শীতকালীন সাধারণ রোগমালা

ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ
54

বৈচিত্র্যময় ষড়ঋতুর লীলাভুমি আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। এর মধ্যে শীতকাল অনেকের প্রিয়ঋতু। শীতকালীন সবজি আর খেজুরের রস ভোজন বিলাসিদের আরাম দেয়। এ সময় গ্রীষ্মের অতিরিক্ত গরম আর বর্ষার পানি বাহীত রোগগুলী থেকে মানুষ মুক্তি পায়। তবে শীতের উত্তরায়নের বাতাসে কিছু জীবানু আনাগোনা হয় আর এসবের প্রভাবে শীতকালে মানুষ কষ্ট পায়।
শীতের সময়, পরিবেশ শীতল হওয়ার সাথে সাথে শরীরের তাপ ও সাধারণত কম অনুভুত হয়। একই সঙ্গে, শরীর নতুন জলবায়ুর সাথে অভিযোজিত হবার চেষ্টা করে। ফলস্বরূপ, শীতে কিছু নতুন রোগের প্রকোপ হয়। কিছু লোক এই সাধারণ রোগগুলিতে বেশি সংক্রামিত হলেও সতর্ক থাকলে তা এড়ানো যেতে পারে।
সর্দি এবং ফ্লু

প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে, এই সর্দি আর ফ্লু ঠান্ডা আর শীতের কারণে হয়। এগুলি ভাইরাস বাহিত আর শীতের শুষ্কতা আর কম আদ্রতা এসব ভাইরাস মানুষের দেহে সংক্রমণকে সহজ করে। বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদি ভাইরাস বাহিত ফ্লুগুলি কখনো কখনো এসময় মারাত্মক আকার ধারণ করে আরা অনেক মানুষ এতে আক্রান্ত হয় আর তাদের জীবন সংশয় ও হতে পারে। শীতকালে যখন তাপমাত্রা হ্রাস শুরু হয়, তখন শরীর স্বাভাবিকভাবেই তার স্বাভাবিক তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাই বিভিন্ন উষ্ণ কাপড়ের সাহায্যে দেহ ঢেকে রাখা হলে তা আপনার দেহকে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করবে আর এসব ফ্লু থেকে রক্ষা করবে।
কাশি ও শ্বাসকষ্ট

শীতের ধুলোবালি, শুষ্কতা এবং শীতল বাতাস সবই কাশি আর শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দেয়। যাদের কোল্ড এলার্জি আছে তাদের আগে থেকে সাবধান থাকতে হবে আর যাদের প্রতি বছর শীতে এজমার লক্ষণ প্রকাশ পায় তাদের এজমার ওষুধ সাথে রাখতে হবে। মোটর সাইকেল বা বাইসাইকেল ইত্যাদি দুচাকার গাড়ি চালানোর সময় সর্বদা হেলমেট পরুন বা ধুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করতে স্কার্ফ ব্যবহার করুন। ধূমপানজনীত শ্বাস কষ্ট বাড়তে পারে আর তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে ধুম পান ত্যাগ করতে হবে।
ত্বকের চুলকানি

সংবেদনশীল ত্বক বা এলার্জি শীতের সময় চুলকানির জন্ম দেয়। ছত্রাকের সংক্রমণ, স্ক্যাবিস ইত্যাদির প্রকোপ শীতে বৃদ্ধি পায়। তাই শীতে ত্বকের যত্ন নিতে হবে। কম আর্দ্রতার সাথে শীতল তাপমাত্রায় ত্বকের আর্দ্রতা বৃদ্ধিকারক মালিশ ব্যাবহার করতে হবে।
মাথা ব্যথা

শীতল বাতাস কখনও কখনও আপনার মাথাব্যাথার কারণ হতে পারে। কখনো কখনো কেউ যদি মাথাব্যাথা, জ্বর, বমি আর বেহুশ অবস্থায় পতিত হয় যা মস্তিস্কে প্রদাহজনিত কারণে হতে পারে। এরুপ ভাইরাল মেনিঞ্জাইটিস, এন্সেফালাইটিস ইত্যাদির প্রকোপ শীতে বেড়ে যায়। আবার সাইনাসে ইনফেকসান হয়েও মাথাব্যাথা হতে পারে। সুতরাং, একটি উষ্ণ মাফলার বা স্কার্ফ দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখুন। আপনি যদি দু-চাকার গাড়ি চালান, শীতকালে অবিরাম মাথা ব্যথা থেকে দূরে থাকতে চাইলে একটি ভাল হেলমেট এবং মাফলার বিনিয়োগ করুন।
শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা

শীতের মৌসুমে বায়ুর অণুগুলি পাতলা হয়ে যায় এবং আরও শুস্ক থাকে। ফলস্বরূপ, হাঁপানি বা সিওপিডি-র মতো শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিস্থিতিতে ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের চরম শীতের তাপমাত্রায় ক্রমশ শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে। এই প্রভাব থেকে নিজেক বাচাতে হলে, উষ্ণ পোশাক পড়তে হবে আর হাঁপানি বা সিওপিডির ঔষধ সাথে রাখতে হবে।
হার্ট অ্যাটাক

আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই এই বিষয়টি সম্পর্কে অসচেতন যে শীতকাল হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান মৌসুম। তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সাথে সাথে ধমনীগুলি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং হৃদপিণ্ডের রক্ত পাম্প করা শক্ত করে তোলে।
সাধারণত শীত কালে রাতের শেষ ভাগে এরূপ হার্ট এটাক বেশী হয়। বয়স্ক লোক শীতের রাতের শেষ ভাগে যদি হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করে বা তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তাহলে তাকে দেরী না করে হাস্পাতালে নিয়ে যেতে হবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, ৩০ বছরের বেশি বয়সের লোকদের শীতের মৌসুমে বেশি পরিশ্রম এড়ানো উচিত। এছাড়াও শীতের সময় খাবার অতিরিক্ত খাওয়া অনুচিত।
সাইনোসাইটিস

নাক জ্যাম থাকা, মাথাব্যথা, কাশি, নাকের থেকে অনবরত সর্দি ঝরা ইত্যাদি শীতের সময় মানুষকে অনেক কষ্ট দেয়। ঘর বন্ধ থাকলে এবং সঠিক বায়ুচলাচল না হলে অনেকের সাইনাসের সমস্যা দেখা দেয়। এই মওসুমে সাইনোসাইটিস থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে, স্বাস্থ্যকর খাবার থেতে হবে, প্রচুর পরিমাণে তরল পান করুন এবং ধুলাবালি এড়িয়ে চলতে হবে।
শীতকাল মজা করা আর উদযাপনের মওসুম। নিজেকে এমন কোনও রোগের দ্বারা হতাশ করবেন না যা আপনাকে এই আনন্দগুলি থেকে বিরত রাখে। কিছু সতর্কতা এই মৌসুমে সর্বাধিক উপকার আসতে পারে আর এসব রোগ থেকে আপনাকে দূরে রাখতে পারে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক- মেডিসিন বিভাগ
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ

x