শিরীনের কান্না ও আরব দেশের হাতছানি

সালমা বিনতে শফিক

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:২০ পূর্বাহ্ণ
86

১।
শিরিনের ঘরে আগুন লেগেছিল বছর খানেক আগে। সেই আগুনের আঁচ আমাদের গায়ে লাগার কথা না। লাগবে কি করে? ও যে আবাসিক এলাকায় ঘর বেঁধেছিল অনেক ধারকর্জ করে তার নাম ‘ছিন্নমূল’। কে এই নাম দিয়েছিল কে জানে? তবে সার্থক নামকরণ। শিরিনদের মতো ছুটা গৃহকর্মী, ও নানান ধরনের ছোট কাজ করা মানুষদের বসতি এই এলাকায়।
শুক্রবার সকালে বিছানা ছাড়ার আগেই শিরিনের নাম ভেসে উঠে মুঠোফোনের পর্দায়। ভেবেছিলাম ওর মেয়েরা হয়তো বেড়াতে আসতে চায়, আজ ছুটির দিন তাই। না, কান্নার রোল শোনা যায় ওপাশ থেকে। ‘আফা আমার গর ফুইরা গ্যাসে’।
কি বলে সান্ত্বনা দেই শিরিনকে? দুই মেয়ে নিয়ে ওর যুদ্ধ চলছে অনেক দিন। দুই/তিন বাড়ি কাজ করে মেয়েদের স্কুলে পড়ায়। মেয়েদেরকে ওর মতো ময়লা কাপড় পরায়না। কত সাধ ওরা স্কুল পাশ দেবে, সম্মানের একটা জীবন পাবে।
শিরিন জানেনা ওর ঘর ভেঙেছে আসলে মাস ছয়েক আগেই। কপাল পুড়েছে আরও আগে। ওকে না জানিয়ে মেয়েদের বাপ ঘর বেঁধেছে অন্য একজনের সঙ্গে। কে জানে সে লোকটাই আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল কিনা ওর ধারদেনা করে জোড়ানো এক চিলতে ঘরে।
২।
আজ শিরীন এসেছে। তেমন কোন কাজ নেই। কেবল একটা বাসায় কাজ; হাজার দেড়েক টাকা পায়। দুই মেয়ে নিয়ে চলেনা। এরই মাঝে নতুন ঘর তুলেছে। অনেক দিন ছাপরা বেড়ার দরজা ছিল। কুকুর বেড়াল ঢুকে মেয়েদের জন্য রাখা বাড়াভাতে মুখ দিয়ে ফেলত। অনেক কষ্টে ইস্পাতের দরজা লাগিয়েছে। এখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়। কিন্তু হাজার দেড়েকে মাস পার করে কি করে?
বড় মেয়েটাকে তিন কেলাশ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চকলেটের কারখানায় কাজ নিয়ে দিয়েছিল। মাস যেতে না যেতে ছাড়িয়েও এনেছে। মন মানেনা, ভয় লাগে। বড় বোন শিরীনকে বুদ্ধি দেয়- আরব দেশে চলে যা। বাসায় কাজ করে মাসে হাজার বিশেক পাওয়া যাবে।
আঁতকে উঠি আমি। শনিবারের নারীপাতায় সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা কফিনবন্দী আবিরন আর সর্বস্ব খুইয়ে আসা ঝাপসা ছবির মেয়েদের কথা লিখে বেশ একটা সাড়া ফেলে দিয়েছিলাম। অনেক অভিনন্দন যোগ হয়েছে প্রাপ্তির খাতায়। আজ বুধবার, মাঝে তিন দিবস মাত্র পার হল। এ আমি কী শুনছি?
নারীপাতায় প্রকাশিত আমার প্রবন্ধের পাশেই ইশরাত জাহান ঊর্মি’র গবেষণাধর্মী রচনায় সৌদি আরবে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো নারী গৃহকর্মীদের দুর্ভোগের পূর্ণ ফিরিস্তি ও পরিসংখ্যান বলছে- এ দায় আমাদেরও, সুবিধাভোগী নাগরিক জনগোষ্ঠীর।
শিরীনরা কাগজ পড়েনা জানি। টেলিভিশন কী দেখেনা? ছিন্নমুলের বাসিন্দারা কী সত্যিই জানেনা আবিরন নাজমাদের শেষ পরিণতির কথা? নাকি জানলেও বিকল্প খুঁজে পায়না বলে মৃত্যুপুরীতে পাড়ি জমায়- ‘যদি লাইগা যায়’ পরখ করে দেখার আশায়!
৩।
অনেক বুঝিয়েছি শিরীনকে। কাগজের কথা, টেলিভিশনের কথা, নাজমা আবিরনদের কথা। কিছু হাঁস মুরগি কিনে দিতে চাইলাম। সেখানেও সমস্যা; ও কাজে গেলে পাশের বাড়ির লোকজন বিরক্ত হয় মুরগিদের আনাগোনায়। সবজি লাগিয়েছিল কিছু ঘরের সামনের এক চিলতে উঠোনে; রাতে পাহাড় থেকে হরিণ নেমে গাছ পাতা সব খেয়ে যায়। জমিটা বেঁচে দিয়ে দেশগেরামে ফিরে যাবে ভাবছে, কেনা দামও উঠছেনা। তাছাড়া, গ্রামে গিয়েও তো কাজও পাবেনা। মেয়েদেরকে খাওয়াবে কীভাবে? আকাশটা যেন ভেঙে পড়ছে ওর মাথার ওপর। ‘যার কেউ নাই, তারে আল্লাহও দেহেনা আফা…’- ডুকরে কেঁদে ওঠে শিরীন।
বিকল্প একটা উপায় পাওয়া গেছে। কাপড়ের ব্যবসা করা যায়। পাইকারি কাপড় কিনে গ্রামে গ্রামে ফেরি করা। এই নগরে গ্রাম! পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা; ভর দুপুরে পুকুর পাড়ে শিকারের খোঁজে ওঁত পেতে থাকে মাছরাঙা! আরে না। এই সব ভাসমান গ্রাম। বাপ দাদার ভিটে ফেলে ভাগ্য বদলের আশায় শহরে পাড়ি জমানো অশিক্ষিত মানুষরা বসত গড়ে বৃক্ষ জলাশয় বিহীন জনপদে। গ্রামের মানুষরা থাকে বলেই গ্রাম নাম এসব এলাকার। ওদের ঘরের বৌ ঝিদের ওপর ভর করে শিরীনের কাপড়ের ব্যবসাটা যদি একবার দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায়- মনে মনে হিসেব কষে ফেলি। কিন্তু ওই গ্রামে কি শিরীন নেই একটাও? দেশ গাঁ ফেলে নিশ্চিন্তে ঘরকন্না করবে বলেই কি এসেছে ওরা অচিনপুরিতে?
ভাবনাগুলোতে অযথা ডালপালা গজিয়ে উঠছে; রুগ্ন, দুর্বল। গোড়ায় পর্যাপ্ত সার পানি পড়লে লকলকিয়ে উঠত সমগ্র বৃক্ষ। বৃক্ষটিকে বাঁচাতে হবে আমাদেরকেই।
সাতসকালে পরিপাটি হয়ে কাজের গাড়ি ধরার জন্য হন্তদন্ত হয়ে যখন বের হই, আমারই মতো একদল রমণী তখন পড়িমরি করে প্রবেশ করে আমাদের আবাসিক এলাকার বিশাল দৃষ্টিনন্দন ফটক দিয়ে। পরনের পোশাক বলে দেয় ওরা আমাদের মতো নয়, আমাদের জাতের নয়। জাতপাতের দিন কাগজে কলমে সমাজে না থাকলেও ফটকের গোঁড়ায় মুখোমুখি মহিলাদের কাপড় দেখে অনায়াসে বলে দেওয়া যায় কে কোন জাতের। ময়লা কাপড় পরা রমণীর দল আমার মতো কাজেই যায়। আমাদের পাড়ায়। একেক জন একেক বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে। কেউ দুই বাড়িতে, কেউবা তিন বাড়িতে। ধোয়ামোছা, কুটাবাছা ু সকাল গড়িয়ে দুপুর নামে। কারওবা দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ফেরার পথে দেখা হয়ে যায় কয়েকজনের সঙ্গে। ওরাও তখন ঘরে ফিরে। ক্লান্তিতে পা চলেনা। আমার মতো ওদেরও।

x