শিখরছোঁয়া অহংকার, শিখরছোঁয়া ওয়াসফিয়া

ফারহানা আনন্দময়ী | শনিবার , ৩০ জুলাই, ২০২২ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে গত ২৩ জুলাই বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ K2-র চূড়ায় পা রাখলেন এভারেস্ট বিজয়ী পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজরীন। কারাকোরাম পর্বতমালার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ K2। এভারেস্টের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত এটি। K2 কে অনেকগুলো নামে ডাকা হয়, The King of the Mountains অন্যতম। এটাকেই আরোহণের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম পর্বত বলে ধরা হয়। এগুলোকে আরোহণ করা যেকোনো পর্বতারোহীর জন্যই চূড়ান্ত কৃতিত্বের। আর সেই কৃতিত্ব অর্জন করে আমাদের গর্বিত করলেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। K2 সামিট করার পরপরই ওয়াসফিয়া পোস্ট দিয়ে বলেছেন-
When the time comes for me to exit the planet, please rejoice in knowing I lived or aspired to live majority of my life free from society and other people’s judgement. I made my own rules. My mind is free. I live under no captivity. And I wih for each of you to live with the same freedom. May all beings be free.
‘নিজেরে করো জয়’…কথাটা গুরুদেব লিখেছেন খুব সহজ করে, কিন্তু কাজটা কি অতোটাই সহজ? সত্যিই কি জয় করা যায় নিজেকে? হ্যাঁ, জয় যে করা যায় তার একটা হৃদয়রাঙা অভিজ্ঞতা হলো আমার, এক অনুপম আয়োজনে, এ শহরেই, এক সন্ধ্যায়। বেশ কয়েক বছর আগে ওয়াসফিয়ার সঙ্গে আলাপের সৌভাগ্য হয়েছিল। বিশদ বাঙলা- বর্তমানে যার নাম বিস্তার, সেই প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে তিনি এসেছিলেন চট্টগ্রামে। আষাঢ়ের পূর্ণিমা সাধারণত এমন হয় না, চাঁদি ফেটে যাওয়া জোছনায় পুড়তে পুড়তে পৌঁছুলাম বিশদ বাঙলায়। সেখানে অপেক্ষা করছিল এক অপার বিস্ময়। বুদ্ধির দীপ্তিতে ঝলমল করছে তাঁর দুটো চোখ, আত্মবিশ্বাসের দ্যুতি ঠিকরে পড়ছিল তার পুরো অবয়ব জুড়ে। মুখ থেকে বের হওয়া কথাগুলোর মধ্যে শব্দের কোনো শিথিলতা নেই, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা নুড়ি পাথরের মতো স্বতঃস্ফূর্ততা তার বলা প্রতিটি শব্দে। সাধারণ ভঙ্গিতে অকপটে শুনিয়ে গিয়েছিলেন নিজেকে জয় করার অসাধারণ এক সাহসী গল্প। তিনি ওয়াসফিয়া নাজরীন, আমাদের শিখরস্পর্শী অহংকার…তিনি শুধু হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়া জয় করেননি। জয় করেছেন তার বিশ্বাস প্রতিজ্ঞা আর আমাদের মত স্বপ্ন দেখা, কিন্তু স্বপ্ন ছুঁতে না পারা সকলের স্বপ্ন।
একুশ শতকের এই বিশ্বায়িত সমাজে ওয়াসফিয়া নাজরীনকে বিশ্বের অন্য কোনও এগিয়ে যাওয়া সভ্য দেশে আলাদা করে নারী হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে না, সে আমি জানি। তাঁকে তারা বলবে হিমালয় জয় করা এক দুঃসাহসী অভিযাত্রী…নারী পুরুষের স্বতন্ত্র জৈবিক পরিচয় সেখানে গৌণ। তবে আমাদের এই ধর্ম-শাসিত, পুরুষ-শোষিত সমাজে তাঁকে অসম্ভবের বিধি নিষেধ ডিঙোনো এক ‘বিস্ময় নারী’ হিসেবে চিহ্নিত করতেই বেশি গৌরব বোধ করছি। তিনি যখন হিমালয়ের সাথে তাঁর ভাব-ভালবাসার গল্প বলছিলেন, তার জীবনের পেছনের কথা বলছিলেন, শুনতে শুনতে কেবল এ কথাই মনে বাজছিল, মানুষ চাইলে সবকিছুই পারে। তবে সে চাওয়ার মধ্যে সততা থাকা চাই, ইচ্ছের জোর থাকা চাই, প্রবল সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকা চাই।
ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, যে কোনও চ্যালেঞ্জিং কাজের জন্য প্রথম এবং প্রধানতম নিয়ামক হলো আত্মবিশ্বাস। তবে ওয়াসফিয়ার কাছে যখন জানতে চাইলাম, তিনি প্রথাগত ধারণার একটু বাইরে দিয়েই হাঁটলেন। তাঁর মতে, জীবন জয় করার প্রধান শর্ত হলো জীবনের প্রতি সততা। নিজের প্রতি সৎ থাকা, নিজের জীবনে-চর্চার প্রতি সৎ থাকা, সর্বোপরি নিজের প্রতিজ্ঞার প্রতি একনিষ্ঠ সততাই তাঁকে আজ তার গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে। ওয়াসফিয়া জীবনটাকে শুধু পাহাড়চূড়া জয় করার মতো সাহসী অ্যাডভেঞ্চারে ভরিয়ে রাখেননি। সমাজের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে, সমাজের অসারতার বিরুদ্ধে, সাজানো শ্বাসরোধী পেষনের বিরুদ্ধে এবং কম সুবিধাভোগী মানুষের অধিকারের পক্ষে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন। তাঁর বয়স বিচার করলে একটু অবাকই হতে হয়, কারণ বয়স অনুপাতে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং অর্জনের পাল্লাটা একটু বেশিই ভারী।
ওয়াসফিয়া নাজরীন নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান এদিক থেকে যে, তাঁর বেড়ে ওঠা এবং বড় হয়ে ওঠাটা আমাদের সমাজের গড়পড়তা সাধারণ নারীর বেড়ে ওঠার চেয়ে একটু আলাদা। তার পরিবার তাকে সেই পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে গেছেন যাতে ওয়াসফিয়া তার ইচ্ছের কুঁড়িটাকে নিজ হাতে পাপড়ি মেলতে পারেন। তিনি শুধু তাই হিমালয় চূড়া ছুঁয়ে আসেননি, এর আগেও তিনি আরো দুটো মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় তার পায়ের ছাপ রেখে এসেছেন। এখন তাঁর অর্জনের থলেতে পাঁচটি চূড়া জয়ের অভিজ্ঞতা। রয়েছে পৃথিবীর সাতটি চূড়া জয়ের অঙ্গীকার। ক২ পর্বতশৃঙ্গ তার অন্যতম। এ অঙ্গীকার শুধু নিজের প্রতি নয়, আমাদের প্রতি, সমাজের প্রতি। ওয়াসফিয়াদের মতো ঠিক-ঠিক মানুষেরাই একদিন সমাজকে একটি সঠিক রূপ দিতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
তাঁর দুঃসাহসিক অভিযাত্রার একটি টুকরো গল্প আমায় দারুণভাবে ছুঁয়েছিল। হিমালয় চূড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর সূর্যোদয় দেখার গল্প। আলোর ঢেউয়ে পাল তোলা সেই ক্ষণটি নিঃসন্দেহে অবিস্মরণীয়… সে এক অন্য রূপ। মাথার ওপরে নয়, পায়ের নীচে সূর্যোদয়…আমরা মাথা উঁচু করে, চোখ তুলে সূর্যদেবকে দেখি। আর সেদিন সূর্যদেব মুখ উঁচিয়ে আমাদের ওয়াসফিয়াকে দেখেছিল… যেন, শুধু তুমিই তাকে চেয়ে দ্যাখো না, সেও তোমায় চেয়ে দ্যাখে।
ইচ্ছেটাকে জীবনের মুঠোয় নয়, বরং জীবনটাকেই ইচ্ছের মুঠোবন্দী করা যায়… সেই বিশ্বাসটুকু এই সমাজের পিছিয়ে থাকা নারীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার এক উদাত্ত আহ্বান রইল ওয়াসফিয়ার কাছে। শুধু হিমালয় বা কিলিমাঞ্জারো কিংবা K2 চূড়া নয়; আমাদের নারীরা যেন যে-যার কাজের ক্ষেত্রে সফলতার শিখর স্পর্শ করতে পারে, যে-যার যোগ্যতার মাপে। মেধা, সততা আর সাহস নিয়ে আপন কর্মক্ষেত্রটি আপন আলোয় আলোকিত করুক… তা সে একজন জীবন কামড়ে ধরা গার্মেন্টসকর্মীই হোক অথবা রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষপদে আসীন একজন নারীই হোক।
কয়েক বছর আগে, বিশদ বাংলার সেই ছোট্ট পরিসরে আমরা যে ক’জন নারী ছিলাম, নিশ্চিত…আমরা সকলেই সেই সময়টুকুর জন্য অসীম তেজে তেজস্বিনী হয়ে টগবগ করে ফুটছিলাম। ওয়াসফিয়ার সাহসী অর্জনে আমরাও অনেকটা দূর এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেয়েছিলাম। ওয়াসফিয়ার সাহস আর অনুপ্রেরণায় আমি নিজে শুধু আত্মবিশ্বাসে নতুন করে জন্ম নিইনি, সাফল্যের এক অমিত আলোয় উজ্জ্বল তাঁর মুখের অবয়বে আমাদের আত্মজার মুখটিও খুঁজে ফিরছিলাম। অজস্র ধন্যবাদ ওয়াসফিয়া নাজরীন, আমাদের স্বপ্ন জাগানোর জন্য, সাহস হয়ে সামনে থাকার জন্য। আপনার এই পর্বত জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক।