শিশুর ভাষা সমস্যা নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডাঃ প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৯ at ৪:২১ পূর্বাহ্ণ
50

রোগ শোকের কারণে একটি স্বাভাবিক শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি যেমন হঠাৎ করে থেমে যেতে পারে তেমনিভাবে বিভিন্ন স্নায়ুজাত ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে একটি শিশুর ‘ভাষা বিকাশ’ পর্বটি পরিপূর্ণ নাও হতে পারে অথবা তার বিকশিত ভাষা দক্ষতাটি হারিয়েও যেতে পারে। আজকের পৃথিবীতে ‘ভাষা সমস্যা’ এক অনিবার্য বাস্তবতা। পৃথিবীর সব সমাজেই ভাষা সমস্যায় আক্রান্ত শিশু পাওয়া যায়। ভাষা সমস্যা শুধু বর্তমান সময়ের সমস্যা নয়। বরং সব যুগেই এর অস্তিত্ব ছিল। যেহেতু ভাষা সমস্যা বিষয়টি সম্পর্কে মানুষ তখন তেমনভাবে সচেতন ছিল না, সেহেতু এ ধরনের সমস্যা নিয়ে তাদের ভাবনার তেমন একটা অবকাশও ছিল না। তার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, তখন ভাষা সমস্যা ছাড়াও আরও অনেক তীব্রও দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক সমস্যাদি বর্তমান ছিল, যার দরুন সে সময়ের মানুষ এই সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকার তেমন কোন প্রয়োজনীয়তা বোধ করত না। সাধারণতভাবে ‘ভাষা সমস্যা’ অভিধাটি ইঙ্গিত করে এমন একটি ভাষিক অবস্থা যার ফলে তার স্বাভাবিক ভাষাগত উপাদানসমূহের বিকাশ বা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। শিশুর ভাষাগত সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু উপসর্গের দ্বারা প্রকাশ ঘটে। এর মধ্যে অন্যতম উপসর্গ হলো শিশুর মানসিক এবং আবেগগত বহিঃপ্রকাশের সমস্যা। এই ধরনের সমস্যার সুদৃর প্রসারী প্রভাব তার নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা থেকে শুরু করে সামাজিক দক্ষতা বা বুদ্ধি দীপ্ততার সার্বিক বিচ্যুতি বিকার পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শিশুর ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা : শিশুর ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতার দুটি মাত্রা আছে, একটি হচ্ছে ভাষা বিলম্ব এবং অন্যটি হচ্ছে ভাষা বৈকল্য। এই দুটিকে ভাষা সমস্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। যদিও ভাষা সমস্যা বিষয়ে এ ধরনের পার্থক্য সবসময় পরিষ্কার নয় তথাপি এ দুটির সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো-
ভাষা বিলম্ব : ভাষা বিলম্ব হচ্ছে ভাষা বিকাশের এমন একটি অবস্থা যাতে শিশুর ভাষাগত উপাদানসমূহ যেমন ঃ ধ্বনি, অক্ষর, শব্দ, বাক্য ইত্যাদি উপাদানসমূহের দেরিতে বিকাশ ঘটে। এ ধরনের ভাষা বিলম্ব যদিও গুরুতর ভাষা সমস্যা হিসেবে অ্যাখায়িত করা হয় না, তথাপি কোনো শিশুর মধ্যে যদি ভাষা বিলম্বের উপসর্গ পরিলক্ষিত হয় তাহলে দেরি না করে যেকোনো মানসিক এবং ভাষা বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া বাঞ্চনীয়।
ভাষা বৈকল্য : ভাষা বৈকল্য হচ্ছে ভাষা অনুধাবন এবং ব্যবহার। বিশেষ করে বাচনিক এবং অবাচনিক এ সংক্রান্ত প্রতীকি চিহ্নসমূহের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকারগ্রস্থ একটি বিশেষ অবস্থা। শিশুর ভাষা বৈকল্য সাধারণত তার মস্তিষ্কের কোনো না কোনো অসম্পূর্ণতা বা ক্ষতির কারণে হয়ে থাকে। তবে শিশুর মস্তিস্কের ক্ষতি বা প্রদাহ যদি তার স্বাভাবিক ভাষা বিকাশের পরে হয় এবং এ কারণে ভাষা সমস্যা দেখা দেয়, তখন এ ধরনের ভাষা বৈকল্যকে অর্জিত ভাষা বৈকল্য বলা হয়। আর মস্তিষ্কের অসম্পূর্ণতা বা অদৃশ্য ক্ষতি যদি শিশু তার জন্মের সময় নিয়ে আসে এবং তার ফলে শিশুর ভাষা সমস্যা দেখা যায়, তখন তাকে বর্ধনমূলক ভাষা বৈকল্য বলা হয়। উপরে উল্লেখিত মাত্রা দুটি “ভাষা সমস্যার” সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
ভাষা সমস্যার কারণ : নিম্নে কারণগুলোকে বিষয়ভিত্তিক আকারে সাজিয়ে প্রকাশ করা হলো।
বংশগত বা জন্মকালীন কারণ

১. বংশগত বৈকল্য, ২. বাবা মা থেকে প্রাপ্ত জটিলতা, ৩. অপরিপক্ষ জন্ম।
চিকিৎসা বিজ্ঞানগত কারণ
১. শ্রবণ সমস্যা, ২. গেলার ক্ষেত্রে সমস্যা, ৩. ক্লেপ্ট পেলেট, ৪. অর্টিজম বর্ণলী বৈকল্য, ৫. দীর্ঘকালীন শারীরিক সমস্যা, ৬. শিসাজনিত বিষ সংক্রমণ।
পারিবারিক ও পরিবেশগত কারণ
১. শ্রবণ-বাচন বা ভাষা সমস্যার পারিবারিক ঐতিহ্য।
২. পিতা-মাতার শ্রবণগত বা জ্ঞানমূলক সীমাবদ্ধতা।
৩. পালক পিতা-মাতা কর্তৃক অবহেলিত শিশু।
৪. পরিবারের ভুল চিকিৎসার ইতিহাস।
উপরোক্ত কোনো কারণে যদি শিশু ‘ভাষা সমস্যায়’ আক্রান্ত হয় তাহলে আক্রান্ত শিশু এমন কিছু উপসর্গটি প্রদর্শন করে যা দেখে শিশুটি যে ভাষা সমস্যাগ্রস্থ, তা সহজেই শনাক্ত করা যায়। আপনার শিশুটি ভাষা সমস্যা আক্রান্ত কিনা, তা প্রধান কিছু উপসর্গ দিয়ে সহজেই শনাক্ত করতে পারবেন।
ইহার লক্ষণ বা উপসর্গ
১. মানসিক এবং আবেগগত বহিঃপ্রকাশের সমস্যা।
২. সরাসরি বক্তার দিকে মুখ তুলে চোখে চোখে না তাকানো।
৩. ভাষা অনুধাবনের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ঘাটতি।
৪. শিশুর আয়ত্তকৃত শব্দের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বিশেষ করে, ‘যাই, করি, খাই’ ইত্যাদি পরিচিত ক্রিয়াপদ ব্যতীত বৈচিত্র্যময় ক্রিয়াপদের সংখ্যা নেই বললেই চলে।
৫. সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা।
৬. সমবয়সীদের সাথে অন্তরঙ্গ হতে সমস্যা।
৭. কিছু স্বরের পুনঃপুনঃ অনুকরণ।
৮. প্রতীকি খেলা খেলতে অসামথ্য।
উদ্বেগজনক লক্ষণ

একটি স্বাভাবিক শিশুর ৪-৫ বছরের মধ্যে মৌলিক ভাষা সমন্বয় ভিত্তি গঠিত হয়ে যায়, তবে আয়ত্তকরণ শব্দাবলীর প্রক্রিয়াটি পুর্নবয়স্ক হওয়ার পরও চলতে থাকে। কেন না আমরা ওই সময়কালে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত ধারণা ও বিষয়ের সাথে পরিচিত হই সেগুলো ক্রমাগত আমাদের শব্দ সম্ভারকে সমৃদ্ধ করতে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, যদি কোনো শিশু ৪-৫ বছরের মধ্যে দৈনিক ৫-১০টি শব্দ দিয়ে পরিবেশ এবং প্রতিবেশ অনুযায়ী মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারে তাহলে তা আশংকাজনক বা উদ্বেগজনক লক্ষণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান

শিশুর মোটর ডেভেলপমেন্ট, ল্যাঙ্গোয়েজ ডেভেলপমেন্ট, স্যোসাল ডেভেলপমেন্ট যদি স্বাভাবিক হয়, তবে ভয় পাবেন না। তাদের খুবই কথা বলার ক্ষমতা এসে যাবে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন ৪ বৎসর বয়স পর্যন্ত কথা বলতে পারতেন না। ইহার বিশিষ্ট জন্মগত প্রবণতা আছে। গর্ভাবস্থায় মাকে ধাতুগত দোষ বিনাসের ওষুধ সেবনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জন্মের পর শিশুকে ধারাবাহিকভাবে ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। বিজ্ঞানী চিকিৎসক হ্যানেম্যান গর্ভাবস্থায় এন্টিসোরিক ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে এর জটিলতা নিরসনের উপদেশ দিয়েছেন। নিম্নলিখিত ওষুধ লক্ষণ ভেদে ব্যবহৃত হয়। যথা- ১. ক্যালকেরিয়া ফস, ২. ক্যালকেরিয়া কার্ব, ৩. ক্যালিফস, ৪. এনাকার্ডিয়াম, ৫. ফেরাম ফস, ৬. ফেরাম মেটালিকাম, ৭. আয়োডিয়াম, ৮. থুজা, ৯. মার্কুরিয়াস, ১০. সিফিলিনাম, ১১. মেডোরিনামসহ আরো অনেক ফলদায়ক ওষুধ আছে। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x