সমগ্র সৃষ্টির জন্য বড় নিয়ামত প্রাপ্তির দিন

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)

রবিবার , ১০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ
43

আজ ১২ রবিউল আউয়াল। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে তিনি পবিত্র মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। আবার ৬৩ বছর বয়সে এই দিনেই তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে রহমাতুল্লিল আলামিন বা সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেন। প্রতিদিন প্রতিক্ষণে বিশ্বের প্রতি প্রান্তে অযুত কণ্ঠে ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরছে তাঁর মহিমাগাথা।
বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর অন্যতম উৎসবের দিন হচ্ছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)। সারা বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমান অত্যন্ত জাঁকজমক, ভক্তি ও মর্যাদার সঙ্গে বছরের এই দিনে ঈদে মিলাদুন্নবী বা নবীর জন্মের ঈদ পালন করেন। যাঁকে সৃষ্টি না করা হলে কোনো কিছুই সৃষ্টি হতো না তাঁর সেই পবিত্র জন্মদিনের চেয়ে খুশির দিন সৃষ্টিকূলের জন্য আর কোনোটিই হতে পারে না। মহানবী (দ.)-এর পবিত্র জন্মদিনই গোটা দুনিয়ার সৃষ্টির জন্য এক বিরাট নিয়ামত প্রাপ্তির দিন, মহাখুশির দিন, সর্বোত্তম দিন। হজরত মুহাম্মদ (দ.) যেই দিন যেই মুহূর্তে পৃথিবীতে তাশরিফ এনেছিলেন, সেই দিন ও সেই মুহূর্তটি বিশ্বজগতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন। এ জন্য বলা হয় ঈদে মিলাদুন্নবী বা নবী (দ.)-এর জন্মোৎসব বা জন্ম দিবসের আনন্দ। তিনি বিশ্বমানবতার প্রতীক ও সত্য-সুন্দরের বাণীবাহক।
পবিত্র মিলাদুন্নবীর ইতিহাস অতি প্রাচীন। মিলাদুন্নবীর সূচনা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন! ‘রোজে আজলে’- ‘পৃথিবীর আদি লগনে’ সব নবীকে নিয়ে আল্লাহ এই মিলাদের আয়োজন করেছিলেন। নবীগণের মহাসম্মেলন ডেকে মিলাদুন্নবী মাহফিলের আয়োজক স্বয়ং আল্লাহ। ওই মজলিসে এক লাখ ২৪ হাজার মতান্তরে দুই লাখ ২৪ হাজার পয়গম্বর (আ.) উপস্থিত ছিলেন। ওই মজলিসের উদ্দেশ্য ছিল হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (দ.)-এর জন্ম, শান ও মান অন্যান্য নবীর সামনে তুলে ধরা এবং তাঁদের কাছ থেকে তাঁর ওপর ইমান আনয়ন ও সাহায্য সমর্থনের প্রতিশ্রুতি আদায় করা। কোরআন মজিদের সুরা আলে ইমরান ৮১-৮২ নম্বর আয়াতে ওই মিলাদুন্নবী মাহফিলের কথা উল্লেখ রয়েছে। নবীজির সম্মানে এটাই ছিল প্রথম মিলাদ মাহফিল এবং মিলাদ মাহফিলের উদ্যোক্তা ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। সুতরাং মিলাদ মাহফিল হচ্ছে আল্লাহর সুন্নাত বা তরিকা। সম্ভবত, সব নবী আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে থেকে মিলাদ শুনেছিলেন এবং কিয়াম করেছিলেন। কেননা, আল্লাহর দরবারে বসার কোনো অবকাশ নেই। পরিবেশটি ছিল আদবের। মিলাদ পাঠকারী ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ এবং কেয়ামকারীগণ ছিলেন আম্বিয়ায়ে কেরাম।
নবীয়ে দোজাহানের শুভাগমনের মাস হিসেবে পবিত্র রবিউল আউয়াল সমুন্নত শান ও মান-মর্যাদার মহিমায় সমুজ্জ্বল। নিঃসন্দেহে প্রিয় নবীর আবির্ভাব ও তিরোধানের স্মৃতিবিজড়িত মাস হিসেবে এ মাস বর্তমান মুসলিম মিল্লাতের জন্য ঐতিহাসিকভাবে স্মরণীয়। আমরা বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বহু বছর ধরে পবিত্র ‘১২ রবিউল আউয়াল’ দয়াল নবীজির পবিত্র বেলাদত (শুভাগমন) দিবস উপলক্ষে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে মিলাদুন্নবী, জশনে-জুলুস ইত্যাদি পালন করে আসছি, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে বেদায়াতে হাছানা ও মোস্তাহাব। উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হুজুর (দ.)-এর প্রতি যথাযোগ্য সম্মান, দরুদ ও সালাম পেশ করা অতি উত্তম ইবাদত।
ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও সত্যবাদিতার জন্য হজরত মুহাম্মদ (দ) নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ‘আল-আমিন’ নামে। ধর্ম-সমপ্রদায়নির্বিশেষে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক গুণাবলি হিসেবে এসব সদ্‌গুণ সব কালে, সব দেশেই স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, তাঁর মধ্যে সম্মিলন ঘটেছিল করুণা, ক্ষমাশীলতা, বিনয়, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, শান্তিবাদিতার মতো সব মানবিক গুণাবলির। আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি কর্মময়তাও ছিল তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আরব ভূখণ্ডে এমন এক সময়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন পুরো অঞ্চলটি অশিক্ষা, কুসংস্কার, গোষ্ঠীগত হানাহানি, দাসপ্রথা, নারীর প্রতি চরম বৈষম্যসহ নানা রকম সামাজিক অনাচারে নিমজ্জিত ছিল। হজরত মুহাম্মদ (দ.) সেই ঘোর অন্ধকার সময়ে আবির্ভূত হন আলো হয়ে। অন্যায়-অবিচার-অজ্ঞানতার আঁধার থেকে মানুষকে তিনি সত্য ও ন্যায়ের আলোকিত পথ দেখান। ইসলামের সেই আলো এরপর শুধু সেই ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়।
সার্বিক অর্থে মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্যই আবির্ভাব ঘটেছিল এই মহামানবের। তাঁর সত্য ও ন্যায়ের আদর্শ ছিল সর্বমানবিক। আজকের হানাহানি ও সংঘাতময় পৃথিবী শান্তির দিশা পেতে পারে এই মহামানবের প্রদর্শিত শান্তি ও সমঝোতার পথে। তাঁর সুমহান জীবনাদর্শ থেকে মানুষের প্রতি সর্বোত্তম ব্যবহার, বিনয়ী চরিত্র, বিনম্র ব্যক্তিত্ব, আনুগত্যতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনসেবা ও মানবকল্যাণ সুনিশ্চিত করাই হোক পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর শিক্ষা। তাই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপন করে সেই মহান রবের নিয়ামত প্রিয় নবীকে স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মধ্যেই রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তির পথ ও পাথেয়।
তাঁর আদর্শ ও চারিত্রিক মাধুর্যের কারণে নানা গোত্রে বিভক্ত, কলহ-বিবাদপ্রিয়, সামাজিক ও নৈতিকভাবে অধঃপতিত, যাযাবর ও বর্বর আরব জাতি একটি সুমহান জাতিতে পরিণত হয়। তিনি উৎপীড়িত ও অত্যাচারিত মানুষের প্রকৃত বন্ধু ছিলেন। অনাথ, দাস, কন্যাশিশু, বিধবা নারী ও গরিব-দুঃখীর দুঃখ মোচনে সদা তৎপর ছিলেন। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে হেরা গুহায় নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই তাঁকে আল-আমিন (বিশ্বস্ত) ও আস-সাদিক (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। সরকারে দো আলম সাইয়িদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ (দ.) ছিলেন বিশ্ব মানবতার প্রতীক ও সত্য-সুন্দরের বাণীবাহক। তাঁর আদর্শ ও চারিত্রিক মাধুর্যের কারণে নানা গোত্রে বিভক্ত, কলহ-বিবাদপ্রিয়, সামাজিক ও নৈতিকভাবে অধঃপতিত, যাযাবর ও বর্বর আরব জাতি একটি সুমহান জাতিতে পরিণত হয়। তাঁর কারণেই আরব জাহানে নবজীবন সঞ্চারিত হয়, নতুন সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটে, নবীন সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় এবং উদ্ভব ঘটে একটি নতুন জীবনব্যবস্থার।
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) এর আনন্দঘন এ দিনে আমরা প্রার্থনা করি, মহানবী (দ)-এর শান্তি, মিলন ও ভ্রাতৃত্বের জীবনাদর্শই হোক আমাদের জীবনের একমাত্র পাথেয়। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করেই আমরা সব ধরনের অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্তি পেতে পারি। জাতিতে-জাতিতে মিলেমিশে বসবাস করতে পারি। সারা পৃথিবীর মুসলমানদের মতো বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাও আজ যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপন করবে। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, নবীজির বাণী হৃদয়ে ধারণ করা এবং তা মেনে চলার মধ্যেই রয়েছে এই দিবস উদ্‌যাপনের প্রকৃত তাৎপর্য।

x