শিরোনাম খুঁজে পাচ্ছি না

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ
52

শিল্প সাহিত্য নিয়ে লেখালেখি করাটা এখন আমার কাছে অবান্তর মনে হচ্ছে। আমরা কি চরম এক অরাজক সময় পার করছি! এখন কি মাৎস্যন্যায় চলছে? টেলিভিশন খুললেই দেশজুড়ে খুনখারাবি আর শিশু ধর্ষণের চিত্র। পত্রিকার পাতা জুড়ে একই সংবাদ। কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চরম অসহিষ্ণুতা ও হিংস্রতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ একটি সমাজে এর বিপরীত চিত্রটাই স্বাভাবিক ও কাম্য। যে পরবর্তী প্রজন্মের দিকে সারাদেশ তাকিয়ে তাদের মধ্যে এক বিশৃঙ্খলা বিরাজমান। শান্ত কোমলমতি সন্তানগুলো কেমন যেন অস্থিরচিত্ত হয়ে উঠেছে।
তবে এর নেপথ্যে অনেক কারণ রয়েছে। অগ্রজ প্রজন্ম নানাভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অত্যন্ত খারাপভাবে ব্যবহার করছে। অস্ত্র, মাদক, নানান রকমের অ্যাপস তাদের কাছে অত্যন্ত সুলভ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ যে মাদকের একটা বড় ট্রানজিট হয়ে উঠেছে তা দেখাই যাচ্ছে। ইয়াবা এখন মিয়ানমারের কল্যাণে দেশজুড়ে বিষের আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। হয়তো এর পেছনে যুব সম্প্রদায়কে মাদকাসক্ত করার বিদেশি ষড়যন্ত্রও থেকে থাকতে পারে।
যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির কারণে নানা রকমের ইলেকট্রনিক অ্যাপস এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের। এসব অ্যাপস সস্তা মোবাইল সেটেও সুলভ। এসব অ্যাপসের ভালো দিকগুলোর পরিবর্তে মন্দ দিকগুলো এই প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেবল যে বিত্তহীন বা নিম্নবিত্ত শ্রেণির তরুণ বা যুব প্রজন্ম এ নেশায় আসক্ত তা নয় মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত সব শ্রেণিতেই এটা লক্ষণীয়। এর নেপথ্যের একটি বড় কারণ সংস্কৃতিগত সংকট অন্যটি বেকার সমস্যা। প্রায় এক কোটি তরুণ বেকারত্বে বিপর্যস্ত। বিকল্প পেশা অবলম্বনের সুযোগও তেমন নেই। চাঁদাবাজি এক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা। যা সমাজের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সর্বস্তরে বিরাজমান। উৎকোচ প্রদান ও গ্রহণ এদেশের সমাজ ব্যবস্থার অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত। আরেকটি হলো অর্থ পাচার যেটিতে বাংলাদেশ একটুর জন্যে প্রথম হতে পারেনি। সামগ্রিক দুরবস্থাকে যদি এক কথায় প্রকাশ করি তবে সে কথাটি হলো দুর্নীতি যেটিতে গত কয়েক দশক ধরে আমরা দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ স্থান অধিকার করে চলেছি। আশা করি, খুব শীঘ্রই প্রথম হবো।
গত কয়েক বছর যাবত যে-প্রবণতা দেশের আরেকটি প্রধান সমস্যায় পরিণত হয়েছে সেটি হলো ‘ধর্ষণ’। এই সমস্যা এখন রীতিমত মহামারীতে রূপ নিয়েছে। যে কোনো বয়সের নারী ধর্ষণের হুমকিতে থাকলেও শিশু কন্যারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর শিশু কন্যাদের শিক্ষা গ্রহনের জন্যে নিরাপদে পাঠানো যাচ্ছে না। প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত সর্বত্র এই অরাজকতা। তবে বিশেষ ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশেষ ধরনের শিক্ষকেরা যেন এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হত্যা। শিশু থেকে মধ্যবয়সি সকলেই হলেও শিশুরাই হত্যার শিকার হচ্ছে বেশি। এর নেপথ্যে সামাজিক অস্থিরতা যেমন দায়ী তেমনি দায়ী আমাদের বিপর্যস্ত ও ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ। পৃথিবী জুড়ে এখন ধর্মীয় জঙ্গিবাদের ক্রম উত্থান। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এদেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এই উগ্রবাদিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে। ধর্মীয় অশিক্ষা ও ভুল শিক্ষা এর জন্যে দায়ী। সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কখনোই এ ধরনের উগ্রবাদিতা সৃষ্টি করতে পারে না। কোনো ধর্মেই অমানবিকতার চর্চা নেই।
সাংস্কৃতিক সংকট যার কথা আগে বলা হয়েছে, এটিও আরেকটি বড় কারণ এতসব অরাজকতা সৃষ্টির নেপথ্যে। আগে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত নিয়মিতভাবে ক্রিড়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রচলন ছিল। বছরের প্রথম দিকে যখন পড়াশোনার চাপ কম থাকে তখন অনুষ্ঠিত হত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। সারা বছর নানাভাবে অনুষ্ঠিত হত সাহিত্য প্রতিযোগিতা। কখনো সাময়িকী প্রকাশ, কখনো দেয়াল পত্রিকা প্রকাশনা, কখনোবা ক্লাসে ক্লাসে আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, ক্রমান্বয়ে গল্প বলা বা সাহিত্য আলোচনা ইত্যাদি। এছাড়া ছিল আন্তঃস্কুল ও কলেজ ক্রীড়া ও সঙ্গীত প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃছাত্রাবাস বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রাম শহরে আমাদের ছাত্রাবস্থায় স্কুল ও কলেজ ক্রিকেট লীগ চালু ছিল। নিশ্চয় তার প্রচলন ছিল অন্যান্য শহরেও। আজ আর এসব নেই। আমাদের লেখাপড়ার বর্তমান অবাস্তব ও অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতি এই জন্য দায়ী। সিংহভাগ স্কুলের ও কলেজের কোন মিলনায়তন বা মাঠ নেই। প্রাইভেট স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে।
সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবে তরুণ মন সৃষ্টিশীল চিন্তা ভাবনার সুযোগ পায় না। শিশু থেকে বয়স্ক প্রতিটি মানুষের অবশ্যই একটা অবসর সময় থাকে। সময়ের পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কম বা বেশি। কিন্তু এ সময়টাতে যদি সে সুস্থির এবং সৃষ্টিশীল চিন্তা ভাবনার সুযোগ পায় তাহলে তার মধ্যে অস্থিরতা তৈরির অবকাশ তেমন থাকে না।
এসব অস্থিরতা তৈরির পেছনে ভিশুয়াল মিডিয়া অর্থাৎ সিনেমা ও টেলিভিশনের ভূমিকাও বিশাল। কুরুচিপূর্ণ ও উদ্ভট চলচ্চিত্র যে কোন বয়সি মানুষের মনে অস্থিরতা তৈরি করে। বিশ্বজুড়ে এ ধরনের ভায়োলেন্স ও ভালগারিটি সর্বস্ব সিনেমার রমরমা বাজার সব সময়েই রয়েছে। আমাদের উপমহাদেশে এ ধরনের ছবিগুলো বেশি তৈরি হয় দক্ষিণ ভারতে। বিশেষ করে তামিল ও তেলেগু ভাষায়। এসব ছবির কারিগরি উৎকর্ষ তরুণ সম্প্রদায়কে বেশি আকৃষ্ট করে। কিন্তু এসব ছবির কনটেন্ট রীতিমত ভয়াবহ। বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে নিয়মিতভাবে ডাউনলোড করে এসব ছবি দেখা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।
আর আছে টেলিভিশন, ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার টিভি সিরিয়ালগুলো ভয়ঙ্কর রকমের অস্থিরতায় পরিপূর্ণ। বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টিভির বেশিরভাগ চ্যানেল ভারতীয় বাংলা ও হিন্দিভাষী। এসব চ্যানেলের সিংহভাগই কেবল সিরিয়াল চালায়। এসব সিরিয়ালে কেবল সাংসারিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা, হিংসা, বিদ্বেষ, খুনোখুনি, ষড়যন্ত্র এসব ছাড়া আর কিছুই নেই। কোন একটি সিরিয়ালে সুস্থতার কোন চিহ্নমাত্র নেই। এসব সিরিয়ালের দর্শক বেশি মধ্যবয়সীরা। তাদের মধ্যেও এর প্রভাবে নানা রকমের অস্থিরতা জারিত হচ্ছে।
তরুণ দর্শকেরা বেশি দেখেন ক্রাইম সিরিজ। বেশ কয়েকটি ভারতীয় চ্যানেল তো বটেই, বাংলাদেশি অনেক চ্যানেলও এসব ক্রাইম সিরিজ প্রচার করে। এসব সিরিজ মন গড়া। সাংঘাতিক রকমের ভায়োলেন্স এবং ভালগারিটিতে পরিপূর্ণ। তরুণদের পাশাপাশি বয়স্করাও এসব সিরিজ দেখেন। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বেশ কিছু খুন ও ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে এসব সিরিজের ঘটনার মিল পাওয়া গেছে। কি ভয়ঙ্কর অনুকরণ, যা ভাবলেই রীতিমত অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়।
ধর্ষিত শিশুগুলো যখন বাবা মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কাঁদে, অসহায় বাবা মা যখন নির্যাতিত শিশুদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন কিংবা জনসমক্ষে ঘটনা খুলে বলে বিচার দাবি করেন, তখন মনে হয় ঐ শিশুরা নয় আমরাই বরং মুখ লুকিয়ে রেখেছি, উটপাখির মতো। ওরা কেন মুখ লুকিয়ে রাখবে? কেন ওরা শৈশব থেকে ধর্ষণ কিংবা নির্যাতনের কারণে লাঞ্ছিত হতে থাকবে? কেন ওরা অপমান সহ্য করে বেড়ে উঠতে থাকবে? কেন একজন লাঞ্ছিতা কিশোরী কিংবা তরুণী এক ঘরে হয়ে থাকবে? অপরাধ তো তার নয়। অপরাধ সেই নরপশু ধর্ষকের। অপরাধ আমাদের সকলের।
আমাদের অবশ্য কর্তব্য, লাঞ্ছিত অপমানিত সেই শিশু কিশোরী তরুণী কিংবা প্রৌড়াকে আরো বেশি করে সম্মান দেয়া, গ্রহণযোগ্যতা দেয়া, সান্ত্বনা দেয়া। বেশি করে তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সাহসী করে তোলা। সরকারি ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মধ্যে দিয়ে তাকে নির্ভরশীল করে তোলা। পুনর্বাসন নয় সম্মানপূর্ণ গ্রহণযোগ্যতাই একজন নির্যাতিতা নারীর কাম্য।
আর যে উদ্যোগটি অত্যন্ত জরুরি সেটা হলো, দ্রুত ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণের বিচার সম্ভব মতো স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে দোষী ধর্ষক বা ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা। অহেতুক দীর্ঘসূত্রতা, উদ্দেশ্যমূলক কালক্ষেপণ বিচারের বাণীকে কেবল যে নিভৃতে কাঁদাবে তাই নয়, সমস্যাটাকে আরো জটিল আরো ভয়ঙ্কর আরো জীবনবিধ্বংসী করে তুলবে।

(এই লেখা শেষ করার পর গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের প্রয়াণ সংবাদ জানলাম। অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা।)

x