শীর্ষ খবর পিঁয়াজ ও নেতাকাহন

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ
14

হচ্ছেটা কী দেশে! পরপর দুটো ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা মাত্র দু’ তিন দিনের ব্যবধানে! কসবা দুর্ঘটনায় ঢাকাগামী তূর্ণা নিশিতার সিগনাল অমান্য করে প্রচন্ড গতিতে সরাসরি গুতো মারে সিলেটগামী উদয়ন এঙপ্রেসের লেজের বেশ কটি বগিতে। এতে তাৎক্ষণিক প্রাণ গেল ১৬ জনের। যাদের অনেকেই শিশু ও নারী। গুরুতর আহতের সংখ্যাও প্রচুর। এদের অনেককে কষ্টকর মৃত্যু অথবা স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হয়ে বাকি জীবনে দুর্বিষহ পথ পাড়ি দিতে হবে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া দুর্ঘটনায় প্রাণহানির শোক পরিবার ও জাতিকে বহন করতে না হলেও রংপুর এঙপ্রেসের মত আধুনিক নতুন ইন্‌িজনসহ সাতটি বগি লাইনচ্যূত হয়ে আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। আহত হয়েছেন ২৫ জন। কেন এবং ঠিক কী কারণে বিশ্বের সবচে’ নিরাপদ ও আরামদায়ক বাহন রেল ব্যবস্থাকে বারবার দুর্ঘটনায় পড়তে হচ্ছে, তা এবার সঠিকভাবে চিহ্নিত করে যথাযথ চিকিৎসা দেয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। রেল যোগাযোগ উন্নত করতে সরকারি উদ্যোগগুলো সফল বাস্তবায়নে এটা অপরিহার্য পূর্বশর্ত। স্বল্প খরচে রেল পরিবহনে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও বড় উপকারভোগী হয় উন্নত ও নিরাপদ রেল ব্যবস্থায়।
অন্যদিকে পুরো জাতি পিঁয়াজ নামের পণ্যটির ভয়ঙ্কর লাফঝাপে অস্থির। ২৫/৩০ টাকা দামের পিঁয়াজ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২৫০/- টাকা কে জি দামে বিক্রি হচ্ছে! এটা স্মরণকালের অবিশ্বাস্য মূল্যবৃদ্ধি! আবার ঘৃর্ণিঝড় বুলবুল উপকূলে আঘাত হানার পর চাল, চিনি, ভোজ্যতেল, আটার দামও কেজি/ লিটারে ৫/৬ টাকা বেড়ে গেছে। এটা ভুক্তভোগী নিম্ন মধ্যবিত্ত আর প্রান্তিক আয়ের মানুষের কাটা ঘায়ে নুন ঘষে দেয়ার মতো! প্রধানমন্ত্রী পিঁয়াজ ব্যবহারে সংযম এবং নিজেও রান্নায় পিঁয়াজ ব্যবহার না করার ঘোষণা দেন। ঘোষণার সময় পিঁয়াজের দাম ১০০/১২০ টাকায় উঠানামায় ছিল। পরে বাড়তে বাড়তে ২৫০ টাকা কেজি! এটা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি পিঁয়াজ বা মজুদদার সিন্ডিকেটের সরাসরি চ্যালেঞ্জ কিনা, খতিয়ে দেখার দায় সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার। বানিজ্য মন্ত্রী টিপু মুন্সিও একজন বড় ব্যবসায়ী। ভারত পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর এক বা সোয়া মাস আগেই তিনি পিঁয়াজ আমদানি উম্মুক্ত করে দেন। বড় কর্পোরেট গ্রুপগুলোকে পিঁয়াজ আমদানি করার সুযোগ দেন। এরপর মিয়ানমার, চীন, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, উজবেকিস্তানসহ বিকল্প দেশ থেকে পিঁয়াজ আমদানির দরপত্র খোলার খবর আসে মিডিয়ায়। পাশাপাশি টেকনাফ স্থল বন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে পিঁয়াজ আসতে থাকে। কিন্তু আখেরে ফলাফল শূন্য। মাসের মধ্যে পিঁয়াজের দাম সর্বকালের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলে। আবার খাতুনগনজের কিছু বড় ব্যবসায়ী গুদামের মজুদ পঁচে যাওয়ায় প্রচুর পিঁয়াজ ফেলে দিচ্ছে কর্ণফুলী পারসহ নানা জায়গায়! বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তা দেখানো হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, পিঁয়াজসহ নিত্য পণ্যের দাম ‘গড়াপেটা’য় মাফিয়া সিন্ডিকেটই আসল খেলোয়াড়! পিঁয়াজ দুর্লভ হলেতো দোকানেই থাকতোনা। এখন আছে-বেচাকেনা হচ্ছে ১৫ গুণ বেশি দামে! ইউরোপ আমেরিকায় পিঁয়াজ বাংলাদেশী মুদ্রার হিসাবে ১৫/ ২৫ টাকা হলে এখানে কেন ২৫০ টাকা? হাজার মেঃ টন মজুদ পিঁয়াজের মাঝে ৬০০/৭০০ টন পঁচে গেলেও মজুদদারের লাভ ৪ গুণ বেশি! এটাতো সরাসরি অন্তর্ঘাত! জন অসন্তোষ তৈরির হাতিয়ার হচ্ছে পিঁয়াজসহ কিছু নিত্য পণ্য! সোসাল মিডিয়াজুড়ে এখন শুধু পিঁয়াজ আর পিঁয়াজ। ট্রল আর নিত্য নতুন সৃজনশীলতার অপূর্ব নমুনা এখানে ভাসছে! এটা ঠিক, পিঁয়াজের বিকল্প পিঁয়াজ ডগা ও ফুল এখন কাঁচা বাজারে প্রচুর। দামও সহনীয়। কিন্তু সোসাল মিডিয়া এ্যকটিভিষ্টরা এসবে মনোযোগ দেন না। তারা পিঁয়াজসহ বাড়তি দামের পণ্য নিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করছে ব্যপকভাবে।
আবার সরকারি দলের রাজনীতিকরা সমস্যার গভীরে না গিয়ে বিএনপি নিয়ে বেশি ব্যাস্ত। বিএনপি নেতারা একে একে দল ছাড়ছেন- আরো ছাড়বেন, এটাই বড় খবর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ আরো কিছু দায়িত্বশীল নেতার কাছে। কাদের সাহেব বারবার ফোড়ন কেটে আফসোস করেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার মতো কোন আন্দোলন বিএনপি করতে পারেনি। বিএনপি ব্যার্থ দল, মির্জা ফখরুল ব্যার্থ নেতা! আন্দোলনের শক্তি বিএনপি’র আদৌ নেই! এটা এক ধরনের এ্যলার্জি নয় কী! বিএনপি কী করছে না করছে, তাতো মানুষ ভালই জানে, এ’নিয়ে সরকারি দলের শীর্ষ একজন দায়িত্বশীলের খোঁচাখুঁচি করা মানে বিএনপিকে নয়, পিঁয়াজকান্ডসহ নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা ও নৈমিত্তিক টানাপোড়েনে বিব্রত সাধারণ মানুষকে উত্যক্ত করা। এটা বোঝার মত প্রজ্ঞার অভাব হলে ক্ষতিটা কার? বিএনপি’র রাজনীতি খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক জিয়ার স্কাইপ নির্দেশনা, পল্টন অফিস, জাতীয় প্রেসক্লাব, জিয়ার মাজার ও টিভি টকশো’তেই আটকে আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যাতো বিপুল। সরকারি দলের কিছু নেতা, অনুগামী ও অনুপ্রবেশকারীদের লাগামহীন অপকর্ম, দুর্নীতি, লুন্ঠন ও অবিশ্বাস্য সম্পদস্ফীতির কারণে সংখ্যাটা আরো বাড়ছে। যোগ্য বিকল্পের অভাবে আওয়ামী বিরোধীরা ক্ষয়িষ্ণু বিএনপিতেই আস্থা রাখছে। দেয়ালের পরিস্কার এই লিখন, টানা ১১ বছর ধরে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের নেতারা যদি পড়তে না পারেন, দায় তাদেরই শোধ করতে হবে। শুধু সরকারি দল নয়, তাদের কারণে সৃষ্ট যে কোন অপঘাত-অঘটনের দায়ও পুরো জাতিকেই বহন করতে হবে। সরকারি দলের নেতারা এই অপ্রিয় সত্য, দ্রুত মগজে ধারণ করলে তাদের যেমন লাভ, তেমনি দেশ ও জাতিরও।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একলাই দল ও সরকারকে শুদ্ধ করার কঠিন মিশনে হাত দিয়েছেন। কাজটি ঘর থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ করেছেন তিনি। দলীয় সম্পাদকসহ সবাই তাঁর শুদ্ধিকরণ অভিযান বা মিশন সম্পর্কে আঁধারে! কেন এবং কী অবস্থায় একজন শীর্ষ নেত্রীকে এতো কঠিন গোপনীয়তায় একলা দুর্গম পথে এগুতে হয়, তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বেশি করে জানার কথা। তাই অন্য দলের ঘাঁড়ে আবর্জনা না ছুঁড়ে আগে নিজের ঘাঁড় পরিস্কার আছে কিনা যাচাই করে দেখা এখন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রী ও দলের শীর্ষ নেত্রীর শুদ্ধি অভিযান থামিয়ে দিতে বা বেপথু করতে দল বা সরকারি পরিচয়ে অন্যায় সুবিধা হাতানো কোন কোন মহল ষড়যন্ত্রের গুটি চালাচালি করতে পারেন, এটা মাথায় রেখে শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চয়ই করণীয় ঠিক করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাতো নিজে ঘোষণাই দিয়েছেন, দেশ ও মানুষের জন্য বাবার মতো জীবন দিতে তিনি একটুও ভীত নন।

x