শীতের আগমনে খেজুর গাছ

পরিচর্যায় ব্যস্ত গাছিরা

অপু ইব্রাহিম ,সন্দ্বীপ

সোমবার , ২৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

প্রভাতে শিশির ভেজা ঘাস আর ঘন কুয়াশার চাদর, শীতের আগমনের বার্তা জানান দিচ্ছে। মৌসুমী খেজুরের রস দিয়েই গ্রামীণ জনপদে শুরু হয় শীতের আমেজ। শীত যত বাড়বে খেজুর রসের মিষ্টিও তত বাড়বে। শীতের দিনের সবচেয়ে আকর্ষণ দিনের শুরুতে খেজুরের রস ও সুস্বাদু গুড়-পাটালি। আর সুস্বাদু পিঠা, পায়েস তৈরীতে আবহমান কাল থেকে খেজুর রস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের প্রাচীন জনপদ সন্দ্বীপে খেজুর রসের সে আমেজ আর নেই। শীত আসতে না আসতেই সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছে। শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে খেজুর গাছ কাটার প্রতিযোগীতা পড়ে যায় গাছিদের মধ্যে। তাই খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে গাছিরা। খেজুর গাছ থেকে রস বের করার জন্য গাছিরা ইতোমধ্যে শুরু করছে প্রাথমিক পরিচর্যা। স্থানীয় ভাষায় এটাকে গাছছোলা বলা হয়ে থাকে। ছোলা গাছে এক সপ্তাহ পরেই আবার চাষ দিয়ে নল লাগানো হবে। খেজুর গাছে তিন স্তরে কাজ করার পর রস সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিক পরিচর্যারত গাছ থেকে আর কিছুদিন পরেই খেজুর রস পাওয়া যাবে। ওই সময় খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহকারী গাছিদের প্রাণ ভরে উঠবে আনন্দে। যদিও আগের মত খেজুর গাছ না থাকায় এখন আর নেই সেই রমরমা অবস্থা। খেজুরের গুড় থেকে এক সময় বাদামি চিনিও তৈরি করা হতো। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর মাত্র কয়েক দিন পরেই শুরু হবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক খেজুর গাছকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ। এক সময় গ্রাম্য জনপদের সাধারণ মানুষ শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে ঠান্ডা খেজুর রস না খেলে যেন দিনটাই মাটি হয়ে যেতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে সন্দ্বীপের খেজুর গাছ। এক সময় দিগন্তজুড়ে মাঠ কিংবা সড়কের দু’পাশে সারি সারি অসংখ্য খেজুর গাছ চোখে পড়ত। শীতের দিনে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন গাছিরা। খেজুরের রস বিক্রি করে সংসার চালাতেন অনেকেই। কিন্তু এখন আর আগের অবস্থা নেই। দিনে দিনে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সড়কের দুই ধারে আগের মতো খেজুর গাছ আর দেখা যায় না। জানা গেছে, রেন্ট্রি, আকাশি, কড়াই ও মেহেগনি গাছসহ বনজ গাছ বেশি করে লাগানোর ফলে দিন দিন খেজুর গাছ কমে যাচ্ছে। এসব গাছের ছায়ায় খেজুর গাছ মরে যায়।
মুছাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন শাহীন বলেন, কয়েক বছর আগেও এই অঞ্চলে ব্যাপক খেজুর গাছ দেখা যেত। আমাদেরই প্রায় অর্ধশত খেজুর গাছ ছিল। একটি খেজুর গাছে ১ হাড়ি রস হত প্রতিদিন। কিন্তু এখন খেজুর গাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে । এখন আমাদের ১০ থেকে ১২টি খেজুর গাছ আছে। গাছ মরে যাওয়ার পর নতুন গাছ লাগানোর উদ্যোগ আর নেয়া হয়নি।
এই মৌসুমে খেজুর রসের পর্যাপ্ত চাহিদা রয়েছে। তবে সেই তুলনায় জোগান সীমিত। গাছিদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, অগ্রহায়ণ মাসের শেষের দিকে খেজুর গাছ কাটা শুরু হয়। আর মাঘ মাসের শেষ পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা হয়। একটি খেজুর গাছ সপ্তাহে চার দিন কাটা যায়। বাকি তিন দিন বিশ্রাম দিতে হয়। গাছিরা মাটির তৈরি হাড়িতে করে রস সংগ্রহ করেন। প্রতি হাড়ি খেজুরের রস ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়।
মাইটভাঙা গ্রামের গাছি মোঃ আলমগীর বলেন, আমি প্রতিদিন ৩০টি গাছ কাটি। তাতে ১২ থেকে ১৫ হাড়ি রস পাই। প্রতি হাড়ি রস ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করি। শীত মৌসুমে এই আয় দিয়েই আমার সংসার চলে। রসের অনেক চাহিদা আছে। আমরা সেই অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারি না। আগের মত খেজুর গাছও নেই, তাই রসও অনেক কম হয়। নতুন করে খেজুর গাছ লাগানো দরকার।
কৃষকনেতা সফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, খোলা আকাশের নিচে পরিষ্কার উঁচু জমিতে খেজুর গাছ চাষের জন্য উপযোগী। বিভিন্ন গাছের ছায়া পড়ার কারণে খেজুর গাছ মরে যায়। একটি গাছ লাগানোর ৭/৮ বছরের মধ্যে রস পাওয়া যায়। খেজুর গাছ চাষের ব্যাপারে কৃষকদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ জরুরি।

x