শেকড়মুখী শিল্প প্রয়াস

পাভেল আল মামুন

মঙ্গলবার , ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
157

ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ ও ২৯ দুইদিন মণিপুরি থিয়েটার কমলগঞ্জের নট-মণ্ডপে আয়োজন করতে যাচ্ছে তাদের নতুন নাটক ‘ও মন পাহিয়া’র চারটি প্রদর্শনী। ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে এরকম একটি আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই আজকের লেখা-
মণিপুরি থিয়েটার মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে একটি নটমন্ডপ নির্মাণ করেছেন। সেখানে তারা ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি’ এবং বাংলা ভাষায় নাটক মঞ্চায়ন করেন। নিয়মিত আয়োজন করে উৎসবের। দেশের নানা প্রান্ত এবং বিদেশ থেকেও নাট্য অনুরাগীরা এখানে আসেন, অবগাহন করেন তৃণমূলে বিশ্বমানের শিল্পের মাঝে। এমনটা শুনে আসছিলাম অনেকদিন থেকেই তাই ইচ্ছে ছিল ঘোড়ামারা যাবার আর স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষ করার। ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত তিনদিনের একক নাট্য উৎসবের খবর যখন পেলাম তখন সুযোগ কাজে লাগালাম। ২৬ তারিখ হাজির হলাম ঘোড়ামারা গ্রামে। ব্যক্তিগত যানবাহনে গেলেও বন্ধুর পথের নানা বাঁক পেরুতে পেরুতে বুঝলাম গ্রামটিকে প্রত্যন্ত বলতেই হবে। সিলেট থেকে ঘোড়ামারা পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগল পুরো ৩.৩০ ঘন্টা, তার মধ্যে এক ঘন্টা গাড়ি চালাতে হলো ভাঙ্গা রাস্তায়- বাঁধা ডিঙ্গানো দৌড়ের মতো। ঘোড়ামারার কাছাকাছি গিয়ে রীতিমত গর্তের ভেতর দিয়ে চালিয়ে পৌঁছালাম নটমন্ডপ-এর সামনে। ততক্ষণে পেছনের চাকা পাংচার। চাকা মেরামত করে ফেরার দু:শ্চিন্তা আপাতত বাদ দিয়ে মন দিলাম থিয়েটারে।

নটমন্ডপের কাছাকাছি যাবার আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম দলে দলে মানুষ যাচ্ছে। কেউ হেঁটে, কেউ সিএনজিতে, কেউ মোটর বাইকে। কাছাকাছি গিয়ে নিশ্চিত হলাম তাদের গন্তব্য নটমন্ডপই। নটমন্ডপের সামনে উপচে পড়া ভিড়, সকলেই দারুণ পোশাকে আর সাজগোজে উদ্দীপ্ত ঘোরাঘুরি করছে। বিস্তর ধানক্ষেতের মাঝে লম্বা একটা হলঘর। সামনে একটুখানি ফাঁকা জায়গা। হালকা ফুলের বাগান। পরিমিত আলোকসজ্জা। পাশেই খাবারের দোকান। টিকেট কাউন্টারে উপচে পড়া ভিড়। অনেকটা বছর ত্রিশ আগে দেখা ঈদের দিনে উপজেলা সদরের সিনেমা হলের মতো। সব মিলিয়ে প্রকৃতই উৎসব। নিজের ভেতরেও মূহুর্তে উৎসবের এক সুখ খুঁজে পেলার। টিকেট কেটে লাইন পেরিয়ে ঢুকে বসলাম সামনে সারিতে।
পুরো নটমন্ডপের অর্ধেকটা জুড়ে মঞ্চ এবং বাকীটায় দর্শক। সারি সারি প্লাষ্টিকের চেয়ার বসানো। একেবারে সামনে চাদর পেতে রাখা- চাদরের বেশীরভাগ জুড়ে শিশু দর্শক। এত শিশু দর্শক এক সাথে প্রসেনিয়াম থিয়েটার দেখছে- এমনটা আগে কখনও দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না। নটমন্ডপের ভেতরটা এমনভাবে বানানো তাতে প্রসেনিয়াম, এরেনা, থ্রাস্ট বা ট্রাভারস সব ধরনের প্রযোজনাই মঞ্চায়ন সম্ভব। আলোক বাতিগুলোও যাতে সে মতে বাঁধা যায় তার ব্যবস্থা একসাথেই রাখা আছে।
দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা দর্শকের কথা বিবেচনায় একটু দেরীতে শুরু হলো নাটক ‘ও মন পাহিয়া’। নাটকটি দেখতে যাবার আগে মোজাম্বিয়ান লেখক মিয়া কৌতোর মূল গল্পটি পাঠের চেষ্টা চালিয়েছিলাম ইন্টারনেট থেকে। গল্পটি পেলাম পর্তূগীজ ভাষায়। গুগল-এ অনুবাদ করের তার দুর্বোধ্য বাংলা পাঠ পড়লাম। নাটক শুরুর পর বুঝলাম এটি মঞ্চায়ন হচ্ছে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি’ ভাষায়। দুর্বোধ্য অনুবাদ আর ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি’ ভাষায় অজ্ঞতার কারণে গল্পটি থিয়েটার-এর ভাষায় বোঝার চেষ্টা চালালাম।
আফ্রিকান বাস্তবতায় লেখা পর্তুগীজ বংশোম্ভূত মিয়া কৌতোর গল্প ‘দি বার্ডস অব গড’ এর ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে শুভাশিস সিনহার ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি’ রূপান্তর- ‘ও মন পাহিয়া’। দক্ষিণ আমেরিকান সাহিত্য ধারা আধুনিক যাদু বাস্তবতার প্র্রভাবে লেখা গল্পটির মণিপুরি মেটামরফোসিস -এই নাট্যকর্মটি একেবারেই হয়ে উঠেছে আমাদের বাস্তবতার গল্প। গল্পের নায়ক এক পাখি- এখানে পাখিরূপে যে চরিত্রটি শুভাশিস সিনহা উপস্থাপন করেছেন তা প্রতীক হয়ে গেছে আমার, আমাদের নিপীড়িত, বঞ্চিত সত্তার প্রতিনিধি। সাহিত্যে পাখির প্রতীকী ব্যবহার একটি অতি প্রাচীন চর্চা। এই চর্চাটি প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য সব জায়গাতেই বিদ্যমান। আলোচ্য গল্পের পাখিটি সুদূর আফ্রিকা থেকে মণিপুরী গ্রামে এসেও ধরে রেখেছে একই রকম প্রতিকীবোধ। মূল গল্পটি পাঠ করে যারা নাটকটি দেখবেন তারা নিঃসন্দেহে এই ভেবে অভিভূত হবেন যে- নাট্যকর্মটিতে গল্পটির মূলভাব অক্ষুন্ন রেখে নাট্যকার কি যাদুকরী নৈপূণ্য দেখিয়েছেন পারিপার্শ্বিকতার সান্নিধ্যে দেশজ উপস্থাপনের। এই উপস্থাপন এতটাই শক্তিশালি যে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি’ ভাষায় রচিত সংলাপগুলোর অভিব্যক্তি থিয়েটারের ভাষায় বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি। এখানেই সার্থকতা থিয়েটারের ভাষায় মুন্সীয়ানা প্রয়োগের। পাশাপাশি থিয়েটার যে প্রকৃতই যোগাযোগে সক্ষম আর তা নিজস্ব উপাদানের সংমিশ্রণেই- সেটির প্রমাণ দিলেন নির্দেশক ‘ও মন পাহিয়া’র উপস্থাপনে। আফ্রিকান গল্পটির কংকালে দেশজ উপদানের যে-প্রলেপ মণিপুরি থিয়েটার দিয়েছে- তা হয়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির উপাদান একেবারেই নিজস্ব করে ফেলার জলজ্যান্ত উদাহরণ। ল্যাটিন আমেরিকান ধারা, আফ্রিকান গল্প, মণিপুরী নৃত্য আর সুর, লালনের গান- সব কিছুকেই একসাথে অচেনা বা আলাদা কিছু মনে হয়নি।
নাটকের মূল চরিত্র- পাখি। চরিত্রটিকে রূপ দিয়েছেন অভিনেত্রী জ্যোতি সিনহা। পাখির চরিত্র নির্মাণে তার দীর্ঘ অধ্যবসায়, পর্যবেক্ষণ, বুদ্ধিবৃত্তিক কল্পনা আর যথাযথ পরিমিতিবোধ সুস্পষ্ট। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যে পাখিদের হাঁটা চলা, কথা বলা, রাগ দুঃখ, অভিমানকে গভীর মনোযোগে দেখেছেন এবং শিখেছেন তার প্রমাণ দিয়েছেন মঞ্চের প্রতিটি পদক্ষেপে। নৃত্য আর অভিনয় কলার সংমিশ্রণে তিনি পাখি চরিত্রটিকে দিয়েছেন যে কারো কল্পনার চাইতে অনেক বেশী সুনিপুণতায় । পুরোটা অভিনয়ে তিনি বেশীরভাগ সময় ভারসাম্য রেখেছেন পায়ের পাতার সামনে অংশে। তার মনোযোগী, পরিশ্রমী আর বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনে পাখিটি প্রকৃতই পাখি হয়ে উঠেছে। তার অভিনীত এই চরিত্রটির তুলনা শুধু পাখির সাথে দেয়া সম্ভব। ‘ও মন পাহিয়া’র মঞ্চায়নে আরও দুজন প্রতিভাবান অভিনেতার কথা বলতেই হবে- উজ্জ্বল সিনহা আর স্বর্ণালী সিনহা। তম্বা চরিত্রের মাধ্যমে উজ্জ্বল সিনহা দর্শক অনুরণনে তৈরি করেছেন এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানবিকবোধ। লাঠিখেলায় তার সুনিপুণ দক্ষতা জানান দেয় তিনি শুধু মণিপুরি থিয়েটার নয় বরং বাংলাদেশের সম্পদ । তম্বার প্রতিবন্ধী সন্তানের চরিত্রে স্বর্ণালী সিনহাও রেখেছেন পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা আর একাগ্রতার ছাপ। সর্বোপরি দলীয় উপস্থাপনে রচিত ‘ও মন পাহিয়া’ একটি একটি Total Acting নির্ভর থিয়েটার- যার সফলতা নির্ভর করে প্রতিটি অভিনেতার অভিনয় সফলতায়।
পাখির জন্য যে পোশাকটি ডিজাইন করা হয়েছে তার সাথে অতীতের কোনো মঞ্চে দেখা কোনো পাখির মিল পাওয়া যায়নি। এবং তা প্রতিনিয়ত দেখা পাখির মতোই লেগেছে। কোমর থেকে কুঁচি করা একটা কাপড় জুড়ে দেয়া হয়েছে জামার হাতের সাথে। তাতেই অনুভবে স্থাপিত হয়েছে পাখির বিশ্বাস। খুব ছোট ছোট অনুষঙ্গ ব্যবহার করে বৃহৎ অর্থকে প্রতিষ্ঠিত করার সাফল্য ‘ও মন পাহিয়া’র পুরো যাত্রায় স্পষ্ট।
মণিপুরি থিয়েটার আর তাদের ‘ও মন পাহিয়া’র পরিবেশনায় প্রযোজনার আঙ্গিক প্রায়োগিক বা কারিগরী কৌশলের উর্দ্ধে যেটি বেশী প্রাসঙ্গিক সেটি হলো শেকড়মুখিতা। বহু বছর আগে মাইকেল মধূসূদন দত্ত ঘর ভাষা সব ছেড়ে ছুটেছিলেন প্রতিষ্ঠিত ভাষায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু বেঁচে আছেন নিজ ভাষার সাহিত্য কর্মটুকুর অস্তিত্বেই। বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত বৃহৎ ভাষা আর সংস্কৃতির চাপে হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা আর সংস্কৃতি। সেখানে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি’ ভাষায় থিয়েটার চর্চা অতিমাত্রায় দুঃসাহসিক একটি কর্মপ্রয়াস। পৃথিবীতে যেখানে প্রতিদিন বাড়ছে One dimensional men সেখানে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষায় নাট্যকর্ম তৈরি এবং উপস্থাপন করে টিকে থাকা একটি বিরল প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টায় মণিপুরি থিয়েটার শিল্পগুণে সফল। দেশের নানা অঞ্চল এবং পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা দর্শকেরা সেই সফলতার বড় প্রমাণক। এই অনন্য নান্দনিক শিল্পকর্মটি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে ২৮ বা ২৯ ফেব্রুয়ারির যে-কোন দিন সন্ধ্যা ছয়টা বা সাড়ে সাতটায় আপনিও হাজির হতে পারেন মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে- মণিপুরি থিয়েটারের নটমন্ডপে। নয়তো এই স্বাদ নিতে অপেক্ষা করতে হবে পুরো একটি বছর- এ বছর নটমন্ডপে এই নাটকের এটাই শেষ আয়োজন।