ট্রাক প্রবেশ করে যানজট সৃষ্টি করে। তবে দিনদিন অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
প্রার্থী যারা : নির্বাচনে ৩৪নং পাথরঘাটা ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৯ জন। এরা হলেন বিএনপির বর্তমান কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইসমাইল, আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আনিসুর রহমান (ইমন), পুলক খাস্তগীর, সুমন চৌধুরী, আসফাক আহমদ ও মশিউর রহমান রোকন, বিএনপির সুফি মো. শফিকুল আলম, সুজন কুমার ভট্টাচার্য্য এবং ৩৩, ৩৪ ও ৩৫ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের বর্তমান কাউন্সিলর লুৎফুন্নেছা দোভাষ বেবী।
এলাকার সমস্যা : ওয়ার্ডের ব্রিকফিল্ড রোড, সিঅ্যান্ডবি কলোনি, আশরাফ আলী রোডসহ আশপাশের এলাকাগুলো খুবই সরু হওয়াতে প্রতিদিনই যানজট নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাজার হাজার মানুষ শাহ আমানত ব্রিজ নেমে পাথরঘাটা এবং ফিরিঙ্গি বাজার দিয়ে শহরে-কোতোয়ালী অথবা নিউ মার্কেট এলাকা প্রবেশ করে। বিশাল এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বর্ষা মৌসুমে পানি চলাচলের পর্যাপ্ত বড় নালা বা খাল নেই। প্রায়ই দখল হয়ে গেছে। এই কারণে বর্ষাকালে এলাকায় সামন্য বৃষ্টি হলে পানিতে ডুবে যায়। আর মাদকের বিস্তার তো আছেই। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে। কিছু সড়ক সম্প্রসারণ হলেও নালা নর্দমাগুলো যথারীতি আবর্জনায় ভরাট ও দখলের থাবায়। তাছাড়া এ ওয়ার্ড সংলগ্ন কর্ণফুলী নদী হওয়ায় সহজে ও দ্রুত উঠে যায় জোয়ারের পানি। কিন্তু পানি নেমে যাওয়ায় চাক্তাই খাল ও মরিয়ম খাল দু’টি বেদখল ও ভরাটের কবলে। ফলে দীর্ঘায়িত হয় জলাবদ্ধতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের আগ্রাসনের কবলে ওয়ার্ডের তরুণরা। কিন্তু নগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ থানা কোতোয়ালী এই ওয়ার্ডের পাশ ঘেঁষেই। তারপরও মাদক সমস্যা কোনো মতেই সমাধান হচ্ছে না। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতাও ভোগাচ্ছে ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। তার অন্যতম প্রধান কারণ খাল ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়া।
বর্তমান কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইসমাইল আজাদীকে জানান, আমরা ওয়ার্ডে গত ৫ বছরে ৪০ কোটি টাকার উন্নয়ন হয়েছে। এলাকার মানুষের স্বপ্ন পূরণের সব চেয়ে বড় যে বিষয়টি সেটি হলো- ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে পাথরঘাটা সিটি কর্পোরেশন বালক উচ্চ বিদ্যালয়। অত্যাধুনিক এই স্কুলটি করার ফলে এলাকাবাসী খুবই খুশি। সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই স্কুলটি আগামীতে বৈকালিক শাখাও চালু করা হবে। তিনি বলেন, মাদক সমস্যা নিরসন ছিল আমার অন্যতম লক্ষ্য। আমার গত দুই মেয়াদে এ সমস্যা অনেকাংশে কমেছে বলে আমি মনে করি। একটি মদের দোকান ছাড়া আর তেমন কোনো আস্তানা নেই। ওয়ার্ডের অনেক সড়ক সম্প্রসারণ সংস্কার করা হয়েছে। পুরো ওয়ার্ডকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এলাকার গরিব-দুস্থদের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন, গরিব শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার জন্য পাথরঘাটা বয়েজ স্কুল ও পাথরঘাটা রবীন্দ্র-নজরুল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা এখন আমার ওয়ার্ডে তেমন নেই। তবে জোয়ারের সময় পানি উঠে।
মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ইমন : পাথরঘাটা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক তিনি। ১৯৯০ সালে পাথরঘাটা ২নং ইউনিটের ছাত্রলীগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার হাতেকড়ি। ১৯৯৫ সালে ওয়ার্ড ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৯৭ সালে কোতোয়ালী থানা ছাত্রলীগের সিনিয়র সদস্য ছিলেন। ২০০১ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সিটি কলেজ শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ছিলেন।
আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তিনি পাথরঘাটা ওয়ার্ড থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নে কাউন্সিলর নির্বাচন করতে চান বলে জানান। এই ব্যাপারে তিনি আজাদীকে বলেন, স্কুল জীবন থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আর্দশের রাজনীতি থেকে একদিনের জন্যও বিচ্যুত হইনি। দীর্ঘদিন এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে আছি। এলাকাবাসী চান-আমি কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করি।
পুলক খাস্তগীর : নব্বই দশকের ছাত্রনেতা, সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা পুলক খাস্তগীর। রাজনীতির পাশাপাশি খেলাঘরসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জড়িত। আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, প্রত্যেক রাজনীতিবিদের শেষ অভিপ্রায় থাকে দলের মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করে জনগণের পাশে থাকার। আমার অভিপ্রায়ও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাকে দল যদি সুযোগ দেয় তাহলে ওয়ার্ডের মানুষের সেবা করে যাব।
আশফাক আহমেদ : কাউন্সিলর পদপ্রার্থী আশফাক আহমেদ আজাদীকে বলেন, জলাবদ্ধতা এ ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের সমস্যা। যেখানে সেখানে রিকশার গ্যারেজ আর বখাটেদের উৎপাত। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা এলাকার পরিবেশ দূষণ করছে। রয়েছে সুপেয় পানির সংকট। তাছাড়া তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ জড়িয়ে পড়েছে মাদকে। আমি কাউন্সিলর নির্বাচিত হলে সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ করব।
সুমন চৌধুরী : ১৯৯৩ সালের স্কুল জীবন থেকে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত। তিনি বলেন, পাথরঘাটা ওর্য়াড ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করে দলকে সংঘটিত করেছি। ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ শাখার সমাজ কল্যাণ সম্পাদক, সহ-সভাপতি ও বিএনপি ও সেনা শাসিত তত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আন্দোলন সংগ্রাম করে অনেক মামলা হামলার শিকার হয়েছি। নেত্রীর (শেখ হাসিনা) গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মামলায় আসামি হয়েছি। এখন ৩৪নং পাথরঘাটাবাসী চায় আমি কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করি। তাই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছি। নির্বাচিত হলে এলাকার সরু রাস্তাগুলো প্রশস্ত করব।
মশিউর রহমান রোকন : আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তিনি। পাথরঘাটা ওয়ার্ডসহ আশপাশের এলাকায় পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে তার। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়েই তিনি কাউন্সিলর নির্বাচন করতে চান। এ রোকন জানান, এলাকাবাসীর সুখে দুঃখে আছি। তারা চায় আমি নির্বাচনে অংশ নিই।
সুফি মো. শফিকুল আলম : আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ওয়ার্ডের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ছাত্র ও যুব সমাজকে মাদকের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করব। মাদক ও সন্ত্রাস মুক্ত এলাকা উপহার দিব। বিগত চসিক নির্বাচনে বিএনপি পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও দলের নির্দেশে বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে সমর্থন দিই। আশা করছি এবার দল আমাকে মনোনয়ন দিবে।
লুৎফুন্নেছা দোভাষ বেবী : ২০০৫ সালে প্রথমবারের মত তিনি ৩৩, ৩৪ ও ৩৫ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ড থেকে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর থেকে টানা জয়ের রেকর্ড তাঁর। আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন করবেন বলে জানান। এ ব্যাপারে লুৎফুন্নেছা দোভাষ বেবী আজাদীকে বলেন, আমি ২০০৫ সাল থেকে এলাকার মানুষের সাথে আছি। তাদের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেছি। বারবার তারা সেই প্রতিদান আমাকে দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। এবারও আমি দলের মনোনয়ন আশা করছি।