শুদ্ধস্বরে ভাঙে রুদ্ধপ্রাণ

বৃহস্পতিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৩ পূর্বাহ্ণ
15

শুদ্ধস্বরে ভাঙে রুদ্ধপ্রাণ। সমাজ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে আবৃত্তি শিল্প মাধ্যমের “বিশেষ গৌরবের” স্থান রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠ, শব্দ সৈনিকদের সংবাদ পাঠ, আবৃত্তি দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত ও একতাবদ্ধ করেছিল এবং পাক হানাদার ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ও সম্মুখ যুদ্ধে উদ্দীপ্ত করেছিল। স্বাধীনতার পর থেকেই আবৃত্তি চর্চা জনপ্রিয় হতে থাকে। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, প্রগতির পক্ষের আদর্শ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন আবৃত্তি সংগঠন গড়ে উঠছে এবং তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কবি আবুল মোমেনের মতে ৫০’র দশকেও চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেগুলো বিচিত্রা অনুষ্ঠান নামে পরিচিত ছিল সেগুলোতেও আবৃত্তি করা হতো। এভাবে চট্টগ্রামে ৬২, ৬৫, ৬৭ ও ৬৯ এর গণ আন্দোলনে খোলা মঞ্চে দ্রোহের কবিতা আবৃত্তি হতো, যা আন্দোলনকে বেগবান কবতে সাহায্য করে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতে শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কবিতা আবৃত্তি হতো। স্বাধীনতার পর ৭২-৭৫ পর্যন্ত অনেক একক আবৃত্তি হলেও সময়ের প্রয়োজনে এসময় সম্মেলক আবৃত্তির প্রয়োজন অনুভব করে আবৃত্তিশিল্পীরা। এরফলে আত্মপ্রকাশ ঘটতে শুরু করল আবৃত্তি সংগঠনের। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামেই অধিক সংখ্যক আবৃত্তি আয়োজন হয়ে থাকে।
সংগঠন ভিত্তিক আবৃত্তি চর্চার পূর্বে চট্টগ্রামে আবৃত্তি শিল্পের প্রসারে অনেকে কাজ করেছেন। ৫০ এর দশকে আবৃত্তিশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন মাহবুব হাসান, অ্যাডভোকেট চিত্তরঞ্জন দাশ, অজীত চক্রবর্তী, কাজী হাসান ইমাম, খালেদা হানুম, ড. কামাল এ খান, সি রোজারিও, সালমা চৌধুরী, অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন, অধ্যাপক আবদুল মতিন প্রমুখ।
৬০ এর দশকে উল্লেখযোগ্যরা হলেন মনোয়ারা করিম বেনুম, অরুণ দাশ, শফি কামাল, লীনা রায়, দিলারা আলো, আবুল মোমেন, উদয় শংকর দাশ, রণজিৎ রক্ষিত প্রমুখ।
৭০’র দশকের আবৃত্তিশিল্পীদের মধ্যে মৃণাল সরকার, মায়া চৌধুরী, ডা. আজম, অঞ্চল চৌধুরী, প্রতিভা সর্ববিদ্যা, আ ফ ম সিরাজউদ্দোলা, প্রণব দাশের কথা জানা যায়।
৮০’র দশকে চট্টগ্রামে আবৃত্তি সংগঠনগুলো দলভিত্তিক আবৃত্তি চর্চা শুরু করে। প্রথম দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক জিয়া হায়দারেরর পৃষ্টপোষকতায় সংগঠন ভিত্তিক আবৃত্তি চর্চা শুরু হলেও তৎকালীন স্বৈরশাসনের নিষ্পেষণে তারা বেশি দূর এগুতো পারেনি। পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রামের কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা সামপ্রদায়িক বিরোধী কবিতা উৎসব করে মুসলিম ইনস্টিটিউটে। ১৯৮৬-১৯৮৭ সালের দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত ‘অভিব্যক্তি’কে অনেকে চট্টগ্রামের প্রথম আবৃত্তি সংগঠন মনে করেন।
এরপর ১৯৮৭ সালের ৯ জানুয়ারি ‘বোধন আবৃত্তি পরিষদ’এর আত্মপ্রকাশের পর মূলত চট্টগ্রামে সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চার প্রসার ঘটে। পরবর্তী পর্যায়ে স্বরশ্রুতি, ক্বণন, ১৯৯০ সালে প্রমা, ৯১’এ চারুবাক, ৯২’এ দৃষ্টি সাংগঠনিকভাবে আবৃত্তি চর্চা শুরু করে। এভাবে মুক্তধ্বনি, উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ, ত্রিতরঙ্গ আবৃত্তি দল, শব্দনোঙ্গর আবৃত্তি সংগঠন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি মঞ্চ, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম, অঙ্গন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শৈশব চট্টগ্রাম, স্বপ্নযাত্রী, প্রমীথী সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ, স্বদেশ আবৃত্তি সংগঠন, সন্‌দ্বীপনা আবৃত্তি বিভাগ, চট্টগ্রাম আবৃত্তি একাডেমি, কর্ণফুলী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী , নরেন আবৃত্তি একাডেমি, নির্মাণ আবৃত্তি অঙ্গন, সুবচন ললিতকলা কেন্দ্র, চট্টগ্রাম আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, বিভাস আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, কণ্ঠনীল বাচিক শিল্প চর্চা কেন্দ্র, বর্ণ আবৃত্তি পাঠশালা, ঐকতান সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, ঐকতান পরিবার, বুনন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাউজান আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, বিনয় বাঁশী শিল্পী গোষ্ঠী, ত্রিস্বর আবৃত্তি সংঘ, উজানী আবৃত্তি সংগঠন, কিবেক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী রাঙ্গামাটি, নানিয়া চর সঙ্গীত একাডেমি , শব্দ সড়ক, ক্বণিত, উদিরণ, কল্পন, শব্দাঙ্গন, আবৃত্তি একাডেমি আবৃত্তি চর্চার সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠে।
যদিও সংগঠনগতভাবে আবৃত্তি শিল্পের বিকাশ দেরিতে হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ৩০ এর অধিক সংগঠন আবত্তি শিল্পের চর্চা করে চলেছে। যারা বিভিন্ন আন্দোলনে নিজেদের সংযোগ রাখা ছাড়াও ৩-৪ দিন ধরে আবৃত্তি উৎসব করার সামর্থ্য রাখে। যা অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরল। তাছাড়াও চট্টগ্রামে বিভিন্ন মিডিয়া ও সংবাদপত্র, বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র ও বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রে আবৃত্তি শিল্পীদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি দেখা যায়।
প্রায় বছর কুড়ি আগে চট্টগ্রামের প্রগতিশীল আবৃত্তি সংগঠনগুলোর আঞ্চলিক মোর্চা সম্মিলিত আবৃত্তি জোট এ শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। পাশাপাশি ২০০৬ সালে চট্টগ্রামে ৪ দিনব্যাপী জাতীয় আবৃত্তি উৎসব ও পরবর্তীতে একাধিকবার আঞ্চলিক আবৃত্তি উৎসব ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে চট্টগ্রামের আবৃত্তিচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ।
চট্টগ্রামে আবৃত্তিচর্চার প্রসারতার ক্ষেত্রে তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- জেলা শিল্পকলা একাডেমি, জেলা শিশু একাডেমি ও বাংলাদেশ টেলিভিশন। জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমি দুই বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্স চালু করে আবৃত্তি চর্চাকে আরও বেগবান করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার প্রায় নিয়মিত আবৃত্তির অনুষ্ঠান ধারণ ও প্রচার করে এ শিল্পের প্রসারতায় অনবদ্য ভূমিকা রাখছে।
চট্টগ্রামে বর্তমানে মঞ্চে নিয়মিত আবৃত্তি চর্চা করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অঞ্চল চৌধুরী, রাশেদ হাসান, ফারুক তাহের, দেবাশিস রুদ্র, মো. মোজাহিদুল ইসলাম, প্রবীর পাল, প্রণব চৌধুরী প্রমুখ।
অন্যদিকে, নারী আবৃত্তিশিল্পীদের মধ্যে আবৃত্তি চর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন মিলি চৌধুরী, আয়েশা হক শিমু, কংকন দাশ, শারমিন মৃত্তিকা, শ্রাবণী দাশ গুপ্তা, সেজুতি দে, শামীমা শিলা, সুপ্রিয়া চৌধুরী প্রমুখ।

x