সবিনয়ে নিবেদন প্রধানমন্ত্রী

কামাল লোহানী

মঙ্গলবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
27

প্রধানমন্ত্রী, আপনি দেশ চালাচ্ছেন, কুশলী যোগ্যতার সাথে। একথা ঠিক দেশের বিপুল উন্নতি সাধন করে চলেছেন, একথা যারা অস্বীকার করেন, তারা নিতান্তই নির্বোধ। পদ্মা সেতু নির্মাণের যে ‘চ্যালেঞ্জ’ আপনি নিয়ে জনগণের অর্থে কাজটি সম্পন্ন করতে যাচেছন তা সত্যিই চমৎকৃত করে সকলকে। এই যে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক যে কলঙ্ক লেপন করতে চেয়েছিল, তাকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অর্থ ব্যয়ে সেতুর একেকটি স্প্যান দৃশ্যমান করে চলেছেন। অনেক সময় নিচ্ছেন ফলে খরচের বহর প্রাক্কলিত অর্থের চেয়ে প্রতিদিন বেধড়ক বেড়ে চলেছে। অর্থসঙ্কট জনগণের টাকায় সামাল দিচ্ছেন, মারহাবা! এগুলো ভিন্ন মতাবলম্বীরা তীর্যক দৃষ্টিতে দেখছেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে কঠিন বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়ে একেকটি ‘স্প্যান’ ওঠানোয় চলছে দারুন প্রচার-প্রচারণা। এতো বৈষম্য সত্ত্বেও পদ্মা সেতু আমাদের চমৎকৃত করে। পদ্মা সেতু শেষ হলে উভয় অংশের জনগণের উন্নতি হবে তা নিয়ে সকলে উল্লসিত, কিন্তু দুই অংশের মধ্যে যে মানগত বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠবে তার কথা কি মনে আছে? অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বলে আপনি তো সম্ভাবনার কথা শোনাচ্ছেন, আমরাও শুনে পুলকিত। কিন্তু সময়, শক্তি ব্যয় করে অবশেষে হয়তো শেষ হবে পদ্মা সেতু তবে শ্রেণি বিভেদ এমন ভাবে ফুটে উঠবে তা কি আমরা সাধারণ জনগণ বহন করতে পারবো? তখন কি হবে? এই উন্নয়নের জৌলুশটাই চোখে পড়ছে। আমরা নির্বোধ জনগণ বুঝতে পারছি। যাক, তবু হোক, সাধুবাদ জানাবে সবাই। তবে অর্থের বোঝা যেন জনগণের উপর এসে না পড়ে, সেদিকে আপনার সদয় দৃষ্টি প্রত্যাশা করছি। পদ্মাসেতুকে ‘শেখ হাসিনা সেতু’ স্তুতিবাজ আইনপ্রণেতারা সবাই নামকরণের প্রস্তাব করলেও আপনি প্রত্যুতপন্ন বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রত্যাখান করে সচেতন জনগণের কাছে নন্দিত হয়েছেন। সাধুবাদ আপনাকে।
রাষ্ট্রের কত যে প্রতিষ্ঠানের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে করা হচ্ছে, সত্যি কথা বলতে কি, ‘উষ্কানিদাতা’ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও তীর্যক চোখে দেখছে। জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নাম একজনের নাম এতো অধিক হবে কেন? সরকারি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হিসাব করে দেখা উচিত যেই চাইবে সে-ই বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করবেন সেটা সাধারণ মানুষের কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না।
বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, অভ্যুদয়ের মহানায়ক। সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ যেখানে বঙ্গবন্ধুর নামে, তারই স্বাধীনতার আহ্বানে, তিনি তো বাংলার সাধারণ মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। তিনি যে সম্মানে সমাসীন, মহীমায় প্রতিষ্ঠিত এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নদ্রষ্টা যে উচ্চতায় উঠে গেছেন সকল জনগণের সমর্থন পেয়ে তাঁকে কি আদৌ টেনে নামানো সম্ভব? শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আজ একটি অমোঘ নাম।
তাহলে কেন দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ইত্যাদির সাথে তাঁর নাম জড়িয়ে তাঁকে অপমান ও অবমাননা করা হচ্ছে। যেখানে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক ত্যাগী বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা রয়েছেন তাঁদের রাজনৈতিক ত্যাগকে কি অবমাননা করা হচ্ছে না! বঙ্গবন্ধু নিজেও তাঁদের শ্রদ্ধা, সম্মান করতেন। এই সব বরেণ্য প্রবীণ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় কতো জেলে একত্রে দিনাতিপাত করেছেন তিনি। ইতিহাসের মহানায়ক সেই আমল থেকে কতকাল জেল খেটেছেন এবং প্রবীণ-অভিজ্ঞ দীর্ঘকাল কারাবাসকারী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কাছ থেকে উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাস জেনেছেন। তাঁকে হত্যা করা না হলে তিনি এইসব মহাপুরুষদের নিশ্চয় তাচ্ছিল্য-অবজ্ঞা করতেন না।
তাঁর সাথে পরিচয় হয়েছিল ছোট বড় অনেক কমিউনিস্ট নেতাদের। এঁদের অনেকের সাথেই তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়েছিল। জেলখানার ভেতর রাজনৈতিক আদর্শগত বিরোধ থাকলেও তাঁর সাথে কোনোদিনও ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
তাহলে নিজ ক্ষমতা আমলে বেধড়ক নামকরণের উৎসব করে আমরা কি বঙ্গবন্ধুর প্রতি আদতেই সম্মান প্রদর্শন করতে পারছি? তাই বলছিলাম, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেকোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রশ্নে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করে প্রথম সৃষ্ট রাজনৈতিক দলের সেকালের সাহসী রাজনৈতিক জননায়ক এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নামটি ভুলে যাবেন না। তাছাড়া মুসলিম লীগকে উচ্ছেদকারী ঐক্যজোট ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠনে পুরোধা ছিলেন মওলানা ভাসানীসহ পশ্চিম পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের অবাঙালি নেতা হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী আর কৃষক-প্রজা পার্টির নেতা শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক, এঁদের প্রতিও জাতীয় ভাবে একই ধরনের শ্রদ্ধা নিবেদন করা উচিত। অবশ্য সে শ্রদ্ধা যেন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। প্রধানমন্ত্রী সমীপে আমার সবিনয় আর্জি তিনি যেমন পদ্মা সেতু নিজের নামে করতে আপত্তি জানিয়েছেন সেই মহত্ত্ব নিয়ে তিনি মওলানা ভাসানী ও অন্যান্য শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দের প্রতি একই সম্মান দেখাবেন এটাই সকলের কাম্য। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের যতগুলো প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছে এবং যে সকল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশেষ করে মওলানা ভাসানী, তাঁর অবদান এবং তাঁকেও কিন্তু আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। যেমন: জীবনভর বিদ্রোহের প্রতীক কমরেড মণি সিংহ। এঁরা আমাদের শ্রদ্ধেয় সুতরাং জাতির কাছে এঁদের অতীত এবং দেশ ও জাতির প্রতি সকল কর্মকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরে সম্মান প্রদর্শন করা অপরিহার্য। এখানে উল্লেখ্য, ফজলুল হকের নামে রাজধানীর বুকেই শেরে বাংলা নগর নামে একটি এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য কৃতিত্বের দাবিদার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সোহরাওয়ার্দীর নামে রেসকোর্স ময়দানের নামকরণ করা হয়েছে। অথচ মওলানা ভাসানীর নামে কিছুই করা হয় নি। তিনি যেমন উপেক্ষিত তেমনি ব্রাত্য।
প্রধানমন্ত্রী সমীপে আরেকটি আর্জি পেশ করতে চাই মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ককে যেভাবে অগণিত জায়গায় নামকরণের ফলকে বিধৃত করা হয়েছে এটা যদি ক্ষমতার পালাবদলে কেউ ‘টেনে তুলে ফেলে দেয়’ তা কি আদৌ রাষ্ট্রের সুনামকে দেশে কিংবা বহিঃবিশ্বে প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা অসম্মানের কারণ হবে না? এমন ঘটনা তো পূর্ব থেকেই ঘটে আসছে।
রোলমডেল বাংলাদেশের আরেক কৃতিত্ব :

দেশের প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, সংসদীয় দলের নেত্রী এবং নামমাত্র ‘চৌদ্দদলীয়’ ঐক্যজোটের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারে আরেক কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছেন। আমরা সবাই জানি মন্ত্রীসভার প্রধান থাকেন সাধারণত সংসদীয় দলের নেতা। সেই হিসেবে শেখ হাসিনা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এবারের জাতীয় বাজেট প্রদান করার কথা ছিলেন অর্থমন্ত্রীর। বাজেট উপস্থাপনার দিন তিনি ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও জনাব কামাল অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাজেট উপস্থাপন করবেন সেই প্রাচীন কায়দায় ব্রিফকেস ভর্তি মুদ্রিত বাজেট নিয়ে যথারীতি প্রধানমন্ত্রীর সাথে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করলেন এবং প্রায় শূন্য বিরোধী দলীয় সংসদে সমর্থক সকল সদস্য করতালি দিয়ে তাদের আগমনকে অভিনন্দিত করলেন। যথারীতি মাননীয় স্পিকারের সম্মতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী অসুস্থতার কারণে অনুমতি নিয়ে বসেই পাঠ করতে শুরু করলেন। প্রায় ঘন্টাখানিক চলার পর তিনি আর না পারায়, সব দায়িত্ব যেমন প্রধানমন্ত্রী নেন ঠিক সেইভাবে আপনি অর্থমন্ত্রীর পরিবর্তে পূর্ণ বাজেটটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করলেন…আমি ৬৪ বছর সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় এধরনের ঘটনার কথা মনে করতে পারছি না। হ্যাঁ ইতিপূর্বে টানা ১০ বছর অর্থমন্ত্রী থাকা কালে আমার চেয়ে মাত্র ৬ মাসের বড় তবু শ্রদ্ধেয় মুহিত ভাই অর্থাৎ আবুল মাল আব্দুল মুহিত তার বিশাল বাজেট বক্তৃতা ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়েই করেছেন। কিন্তু পরের দিকে বার্ধক্যের চাপে পড়ে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে চেয়ারে বসে তার কথা ও প্রশ্নোত্তর বলতেন। আরও উল্লেখ্য এই সংসদেই মোহাম্মদ সাইদুজ্জামান একসময় অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বাজেট পাঠ করার সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। যাক এসব পুরোনো কথা। আমার ধারণা অর্থমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপনকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেয়ার সম্ভবত রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু এবারে তার ব্যত্যয় ঘটলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বাজেটের সম্পূর্ণ অংশটুকু পাঠ করলেন। পরদিন সাংবাদিক সম্মেলন করে নানা প্রশ্নের জবাব দিলেন এবং সর্বশেষে অর্থমন্ত্রীর হয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বাজেট উপস্থাপনা উপলক্ষ্যে নৈশভোজের আয়োজনও করলেন। আপনি বিষয়টিকে টেনে নিয়ে গেছেন এটি আপনার কৃতিত্ব এবং আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু গোটা রেওয়াজটা-বাজেট উপস্থাপনা থেকে নৈশভোজ পর্যন্ত যে কর্মকাণ্ড তা কি শুদ্ধ হয়েছে? নাকি মন্ত্রীসভায় মুদ্রিত বাজেট বক্তৃতা পাঠ করার মতন কেউ ছিলেন না অথবা আপনি নির্ভর করতে পারেননি।
আপনার কাছে আরো বহু প্রশ্ন আছে যা দোষারোপ না করেও আপনার কাছে আমার জিজ্ঞাস্য। ভবিষ্যতে এবিষয়ে জানবার আশা রইলো। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, ভাষা-সংগ্রামী

x