সত্যব্রত বড়ুয়া’র এক অনবদ্য রম্যগ্রন্থ ‘গাধাকাহিনি’

রীতা দত্ত

শুক্রবার , ১২ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ
59

“রাম গরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা” জাতীয় লোকের সংখ্যা বর্তমানে বেশি। যে কোন কারণেই হোক আমাদের জীবন থেকে হাসি, হাস্য কৌতুক নির্বাসিত হতে চলেছে । হতাশা আমাদের ভর করেছে। তা সত্ত্বেও নিজস্ব লেখনির গুণে পাঠকদের কৌতুক রসে সিক্ত করে হাসাতে পারেন হাতেগোনা কয়েকজন রম্যলেখকের মধ্যে রম্য লেখক সত্যব্রত বড়ুয়া অন্যতম। সমাজের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার কারণেই তাঁর লেখালেখির ভুবনে প্রবেশ। চারপাশের নানান অসংগতি, মেকি আচার-অনুষ্ঠান তাঁকে ক্লিষ্ট করেছে যা তিনি প্রকাশ করেছেন অবলীলায় তবে সরাসরি নয় ,কিছুটা ব্যঙ্গ করে।অনেকের মত কেবলমাত্র সমাজের চালচিত্র দেখে কিংবা জেনে তিনি নির্লিপ্ত থাকেন নি। চেয়েছেন লেখার মাধ্যমে হাস্যরস পরিবেশন করে আমাদের সচেতন করতে।জীবনে ঘটে যাওয়া তুচছ ঘটনাকে অবলম্বন করে গড়ে তুলছেন রম্যরচনার ভুবন ।তাঁর লেখনি জীবন ঘনিষ্ঠ। বাস্তবকে ধরে সত্য উন্মোচনে তিনি হাস্যরসের রম্যরচনা সৃষ্টি করেছেন। রম্যরচনার প্রতি আমার এটা স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে। আমি সুকুমার রায়, সৈয়দ মুজতবা আলী,শিব্রাম চক্রবর্তী, ফাহমিদা আমীন এর লেখা রম্যরচনার একজন নিবিড় পাঠক।তাঁদের লেখা দমফাটানো হাসির গল্প পড়েছি,হেসেছি প্রচুর ।
অতি সমপ্রতি রম্য লেখক সত্যব্রত বড়ুয়ার পঞ্চম রম্য গ্রন্থ “গাধা কাহিনি” প্রকাশিত হয়েছে । এর আগে প্রকাশিত তাঁর চারটি রম্য গ্রন্থ ‘বাঁকা চোখে’, ‘যদি সুন্দর একখান মামা পাইতাম’, ‘রম্য সম্ভার’,“ব্যাঙের সর্দি’ পাঠক মহলে আদৃত হয়েছে। অবিরাম লিখে চলেছেন তিনি, কলাম লেখক হিসাবেও তাঁর পরিচিতি আছে। বিভিন্ন দৈনিকে নিয়মিত ছাপা হয় তাঁর লেখা। তাঁর লেখা পড়া সহজ। কিন্তু সহজ কথা সহজে লেখা যায় না। সে লেখা যেমন কঠিন তেমনি কঠিন তার বিচার বিশ্লেষন। কোথাও স্থুলরসের উদার পরিবেশন নেই। পরিচ্ছন্ন বুদ্ধিদীপ্ত সরসতা ও সাবলীল ভাষা তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য। জীবন থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছেন. প্রচলিত বিশ্বাস এমনকি ক্ষতিকর ঐতিহ্যের উপর কষাঘাত করেছেন, কখনো প্রতিবাদীও হয়েছেন। বর্তমান গ্রন্থে মোট ২৮টি লেখা রয়েছে। নাতিদীর্ঘ লেখাগুলো এক নাগাড়ে পড়ে ফেলা যায়। প্রতিটি লেখা সমানভাবে উল্লেখ করার মত, তবে লেখার কলেবর বেড়ে যাবে বিধায় কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করছি। আলোচ্য গ্রন্থের “উপদেশ”, সংবর্ধনা, হাততালি, আনন্দ ,কালো রঙ্গ নামের লেখাগুলির উপর আমার কিছু ভাবনা প্রকাশ করলাম মাত্র। আশা করি পাঠকও কৌতুক রস আস্বাদনে বঞ্চিত হবেন না।
আমাদের অনেকেরই কারণে অকারণে অন্যকে উপদেশ দেওয়ার প্রবণতা আছে যদিও যার উদ্দেশ্যে উপদেশ তিনি সে উপদেশ মোটেই আমল দেন না। এ বিষয়ে লেখক লিখেছেন, পৃথিবীটা এখন উপদেশময়। বড়রা ছোটদের উপদেশ দিচ্ছেন,বড় রাষ্ট্র ছোট রাষ্ট্রকে, রাজনীবিদরা তাদের দলের লোকজনকে হরহামশোই উপদেশ বর্ষণ করছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেসব উপদেশ কেউ কর্ণপাত করে না। অনেকের কাছে উপদেশ হয়ে পড়ে উপদ্রুব।সময়ের পরিবর্তনে উপদেশের কার্যকারীতা না থাকলেও উপদেশদাতা অবলীলায় উপদেশ বর্ষণ করে চলেছেন। এ প্রসঙ্গে লেখক পরামর্শ দিচ্ছেন ঔষধের মত উপদেশেরও “এক্সপেয়ারী ডেট” থাকলে ভালো হত ,তাহলে অযথা উপদেশ বর্ষণ কমত।
“সংবর্ধনা”এ শিরোনামে লেখাটিতে লেখক লিখছেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন , যে দেশে গুণির কদর নেই সে দেশে গুণি জন্ম গ্রহণ করেন না।এখন অহরহ গুণির কদর হতে দেখা যায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গুণিজনদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক সময় শোনা যায় গুণিজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আয়োজক এবং আলোচকবৃন্দ সংবর্ধেয় ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু না জেনে এমন সব বিশেষণ ব্যবহার করে থাকেন যা সত্যের অপলাপ। এ প্রসংগে লেখক তাঁর ব্যক্তিগত একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যা অত্যন্ত কৌতুকপ্রদ। একবার তাঁকে একটি অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। মঞ্চে একজন আলোচক তার বক্তব্যে বলছেন, “সত্যবাবু একজন রম্য কবি। আমি তাঁর অনেক রম্য কবিতা পড়েছি।” লেখক লিখছেন,আমি যে রম্য কবিতা লিখি ,তা আমার জানা ছিল না । আমাদের সমাজে এ রকম ঘটনা নিয়তই ঘটে চলেছে। সভানুষ্ঠানে গেলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন সভা-সমিতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শ্রোতৃমন্ডলি অনুষ্ঠান উপভোগ করে নিজেদের ভালো লাগার অনুভূতি হাততালি দিয়ে প্রকাশ করে থাকেন। লেখকের একটি সরস লেখা “হাততালি”। অতীতকালে প্রশংসা করার জন্য “সাধু সাধু ” এ শব্দ উচ্চারিত হোত। অবশ্য এখনও বৌদ্ধ সমাজের অনুষ্ঠানে এবং শান্তিনিকেতনে এ প্রথা চালু আছে। মোগল আমলে “মারহাবা” বলা হোত। বর্তমানে মাঝে মাঝে এর ব্যতিক্রম হতে দেখা যায়। অনেক অনুষ্ঠানের সঞ্চালক শ্রোতৃমন্ডলির কাছ থেকে বারবার হাততালি আহ্বান করে থাকেন যা খুব শোভনীয় মনে হয় না।হাততালি স্বতঃস্ফূর্ত একটি কাজ। অন্যের নির্দেশনায় তার কার্যকারিতা তা কতটুকু তা ভেবে দেখা দরকার । লেখক লিখেছেন ,অনেক সময় হাততালির মধ্যে মঞ্চে উপবিষ্ট বিশিষ্টজনকে তেল দেওয়া বা তোয়াজ করার একটা প্রচ্ছন্ন ভাবনাও কাজ করে। তাই হাততালিতে খুব উচ্ছ্বসিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
“কালো রঙ্গ”এ শিরোনামে লেখায় লেখক কালো রঙ এর প্রতি তাঁর আকর্ষণের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কালো কলসী থেকে শুরু করে কালো কাক তার ভালো লাগার বিষয়।
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় কালো রং এর মহিমা বুঝাবার জন্য তাঁর “কবি” উপন্যাসে লিখেছেন,“কালো যদি মন্দ হয় কেশ পাকিলে কান্দ কেন”? প্রচলিত কথা,“কালো জগতের আলো”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘কৃষ্ণকলি”কবিতায় লিখেছেন “কালো সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ”তবে কালো রং নিয়ে মাঝে মাঝে বিড়ম্বনায় পড়ার বিষয় তিনি উল্লেখ করে লিখছেন,বিড়ম্বনায় পড়ে যাই সাদা হয়ে যাওয়া কালো চুল নিয়ে । অবশ্য কলপের বদৌলতে এখন মাথায় কালো চুল খুব দেখা যায় না। রাস্তায় সচরাচর মা মেয়েকে একসাথে দেখে বুঝবার কোন উপায় নেই কে মা, কে মেয়ে। সবার মাথা “চির হরিৎ অঞ্চলে” পরিণত হয়েছে। লেখকের আরেকটি সরস রচনা ”আনন্দ”। “আনন্দ” শব্দটি আপেক্ষিক। আনন্দের অনুভূতি সবার এক রকম নয়। আমরা নানাভাবে আনন্দ পাই।কেউ গান শুনে আনন্দ পায়, কেউ কবিতা পাঠে আনন্দ পায়, কেউ ভালো খাওয়া দাওয়া পেলে আনন্দ পায়। কেউ অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়। কি বিচিত্র মানুষের আনন্দানুভূতি! কেউ কষ্টে পড়লে অন্যরা হেসে কুটি কুটি হয়, সমাজে এ ধরণের বহু ঘটনা ঘটে থাকে। লেখক উল্লেখ করেছেন তাঁর জীবনের অনুরূপ একটি ঘটনা। একবার তিনি বাসে সিট না পেয়ে হ্যান্ডেল ধরে দাঁিড়য়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে তিনি সামনের দিকে উপর হয়ে পড়ে গেলেন। বাসের যাত্রীরা সবাই হেসে উঠলো। তিনি যে কষ্ট পেলেন সে বিষয়ে তাদের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। এই হোল আমাদের মানবিকতা !
জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় নানান জটিলতার কারণে আমরা প্রাণ খুলে হাসতে পারছি না। সত্যব্রত বড়ুয়ার রম্যলেখা পড়ে আমরা হাসব, সাথে সাথে সমাজ সচেতন হবো, কিছু সময়ের জন্য হলেও আনন্দ রসে অবগাহন করব। “গাধা কাহিনি” প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা “বলাকা প্রকাশন”। বইটি লেখক উৎসর্গ করেছেন তাঁর জীবনের অনুপ্রেরণাদায়িনী জীবনসঙ্গীকে। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১৫০ টাকা। মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়ে নি। আমি বইটির বহুল পাঠ আশা করি এবং লেখকের কাছ থেকে আরো রসময় লেখা প্রত্যাশা করি ।

x