শ্রদ্ধাঞ্জলি : রানী সরকার

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ১৭ জুলাই, ২০১৮ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ
66

রানী সরকার ২০১৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সম্মাননা প্রদানকালে

তাঁকে যথেষ্ট সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ২০০২ সালে তিনি যখন খুব অসুস্থ হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে তাঁর চিকিৎসার জন্য ও ভরণ পোষণের বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

এ প্রজন্মের দর্শক অভিনেত্রী রানী সরকারকে চেনেন কিনা জানি না। তবে ১৯৮০’র দশক পর্যন্ত এদেশের চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন অনেকটা অপরিহার্য একজন অভিনেত্রী। বেশির ভাগই খল চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। আর নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে একজন অভিনেত্রী যে এতটা জনপ্রিয় হতে পারেন তার উদাহরণ রানী সরকার। তাঁর স্ক্রীন পারসোনালিটি ছিল উঁচু মাপের। একহারা দীর্ঘাঙ্গী অবয়ব তাঁর ব্যক্তিত্বের সাথে ছিল যথেষ্ট সামঞ্জস্যময়। আরো একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি শারীরিক গঠন একই রকম বজায় রাখতে পেরেছেন।

তাঁর শেষ উল্লেখযোগ্য অভিনয় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ছবিতে তিশার মায়ের চরিত্রে। এখানেও তাঁর চরিত্রটি রাগী এক মায়ের। তবে উপস্থিতি স্বল্প। কিন্তু এটুকুতেই তিনি দর্শকের নজর কাড়েন। এ প্রজন্ম হয়তো এ ছবির মাধ্যমে তাঁকে দেখেছেন। এজন্য পরিচালক ফারুকীকে ধন্যবাদ। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অগ্রজ অভিনয় শিল্পীরা উপেক্ষিত। এদেশের সিনেমায় ও টিভি নাটকে অগ্রজ কোনো চরিত্রই থাকে না অনেক দিন থেকে। যা অন্য কোথাও দেখা যায় না।

রানী সরকার এদেশের চলচ্চিত্র জগতের একেবারে শুরুর দিকের শিল্পী। ১৯৫৮ সালে তাঁর অভিনয় ক্যারিয়ারে শুরু মঞ্চে ‘বঙ্গের বর্গী’ নাটকে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে। এরপর মঞ্চে আরো নাটক করেন খুলনায় ও ঢাকায়। তাঁর সাবলীল মঞ্চাভিনয় চলচ্চিত্র পরিচালক এ জে কারদারের চোখে পড়ে। তিনি রানীকে তাঁর ‘দূর হ্যায় সুখ কা গাঁও’ ছবিতে ব্রেক দেন। ১৯৫৮ সালেই এই উর্দু ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্রাভিনয় জীবনের শুরু হয়। উর্দুটা খুব ভালো বলতেন। পরের ছবিটাও ছিল উর্দু। এহতেশামুর রহমান (এহতেশাম)-এর ‘চান্দা’। এহতেশাম ও তার ভাই মুস্তাফিজের প্রায় সবকটি উর্দু ছবিতে রানী সরকার কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে জহির রায়হান ও খান আতা যখন উর্দু ছবি করেন তখনো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তাঁরা কাস্ট করেন রানীকে।

রানী সরকার দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন ১৯৬২ সালে তাঁর অভিনীত প্রথম বাংলা ছবি এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবির মাধ্যমে। এ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এই ছবির অভিনয় তাঁকে ঢাকার ছবিতে অপরিহার্য করে তোলে। এই অপরিহার্যতা গত শতকের ষাট, সত্তর ও আশির দশক জুড়ে বিরাজ করে। ২৫০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঋত্বিক কুমার ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম, জহির রায়হানের কাঁচের দেয়াল, সংগম, বাহানা, বেহুলা, আনোয়ারা; সুভাষ দত্তের সুতরাং, পালাবদল, আয়না ও অবশিষ্ট, কাগজের নৌকা; খান আতাউর রহমানের নবাব সিরাজউদদৌলা, ভাওয়াল সন্যাসী, সোয়ে নদীয়া জাগে পানি, আবার তোরা মানুষ হ; মোস্তফা মেহমুদের মোমের আলো, মায়ার সংসার; সিতার চাওয়া পাওয়া, লাঠিয়াল; কিউ এম জামানের ছদ্মবেশী, ভানুমতী ইত্যাদি। আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি যে আগুনে পুড়ি, অন্তরঙ্গ, আগুন নিয়ে খেলা, অভিশাপ, আঁকা বাঁকা, সমাপ্তি, দু’পয়সার আলতা, তোমার আমার, টাকার খেলা, বিষকন্যা, মলুয়া, দেবদাস, শীত বসন্ত, চন্দ্রনাথ, শুভদা ইত্যাদি।

তবে রানী সরকারের অভিনয় জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও জহির রায়হানের ‘আনোয়ারা’। এ দুটি ছবির প্রধান দুটি চরিত্রে তিনি অভিনয় করেন। দুটি ছবির চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। তিতাসের চরিত্রটি মমতাময়ী জেলেনী মুংলীর, যে অসহায় রাজার ঝি (কবরী) কে আশ্রয় দিতে গিয়ে একঘরে হয়। আনোয়ারার চরিত্র দুর্ধর্ষ সৎমা গোলাপজান বিবির, যে সৎ জামাকে খুন করতে গিয়ে নিজের ছেলেকে রামদার এক কোণে দু টুকরো করে ফেলে নিমিষে। তিতাসের অভিনয় যেমন দর্শকহৃদয় আর্দ্র করে, তেমনি আনোয়ারার অভিনয় দর্শকদের রক্ত হিম করে দেয়। খল চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে বেশি পরিচিতি পেলেও মমতাময়ী চরিত্রেও তিনি সমান দক্ষতায় অভিনয়ে পারঙ্গম ছিলেন। একজন জাত অভিনেত্রীর ক্ষমতাই এই। জহির রায়হানের প্রিয় এই অভিনেত্রী ঋত্বিক ঘটকেরও যথেষ্ট সমাদর অর্জনে সমর্থ হয়েছিলেন। ঋত্বিক চারজন অভিনেত্রীর খুবই প্রশংসা করেছিলেনরোজী, রওশন জামিল, রহিমা খাতুন ও রানী সরকার। এঁদের মধ্যে তিনি উচ্ছ্বসিত ছিলেন রহিমা খাতুন ও রানী সরকারের অভিনয়ের সাবলীল প্রাণবন্ততায়।

রানী সরকার অভিনয়ে আসার আগে গায়িকা ও নৃত্যশিল্পী হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি অর্জন করেছিলেন সাতক্ষীরা ও খুলনায়। ঢাকায় এসে তাঁর অভিনয় জীবনের জোয়ারে এ দুটি গুণ ঢাকা পড়ে যায়। ব্যক্তি জীবনেও ছিলেন অত্যন্ত রুচিশীলা ও অমায়িক। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সাথে দু’বার আলাপের সুমিতা দেবীর বাসায়। অত্যন্ত সৌজন্যবোধ ও মার্জিত আচরণের পরিচয় পেয়েছিলাম তাঁর। সুমিতা দেবীর সাথে তাঁর সখ্য ছিল ঘনিষ্ঠ। দুজনে অভিনয় করেছেন এক সাথে অনেক ছবিতে।

রানী সরকারের স্ক্রীন পারসোনালিটির কথা বলেছি। আমি খেয়াল করে দেখেছি, সিনেমা কিংবা টিভির পর্দায় যখনই তিনি আসতেন দর্শক রীতিমত তৈরি হয়ে বসতেন যেন সম্ভ্রম আর মনোযোগ নিয়ে। টেলিভিশনেও প্রচুর অভিনয় রয়েছে তাঁর। এরমধ্যে বেগম মমতাজ হোসেন রচিত ‘সকাল সন্ধ্যা’ সিরিয়ালের কথা উল্লেখযোগ্য। এই নাটকে তিনি মিথিলার মায়ের খলচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

রানীর উর্দু উচ্চারণে শুদ্ধতার কথাও বলেছি। এ কারণে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশেও জনপ্রিয় ছিলেন। অনেকগুলো উর্দু ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। এখানেও তাঁর চরিত্র ইতিবাচক নেতিবাচক দু’রকমেরই ছিল। লাহোর ও করাচীর কয়েকটি ছবিতেও তিনি অভিনয় করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য উর্দু ছবি, দূর হ্যায় সুখ কা গাঁও, চান্দা, তালাশ, পয়সে, ইস ধরতি পর, নাচঘর, ক্যায়সে কঁহু, আযম, নবাব সিরাজউদদৌলা, সোয়ে নদীয়া জাগে পানি, সংগম, বাহানা, বন্ধন, কাজল, তানহা, জাঁহা বাজে শেহনাই ইত্যাদি।

রানী সরকার ২০১৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সম্মাননা প্রদানকালে তাঁকে যথেষ্ট সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ২০০২ সালে তিনি যখন খুব অসুস্থ হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে তাঁর চিকিৎসার জন্য ও ভরণ পোষণের বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তিনি অভিনয় করে গেছেন। তাঁর শেষ অভিনয় ২০১৬ সালে ‘গ্রাস’ ছবিতে। ১৯৫৮ থেকে ২০১৬। ৫৮ বছরের ঈর্ষণীয় ক্যারিয়ার।

সার্থকনামা এই শিল্পীর জন্ম ১৯৩২ সালের ৭ জুলাই সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার সোনাতলা গ্রামে। বাবা সোলেমান মোল্লা মা আসিয়া খাতুন। বাবা ছিলেন শিক্ষা ও সংস্কৃতি অনুরাগী। বাবার উৎসাহ ও প্রেরণায় রানীর শিক্ষা ও শিল্পজীবন শুরু। পিতৃদত্ত নাম মোসাম্মৎ আমিরুন নেছা খানম। ডাকনাম মেরী। প্রথম ছবিতে আমিরুন নেছা নামে অভিনয় করলেও দ্বিতীয় ছবি চান্দাতে পরিচালক এহতেশাম তাঁর নতুন নাম রাখেন রানী সরকার। গ্রামের বিদ্যালয় সোনাতলা ইউপি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা এবং খুলনার করোনেশন গার্লস স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন তিনি। সেদিক থেকে বলতে গেলে তিনি আমাদের চলচ্চিত্রাংগনের শিক্ষিত অভিনেত্রীদের একজন।

২০১৮ সালের ৭ জুলাই ৮৬ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে পরিণত বয়সে রানী সরকার চলে গেছেন। একটি বিরল সমাপতন ঘটে গেছে তাঁর জীবনে। জন্ম ও মৃত্যু একই দিনে৭ জুলাই। মহান মানুষদের জীবনে এই সমাপতন লক্ষ্যণীয়। রানী সরকারও আমাদের চলচ্চিত্রের একজন মহান শিল্পী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস যাঁর নাম ছাড়া কখনোই লেখা যাবে না।

x