শিল্পে সঁপেছি শরীর

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৫১ পূর্বাহ্ণ

দ্বিতীয় পর্ব
[কয়েক সংখ্যা আগে, মারিনা আব্রামোভিচের প্রদর্শনী বিষয়ক একই শিরোনামের একটি লেখায় বলেছিলাম, তাঁকে নিয়ে আবারও কিছু কথা জড়ো করে খোলা হাওয়ার পাতায় তুলে রাখব। আজ রইল দ্বিতীয় পর্ব। যারা আজই মারিনাকে পড়ছেন, তাদের জন্য একটি ছোট্ট পরিচিতি এখানে সংযুক্ত করছি। বিশ্ব বিখ্যাত পারফর্মিং আর্টিস্ট মারিনা আব্রামোভিচের জন্ম যুগোশ্লাভিয়ার বেলগ্রেড শহরে ১৯৪৬ সালে। মা ডনিকা রোজিক, বাবা ভজিন আব্রামোভিচ। হাইস্কুল শেষে মারিনা ভর্তি হন বেলগ্রেডের একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ, পরে ক্রোয়েশিয়ার একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ। পেশাজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। কাজ করেন প্যারিসের আকাদেমি দে বিউজ-আর্টস এবং বার্লিন ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্টস-এর মতো প্রতিষ্ঠানে। পেয়েছেন অসংখ্য পদক আর সম্মাননা। উল্লেখযোগ্যগুলো হলো ১৯৯৭ সালের ভেনিস বিয়েনালে গোল্ডেন লায়ন, ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ডান্স এন্ড পারফর্মেন্স এওয়ার্ড, সম্মানসূচক ডক্টরেট অব আর্টস পেয়েছেন ‘ইউনিভার্সিটি অব প্লে মাউথ, যুক্তরাজ্য’ এবং ‘ইন্সটিটিউতো দে সুপিরিয়া দে আর্ট’ ইত্যাদি। পারফর্মিং আর্ট জগতের লোকেরা ভালবেসে তাকে ‘গ্র্যান্ড মাদার অব পারফর্মিং আর্ট’ নামে ডাকেন।]
১৯৭৩ সালের গোড়ার দিকের কথা। পারফর্মিং আর্টে নিরীক্ষাধর্মী কাজের শুরুর সময়। মারিনা আব্রামোভিচ তার প্রথম প্রদশর্নীর জন্য প্রস্তুত। এক সাক্ষাৎকারে বলেছেনও সেই সময়কার কথা। জানিয়েছেন, ‘রিদম টেন সিরিজের প্রথম প্রদর্শনীর আগের কয়েক রাত আমার নির্ঘুম কেটেছে। ওজনও হয়তো দুয়েক কিলো কমে গেছিলো দুশ্চিন্তায়। কারণ যা ঘটাতে যাচ্ছি তা যদি ঠিকঠাক কাজ না করে তাহলে নগদে কিছু ক্ষতি আমার পাওনা!’ কেমন সেই প্রদর্শনী? পাঠক, সার্কাসের তাঁবুতে অনেকে দেখেছেন ছুরি ছুড়ে মারার ভয়ংকর খেলাটি। বা কোনো চলচ্চিত্রে হয়তো দেখেছেন। মারিনা তাতে যোগ করলেন জটিল নীরিক্ষা। একটা টেপ রেকর্ডার চালু থাকবে প্রদর্শনস্থলে। মারিনা দাঁড়াবেন কাঠের পাল্লায় পিঠ ঠেকিয়ে, একে একে বিশটি ছোরা ছুটে আসবে তার ছড়ানো দুই পাঞ্জার আঙুলের ফাঁকে। এর মধ্যে নিশ্চয় কোনো কোনো ছোরা তার শরীরে আঘাত করবে, কেটে দেবে আঙুল! এক রাউন্ড ছোরা ছোড়া শেষ হলে, তিনি রেকর্ডারটি বাজিয়ে শুনবেন, শব্দ শুনে বোঝার চেষ্টা করবেন ভুল-চুক কোথায় হলো। তারপর আবারও সেই ভুল শোধরানোর জন্য খেলাটি শুরু করবেন। এবং দেখা যাবে বারবার করার ফলে এক সময় আঘাত লাগার হার কমে এসেছে। মোটা দাগে এডিনবার্গের সেই প্রদর্শনীর চিত্র। কিন্তু এতে করে মারিনা ঠিক কী বুঝে নিতে চাইছিলেন? প্রথম কথা হলো শরীরের মানসিক এবং দৈহিক যে সীমাবদ্ধতা, তার শুলুক সন্ধানের চেষ্টা। পাশাপাশি ছুরিকাঘাতের হাত ধ’রে আঘাত বা পাশবিকতার প্রাথমিক ধ্বনি এবং তা বদলে যাওয়ার ইতিহাস কিংবা পুনরাবৃত্তির বেদনা, এসবই ধরতে চেয়েছিলেন তিনি। তিনি জানান, ‘আপনি যখন সমস্ত শরীর-মন দিয়ে এই প্রক্রিয়ায় ঢুকে যাবেন, দেখবেন আপনার শরীর এমন এমন বাঁক নিচ্ছে, এমনভাবে সরে আসছে যা আপনি স্বাভাবিক অবস্থায় কোনোদিনই করতে পারতেন না।’
এবার বলি তার ১৯৯৫ সালে করা ক্লিনিং দ্য মিরর সিরিজের কথা। রিদম সিরিজ থেকে একদমই আলাদা এই প্রদর্শনী। তবে আমজনতার জন্যে বরাবরের মতোই বিদঘুটে! প্রদর্শনীটা এরকম, আব্রামোভিচ একটা বড় ঘরে মানুষের কঙ্কাল কোলে নিয়ে বসবেন। কংকালটি বহু বছরের পুরনো, খুলিতে-হাড়ে ময়লার কালশিটে দাগ। তিনি ব্রাশ হাতে সেই কংকালের নির্দিষ্ট পাঁচটি স্থান যেমন: খুলি, পাঁজরের হাড়, শ্রোণী (মেরুদণ্ডের নিচের অংশ এবং নিতম্বের মধ্যকার অস্থি কাঠামো), হাত ও পায়ের হাড় ইত্যাদি অংশে জোরে জোরে ঘষবেন সাবান গুলানো জল দিয়ে। আর এই কাজটি পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন মনিটরে ধারণ করা হবে। সময় তিন ঘন্টা। প্রদর্শনীর দিন দেখা গেলো; সময় যতই গড়াচ্ছে, চকচকে হয়ে উঠছে কোলের কঙ্কালটি, আর নোংরা জলে-ফেনায় ভরে উঠছে মারিনার শরীর। তিনঘন্টার এই প্রদর্শনীটি মূলত তিব্বতের ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠানের রূপক পরিবেশনা। তিব্বতে মনা করা হয় এই প্রক্রিয়ায় আত্মার নশ্বরতা নিশ্চিত হয়। ক্লিনিং দ্য মিরর সিরিজের প্রথম প্রদর্শনীটি হয় মিউজিয়াম অব মডার্ণ আর্টস-এ। দ্বিতীয়টি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, তৃতীয়টি পিট্‌ রিভার্স মিউজিয়ামে।
আচ্ছা, শিশু বেলায় আমরা অনেকেই বাবা-মা বা বয়োজেষ্ঠ্যদের এই প্রশ্নটা অবচেতনে করেছি তো, যে, ভূতেরা কী খায়? এই প্রশ্নের নানরকম উত্তরও আমরা পেয়েছি, ভূত আগুন খায়, ভূত অন্ধকার খায়, ভূত বড়ো বড়ো জাহাজ খায় ইত্যাদি ইত্যাদি। সেসব শিশু মনে কী প্রভাব ফেলেছে সে নিয়ে আলাদা রচনা হতে পারে। কিন্তু এই একই ভাবনায় সঞ্জাত হয়েছিলেন মারিনা আব্রামোভিচও! ফলশ্রুতিতে ১৯৯৬ সালে তিনি উপহার দিলেন ‘স্পিরিট কুকিং’ শির্ষক প্রদর্শনীটি। রন্ধনশিল্পী জ্যাকব স্যামুয়েলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছিলেন ‘আ্যাফ্রোডিজিয়াক রেসিপি’ তথা কাম-উদ্দীপক খাবারের পদ নামের একটি কুকিং রেসিপি বইয়ের। সেসময়েই মারিনার মাথায় আসে এই প্রদর্শনীর। রোমের যেরিন্থিয়া এসোসিয়াজিয়ঁ পার লে’আর্তে কনতেম্পোরানিয়া-য় এই প্রর্দশনীটি করা হয়। মূলত মাল্টিমিডিয়া ইন্সটলেশনের মাধ্যমে অদ্ভুত অদ্ভুত সব রেসিপি রান্না করে দেখানো হয়। যা মানুষ খাওয়া তো দূরের, কখনো এমন উপকরণ দিয়ে কোনো খাবারের পদ তৈরি হতে পারে সেটা ভাবেনওনি। মাত্র দুটি উদাহরণ দিই: থার্টিন থাউজেন্ড গ্রামস্‌ অব জেলাসি রেসিপিটির মূল উপাদান সদ্য প্রসূত মায়ের স্তন হতে নেওয়া টাটকা দুধ এবং বীর্য-রস! সুইটেন্ড ক্রাশ নামের রেসিপিটির মূল উপাদান মিহি কাঁচ-গুঁড়ো, গোল মরিচের গুঁড়ো এবং চোলাই মদ! এই প্রদর্শনীর পর রক্ষণশীলরা মারিনা’র মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও; তাবড় তাবড় শিল্পবোদ্ধারা এই প্রকাশের মধ্যেই দেখেছেন, শিল্পের ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙ্গে পড়ার পেছনের আকুতি। (আগামী পর্বে সমাপ্ত)

x