সংকট উত্তরণে দূতাবাসগুলোর সক্রিয়তা বাড়ানো জরুরি

বুধবার , ১৮ মার্চ, ২০২০ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
52

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিদেশিদের ঢুকতে দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বিদেশিদের নিজ সীমায় প্রবেশই করতে দিচ্ছেনা কাতার ও কুয়েত। শ্রমিক ভিসা ইস্যু করা কমিয়ে দিয়েছে বাহরাইন লেবাননসহ অন্য দেশগুলোও। দেশগুলোর কয়েকটিতে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি যাওয়া শ্রমিকদের প্রবেশে কোন বাধা আরোপ হয়নি। তবে অন্য দেশে ট্রানজিট নিয়ে যাওয়া শ্রমিকদের কোনভাবেই ঢুকতে দিচ্ছে না দেশগুলো। পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে গেলে শ্রমিকদের সরাসরি গমনও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রেমিট্যান্স আয়ের বৃহৎ ক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিকে বিপন্ন করে তুলেছে কভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস। গণমাধ্যমে অতি সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে দু’টি খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সে দু’টি হলো, তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তৈরি পোশাক থেকে রফতানি আয় যেখানে কমতির দিকে, সেখানে শ্রমিক রফতানি থেকে আয় অর্থাৎ প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স লেনদেনের ভারসাম্য রাখে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক রফতানি কমে এসেছে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে খ্যাত মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে মালয়েশিয়া, কাতার ও সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানোয় নানা বিড়ম্বনা যুক্ত হয়েছে নিকট অতীতে। নারী গৃহকর্মীদের নিপীড়ন, আকামা, নবায়ন না করা, নতুন শ্রমিক গ্রহণ, না করা ইত্যাদি সমস্যার মধ্যে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ভাইরাসের মোকাবেলায় বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যে পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন এ নিষেধাজ্ঞা কত দিন থাকবে, যে সব শ্রমিক এরই মধ্যে দেশে এসেছিলেন তারা কর্মস্থলে ফেরত যেতে পারছেন না। এসবের প্রভাব রেমিট্যান্সের ওপর পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে সেবা খাত করোনার প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। এসব খাতেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন। সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয় হারানোর আশংকা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে ছুটিতে আসা ও অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকদের শঙ্কা মুক্ত করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় বাংলাদেশিরা যাতে কাজ না হারান তার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য এখনই আলোচনা শুরু করা দরকার। চীন থেকে উৎপন্ন ভাইরাসটি ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে বড় অংকের রেমিট্যান্স আসে এমন দেশও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যাপকভাবে এবং সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইতালি, কানাডা, হংকং, জাপান, আর আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাস। এসব দেশ থেকে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। ফলে সব মিলিয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক অবস্থা দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের জোগানো ২ শতাংশ প্রণোদনা কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে, সেটাই এখন প্রশ্ন। সব দেশেই চীনের প্রভাব রয়েছে। ফলে ওইসব দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। করোনায় আক্রান্ত দেশগুলোর সঙ্গে পণ্য রফতানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ওইসব দেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া এসব দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে চলে আসছেন। এতে আগামী দিনগুলোয় দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও কমে আসবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক মন্দার কারণেও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমবে। কেননা বাংলাদেশে বড় অংকের রেমিট্যান্স আসে এমন অনেক দেশই সরাসরি করোনায় আক্রান্ত হয়েছে বা করোনার প্রভাব রয়েছে।
দেশের মোট রেমিট্যান্সের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এছাড়া এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর-এ চার দেশ থেকে আসে ১১ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে সোয়া ১২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে সাড়ে ১১ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশ থেকে আসে সাড়ে ৭ শতাংশ। আলোচ্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিকের দেশগুলোয় করোনার প্রভাব ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। ইউরোপীয় অঞ্চলের কিছু দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশও করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব থেকে। এ দেশটিও করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে। এখানেও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে এসব দেশে কর্মরত অনেক প্রবাসীই বাংলাদেশে চলে আসছেন। আবার দেশ থেকেও নতুন করে ওইসব দেশে কোনো কর্মী যাচ্ছেন না, এ অবস্থা চলতে থাকলে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। একই সাথে করোনা ভাইরাসের সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে এ খাতে নেতিবাচক অবস্থা আরো ভয়ংকর রূপ নেবে।
বিশ্বে বর্তমানে এক ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। এর নেতিবাচক প্রভাব অল্প-বিস্তর অনেক দেশেই পড়েছে। এ মন্দার একটা প্রভাব প্রবাসী আয়ে পড়তে পারে। কারণ যেসব দেশে এ মন্দা দীর্ঘদিন ধরে চলার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, সেসব দেশের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে। এতে কাজের ক্ষেত্র হ্রাস পাবে। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে। এছাড়া জনশক্তি রফতানি এবং বিদেশে যারা রয়েছেন, তাদের ওপর করোনা ভাইরাসের সাময়িক প্রভাব তো রয়েছেই। কেননা করোনা ভাইরাস যেভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে তাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে। তাই আগে থেকেই প্রবাসীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা বিধানের সাথে সাথে দেশে আটকে পড়াদের করোনার প্রভাব কেটে যাওয়ার পর দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্বে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনশক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি রাখতে দূতাবাসগুলো যেন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে তার পরিকল্পনা এখনই নেওয়া দরকার।