শ্রুতিঙ্গনের শাস্ত্রীয় সংগীত আয়োজন

সনেট দেব

বৃহস্পতিবার , ১৯ মার্চ, ২০২০ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
35

৬৪ কলার মধ্যে সঙ্গীতকে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ কলা বিদ্যা। সঙ্গীত সম্পর্কিত প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ “সঙ্গীত পারিজাত” গ্রন্থের রচয়িতা অহোবল সঙ্গীতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “গীতং, বাদ্যং, নৃত্যং ত্রয়ং সঙ্গীত মূচ্যতে” অর্থাৎ গান, বাদ্য ও নাচ এই তিনটির সম্মিলিত রূপকেই সঙ্গীত বলে। কিন্তু শাস্ত্র যাই বলুক মনের কথা সুর দিয়ে প্রকাশ করাকেই সঙ্গীত বলে মনে করি আমি; সে হোক যন্ত্র, মন্ত্র, কণ্ঠ কিংবা নৃত্যের মাধ্যমে। সঙ্গীতের উৎপত্তি মানব সৃষ্টির মতই অজানা। কখন ও কোথায় এ রহস্য কিন্তু আজও উন্মোচিত হয়নি। কোনটা কার আগে সৃষ্টি তার সঠিক তথ্য আজও মেলেনি। কিন্তু সৃষ্টিতত্ত্ব অজ্ঞাত থাকলেও রয়েছে এর ধারাবাহিকতা। ধারাবাহিকতার আদলে উদ্ভব হয়েছিল সঙ্গীতের নতুন নতুন ধারা ও রূপ, আবার পালাক্রমে তা হয়েছে লুপ্ত।
সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে অর্জিত হয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনোজাগতিক মুক্তি। শাস্ত্রীয়সংগীত সংস্কৃতির অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ। শুদ্ধসংগীত যেমন জীবনী শক্তিকে জাগ্রত করে তেমনি ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সত্য, সুন্দর, কল্যাণ ও আনন্দ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা ও অবদান রাখে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টায় নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সংগীত গুরু, ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া স্মরণে ৮ম বার্ষিক উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মিলন ও গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজন করে শ্রুতিঙ্গন বাংলাদেশ, শান্তুনু মিত্র ও কনাশ্রী সেনর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বিজিসি ট্রাস্ট এর উপাচার্য প্রফেসর ড. সরোজ কান্তি সিংহ হাজারী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন শ্রুতিঙ্গনের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী লিটন দাশ।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. অনুপম সেন বলেন, ওস্তাদ নীরদ বরণ বড়ুয়া সংগীত বিশারদ (বম্বে) হয়ে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যদি চট্টগ্রামে না থাকতেন তাহলে চট্টগ্রামের শাস্ত্রীয় সংগীত চর্চা এত উর্বর হতো না। বিশেষ অতিথি ডা. শ্রীপ্রকাশ বিশ্বাস বলেন, শ্রুতিঙ্গন উচ্চাঙ্গ ও নজরুলসংগীত চর্চার পাশাপাশি সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য গুণীজনকে সংবর্ধিতও করছে যা সত্যিই বিরল ঘটনা। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রামের ভারতীয় হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী। সভাপতি বেনু কুমার দে বলেন, প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের মধ্যে শ্রুতিঙ্গন প্রমাণ করেছে “উদ্দেশ্য মহৎ হলে কোন বাধাই-বাধা”- “ইচ্ছাগুলো যদি পবিত্র হয় স্বপ্নগুলো পূরণ হবেই।” সম্মিলনে ৪ জন গুণী ব্যক্তিকে সংবর্ধিত করা হয়। তাঁরা হলেন প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার, উপাচার্য (চবি), বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রামের জেনারেল ম্যানেজার নিতাই কুমার ভট্টাচার্য, সাংবাদিক আবুল মোমেন এবং অভিনেতা ও নাট্য নির্দেশক আহমেদ ইকবাল হায়দার।
আয়োজনের দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে মঙ্গলদীপ প্রজ্জ্বলের মাধ্যমে প্রায় ৮০জন শিল্পীদের পরিবেশনায় প্রশিক্ষক ভূপালী রাগে ধ্রুপদ, আহির ভৈরব রাগে সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমানের রচনায় ভাষা শহীদদের স্মরণে বাংলা খেয়াল, “ মা মা বলে ডাকো মাতৃভাষার পক্ষে থাকো”, মালকোষ রাগে “ভাষাতেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব”, মিমাকী টোড়ী রাগে “শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দাও তোমার সুকর্ম দেখাও”, ১৫টি রাগে রাগমালা এবং বাগেশ্রী রাগে ‘তারানা’ প্রায় ৩৫ মিনিটের পরিবেশনায় হলভর্তি দর্শকের মধ্যে মনে হয়েছিল নীরবতায় সৃষ্টিকর্তার আরাধনা করছেন। তবলায়- সুমন মজুমদার। তারপর বেহালায় রাগ মালকোষ পরিবেশন করেন ডা. সন্দীপন দাস, তবলায়- সুমন মজুমদার, রাগ মধুবন্তী পরিবেশন করেন সৈকত দত্ত। হারমোনিয়ামে- লিটন দাশ, তানপুরায়- নিপা দত্ত, তবলায়- সানি দে, পরিবেশনায় নিয়মিত চর্চার ছাপ পাওয়া গেলেও চঞ্চলতা পরিহার করলে ভবিষ্যতে সে আরো ভালো করবে।
এরপর ক্লাসিক্যাল গীটারে রাগ বেহাগ পরিবেশন করেন আগরতলা ত্রিপুরার শিল্পী পংকজ কুমার দাশ, তবলায়- আগরতলা ত্রিপুরার শিল্পী শুভ্রাংশ দাশ। তাঁর পরিবেশনা দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনেন। রাগ শুদ্ধ ষড়জ পরিবেশন করেন রাজশাহীর শিল্পী সলোক হোসেন, হারমোনিয়ামে- তাপস দত্ত, সুমন মজুমদার, রাগ ভূপালী পরিবেশন করেন পশ্চিমবঙ্গ কোলকাতার শিল্পী বিপ্লব মুখার্জী, তবলায় ছিলেন- কোলকাতার শিল্পী রূপক মিত্র, হারমোনিয়ামে- লিটন দাশ, তানপুরায়- অপর্ণা শীল। তাঁদের পরিবেশনা এতই মনোমুগ্ধকর ছিল যে দর্শক মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে শিল্পীদের অভিবাদন জানান। এরপর সেতারে রাগ কিরোয়ানী পরিবেশন করেন আগরতলা, ত্রিপুরার শিল্পী পণ্ডিত শুভংকর ঘোষ, তবলাং- শুভ্রাংশ দাশ। সর্বশেষ পরিবেশনা রাগ বাগেশ্রী পরিবেশন করেন আগরতলা ত্রিপুরার শিল্পী শুভজিৎ শংকর সেন, তাঁকে তবলায় সহযোগিতা করেন, শুভ্রাংশ দাশ, হারমোনিয়ামে- লিটন দাশ, তানপুরায়- নয়ন মহাজন।