সক্ষমতা বাড়বে ১৩ গুণ

১৩৩তম বর্ষে চট্টগ্রাম বন্দর ।। টার্মিনাল নির্মাণসহ চলছে বেশ কিছু প্রকল্পে কাজ ।। ব্যয় ২৫ হাজার কোটি টাকা

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ
236

দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ১৩ গুণ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত করার মাধ্যমে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত এই বন্দর সব চাহিদা মোকাবেলা করতে পারবে। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা পদক্ষেপের মধ্যে আজ বুধবার দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর ১৩৩তম বর্ষে পদার্পণ করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, বছর কয়েক আগে একেকটি জাহাজকে আট-দশ দিন অপেক্ষা করার পর বন্দরের জেটিতে বার্থিং নিতে হত। নানামুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে ওই অবস্থার উত্তরণ ঘটেছে। এখন অধিকাংশ জাহাজ এক থেকে দুদিনের মধ্যে বার্থিং পাচ্ছে। সিঙ্গাপুর বা কলম্বো থেকে এসে বহির্নোঙরে অপেক্ষা না করে সরাসরি বার্থিং নেওয়ার রেকর্ডও আছে। বহির্নোঙরে আগে যেখানে দশ-বারোটি জাহাজের জট লেগে থাকত, বর্তমানে সেখানে দুই-তিনটির বেশি জাহাজ অবস্থান করে না। অথচ বন্দরে আসা জাহাজের সংখ্যা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু পদক্ষেপের ফলে জাহাজের অবস্থানকাল কমে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্য হ্যান্ডলিংও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রেখে বন্দরের সক্ষমতা ১৩ গুণ বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করে আগামীর বন্দরখ্যাত বে-টার্মিনাল নির্মাণ, পতেঙ্গায় কন্টেনার টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল ও কর্ণফুলী কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কন্টেনার জট কমাতে ৩৭ একর জায়গায় নির্মাণ করা হচ্ছে ওভারফ্লো কন্টেনার ইয়ার্ড। সাউথ কন্টেনার ইয়ার্ডে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে নিলামকৃত পণ্যের কন্টেনার। সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর এলাকায় আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ হালিশহর সমুদ্র উপকূলে প্রায় আড়াই হাজার একর ভূমিতে বে-টার্মিনাল গড়ে তুলছে। ৮৭১ একর ভূমি হুকুম দখল করা হচ্ছে। এর সাথে সাগর ভরাট করে প্রস্তুত করা হবে আরো ১৬শ একর ভূমি। বিস্তৃত এই ভূমিতে বিদ্যমান চট্টগ্রাম বন্দরের পাঁচ গুণেরও বেশি বড় বে-টার্মিনাল গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে হুকুম দখলকৃত ব্যক্তিমালিকানাধীন ৬৮ একর ভূমিতে ট্রাক টার্মিনালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে। আগামী বছর এই টার্মিনালে কিছু কার্যক্রম শুরু হবে।
পতেঙ্গায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। বোট ক্লাবের কাছে বিমানবন্দর সড়ক সোজা করা এবং কয়েকটি স্থাপনা সরিয়ে ২৬ একর জায়গায় টার্মিনালটি হবে। ২০২০ সালের জুনের মধ্যে এখানে জাহাজ ভিড়বে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। এই প্রকল্পের আওতায় ৬শ মিটার জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে ৩টি কন্টেনার জাহাজ বার্থিং নিতে পারবে। একইসাথে নির্মাণ করা হচ্ছে ২২০ মিটার ডলফিন জেটি। এখানে ভোজ্যতেলবাহী জাহাজ বার্থিং নিতে পারবে। পতেঙ্গা টার্মিনালে বছরে সাড়ে ৪ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত পতেঙ্গা টার্মিনালের প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
বন্দরে বর্তমানে ১০টি গ্যান্ট্রি ক্রেন দিয়ে চলছে কন্টেনার ওঠানামার কাজ। টার্মিনালের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্ট্র্যাডল ক্যারিয়ার, রিচ স্ট্যাকার, রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি, রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের কার্যক্রমও গ্রহণ করা হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ পতেঙ্গার লালদিয়ার চর এলাকায় লালদিয়া মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ করবে। ৫৮ একর ভূমিতে ৮২০ মিটার লম্বা জেটিসহ অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এই টার্মিনালে কন্টেনারের পাশাপাশি জেনারেল কার্গোবাহী জাহাজও হ্যান্ডলিং করা হবে।
সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর এলাকায় একটি টার্মিনাল নির্মাণের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই চারটি টার্মিনাল নির্মিত হলে চট্টগ্রাম বন্দর জাহাজ, খোলা পণ্য কিংবা কন্টেনার হ্যান্ডলিং নিয়ে অনেকদিন নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ গতকাল বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেবা বাড়ানোর নানা পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বন্দরের সংরক্ষিত এলাকা বাড়ানো হয়েছে। জাহাজ এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে গৃহীত এসব পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম বন্দরকে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এই বন্দরের সক্ষমতা ১৩ গুণ বৃদ্ধি পাবে। তা দিয়ে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, মাত্র ৬ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে ১৯৭৬ সালে কন্টেনার পোর্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল। গত বছর তা ২৯ লাখ ৩ হাজার ৯৯৬টি কন্টেনারে উন্নীত হয়েছে। ২০৩৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬ লাখ টিইইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করতে হবে বলে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।