সন্ধ্যা কাটলো রাগের অনুরাগে

সনেট দেব

বৃহস্পতিবার , ৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
10

শুধুই রাগাশ্রয়ী গানের একটা সন্ধ্যা আজকাল খুব একটা শোনা যায় না কেন? আচ্ছা, রাগাশ্রয়ী গান মানেই নিশ্চয়ই রাগপ্রধান গান নয়? সমকালীন গানে কি কোথাও রাগ-রাগিনীর ছোঁয়া নেই? এইসব প্রশ্ন আপনাদের মতো আমার মনেও ঘুরপাক খায়। সত্য কথা বলতে কি, বাংলা গানে রাগের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতকে রচিত চর্যাগীতির বিভিন্ন পদে। যেমন, পটমঞ্জরী রাগে রচিত ‘ঢেগুন পা’র ৩৩ নং চর্যাপদটি ছিলো- ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী, হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী’। যার আধুনিক বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- ‘টিলার উপর আমার ঘর, আমার কোন প্রতিবেশী নেই। আমার হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ নিত্য অতিথি আসে।’ পরবর্তীকালে বাংলা গানের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই পদকর্তাগণ তাঁদের রচনায় রাগের উল্লেখ করেছেন। জয়দেবের গীতগোবিন্দ থেকে শুরু করে পদাবলী কীর্তন, মঙ্গলগীতি, শ্যামাসঙ্গীত, টপ্পা, ব্রহ্মসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রভৃতি সঙ্গীতধারায় বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর প্রভাব রয়েছে। তবে উল্লিখিত সঙ্গীতধারাসমূহে রাগ-রাগিণীর প্রয়োগের চেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুটনের প্রয়াসই প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলা রাগপ্রধান গানের পদ রচনায় ভারতীয় রাগসঙ্গীতের রীতি অনুসৃত হলেও গায়নশৈলীতে ধ্রুপদ, খেয়াল প্রভৃতির নিয়ম-কানুন ততটা পালিত হয় না।

উনিশ ও বিশ শতকে বাংলা রাগসঙ্গীত দ্বারা বাংলা আধুনিক গান গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর রীতি-পদ্ধতি সার্থকভাবে বাংলা গানে প্রয়োগ করেন। তিনি বাংলা গানের সনাতন পদ্ধতি ভেঙ্গে নতুন রীতিতে ভাবগীতি, রাগপ্রধান গান, লঘু সঙ্গীত প্রভৃতি রচনা করেন। তাঁর অনুসরণে সমকালীন সঙ্গীতজ্ঞ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন এবং পরে কাজী নজরুল ইসলাম রাগরীতি ব্যবহার করে বাংলা গানের উৎকর্ষ সাধন করেন। অতুলপ্রসাদ তাঁর বিভিন্ন গানে রাগগীতি গাওয়ার নানা কলাকৌশল প্রয়োগ করেন। এ বিষয়টি তাঁর গানের সুরে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। রাগ-রাগিণীকে প্রাধান্য দিয়ে আধুনিক বাংলা গান রচনা ও গাওয়ার যে রীতি বিশ শতকের তৃতীয় দশকে শুরু হয়েছিল, তাকে আরও সমৃদ্ধ করেন নজরুল ইসলাম। তাঁর হাতেই নানা রাগ-রাগিণীভিত্তিক বাংলা রাগপ্রধান গান এক চমৎকার রূপ লাভ করে। ফলে তৎকালীন বাংলায় রাগপ্রধান বাংলা গান বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।

প্রতিটি গানের ভিতর অন্তনিহিত ভাবেই লুকিয়ে থাকে রাগ। আর রাগে’র অনুরাগে এক ভিন্ন ধরনের সন্ধ্যা কাটালো চট্টগ্রামের সংগীত পিপাসু শ্রোতারা। ভিন্ন ভিন্ন রাগের আলোকে ভিন্ন আঙ্গিকের গান গাওয়ার প্রচেষ্টা নিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটায়, নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তে অভ্যুদয় সংগীত নিকেতন প্রথমবারের মত আয়োজন করেন ‘রাগ’ এর অনুরাগ শীর্ষক সঙ্গীত সন্ধ্যার। কখনো শাস্ত্রীয় সংগীত আবার কখনো রবীন্দ্রনাথ, কখনো নজরুল সহ রাগ নির্ভর জনপ্রিয় কিছু গান এই আয়োজনের ভিন্ন মাত্রা সংযোজন করে। মূল রাগের সাথে মিল রেখে তিন ধারায় তিনশিল্পী তাদের ভিন্ন আঙ্গিকে গায়ন রীতি উপস্থাপন করে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন। আর এই তিন গুনী শিল্পী হলেন, শাস্ত্রীয় ও নজরুল সঙ্গীতশিল্পী সুব্রত দাশ অনুজ ও রাজেশ সাহা। সাথে ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী শ্রেয়সী রায়। এই তিন শিল্পীর অনবদ্ধ পরিবেশনায় পুরোটা সময় জুড়ে দর্শকদের সংগীতের তৃষ্ণা নিবারণ করে।
আবৃত্তিশিল্পী সেঁজুতি দের অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় আয়োজনে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তরুণ উদয়মান তবলাবদক সানি দে। মালকোষ, বেহাগ, দেশ, বাগেশ্রী ও ভৈরবী এই পাঁচটি রাগের উপর শিল্পীরা পরিবেশন করে তাঁদের পরিবেশনা। পরিবেশনা শুরু হয় মালকোষ দিয়ে। সুব্রত দাশ অনুজ তাঁর অন্যন্য গায়কীতে “কৃষ্ণ মাধো রাম নিরঞ্জন গোবিন্দ গোপাল” বন্দিশে শুরু করে রাগ মালকোষ। তিনতালে তালের একই সুরের রাগের আলাপের পর প্রবেশ করেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী শ্রেয়সী রায় ‘আনন্দ ধারায় বহিছে ভুবনে’ গান দিয়ে। গানের অন্তরাটুকু শেষেই শিল্পী রাজেশ সাহা শুরু করেন মালকোষ রাগের আঁধারে নজরুলের ‘শশ্মানের জাগিছে শ্যামা মা’ গানটি। একটু ক্ল্যাসিকাল, একটু রবীন্দ্র, একটু নজরুল। এভাবে একটি ভিন্ন রকম পরিবেশনা শুরতেই দর্শকদের মনে অন্য রকম আলোড়ন তৈরী করে।
বেহাগ রাগে শিল্পী সুব্রত দাশ অনুজ শুরু করেন তুলসী লাহেরীর দূর্লব গান ‘আমায় বলোনা ভুলিতে বলো না’ গানটি দিয়ে। এ গানকে অনেকে নজরুল সঙ্গীত মনে করে। বাস্তবে এটি তুলসী লাহেরীর উনিশ শতকের বিখ্যাত গান ছিলো। একই রাগে শিল্পী শ্রেয়সী রায় রবীন্দ্রনাথের ‘মহারাজ একি সাজে’ এবং শিল্পী রাজেশ সাহা বেহাগ রাগের উপর খেয়াল পরিবেশন করেন। দেশ রাগের শুরুতে তিনতালে ‘করম করদিজে খাজা মঈনউদ্দিন’ বন্দিসে রাগ পরিবেশন করেন শিল্পী সুব্রত দাশ অনুজ। তারপর রাজেশ সাহা অরুণ ভাদুরীর বিখ্যাত ‘ঐ ঘিরে আসে বাদলের মেঘ’ ও শ্রেয়সী রায় রবীন্দ্রনাথের ‘এসো শ্যামল সুন্দর’ গানটি পরিবেশন করেন একই রাগ ও তালে।
বাগেশ্রী রাগে শিল্পী শ্রেয়সী রায় করেন রবি ঠাকুরের ‘আমার মিলন লাগি’, শিল্পী সুব্রত দাশ অনুজ করেন নজরুলের ‘চোখের নেশা ভালোবাসা’ এবং কাহারবা তালের উপর শিল্পী রাজেশ সাহা বাগেশ্রীর উপর খেয়াল পরিবেশন করেন। ভৈরবী রাগে শিল্পী শ্রেয়সী রায় করেন রবি ঠাকুরের ‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো’, শিল্পী রাজেশ সাহা করেন নজরুলের ‘হে মাধব, হে মাধব’। শিল্পী সুব্রত দাশ অনুজ ভৈরবী রাগের উপর ‘সাদরা’ পরিবেশন করেন। ঝাঁপতালের এই পরিবেশনার ছিলো শুধু ঈশ্বর বন্দনা। আয়োজনে ইতি টানা হয় রজনীকান্ত সেনের লেখা, ভৈরবী রাগের আবেশে ‘তুমি নির্মল করো, মঙ্গলো করে, মলিন মর্ম মুছায়ে’ গানটি দিয়ে। তিন গুনী শিল্পীর ত্রৈয়ী কণ্ঠে পরিবেশত হয় গানটি। আয়োজনে শিল্পীদের সাথে তবলায় সানি দে, কী বোডে সৃজন রায়, বেহেলায় শ্যামল চন্দ্র দাশ ও অক্টোপ্যাডে জুয়েল দাশ।

x