সন্তানের গল্পে মা

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৯ at ৪:১৮ পূর্বাহ্ণ
61

বিশ্ব মা দিবস মজ্জাগত হয়নি বলে হয়তোবা ব্যক্তিগত পর্যায়ে মাকে নিয়ে দিবসটি উদযাপনের কথা আমরা ভাবি না। গত মা দিবসের প্রাক্কালে করুণা আচার্যের কথা শুনে তাই চমকে উঠেছিলাম। করুণা তাঁর নবতিপর মাকে রীতিমতো মঞ্চে তুলে সুধীজনসমক্ষে আনুষ্ঠানিক সম্মাননা জানাতে চান। মা অর্চ্চনা বালা আচার্য প্রতীক হবেন সকল মায়ের। এও সম্ভব? আমি বোকার মতো প্রশ্ন করি। করুণার ত্বরিত উত্তর, কেন নয়? আমি করবো। তার আগে একটা কাজ করতে হবে আমাকে। যাঁরা লেখালেখি করেন, লেখার কাজের সঙ্গে যুক্ত যাঁরা, তাঁদের সবাইকে অনুরোধ করবো ‘মা’ সম্পর্কে লিখতে। যার যেমন খুশি। নিজের মা, পরের মা, কোনো মহীয়সী মা, বিশ্বমাতা-যাকে নিয়ে যেভাবে ইচ্ছে লিখবেন সবাই। আমি বই করবো। সে বই এর প্রকাশনা উৎসব হবে ওই অনুষ্ঠানে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজটা করবো । আমি চাই আমার মা দেখুক, জানুক, বুঝুক আমি মাকে কতটা ভালবাসি। অতঃপর মাঝে মাঝে করুণার ফোন পেয়েছি। কাজের অগ্রগতির কথা শুনেছি। হঠাৎ করে সেদিন ‘মায়ের স্মৃতি’ হাতে পেয়ে চমকে উঠেছি। বই এর সঙ্গে বইয়ের প্রচ্ছদের মতো প্রচ্ছদে একটি ডায়েরি উপহার। উপরি-পাওনা। একি করুণা তব..।
করুণা তাঁর কথা রেখেছেন। বেশ সুচারুভাবে , ঘটা করে মিলি চৌধুরীর কাব্যিক সঞ্চালনায়, উর্বশী চক্রবর্তী ও রীতাদির (রীতাদত্ত) দেশবন্দনা-মাতৃবন্দনা এক করা গানে, সুধীজনদের কথামালায় গত ২৭ শে সেপ্টেম্বর চেরাগীস্থ সুপ্রভাত হলে অনুষ্ঠানটি সুসম্পন্ন হলো। ফুলে ফুলে সেজে মঞ্চে বসে রইলেন মা অর্চ্চনা বালা আচার্য এবং তাঁর পাশে করুণার হাতে লেখার কলম তুলে দেওয়া দ্বিতীয় জননী বেগম মুশতারী শফি। মুশতারী আপা এ জীবনে অঢেল সম্মান পেয়েছেন। কিন্তু এমন একটি মাতৃসম্মাননা আর পেয়েছেন কি? অনুষ্ঠানের নিয়মে অনুষ্ঠান শেষ হয়। আমরা সবাই যার যার ঘরে ফিরি শতাধিক মায়ের গল্প নিয়ে। বলছি ‘মায়ের স্মৃতির’ কথা ।
‘মায়ের স্মৃতি’ সঙ্কলনে শতাধিক সন্তান লিখেছেন তাঁদের মায়ের কথা। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিজগতের সঙ্গে এদের কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকার কথা বলছে এঁদের লেখক-পরিচিতি। তবু বলবো করুণা আচার্য যখন সম্পাদক তখন এঁরা সকলেই যে স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে লিখেছেন তা ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু যিনি যা-ই লিখুন না কেন ‘মা’ শব্দের পরশপাথরস্পর্শে লেখাটির উপর সোনার আলো ছড়িয়ে পড়েছে। যেমন, নিতান্ত সাদামাটা দশ-পনেরোটি বাক্য রাজন বড়ুয়া তাঁর মতো করে লিখে গেলেন কিন্তু যেই না বললেন দুনিয়ার সব জাদু বোধ করি লুকিয়ে আছে ‘মা’ শব্দে, লেখাটা কেমন আদর পেয়ে যায়। রুমি চৌধুরী যখন লেখেন,‘ আমার মা একাই একটা পৃথিবী অথবা একটি নক্ষত্র’ মায়ের আলোর প্রসাদ পেয়ে গেল লেখাটি। রুনা তাসমিনা, বলতে গেলে কিছুই লিখলেন না। কিন্তু যখন বললেন, একজীবন তো যথেষ্ট নয় মাকে নিয়ে লেখার জন্য আমরা তাঁকে বিশ্বাস করি। মা শব্দের অর্থের জন্য অভিধানের প্রয়োজন হয় না বা কোনো অর্থই এ শব্দের জন্য যথাযথ মনে হয় না লিটন কুমার চৌধুরীর। কাঞ্চনা চক্রবর্তী বললেন, ‘মা’ এক অতল সমুদ্রের নাম, এক অবারিত আকাশের নাম ‘মা’। ‘মায়ের সব গল্পই বর্তমান; মায়ের কোনো অতীত নেই।’ বললেন সত্যব্রত বড়ুয়া। সুপ্রতীম বড়ুয়া লিখেছেন, ‘মা মানেই ভালোবাসা।’ এ ভালোবাসাকে দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপদানের বা এর গভীরতা নিরূপণের চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ। মায়ের ভালোবাসা বালক বয়সে কোমল প্রশ্রয়ের, পরিণত বয়সে আবেগ-উৎকন্ঠার। আর এ ভালোবাসা তিনি বলেন, অঙ্কের হিসাবকে বিভ্রমে ফেলে দেয়। তিনি ভেবে পান না একাধিক সন্তানের জননী তার প্রতিটি সন্তানকে কি করে শতভাগ ভালবাসায় বড় করেন। এসব কথা সিতাংশু করের।
ডা. লাভলু চক্রবর্তী মাকে বিশ্বসভ্যতার শ্রেষ্ঠ সভ্যতা মনে করেন। তাঁর ভাষায়, এক অন্তর্লীন বেদনাপ্রবাহের নাম, বিপুল এক দুঃখবোধের নাম মা। নেছার আহমেদ তাঁর মাকে আর কোথাও খুঁজে পান না, কোনো ধ্রুপদী সাহিত্যেও না। তাঁর মা তাঁর স্বপ্ন, তাঁর স্বর্গ তাঁর হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস। রাসু বড়ুয়া মায়ের সঙ্গে হারিয়ে ফেলেছেন তাঁর নিশ্চিত ঠিকানা।
পবিত্র কোরান-বাইবেল বা বেদ পুরাণ নির্দেশিত মাতৃশ্রেষ্ঠত্ব বা মাতৃসম্মানের চিন্তাসূত্রে কথা গেঁথে যাঁরা লেখা শুরু করেছেন তাঁরাও শেষ পর্যন্ত মাতৃ আবেগের জোয়ারে ভেসেছেন। এসব লেখায় যে মায়েরা উঠে এসেছেন তাঁদের মধ্যে সন্তানের জন্য প্রাণপাত করা মায়ের সংখ্যাই বেশি। মধ্যরাতে সন্তর্পণে সিঁড়ি ভেঙে দরোজায় টোকা দেবার আগেই রমজান আলী মামুন (সদ্য প্রয়াত) নিঃশব্দে দরোজার পাল্লা খুলে মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। মা যখন আর নেই তখন ভাবছেন না জানি এরপর কি হবে! কিন্তু কি আশ্চার্য তিনি নিজেই আর নেই। মা তাঁর মাটির ঘরের দোর খুলেই রেখেছেন আদরের ছেলেটির জন্য। মা হারানোর যন্ত্রণাকে মূলধন করে লিখেছেন সুরেশ কুমার দাশ। মা যাচ্ছেন। চলে যাচ্ছেন। মাকে হারাবার অক্ষমতার দায়ও তিনি নিজে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। একফোঁটা পানিও তিনি দিলেন না মায়ের মুখে। বললেন, চরম পানিশূন্য হাহাকারের মধ্যে যেন আমার মৃত্যু হয়। অনেক শ্রম অনেক কষ্টের বিনিময়ে বেড়ে ওঠা সন্তান অনেক সময় মাকে সুখে রাখার বা সুখী করার সুযোগবঞ্চিত হন। সেজন্য সারাটা জীবন অপরাধবোধে ভোগেন। সুপলাল বড়ুয়ার মনে পড়ে ছেলের শখ মেটাতে মা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে লোন দিয়ে ছেলের লেখাপড়ার জন্য টেবিল-চেয়ার কিনে দির্য়েছিলেন। শহরে যখন পড়তে যাচ্ছে সন্তান তখন মা উপজেলা সদর পর্যন্ত মাথায় করে মাসের চাল-আলু গাড়িতে তুলে দিয়ে যাচ্ছেন, এমন স্মৃতি লালন করা সন্তান বড় হয়ে হাজার হাজার টাকার ওষুধ কিনে দিয়ে মায়ের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে। এতেই দায়িত্ব শেষ? নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে মায়ের সন্তান। অন্যরকম ক্ষোভের বা খেদের কথাও লিখেছেন অনেকে। মা দিবস উপলক্ষে নানা সংগঠন রত্নগর্ভা মায়েদের সম্মাননা দিয়ে থাকেন। সত্যিকারের লড়াকু মায়েরা কি পান? আদৌ কিছু পান কি? এমন প্রশ্ন উঠে এসেছে সাথী দাশের লেখায়। একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কেউ কেউ যে দৃষ্টিকোণ বেছে নিয়েছেন তাতে পাঠ শেষে মনে হয়েছে আরেকটু দৈর্ঘ-প্রস্থ-বেধ পেলে লেখাগুলো সামাজিক দলিল হয়ে উঠতে পারতো। (আনোয়ারা আলম, এলিজাবেথ আরিকা) উপদেশমূলক লেখাও আছে এখানে। সন্তানের জন্য এত যাঁর আবেগ-উৎকন্ঠা, ত্যাগ-তিতিক্ষা সে মায়ের জন্য বৃদ্ধাশ্রম কেন? একালের আধুনিকা মায়েদের দেখে কারও হাহাকারের কথাও জেনেছি আমরা। এঁদের সন্তানেরা কোন স্মৃতিমেদুরতায় বাঁচবে? (ডালিয়া বসু সাহা, ভারত) মায়ের উপর নির্যাতন, পিতার নিষ্ঠুরতার চিত্রে পিতৃতন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচনের প্রয়াসও এখানে দেখেছি আমরা। অন্যদিকে আদরে-আনন্দে, সেবায় শুশ্রূষায় মাকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে রাখার কথাও এসেছে। (এসএম মোখলেসুর রহমান) নিজের জীবনে বড় হবার বা সর্বাঙ্গীন সাফল্যে জীবন ভরে ওঠার গল্প বলে কেউ মাকে বড় করতে চেয়েছেন। (সাখাওয়াত সৌরভ) সবকিছুই কিন্তু মায়ের জন্য। মাকে মনে করে। শিরোনামে ‘মনে পড়লো মাকে’ রেখে অনুপম শীল লেখাটা যে বাক্যে শেষ করেন তাতেই মাকে নিয়ে ভালো একটা গল্প হয়ে যায়। (শেষ বাক্য: তোমার গায়ের গন্ধটা ভুলে যেতে বসেছি মা)।
এমন অনেক গল্প লুকিয়ে আছে অনেকের লেখার মধ্যে। গল্পের কথা যখন এল তখন বলতে হয় সন্তান কবি হোক, গল্প লিখুক মায়ের এমন চাওয়ার কথাও কেউ কেউ লিখেছেন। জসীম মেহবুব লিখেছেন, সন্তানের নাম জসিম উদ্দিন রেখেছেন তাঁর মা। সন্তানকে ‘কবিপুত্র’ বলেই ডাকতেন। নিজের লেখালেখির পেছনে মায়ের প্রেরণার গল্প বলতে গিয়ে নিজের গল্পটাই সুন্দর করে বলেছেন আলী আসকার। তিনি লিখেছেন, ‘একজন মানুষের সঙ্গে অনেকগুলো ভূত বাস করে। পত্র পত্রিকায় যখন লেখা প্রকাশিত হতে থাকে তখন তাদের মাথায় ভূতের উপদ্রব বেড়ে যায়। মা বলেন, তুই নাকি গল্প-টল্প কি লিখিস? কী লিখিস? পত্রিকায় তোর নাম-টাম যায়। তোকে যদি পুলিশে ধরে?’ সাইফুল্লাহ কায়সার বলেন, মা একটি অসমাপ্ত গল্প, শ্রেষ্ঠ কবিতা, সেরা উপন্যাস। নজরুল জাহান বলেন, মা সন্তানের মহাকাব্য। দু একজন গদ্যকথার মাঝখানে ছড়ার ছন্দে বা কবিতার ব্যঞ্জনায় মাকে আবিষ্কার করার প্রয়াস পেয়েছেন। গোফরান টিটো ও খোরশেদ আলম খোকনের লেখার প্রেরণা তাঁদের মা।
আসলে ‘মায়ের স্মৃতি’ মাকে নিয়ে বিচিত্র কথার ফুলঝুরি। একজন ইলিয়াস বাবর বলেছেন তাঁর অক্ষর জ্ঞানহীন শিক্ষিত মায়ের কথা। খাঁটি আঞ্চলিক উচ্চারণে এই মা জীবনব্যাপী শুদ্ধতার কথা বলেছেন। ঘড়ি-জ্ঞান না থাকলেও সময়জ্ঞান তাঁর টনটনে। লেখাপড়া জানেন না কিন্তু দিব্যি সব ওষুধের নাম জানেন। ওষুধ চেনেন। সবকিছুই সন্তানের জন্য। সে মায়ের গ্রীষ্ম বর্ষা নেই। আছে শুধু বসন্ত। তাঁর সন্তান। সবই কি কথার ফুলঝুরি শুধু? তাহলে অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাতৃস্মৃতি ‘অনুভব’কে কি বলবো আমরা? অসাধারণ এই ছো্‌টগল্পটিতে মা হারানো ব্যথার রং দেখতে পাবেন পাঠক। লেখক যে কবি ও চিত্রশিল্পী একইসঙ্গে। দেখে নিন অন্তরা দাশকে। আট-দশ লাইনের একেকটি অধ্যায়। এক. দুই.তিন. চার-হ্যাঁ, চার অধ্যায়ে অন্তরা দাশ লিখলেন একটা উপন্যাস, ‘মেয়েটি যখন মা।’ ভালো-মন্দের কথা বলছি না, লেখার কথা বলছি। বলছি মায়ের কথা। রাশেদ রউফের লেখার শিরোনাম : আমার মা। যাঁর কিশোর কবিতার খ্যাতি দেশজোড়া তিনি তাঁর মায়ের কথা লিখতে গিয়ে হুমায়ূন আজাদের কাছে হাত পাতেন। উদ্ধৃতিটি আমরা ধার নিচ্ছি তাঁর কাছ থেকে।
‘আমাদের মা ছিলো অশ্রুবিন্দু-দিনরাত টলমল করতো ।
আমাদের মা ছিলো বনফুলের পাপড়ি ; সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো
আমাদের মা ছিলো ধানক্ষেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো
আমাদের মা ছিলো দুধভাত-তিনবেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো ছোট্ট পুকুর- আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম।
আমাদের মার কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিলো কিনা আমরা জানি না।
শেষ কথা: ‘মায়ের স্মৃতি’ সঙ্কলন গ্রন্থটির জন্য আমরা সকলে এবং এই লেখাটার জন্য আমি- নিজে, আমরা সবাই ঋণী রইলাম করুণা আচার্যের কাছে। আমরা ওঁর বইএর প্রচ্ছদ নিয়ে বলবো না এ কেমন প্রচ্ছদ? বই এর পারিপাট্য নিয়েও কিছু বলবো না। মুদ্রণ সৌকর্য তো দূরের কথা মুদ্রণ প্রমাদ নিয়েও কিছু বলবো না। করুণা আচার্যকে বরং আমরা মাথায় রাখবো কারণ তিনি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমরা চাই করুণা দীর্ঘজীবী হোন, আরও প্রচুর অর্থবহ কাজ করুন।

x