সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে শ্রমিক সুরক্ষায় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে

প্রবাসী শ্রমবাজার অস্থির

শুক্রবার , ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৩৪ পূর্বাহ্ণ
17

জনশক্তি রফতানির শীর্ষ গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই খারাপ সময় পার করছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। ব্যাপক মাত্রায় সৌদিকরণের ফলে আকামা (কাজের অনুমতি পত্র) নবায়ন করতে না পেরে সৌদি আরবে প্রতিনিয়ত অবৈধ হয়ে পড়ছেন প্রবাসীরা। অবৈধ হয়ে পড়াদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, এমন কি কাতারেও। এ অবস্থায় চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ অবৈধভাবে অবস্থান করতে গিয়ে ধরা পড়ছেন। কারাভোগ শেষে দূতাবাসের মাধ্যমে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে তাদের। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আউটপাস নিয়ে ফিরছেন শ্রমিকরা। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ফিরেছেন ৩৫ হাজার ৮৩৯ জন শ্রমিক। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
নয় মাসে প্রায় ৩৬ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক দেশে ফিরে আসা যেমন তেমন কথা নয়। কারণ বাংলাদেশি জনশক্তি রফতানি শীর্ষ গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা কারণে এখন অস্থির এ শ্রমবাজার। এছাড়া অন্য শ্রমবাজারগুলোও এরই মধ্যে নিজেদের বেকারত্ব ঘোচানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন ওইসব দেশে থাকা অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিক। কাজের সুযোগ না থাকলেও দালালদের খপ্পরে পড়ে সেসব দেশে যাচ্ছেন শ্রমিকরা। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমবাজার থেকে শ্রমিকদের ফেরত আসার যে ঢল নেমেছে, তা এখনই রুখতে হবে। তা যদি না হয় তাহলে ভবিষ্যতে জনশক্তি রফতানি হুমকির মুখে পড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়বে। বিভিন্ন কারণে শ্রমিকরা দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার নজির আমাদের চোখে পড়েনি। এটা সত্যিই হতাশাজনক। বৈধ কাগজ থাকার পরও অনেক সময় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আসলেই ঠিক প্রক্রিয়া মেনে শ্রমিকদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে কিনা সেটা দেখতে হবে। সরকারি পর্যায়ে শ্রমিকদের সুরক্ষা বলয়ে নিতে চাপ দিতে হবে।
প্রশ্ন হলো, কেন ক্রমেই কমে আসছে জনশক্তি রফতানি, আবার কেনইবা ফেরত আসছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। বিষয়টি দায়িত্বশীল মহলের খতিয়ে দেখা দরকার। এক সময় উপসাগরীয় ছয়টি দেশ জনশক্তি রফতানির প্রধান ভরাসস্থল ছিল। বর্তমানে নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ওই সব দেশে শ্রম ক্ষেত্রগুলো কিছুটা সংকুচিত হয়েছে এবং এটা বাড়ছে। তাই আমাদের বসে থাকলে চলবে না। যেসব সংস্থা জনশক্তি রফতানিতে নিয়োজিত, তাদের নতুন নতুন শ্রমক্ষেত্রের খুঁজে নিতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা না হলে বাংলাদেশের বৃহৎ আয়ের উৎস বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। কয়েক বছর ধরেই বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলোয় অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর মধ্যে সৌদিআরব, মালয়েশিয়া ও লিবিয়ার বাজার বেশি আলোচনায় রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কয়েক দফা শ্রমিক পাঠানো বন্ধের পর অচলাবস্থা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। সৌদিআরবে নারী শ্রমিক পাঠানোর পর তা নিয়ে ভয়াবহ কিছু খবর আমাদের আবার ভাবিয়ে তুলেছে। অনেকে এরই মধ্যে দেশে ফিরে এসে করুণ অবস্থার কথা জানিয়েছেন। এখন সেখান থেকে পুরুষ শ্রমিকরাও ফিরতে শুরু করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া থেকেও অনেকে ফিরে এসেছেন। এ বিষয়গুলো অবহেলা করলে চলবে না, গুরুত্ব দিতে হবে। এসব দেশে বহু বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন তাদের এভাবে ফিরে আসা চলতে থাকলে এক সময় দেশের শ্রমবাজারে চাপ আরো বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিদেশে শ্রমবাজার নিয়ে আমাদের দূতাবাসগুলোর বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে। দূতাবাসগুলোয় শ্রমিকরা কোন অভিযোগ করলে তা যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সমাধান হয় তার উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীসহ শ্রমিক পাঠানোয় নিয়োজিতরা কোন অনিয়মে জড়িত কিনা তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে কারো কোন অনিয়ম-দুর্নীতি পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। বৈদেশিক শ্রমবাজারের ওপর আমাদের নির্ভরতার বিষয়ে নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে কিনা, সেটিও চিন্তা করে দেখা দরকার। সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ অধিকাংশ দেশ এখন অভ্যন্তরীণভাবেই শ্রমিকের চাহিদা পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। দিন দিন এসব দেশে বৈদেশিক শ্রমিকের চাহিদা কমে আসবে। এক্ষেত্রে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও দক্ষতা বাড়ানোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। বিশ্বে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা পড়ছে, কমছে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা। এ অবস্থায় আমাদের দক্ষতা বাড়ানোর কার্যক্রমকে সাজাতে হবে আন্তর্জাতিক চাহিদার আলোকে। কিন্তু বাংলাদেশে নামমাত্র প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে জনশক্তি রফতানির পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। তাই এতে আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। নার্স তৈরি করা হচ্ছে কিন্তু তারা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সেবা জোগাতে পারছে না। ফলে বিদেশে যেতে পারছেন না তারা। স্বাভাবিকভাবেই মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কোন বিকল্প নেই।

x