সঙ্গীতে চট্টগ্রামের নারী

মৃণালিনী চক্রবর্তী

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ
251

পাহাড়, সাগর ও নদীর বুকে ও কোলের স্নেহের মধ্যমনি চট্টগ্রাম। তাকে আরও রূপকারে ডাকা হয় বীর চট্টলা-বাণিজ্যিক রাজধানী, বন্দর নগরী-‘চট্টগ্রাম।’ প্রবাদ প্রবচনে বীর গর্বে বলে, প্রেরণার আশীর্বাণী “চট্ট জাগলে হট্ট জাগবে, হট্ট জাগলে বঙ্গ জাগবে, বঙ্গ জাগলে বিশ্ব জাগবে। অর্থাৎ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে, স্বাধীনতা অর্জনের পদক্ষেপ ও ভূমিকায় চট্টগ্রামের অবদান বিশ্বজননন্দিত ও ভূয়সী প্রশংসিত। ভারতে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে চলচিত্র নির্মাণে নামকরণ করা হয়েছে দঞযব ঈযরঃঃধমড়হমচ। এই চট্টগ্রাম লোকজ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপকাড়া ঐশ্বর্য্যে অপ্সরী। তাই এখানে এসেছিলেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৭ খৃ.১৭ ই জুন চট্টগ্রামের স্বদেশী আন্দোলন ও স্বদেশী মেলার সাফল্য দেখতে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শাখা প্রতিষ্ঠায় চট্টগ্রামের কবি সাহিত্যিকদের প্রাণে প্রেরণা দানে। এটা চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রার যোগ। রবীন্দ্রনাথ চট্টগ্রাম আগমনের ৪ বছর পর জন্ম হয় চট্টগ্রাম সাহিত্য পরিষদ। এই “চট্টল সাহিত্য পরিষদ” পরবর্তীকালে চট্টগ্রামের সাহিত্য চর্চাধারাকে বেগবান করেছিল। বোঝা যায় ১৯১৩ খৃ. ২২ ও ২৩ মার্চ চট্টগ্রামে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন থেকে চট্টগ্রামে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ খৃ. আর্য্য সঙ্গীতের জন্ম হয়। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা উদ্যোগীদের মধ্যে অনেকেই স্বদেশে আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৬ খৃ. জুলাই মাসে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রাজনৈতিক কাজে বন্ধু হেমন্ত সরকারসহ প্রথম চট্টগ্রাম আসেন এবং সংবর্ধনার আয়োজনে ছিল তখনকার প্রভাবশালী হিন্দু মুসলমান নেতৃবৃন্দ। ১৯২৯ খ্র. জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম ভিক্টোরিয়া ইসলামিয়া হোস্টেল ও মুসলিম শিক্ষা সমিতির ৩০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে যোগদানের জন্য নজরুল যখন দ্বিতীয়বার চট্টগ্রামে আসেন তখন কাট্টলীতে ইউনিয়ন ক্লাব কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য বিরাট সভার আয়োজন করে। সেবারই সন্দ্বীপের কার্গিল হাই স্কুল মাঠেও কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য বিরাট সভা হয়। তৃতীয়বার ১৯৩২ খৃ. নজরুল চট্টগ্রামে আসেন রাউজান সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে। তারপর সীতাকুন্ড পাহাড়েও বেড়াতে যান। এই কবিদ্বয়ের চট্টগ্রাম আগমন বরাবরই চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে প্রেরণা যুগিয়েছে। তাদের কাব্যিক সুর রস ধারায় চট্টগ্রামের অনেক সংগীত শিল্পীর, নব প্রাণের উদয় হয়েছে বারবার। তাদের ভান্ডারে জন্ম নিয়েছে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক রূপমাধুকরী, শিল্পকাব্য। তাছাড়া চট্টগ্রামে এসেছেন সাংস্কৃতিক মঞ্চে রাজনীতিবিদ মহাত্মা গান্ধী, দেশ বন্ধু চিত্তরঞ্জন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামের হরিখোলা মাঠে পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মীদের প্রথম সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সেখানে এসেছিলেন এ বাংলার বরেণ্য সাহিত্যিকবৃন্দ আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, ড. মো. শহিদুল্লাহ, বেগম শামসুন্নাহর মাহমুদ, কবি সুফিয়া কামাল। ওপার বাংলার সাংবাদিক সাহিত্যিক সত্যেন মজুমদার গীতিকার সুরকার সলিল মাধুরী, কন্ঠশিল্পী, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সুখেন্দু গোস্বামী, হেনা দে প্রমুখ। সেদিন সেই সাংস্কৃতিক সম্মেলন আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সংগঠনে আরও যুক্ত ছিলেন মেধা-মননে শ্রমে শওকত ওসমান, সাইদুল হাসান, চৌধুরী হারুন-আর-রশিদ, মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী, করিম শরাফী, কবিগানের আসরে ছিলেন রমেশ শীল ও ফনি বড়ুয়া। চট্টগ্রামের এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন যুদ্ধকে মুক্তি ও শান্তিতে পরিণত করেছে। এবং এই আন্দোলনের যাত্রায় এ সময় আরও যুক্ত হয়েছেন সত্যজিৎ, শম্বুমিত্র, উৎপল দত্ত, মুনির চৌধুরী, জহির রায়হান, ঋত্তিক ঘটক, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আহমেদুল করিম, অচিন্ত্য চক্রবর্তী, গোপাল বিশ্বাস, বদিউস সালাম, সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।
মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী সম্পাদনায় ১৯৪৮ সালের দিকে প্রথম প্রগতিশীল সাহিত্যপত্র “সামন্ত” এর প্রকাশনা শুরু হয়। ক্রমে তা হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের প্রবীণ ও নবীন লোক সাহিত্যিক ও শিল্পীদের সম্মিলিত হওয়ার কেন্দ্র। পৃষ্ঠপোষণায় শ্রদ্ধেয় আবুল ফজল, কবি ওহিদুল আলম, শুভাশীষ চৌধুরী প্রমুখ লেখক বুদ্ধিজীবী।
১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম “বিশ্বশান্তি পরিষদের” শাখা চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়। সভাপতি আবদুল হক দোভাষ, সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী। এ সকল পরিষদ মূলত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে বেগবান প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস। ১৯৪৯ এ “প্রান্তিক নব নাট্য” সংঘ সৃষ্টি হয় এ সময় সর্ব প্রথম অভিনয়ে নারী চরিত্র বাস্তবে দেখা যায় ১৯৫২ সালের ১৪ ই অক্টোবর ওয়াজিউল্লাহ রঙ্গমঞ্চে ‘জবানবন্দী নাটকে কামেলা শরাফী ও মনি ইমামকে।
১৯৫৬ সালে সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সৃষ্টি হয় “কৃষ্টি কেন্দ্র।”
১৮৭৫ সালে ২৯ শে জানুয়ারি গঠিত হয় “চট্টগ্রামএসোসিয়েশন”। নারী শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিস্তারে এই এক নারী সংগঠন গড়ে তোলা। সমাজ-গঠনমূলক নানা প্রতিষ্ঠান, ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সূচনা যাত্রায়। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের নারীর ভূমিকা অগ্রগন্য এটা অস্বীকার করা যায় না। বৃটিশ বিরোধী সমস্ত বিপ্লবে চট্টগ্রামের চিরস্মরণীয় মহিলা নেতৃবৃন্দ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, চারুলতা দাশগুপ্ত, ডা. সুহাসিনী মুখার্জী, সাবিত্রী দেবী, ইন্দুমতী সিংহ, কুন্দুপ্রভা সেন, নির্মলা চক্রবর্তী, নিরুপমা বড়ুয়া, মল্লিকা মুকুল, রানী দত্ত, শান্তি রানী ঘোষ, সুনীতি চৌধুরী ইত্যাদি।
চট্টগ্রাম লোকজ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। এখানে বহু জাতিতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্বের মিলনতীর্থ ঘটেছে। বাঙালি ও নৃগোষ্ঠী। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃস্টান ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্বলিত সংস্কৃতি ও আত্মজ-লোকসংস্কৃতি এখানে বিরাজমান। বীর বাঙালির দেশের নারীরা ভাষার উৎপত্তিকাল থেকে গৃহকর্মের আত্মশক্তিকে ও গৃহমাঙ্গলিক শক্তিকে দীপ, ধুপ, ফুল, বেলপাতা, মন্ত্র, পাঁচালি পাঠের মাধ্যমে আরাধনা করে চলেছেই। সেই সুর আরাধনায় গ্রাম বাংলার প্রায় প্রতিটি নারীই শক্তিধর। তাছাড়া হিন্দু সংস্কৃতিতে গীতা, পাঁচালী, রমায়ন, মহাভারত পাঠে, চণ্ডীপাঠে, মনসামঙ্গল, মনসাপুঁথি পাঠে সুরের যে মায়াজালে মোহাবিদ্ধ হয় অন্তর তা চমৎকারিত্বে নিপুন শিল্পত্বের উৎকর্ষে উচ্ছ্বসিত। আমার মনে হয় বাঙালি সমাজব্যবস্থায় প্রতিটি ঘরে ঘরে নারীরা নিরক্ষর অন্ধকার যুগ থেকেই দেহতত্ত্ব, অনুষ্ঠানাদি, উৎসবাদি ও গৃহকর্মের সুখ দুঃখে মিশে আছে মুখে মুখে মনের কথায় সুর মিশিয়ে সঙ্গীত রচনা করে চলেছে। যেমন মিরসরাই অঞ্চলে দোহারী সঙ্গীত। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, পৈতে অনুষ্ঠান সাধভক্ষন ইত্যাদি অনুষ্ঠানাদিতে তারা একজন গান ধরে। পরে ১০/১২ জন নারী একই কথার আবার সুরের টান দিয়ে গান ধরে। এই সুর ধরার সংযোজন শিল্পীর কন্ঠে অতি আবেগী এবং মায়াবী। যেমন বিয়ের দিন কন্যার স্নানকালে গাওয়া হয়।
সুশীলাগো সুর বালা, স্নান করো গো সকালবেলা
আমার সীতা এই বাসনা গামছা বিনে স্নান করে না
আমার সীতা এই বাসনা সাবান বিনে স্নান করে না
আমার সীতা এই বাসনা নতুন কাপড় বিনে স্নান করে না
এভাবে যত অলংকার লাগিয়ে গানটিকে লোক সুরে উপস্থাপন করে। যে লিখতে জানে না কিন্তু এই সৃষ্টিকে সে আত্মপুরে গেঁথে রাখে আজীবন। সে পুরো গ্রামের আত্মীয়ানুষ্ঠানে সে গায়কীতে মন ভরিয়ে দেয়। ঈশ্বর প্রদত্ত প্রাকৃতিক রসদে গড়ে ওঠা এই সকল গান, সুর শিল্পীকে আমরা কোন যান্ত্রিক ও লিপিবদ্ধকরনে আবদ্ধ করতে পারি নাই। এসকল গানে নৃত্য নেই। কিন্তু কখনো কখনো রসিক দাদী নানীরা নাতি-নাতিনির বিয়েতে আনন্দে নেচে ওঠে। কোনো বাদ্য যন্ত্র লাগে না। কিন্তু তালের আবহ আছে। বিয়ের ঘটভরা থেকে ফুলশয্যা পর্যন্ত প্রতিটা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে এ ছন্দানুগ গানগুলো গ্রামের মানুষের প্রাণে জনপ্রিয়তা লাভ করে। শুধু অনুষ্ঠান নামলেই হলো। এরা গান করার জন্য দলবদ্ধ হয়ে আসবেই। খাওয়া দাওয়া আনন্দ আপন মনে করে যায়। আসলে সে যুগে আনন্দ উপভোগ উপকরণতো ছিল সীমিত তা এর মধ্য দিয়ে একঘেয়েমি জীবনের অবসান ঘটতো।
তেমনি চট্টগ্রাম শহরেও আমরা পশ্চিমা মুসলিম সমাজে বিশেষ করে। এই প্রভাব লক্ষ্য করেছি। যেমন এর নাম হঁঅলা বা মেয়েলি গান। বিয়ে, কর্ণছেধন এসকল অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হতো বিয়ের কথা থেকে বিয়ে সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত যতদিন সময় ততদিন ঢোলক, নৃত্য ও গানের (অঁহলা) মাধ্যমে ঐ বাড়িতে বিয়ে ঠিক হয়েছে পাড়া-পড়শী অনায়াসে জেনে যেত। এই আসর সারাদিনের নৃত্য গীতে আবদ্ধ। এই অনুষ্ঠানগুলো মেয়েদের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। যেমন গানের কলির রূপ-
কানা কানা মুড়ার মাঝে ছিডি আছিলাম রাই
দুনার বাপরত নাইয়র যারজে ধূতির কাছা নাই
৮০/৯০ দশক পর্যন্ত দেখা যায় এই সংস্কৃতি। তাছাড়া কবিগান, পল্লীগান, আঞ্চলিক গানের বিষয়গুলোও তাদের অন্তরে ও কন্ঠে ধ্বনিত হতো। কিন্তু পারিবারিক অবয়বে আবদ্ধ নারী সমাজ তখন তার প্রতিভা গন্ডীতেই ছিল অপ্রকাশিত। শ্রাবণ মাসে গ্রাম শহরের নারী সমাজ আজও ঘরে ঘরে যুক্ত হয়ে মনসা পুঁথি পাঠে আনন্দ উপভোগ করে। তারা ‘ঘোষা’ তৈরি করে পুঁথির দুই লাইন পাঠের পর পর সবাই মিলে “ঘোষা” লাগায়।
উলুবনের মশা রে তুই গুন গুন গুনগুন করিস না
থাপ্পর দিলে মরিয়া যাবি গুনগুন করিস না
আরও কত বয়ানে আবদ্ধ ছন্দ পয়ারে, এইসব লোক সংস্কৃতি আজও প্রচলিত। বাংলার লোক সংস্কৃতি উজ্জীবনে নারীর প্রেম-বিরহ বিশ্লেষণাত্মক, লৌকিক-দেহতাত্ত্বিকব্যঞ্জনায় অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। তারপর আধ্যাত্মিকতা ভাবধারা। ঈশ্বরপ্রেম ও অন্তরের কষ্ট থেকে সংগীতের যাত্রা। তখন নারীদের কান্নার বিলাপেও সুর ছন্দ ছিল। সে মনের দুঃখ, কান্নার ভাষায় মানুষকে বুঝাতো ঘটনা-সহানুভূতি উপস্থাপন করতো। কিন্তু করুণতায় পূর্ণ ছিল সে সুর। গ্রামের অনেকেই ছুটে আসতো। ঘরে ঘরে ঈশ্বরকে পাওয়ার প্রার্থনায়, তুষ্টির প্রার্থনায়, সঙ্গীত, কীর্ত্তন, হরিনামের সুরসাধনায় অনুসরণিত হতো প্রতিটা গৃহ মন্দির। সকাল সন্ধ্যা এই নারীর অন্তকর্ষন। যা সমগ্র সমাজ সংসার প্রভাবান্বিত হয়, উদ্বেলিত হয় শুদ্ধাচার অন্তঃদর্শনে।
চট্টগ্রামে ষাটের দশকের আগে ও পরে কীর্ত্তন গানের খুব প্রচলন ছিল। এই কীর্ত্তন সংগীত ৩ ভাগে বিভক্ত। পদাবলী কীর্ত্তন, পালাকীর্ত্তন, হরিনাম বা নাম সংকীর্ত্তন। পদাবলী কীর্ত্তনে চট্টগ্রামের সুর সমৃদ্ধ ছিল। তখন পদাবলী কীর্ত্তনে শিল্পী বনবীথি সেনগুপ্ত ষাট ও সত্তরের দশকে মায়া চক্রবর্তী, প্রভা দে, সত্তরের দশকে মৃণালিনী চক্রবর্তী, রুবি দাশ গুপ্ত, শিপ্রা ধুম, নীলা দাশ প্রমুখ শুধু চট্টগ্রামের নয় কীর্ত্তন ভবন ও আধ্যাত্মিক সঙ্গীত নিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, বরিশাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সিলেটসহ আরও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সংস্কৃতির আদান প্রদান, বিন্যাসে তারা অংশগ্রহণ করেছেন। নব্বই এর দশকের পরে দেখা যায় পূরবী চক্রবর্তী ও অপু দাশ বর্মন, মিতালী রায়। ১৯৭১ এর পর হরিখোলা মাঠে হয় আবার প্রগতিশীল কর্মীদের সনাতন সাংস্কৃতিক সম্মেলন। ঢাকা, কোলকাতার অনেক লেখক সাহিত্যিক শিল্পী এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। শিল্পী মায়া চক্রবর্তী, মৃণালিনী চক্রবর্তী অংশগ্রহণ করেন। ড. আশরাফ সিদ্দিকী প্রধান অতিথি, অধ্যক্ষ বিভূতি ভূষণ ভট্টাচার্য, অধ্যাপক রনজিত চক্রবর্তী, অধ্যাপক চিত্ত প্রসাদ তালুকদার, এডভোকেট রানা দশগুপ্ত, ডা. আনিসুজ্জামান আরও প্রমুখ ব্যক্তি আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় কবিগান, পালাগান, কীর্ত্তন, ভজন, কাওয়ালী, গণসঙ্গীত, আঞ্চলিক গানের আসরে চট্টগ্রাম মুখরিত ছিল। সঙ্গীত চর্চায় চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারা লক্ষ্য করলে দেখা যায় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর অসহযোগ খেলাফত আন্দোলনের কালেও চট্টগ্রামের রাজনৈতিক তৎপরতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড জোরদার হয়ে হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। বিশ এর দশকে সুরেন্দ্র লাল দাশের নেতৃত্বে আর্য্য সঙ্গীত শিল্পী দলের নিখিল বঙ্গ কংগ্রেস সম্মেলনে যোগদান ঐ সময়ে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ।
“চট্টল হিত সাধনী সভা” এবং “চট্টগ্রাম এসোসিয়েশন” এই দুই সাংস্কৃতিক সংগঠন ১৯০৪ খৃষ্টাব্দের পর পর তিন বছর স্বদেশী মেলার আয়োজন করে। অবিভক্ত বাংলার জনগণের কাছে সব স্বদেশী আন্দোলনে চট্টগ্রামের জনগণের উদ্যোগ, উদ্যম, ত্যাগ তিতিক্ষা ও নিষ্ঠা প্রশংসা লাভ করেছিল। এতে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিও চট্টগ্রামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ১৯০৬ সালে আর্য্য সঙ্গীত প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামে শুদ্ধ মার্গ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা এগিয়ে যায়। এই প্রতিষ্ঠান অবিভক্ত বাংলার প্রথম সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্র এই বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন গান “চর্যাগীতি”। চৈতন্যযুগে চট্টগ্রামে কীর্তন গানের প্রচলন হয়। মধ্যযুগে চট্টগ্রামে রাগ সঙ্গীত চর্চা হতো তা আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ সংগৃহিত ১৯টি রাগনামা ও ১৩টি রাগ তালনামা পুঁথি হতে এমন পাওয়া যায়। ড. এনামুল হক রাগ তাল সম্পর্কিত কয়েকটি পুঁথি চট্টগ্রামের পল্লী অঞ্চল থেকে রচয়িতা চট্টগ্রামের সংগ্রহ করেন। ১৯৪৮ খৃষ্টাব্দে ওস্তাদ ফজলুল হক আর্য সঙ্গীতের অধ্যক্ষ হয়ে এলেন। ১৯৪৯ খৃষ্টাব্দে চট্টগ্রামে আসেন ওস্তাদ বেলায়েত হোসেন। সৌরেন্দ্র লাল দাশ গুপ্ত, চুনিলাল সেন এদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুদ্ধ সঙ্গীতের চর্চা শুরু হয় চট্টগ্রামে। এদের শিষ্যা শিল্পী বেলা ইসলাম, শিল্পী অলকা দাস, শিখা রানী দাশসহ চেমন আরা। তারা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৬৪ খৃষ্টাব্দে ভারত থেকে “সঙ্গীত বিশারদ” উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া চট্টগ্রামে আসেন এবং আর্য সঙ্গীত সমিতিতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এ শিক্ষকতায় এলে পরে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। সেই থেকে চট্টগ্রামে সঙ্গীত শিক্ষা উৎসাহ ব্যঞ্জক ও বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করে। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে চট্টগ্রাম শুধু নয় পৃথিবীর নানা দেশে আর্য সঙ্গীতের ছাত্র ছাত্রীরা প্রশিক্ষণ ও শিক্ষকতায় অবদান রেখে যাচ্ছেন।
১৯২৫ খৃষ্টাব্দে আর্য সঙ্গীতের প্রতিষ্ঠাতা, ভারত উপমহাদেশের অর্কেস্ট্রার জন্মাধিনায়ক চট্টগ্রামের কাট্টলী গুণধর গর্বিত পুরুষ “সুরেন্দ্রলাল দাশ”। আর্য্য সংগীতে ছাত্রীদেরও সঙ্গীত শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন। তাঁর শিষ্য ছাত্রীদের মধ্যে ঊষা সেন গুপ্ত, মালতী দত্ত, চিন্ময়ী কানুনগো, অনিমা সেনগুপ্ত, লীলা দাশ (কন্যা), বনবীথি সেন গুপ্ত, চিত্রা দত্ত, নীহার কনারক্ষিত প্রমুখ ত্রিশের দশক থেকে ভারত বিভাগ পূর্বকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের সঙ্গীত জগৎকে উজ্জ্বল করে রেখেছিলেন। চট্টগ্রামে গায়িকাদের মধ্যে প্রথম হিজ মাষ্টার্স ভয়েস এ গ্রামোফোন রেকর্ড করেন ১৯৩৪-৩৫ খৃষ্টাব্দে চিত্র দত্ত। ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দে গায়িকা জ্যোস্না সেনের একটি রেকর্ড বের হয় ওরিয়েন্ট কোম্পানী থেকে। সুরেন্দ্রলাল দাশের নেতৃত্বে আর্য্য সঙ্গীতের শিল্পী দলের “নিখিল বঙ্গ কংগ্রেস সম্মেলনে” যোগদান এ সময়ে চট্টগ্রামে সংস্কৃতি অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আরও উল্লেখযোগ্য ভারতীয় অর্কেস্ট্রা সৃষ্টিতে সুরেন্দ্রলাল দাশের কৃতিত্ব স্মরণীয় কীর্তি তিনি ৬০টিরও বেশি রাগে অর্কেস্ট্রা সৃষ্টি করেছেন। এবং অর্কেস্ট্রা ব্যবহারের জন্য তিনি কয়েকটি যন্ত্রও উদ্ভাবন করেছেন। মন্ত্রবাহার, তড়িৎবীন, মেগনাদ, ভ্রামরী, তারসানাই, রম্ভসানাই। সংস্কৃতের ছন্দে রাগ সঙ্গিতের অনুপ্রবেশ সেই আশ্রয়ে বিভিন্ন তালের সৃষ্টি তা বিস্ময়কর অবদান। এই সৃষ্টি কল্পের অবদানে বীর প্রসবিনী চট্টগ্রামে আর্য্য সঙ্গীতে বারবার এসেছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, থেকেও যেতেন। এসেছিলেন নাট্যাচার্য্য শিশির ভাদুড়ী, নৃত্যাচার্য উদয়শংকর, কমলা শংকর, গোপেশ্বর বন্দোপাধ্যায়, শ্রী জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ, দ্বিপেন বন্দোপাধ্যায়, ওস্তাদ আবিদ খাঁ, খুরশীদ খাঁ, পন্ডিত বারিন মজুমদার, নারায়ন বসাক, ইয়াসির খাঁ, শাহাদাৎ খান প্রমুখ। ১৯০৬ খ্রীস্টাব্দে আর্য্য সঙ্গীতের জন্ম। ১৯২০ খ্রীস্টাব্দে সুরেন্দ্রলাল দাশ প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর আর্য্য সঙ্গীতের নবজীবন শুরু হয়। এই অর্কেষ্ট্রায় নারী শিল্পীদের অবদানও ছিল। কলকাতা বেতার কেন্দ্রে “ঐক্যতানিক যন্ত্রসঙ্গীত” ভারত উপমহাদেশে প্রথম স্মরণীয় কীর্তি।
আর্য্য সঙ্গীত এ শিক্ষাদানের অবদানের সেকালে ও একালে, নারীর ভূমিকায়। দৈনিক আজাদী প্রকাশিত “হাজার বছরের চট্টগ্রাম” ভুল তথ্য। মালবিকা দাশ শিক্ষক ছিলেন না শিক্ষার্থী ছিলেন। যারা শিক্ষা দান করছেন সেখান থেকে একটি নাম বাদ পড়ে গেছে। হাজার বছরের চট্টগ্রামের ইতিহাসে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা ও শুদ্ধ সঙ্গীত এর প্রচার ও প্রসারে চট্টগ্রামের ওস্তাদ ও শিল্পীদের সমন্বয় যাত্রার পুরোধা “আর্য্য সঙ্গীত সমিতি”। ১৯৪৮ সালে ওস্তাদ ফজলুল হক আর্য্য সঙ্গীতের অধ্যক্ষ হয়ে এলেন। তাঁর সাহচর্যে সৃষ্ট চট্টগ্রামে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বিশিষ্ট শিল্পীবৃন্দ নারীদের মধ্যে বেলা ইসলাম, শিখা রানী গুহ, অলকা দাস, কল্যাণী আলী। ৮০ এর দশকে ওস্তাদ নীরদবরণ বড়ুয়ার সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা শিষ্যাদের মধ্যে শিখা রানী নাগ, মন্দিরা রায়, মালবিকা দাশ, মৃনালিনী চক্রবর্ত্তী, মিতালী রায়, অনিতা লালা, অপু দাশ বর্মন, শর্বরী রায়, তৃপ্তি দে, রুমি বড়ুয়া, সন্ধ্যা ঘোষ দস্তিদার, শিখা চৌধুরী আরো অনেকে। ৯০ এর দশকে ওস্তাদ মিহির লালা, ওস্তাদ নির্মলেন্দু চৌধুরী সাহচর্যে গড়ে ওঠা লোপা দাশ, সংযুক্তা দাশ, গার্গী দত্ত, গৌরি নন্দী, মুনমুন সেন, সীমু বিশ্বাস, সুকন্যা মজুমদার, রচিতা চৌধুরী, আরো অনেকে। মৃণালিনী চক্রবর্ত্তীর সাহচর্যে ঝুমা রায়, তাবাসুম তামান্না, ত্রয়ী বসু, স্নিগ্ধা চৌধুরী আরও অনেকে বর্তমানে ওস্তাদ স্বর্ণময় চক্রবর্ত্তীর শিষ্য ফাগুনী বড়ুয়া, কনকচাঁপা খাস্তগীর, সেঁজুতি বড়ুয়া প্রমুখ। অর্থাৎ আজ যারা প্রশিক্ষণ কাজে সমাজকে সংস্কৃতালয়ের মঙ্গল গৃহে সাজানোতে নিবিষ্ট তারা প্রত্যেকই আর্য্য সঙ্গীত এ গড়া ওস্তাদ ও ছাত্রছাত্রীদের শিষ্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। আর্য্য সঙ্গীতে নারী শিক্ষক ৭০ এর দশকে চিন্ময়ী দেব, নিহার কণা রক্ষিত ৮০ এর দশকে মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী, মঞ্জু নন্দী, ৯০ এর দশকে শ্রীমতি জয়ন্তী লালা, শর্বরী রায়, মায়াবী শ্যাম, গায়িত্রী চৌধুরী। বর্তমানে মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী, শ্রীমতি জয়ন্তী লালা কাজ করে যাচ্ছে। ১৯০৭ খৃঃ এবং ১৯১৩ খৃঃ রবীন্দ্রনাথ চট্টগ্রামে আসলেও সংস্কৃতির ভাবধারা বিনিময় হলেও ঊনিশ শতকের শেষার্ধে যাত্রামোহন সেনের উদ্যোগে চট্টগ্রামে প্রথম রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চা শুরু হয়। এই চর্চা প্রথমে ব্রাহ্ম সমাজে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীতে ঠাকুর বাড়ির সাথে পরিচয় সূত্র এই চর্চা নোয়াপাড়ার কবি নবীন চন্দ্র সেন এবং রায় পরিবার, পটিয়ার রায় বাহাদুর, শরৎ চন্দ্র দাস, কমলকৃষ্ণ সেন, যামিনী কান্ত সেন, কেদার নাথ দাশগুপ্ত, ব্যারিস্টার পূর্ণচন্দ্র সেন, ব্রজকুমার সেন এই সকল পরিবারে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের শিল্পী ও খ্যাতিমান রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী কলিম শরাফী চট্টগ্রামে বসবাসের জন্য আসেন। সেই সময় গণসঙ্গীত ও রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চা পেলো নূতন মাত্রা। সেই পঞ্চাশের দশকে উদীয়মান শিল্পীরা হলেন দেদীপ্যমান নক্ষত্রের মত-খুরশীদা আজিম, মালেকা আজিম, রাজিয়া সাহিদ, কিশোয়ার কামাল, মায়া চক্রবর্ত্তী, দিলারা আলো, বিলকিস নাসির উদ্দীন, চেমন আফরোজ কামাল, জুলিয়া মান্নান, গুল নার্গিস, শীলা দাস (মোমেন), শামীমা বেগম, পূরবী সেনগুপ্ত। চেমন আরা আফরোজ, দীপালী দাশ, সোহেলা রহমান, শাহেনারা বেগম, সুফিয়া আমিন। ৭০ ও ৮০ এর দশকে কাকলী দেওয়ান, মার্গারেট বেবী সাহা, আইরিন সাহা, গীতশ্রী সেন, খুরশীদা আলম, রওশন আরা চৌধুরী, মাহবুব আরা বেগম, শর্মিষ্ঠা সরকার, বিলকিস বানু, রুমানা চৌধুরী, দেঁলন চাঁপা বড়ুয়া, সুমিত্রা ভট্টাচার্য্য, নীলুফা করিম, ফোজিয়া খান, শ্বাশতী তালুকদার, কাবেরী সেনগুপ্ত, কৃষ্ণা দাশগুপ্ত, আলেয়া শরাফী, সুপ্তা রাহা, আলপনা ব্যানার্জী, রুমা ঘোষ, নীলুফার রহমান রোজী, রাশেদা সিদ্দিকা, আয়েশা সিদ্দিকা, ফ্লোরা আহমেদ, আখতার জাহান, রেহেনা করিম রানু। ৯০ এবং ২০০০ থেকে লাকী দাশ, তৃপ্তি দাশ, শ্রেয়সী রায়, শীলা চৌধুরী, শান্তা গুহ, লাকী দাশগুপ্ত, নওশিন কবির, চন্দ্রিমা লালা, কান্তা দে, বহ্নিশিখা রক্ষিত, মৌসুমী চৌধুরী, মনীষা রায়, তুলি দাশগুপ্ত, রুম্পা সেন, পূজা ধর, সৃষ্টি বড়ুয়া, প্রিয়তী বড়ুয়া, রওশন আরা মমতাজ, শিবানী চৌধুরী, রওশন আরা ফিরোজ, ছন্দা সেনগুপ্ত, বনানী শেখর রুদ্র, বনানী সেনগুপ্ত, স্বপ্না সেন, সোমা সেনগুপ্ত, সুপর্ণা ধর, রুহি মোস্তফা, শিপ্রা দে, নীলা মিত্র, পাপিয়া আহমেদ। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি যে আমাদের মহৎ উত্তরাধিকার তার ঘোষণা করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
ষাটের দশকে বাঙালি সংস্কৃতির উপর স্বৈরাচারী আক্রমণ ও বৈরী মনোভাব নিবন্ধনেও প্রতিবাদ স্বরূপ চট্টগ্রামে উদ্‌্‌যাপিত হয় সপ্তাহব্যাপী “রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী” সেন্ট প্লাসিডস্‌্‌ স্কুল প্রাঙ্গণে। এ সঙ্গীত পুরো বঙ্গভূমিতে শুধু নয় বিশ্বের মানুষের প্রাণের টানের গান হয়ে ওঠে তখন।
১৯২৬, ১৯২৯, ১৯৩২ খৃস্টাব্দে নজরুল ইসলাম রাজনৈতিক কাজ ও সাহিত্য সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে তিন বার চট্টগ্রামে আসেন। এই কবি এই শিল্পী, সাহিত্যিক এই সুরকার ও গীতিকার চট্টগ্রামে আগমন বরাবরই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জাগরণের প্রেরণা যুগিয়েছে। এবং প্রতিটি সভায় নজরুল নিজের গান করেছেন নিজে। বিশেষ করে কাট্টলীতে, ফতেয়াবাদ। তাঁর রচনার কলমধারা “সিন্ধুহিন্দোল” এবং “চক্রবাক” এ চট্টগ্রাম এর কর্ণফুলী, সীতাকুণ্ডুর পাহাড়ী ঝর্ণা, ফতেয়াবাদ, রাউজান, সন্দ্বীপ, পার্বত্য চট্টগ্রাম এর স্মৃতি বিজড়িত সৃষ্টি কর্মে পূর্ণ।
১৯৪৬-৪৭ খৃস্টাব্দে দেশবিভাগ বৈরী অবস্থায় চট্টগ্রামে সঙ্গীত চর্চা ম্লান হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ খৃস্টাব্দ থেকে চট্টগ্রামে আর্য্য সঙ্গীতের বিভিন্ন ওস্তাদের আগমনে আবার সঙ্গীত ধারা বেগবান হয়ে ওঠে। তখন রাগ সঙ্গীতের পাশাপাশি চলতে থাকে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, লোক সঙ্গীত, গণ সঙ্গীত। এই বৈরী মনোভাবের প্রতিবাদে ১৯৬০ খৃস্টাব্দে এনায়েত বাজারস্থ ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটে নজরুল হীরক জয়ন্তীও পালন করা হয়। চট্টগ্রামে নজরুল চর্চা এক সময় ছিল গ্রামোফোনমুখী। বেতারে গাওয়ার শিল্পীও তৈরি হয়েছে। কিন্তু ব্যাপকভাবে প্রসারতা লাভ করে চট্টগ্রামে আর্য্য সঙ্গীত এ নজরুল বিভাগ খুলে। সেই ৯০ এর দশকে শিক্ষক ছিলেন জয়ন্তী লালা। আর আমরা বিভিন্ন নজরুল অনুষ্ঠানগুলিতে সহযোগিতায় ছিলাম। ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামে নজরুল সঙ্গীত ও নজরুল চর্চাকে বেগবান করানোর প্রচেষ্টায় “নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা” নামে এক সংগঠনের প্রস্তাবনা উত্থাপিত হয়। এতে চট্টগ্রামে নজরুল চর্চা ও ভাবনার এক নবউন্মোচিত দ্বার উদ্বোধিত হয়। এতে উপস্থিত ১ম বৈঠকে ছিলেন শিল্পী ওমর ফারুখ, এ,কে,এম এমদাদুল হক, মৃণাল ভট্টাচার্য্য, জয়ন্তী লালা, মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী, কাজী আয়েশা আমান। সেই থেকে আজও চট্টগ্রামে নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছে। ত্রৈমাসিক দোলনচাঁপা, নজরুল জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী, জেলা প্রশাসন কার্যক্রমে, আঞ্চলিক কার্যক্রমে, বেতার ও টেলিভিশনে। প্রথম তার অবস্থান ছিল গৃহকেন্দ্রিক বৈঠক ও সভা। বর্তমানে মোমেন রোড, নীরদ ভবনে স্থায়ী কার্যালয়। এই কার্যক্রম কমিটিতে নারীদের মধ্যে আছে-শুরু থেকে আজও সহ-সভাপতি শিল্পী জয়ন্তী লালা সাহিত্য-সম্পাদক শিল্পী মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী। অর্থ সম্পাদিকা দীর্ঘদিন ছিলেন শিল্পী আয়েশা খাতুন। বর্তমানে অর্থ সম্পাদিকা শিল্পী দাশগুপ্ত। অন্যান্য সদস্য ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। নজরুল চর্চায় বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন চট্টগ্রাম শুরু কাল থেকে যারা সঙ্গীত পরিবেশন করছেন। ষাটের দশকে ও সত্তরের দশকে আভা আলম, বীণা সেন, রওশন আরা চৌধুরী, কাজী আয়েশা আমান, জয়ন্তী লালা, আয়েশা খাতুন, কল্পনা লালা, ফরিদা করিম। ৮০ দশকে ও ৯০ দশকে-মুনিরা ইয়াসমিন, ফাহমিদা রহমান, শীলা চৌধুরী, জেলী চৌধুরী, মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী, পূরবী চক্রবর্ত্তী, মিতালী রায়, গায়িত্রী চৌধুরী, কাকলী দাশগুপ্ত, মন্দিরা রায়, শিখা নাগ। ২০০০ দশকে দিলরুবা মারিয়া, শারমিন চৌধুরী তিনা, সুদীপা দাশ, মুনমুন চক্রবর্ত্তী, শিল্পী দাশগুপ্ত, হিমালী মজুমদার হুমায়রা জেনী, রুনা পারভীন, বিজয়া সেনগুপ্তা, নওরীন করিম, গার্গী দত্ত, জবা, তৃপ্তি দাশ, রীতি দাশ, জয়া দাশগুপ্ত, আরতি ধর, মানু মজুমদার, রচিতা চৌধুরী, ঝুমা রায়, পাপড়ী ভট্টাচার্য্য, ইন্দিরা চৌধুরী, সিমা দত্ত, রুহি মোস্তফা, কাজী আসমা হক মেরী, মন্দিরা চৌধুরী।
চট্টগ্রামে “নজরুল একাডেমি” নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান ফাহমিদা রহমান প্রশিক্ষণ ও প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে। আর্য্য সঙ্গীত সমিতিতেও নজরুল বিভাগ ও রবীন্দ্র বিভাগ প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।
লোক সঙ্গীতে চট্টগ্রাম: এই বাংলার লোক সঙ্গীত অন্তরের কথনে মিশ্রিত ভাব ও সুরের মিলনে পদাবলী ও কীর্ত্তনের মত আদি সঙ্গীত। নানা ভাবধারার রূপে পল্লীগীতি, ভাটিয়ারী, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী, লালন, মাইজভাণ্ডারী, লোকাচারে বন্দী আধ্যাত্মিক ও দেহতাত্ত্বিক গান এ দেশের নানা অঞ্চলের রূপরেখায় অংকিত বাংলার নিজস্ব শেকড়ের সঙ্গীত। আঞ্চলিকতার মোহ তার প্রধান রূপ। লোক সঙ্গীতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান বিশ্বে সমাদৃত। চট্টগ্রামের কিংবদন্তী শিল্পী জুটি শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব আঞ্চলিক উপকরণে সঙ্গীত ভাষা ও সুরের রসনাট্য উপস্থাপনায় চট্টগ্রামকে বিশ্ব দরবারে সফল উপস্থাপন করেছে। লোক সঙ্গীত এই বাংলার প্রাণপ্রকৃতির মুখশ্রী। এই রসবোধক গানে নারী শিল্পী যারা ছিলেন ও আছেন-ষাটের দশকে-শেফালি ঘোষ, আরতি ধর, কল্পনা লালা, কল্যাণী ঘোষ, সুফিয়া আমিন, লতিকা চৌধুরী, মালেকা পারভীন বানু, রওশন আরা ফিরোজা, সুফিয়া ইসলাম, হাসিনা মমতাজ, আলম আরা, ফেরদৌসি আলীম, মিরা দাশগুপ্তা, সেলিনা বেগম, রানী প্রভা চৌধুরী, মঞ্জুশ্রী গুহ, কল্যাণী চৌধুরী, লক্ষী রানী পাল, বেলা খান, নিয়তি পাল, লীনা রায়, রত্না চৌধুরী, নীরা শামসুরনাহার, নাজমা বানু, সেতারা চৌধুরী, যুঁথি মীর্জা, বাঁশরী ভদ্র, মারফুয়া চৌধুরী, মেহজাবীন খান, সেলিনা রশিদ, ফরিদা বানু, রেফাতুল আজরা, রমা খাতুন, লুৎফুর হাসিনা ভূঁইয়া, অর্চনা দেবী, পারভিন বেগম, ইসমত আরা জাহান, বেবী রানী দাশগুপ্ত, ঊমা চৌধুরী, মিনুরানী দাশ, রেশমা, রেজিনা মান্নান, দিলরুবা রহমান, জাহানারা বেগম, মানজুমা হোসেন, সন্ধ্যা রানী দাশ, লিলবানু, দিলারা হাশেম, রাহিমা খাতুন, বেবী রানী দাশগুপ্তা, রানী চৌধুরী।
৭০ এর দশক হতে ২০০ বিলকিস ইসলাম, আফিজা খানম, পিলু খান, লায়লা দোজা, কান্তা নন্দী, মমতাজ খানম, সাফিনা মাহবুব মুন্নি, রেহানা খানম, খালেদা মঞ্জুরে খুদা, মঞ্জুলা দাশগুপ্ত, আয়েশা খাতুন, কায়রুন্নহার কেয়া, শাহরিয়া পারভিন রোজী, কাজী আয়েশা সিদ্দিকা, রাশিদা সিদ্দিকী, নীলুফার ইয়াসমিন, সাফিনা হোসেন, শর্মিষ্ঠা ঘোষ, নাজমা ইসলাম, আখতার জাহান, জাহানারা রহমান, হামিদা বাবু মমতাজ, শামসুন্নাহার হাফিজ, খুকী রানী শীল, নীলা নাজনান, পুষ্পিতা খীসা, প্রতিমা ঘোষ দস্তিদার, ফেরদাউস হালী, সাগরিকা বড়ুয়া, সীমা রক্ষিত, শিল্পী রানী চৌধুরী, শিউলী দেবী, সুপর্ণা রায় চৌধুরী, জান্নাতুল নাইম পুতুল, শাহরিন জহির, সুপর্না মুৎসুর্দ্দী, শেফালী রহমান, প্রাপন্তী চক্রবর্ত্তী।
প্রেম, প্রকৃতি ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় গীতি কবিদের মনের নির্ঝরিনীতে ঝরে কথা ও ছন্দের ঝর্ণা। তাঁর আবগাহনে সুর গাঁথায় সৃষ্টি হয় শিল্পত্ব শিল্পীর কণ্ঠশৈলীতে। আধুনিক গান নানা মান-অভিমান, প্রেম-বিরহের, বৃত্তে তাঁর ছান্দিক রূপ। চট্টগ্রামে নারী গীতিকবিদের মধ্যে আছেন শাহীন আনোয়ার, সুরাইয়া জহুর শিরীন, মারজানা আহমান মুক্তা, কবিতা ইকবাল, মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী।
আর ষাটের দশক থেকে কণ্ঠে আধুনিক গানের ছোঁয়ায় চট্টগ্রামে যে নারীশিল্পীরা জেগে উঠেছেন-জেসমিন রেশমা, কাজী আয়েশা আমান, কল্পনা লালা, কান্তা নন্দী, মায়া চক্রবর্ত্তী, সোহেলা রহমান, বীথি ভদ্র, রওশন আরা মমতাজ, রোখসানা রেবা, জাহেদা পারভীন, মিনাক্ষী সরকার, মমতা খান, ছায়া রায়, বেলা খান, কবরী দাস, সালমা চৌধূরী, জার নিগার, সেতারা চৌধূরী, বাসন্তি সর্ববিদ্যা, জিনাত রেহানা, শ্যামলী চৌধুরী, ছন্দা দেব, বাঁশরী ভদ্র, মাহজাবিন খান, পারভীন আহমদ, আফরিন আহমেদ, আফসারি খানম, আনজুমান আরা বেগম, সুলতানা মমতাজ, শাহনাজ বেগম, রেফাতুল আজরা, লুৎফুল হাসিনা ভূঁইয়া, মারুফা চৌধুরী, মিলিয়া গণি, ইফাতুল বুশরা, হাবীবা খাতুন, ইসমত আরা জাহান, নমিতা মোমেন, গীতাশ্রী সেন, মাহমুদা রহমান, কানিজ জোবেদা, লায়লা আর্জুমান্দ, ফ্যান্সি হক, মেহের নিগার, রেজিনা বেগম, দিলরুবা বেগম, ঊমা চৌধূরী, রেজিনা মান্নান, সুরাইয়া বেগম, শামীম আকতার, জাহিদা বেগম, গোলাম মমতাজ, শামীমা বেগম, হাবিবা খাতুন, শাহেদারা কামাল, দিলরুবা রহমান।
৭০ এর দশক হতে ২০০০ দশক-
বিলকিস ইসলাম, খোদেজা আহমদ, মমতাজ খানম, পিলু খান, লীনা দোজা, লায়লা দোজা, নীলুফা করিম, সুলতানা চৌধূরী, শামসুর নাহার জামাল, মুন্নি বেগম, সন্ধ্যারাণী দে, ইফাত ইসরাইল, শামসুর নাহার করিম, সেলিনা আক্তার, রোকসানা সাফা, রুনা পারভীন, মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী, আলেয়া আরিফ, করবী দাশ, পূর্ণিমা দাশ, অনামিকা তালুকদার, শুভ্রা চৌধূরী, বীণা দাশ, আকলিমা আক্তার মুক্তা, সোমা চৌধূরী, শেখ তাহমিনা আফরিন, হৈমন্তী রক্ষিত মান, সুবর্ণা রহমান, খাদিজা খাতুন বীথি, শর্মিলা বড়ুয়া, তন্বী দত্ত, ডা. কাজী আসমা আঞ্জুম, ইশরাত জাহান চৌধুরী, জয়শ্রী ধর, তানজিনা চৌধূরী মুনা, তামান্না ইসলাম, তাহমিনা আক্তার, বেবী রাণী দে, জেবুননেছা পপি, নার্গিস আক্তার বেবী, নিগা চৌধূরী, নীলা মিত্র, পলি শারমিন, পাপিয়া আহমেদ, বীণাপানি চক্রবর্ত্তী, অরুণিমা ইসলাম, ছন্দা ভূঁইয়া হাজরা, সুতপা চৌধূরী।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় শিল্পী (নারী)-মালতী চৌধূরী মহলা চিং, পুষ্পিতা খীসা, লংবতী ত্রিপুরা, ক্যাথারিন ত্রিপুরা, মেহনা প্রু, মাউ চিং চৌধূরী, তৃষ্ণা ত্রিপুরা।
নারীরা একসময় ঘরে থেকেও, পর্দানসীন সমাজ ব্যবস্থায়ও, পুঁথি, পাঁচালী, পালাকীর্ত্তনের সুর, কোরআন শিক্ষা, হামদ-নাত ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেকে এক সুর পরিমণ্ডলে আকৃষ্ট করে রেখেছেন। তাদের হাতে কৃষি, কুটির শিল্প, নকশী কাঁথা সৃষ্টির নবরূপ উন্মোচিত হয়। প্রতিটা ক্ষেত্রেই তারা ঈশ্বরের আশীর্বাদের জন্য মঙ্গল প্রার্থনায় নিজেদের তৈরি সহজ ভাষায় লোকসংস্কৃতির গানের রূপ রচনা করেন। যা আদিতে ছিল এখনও আছে। সুরের কারুকার্য্য অনেকটা বৈদিক ধারার লোকরূপ, প্রায় একই রকম। যারা যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়া পায় নি। আজ যান্ত্রিক সভ্যতায়, প্রযুক্তি সভ্যতায়, নারীরা অনেক উপকরণের সমাহারে রেডিও, টেলিভিশনের ব্যাপ্তিকালে তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে নিজেদের আরও উপস্থাপনার সফল পথ খুঁজে নেয়। চট্টগ্রামে অনেক নারী শিল্পী এখন নিজেদের সংগঠন তৈরি করার ইতিহাস রচনা করছেন। তারা সঙ্গীত শিক্ষাদানের প্রেক্ষাপটে নিজেদের আলোকিত ভূবন তৈরি করছেন। যেমন নিজস্ব সংগঠন: সঙ্গীত ভবন-পরিচালক (বর্তমান) কাবেরী দাশগুপ্ত, অভ্যুদয়-পরিচালক শ্রেয়সী রায়, সঙ্গীততীর্থ-পরিচালক শান্তা গুহ, রাগেশ্রী-পরিচালক মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী, রক্তকরবী-পরিচালক শীলা মোমেন, আনন্দধ্বনি-পরিচালক নন্দিতা নন্দী (ওস্তাদ মিহির নন্দীর স্ত্রী ও ওস্তাদ মিহির নন্দীর শিষ্যদের নিয়ে গড়া)।
তাছাড়া অনেক প্রাচীন সংগঠন চট্টগ্রামে আছে যেখানে নারী শিল্পীরা সঙ্গীত এ প্রশিক্ষণও দিয়ে যাচ্ছে। আর্য্য সঙ্গীত সমিতি-উপাধ্যক্ষ মৃণালিনী চক্রবর্ত্তী, উপাধ্যক্ষ জয়ন্তী লালা, শিক্ষিকা মজ্ঞু নন্দী।
সঙ্গীত পরিষদ-শিক্ষিকা জয়শ্রী চক্রবর্ত্তী, শিক্ষিকা মিতালী রায়, শিক্ষিকা পুরবী চক্রবর্ত্তী, শিক্ষিকা শ্রেয়সী রায়।
সঙ্গীত ভবন-অধ্যক্ষ পূরবী সেনগুপ্ত, অধ্যক্ষ কাবেরী সেনগুপ্ত।
উদীচি শিল্পী গোষ্ঠীতে সম্পাদক শিলা দাশ।
সুর সপ্তক সঙ্গীত বিদ্যাপীঠ-শিক্ষিকা ফাল্গুনী বড়ুয়া (ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়ার কন্যা) তার সাথে ওস্তাদজীর শিষ্য আমরাও আছি।
নজরুল একাডেমি-শিল্পী ফাহমিদা রহমান।
তাছাড়া নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মেলন পরিষদ, রেডিও ও টেলিভিশন শিল্পী সংস্থা, শিল্পকলা একাডেমী-শিশু একাডেমী ইত্যাদিতে প্রশিক্ষণ-চর্চায় অংশগ্রহণে অনেক নারী শিল্পীরা আছেন।
ধ্রুব পরিষদ-সন্ধ্যা ঘোষ দস্তিদার, সানি টিউটোরিয়াল-পূরবী সরকার, চট্টলকুড়ি-মানসী দাশ তালুকদার।
চট্টগ্রামে নারীরা এখন অনেক এগিয়ে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পর্দা শৃঙ্খল ভেঙ্গে তারা শিক্ষা, সঙ্গীত, আইন, চিকিৎসক, বৈজ্ঞানিক, পাইলট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, গবেষক সব ক্ষেত্রে তারা দক্ষতার পরিচয়ে এগিয়ে চলেছে। তারা কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার সর্ব কাজে তারা অংশগ্রহণ করে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তারা হাতে হাত ধরে তারা দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে বদ্ধপরিকর ভূমিকা রেখে চলেছে। সঙ্গীত একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যত যুদ্ধ ঘটেছে সঙ্গীত ছিল প্রেরণার উৎস। সঙ্গীত মনে করিয়ে দেয় ইতিহাস। সঙ্গীত আনতে পারে বিদ্রোহ ও শান্তির জোয়ার। Music as a perfect method warrior, pleasure, solidarity, Music look us folk and environment. Music for the soul (Plato)
তথ্যসূত্র:
১। চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক আন্দোলন-মাহবুব হাসান সম্পাদিত।২। সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ-আবুল ফজল। ৩। কালধারা চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংখ্যা। ৪। আর্য্য সঙ্গীত সমিতি শতবর্ষ উদযাপন ০৬। ৫। শিল্পী কোষ: চট্টগ্রাম/সঙ্গীত রাশেদ রউফ সম্পাদিত। ৬। চট্টগ্রামে নজরুল/নজরুল ইনস্টিটিউট। ৭। হাজার বছরের চট্টগ্রাম, দৈনিক আজাদী ৩৫ বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা। ৮। চট্টগ্রাম বেতারের স্মৃতিময় দিনগুলো/ ফজল হোসেন সম্পাদিত। ৯। নিজস্ব জানা তথ্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সংগীতশিল্পী, অধ্যাপক

x