সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় আইন ও কমিশন গঠন করতে হবে

বৃহস্পতিবার , ৮ আগস্ট, ২০১৯ at ৩:২১ পূর্বাহ্ণ
166

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরে সংগঠনটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির এ দাবি জানান। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
খবরের বিবরণে বলা হয়, শাহরিয়ার কবির বলেন, ইউনিফর্ম না পরে স্কুলে আসায় মিরপুরের আলীম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ২৪ জুলাই সতর্ক করা হলে তার পরিবারের সদস্যরা এসে প্রধান শিক্ষক রমেশ কান্তি ঘোষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং তার কক্ষে ভাঙচুর চালান। পরে ছাত্রীর ভাই রাকিবুল হাসান ফেসবুকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে লেখেন-প্রধান শিক্ষক বলেছেন, ‘হিজাব-বোরখা পরে স্কুলে যাওয়া যাবে না। এ নিয়ে উভয় পক্ষ থানায় অভিযোগ করে, যার তদন্ত চলছে। ফেসবুকে মিথ্যা সাম্প্রদায়িক বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়ে হিন্দু পাড়ায় হামলার ঘটনার ভুক্তভোগী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজ দাশ ও সঞ্জু বর্মণকে সংবাদ সম্মেলনে হাজির করে নির্মূল কমিটি। সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে শাহরিয়ার কবির বলেন, আমাদের দেশে ধর্মীয় বা জাতিগত কারণে সংখ্যালঘু হওয়ার জন্য কেউ লাঞ্ছনা বা নির্যাতনের শিকার হবেন, এটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ জন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য আইন করাটা অতি জরুরি প্রয়োজন।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশের মতো জনগণতান্ত্রিক দেশ, যার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নীতি ও আদর্শ ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, যা সংবিধানেই উল্লেখিত হয়েছে সে দেশে সংখ্যালঘু হওয়ার জন্য লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হবেন এটা কোনমতেই মেনে নেওয়া যায় না। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের যে দাবি তুলেছে সেটাও খুবই যুক্তিসংগত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং রংপুরের গঙ্গচড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার কথা বলা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্বার্থান্বেষী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নতুন হাতিয়ার।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও নানাভাবে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীও এ নির্যাতনে অংশ নিচ্ছে। গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা আগুন দিয়েছিল। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কেবল নির্যাতিতই হচ্ছে না, তারা নির্যাতন-অত্যাচারের বিচারও পাচ্ছে না। সাঁওতাল পল্লীতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের নাম পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। রামু, নাসিরনগর ও গঙ্গাচড়ায় হামলার বিচারও হয়নি। এ অবস্থায় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় বিশেষ আইনের দাবিটি অত্যন্ত যুক্তিসংগত সন্দেহ নেই। এবারই যে প্রথম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষার জন্য বিশেষ আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে তা নয়। অতীতেও কয়েকবার এমন দাবি উঠেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন এ দাবি তুলেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিভিন্ন সময় এ দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। বিগত দিনে অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় আইন ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, বাস্তবায়ন হয়নি। এখন আর দেরি করার সময় নেই। যত দ্রুত সম্ভব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় আইন প্রণয়ন করা দরকার। এটা শুধু আমাদের কথা নয়; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষের মনের কথা। পাকিস্তান আমল থেকে দেশের সংখ্যালঘুরা নানাভাবে নির্যাতিত হয়ে আসছেন। ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশেও তারা নির্যাতিত-অত্যাচারিত হবেন-এটা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যে দলের নেতৃত্বে দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে সেই দল দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার পরও সংখ্যালঘু নির্যাতনের চিত্র বদলায়নি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু নির্যাতন আরও বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও হামলার শিকার হয়েছে। এমনতর পরিস্থিতিতে আইন করে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই। আইন করার পাশাপাশি একটি কমিশনও গঠন করা জরুরি। আমরা আশা করি, সরকার বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে।

x