শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি : আমরা কেমন জাতি চাই

রেজাউল করিম স্বপন

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:২০ পূর্বাহ্ণ
24

কয়েকদিন থেকে মনটা খুব খারাপ। প্রতিদিনের পত্রিকা ওল্টালে শুধু নেগেটিভ খবর। ভাল ও উৎসাহিত হওয়ার মত খবর খুব একটা দেখা যায় না। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও প্রতিদিন ভাল খবরের জন্য আমাদেরকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হয়। আস্তে আস্তে দেশের গর্বের জায়গাগুলোকে আমরা ধ্বংস করে ফেলছি, যেমন উচ্চশিক্ষা। আমাদের সমাজে এখনো কোন পরিবারের সন্তান ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়লে সমাজের সবাই সেই পরিবারকে সম্মানের চোখে দেখে ও শ্রদ্ধা করে। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে এইচএসসি পাস করে। তার মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী এক হাজার বুয়েটে ও কয়েক হাজার সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পায়। অর্থাৎ যারা বুয়েট ও সরকারি মেডিকেলে সুযোগ পায় তারা এস এস সি ও এইচ এস সিতে সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করা মেধাবী ছাত্র ছাত্রী। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, স্কুল ও কলেজে পড়ার সময় এসব ছাত্রছাত্রী পড়ালেখার বাইরে তেমন কিছু করার সুযোগ পায় না। সেই মেধাবী সন্তানগুলি বুয়েট, মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নষ্ট রাজনীতির সংস্পর্শে এসে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সেজন্য এখন বুয়েটসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে খুনিরা বাস করে, না হলে কিভাবে বুয়েটে একটি মেধাবী ছেলেকে ৬ ঘণ্টা অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়। যে ছেলেগুলো এ হত্যাকাণ্ডটি করেছে তারাও বুয়েটের ছাত্র। তারাও বুয়েটে প্রথম এসে র‌্যাগিং ও বড়ভাইদের (ছাত্রনেতা) হাতে অপদস্ত ও নিগৃহীত হয়েছে। কিন্তু তারা যখন দেখলো এই ধরনের অন্যায়ের কোনো বিচার হয় না, উল্টা তাদের আরো নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তখন তারা নিজেরা ছাত্রনেতাদের কাছাকাছি থেকেও হুকুম তামিল করে তাদের প্রিয়ভাজন হয়। এতে করে তারা দাপটের সঙ্গে হলে আরাম আয়েশে থাকে, আর্থিকভাবে লাভবান হয়, পড়ালেখার ব্যাপারে আলাদা সুবিধা পায়, মাদকসহ নিষিদ্ধ পণ্যে আসক্ত হয়ে পড়ে, চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্যসহ অন্যান্য বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করতে পারে। অথচ বুয়েট প্রশাসনসহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যদি শুরুতে এসব অনিয়ম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতো তাহলে এ অন্যায়গুলো বছরের পর বছর চলতে পারতো না।তাই আবরার হত্যার জন্য বুয়েট প্রশাসন পুরাপুরি দায়ী। শুধু তাই নয় যারা গ্রেফতার হলো তাদের জীবনও ধ্বংস হয়ে গেল। এর দায়ও বুয়েট প্রশাসনের। কারণ এই ছেলেগুলো কখনো অপরাধী ছিল না, আবরারের মত মেধাবী ছাত্র ছিল। তারাও বুয়েটে এসে নষ্ট হয়ে গেল।
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা দানব সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সেই দানবকে জাগিয়ে দিলেই মানুষ ভয়ংকর আচরণ করেও স্বাভাবিক থাকে। আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছাত্রদের মধ্যে সেই দানব জাগ্রত ছিল, তাই তারা আবরারকে দফায় দফায় নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ও হত্যার পর সবাই স্বাভাবিকভাবে গভীর রাতে খাওয়া দাওয়া করেছে, টেলিভিশনে খেলা দেখেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আবরার মরে যাওয়ার পরও তারা ডাক্তার, প্রভোস্ট ও ছাত্র কল্যাণ পরিচালকের সামনে এসে স্বাভাবিক আচরণ করেছে, যেন আবরারের মৃত্যু স্বাভাবিক একটি বিষয়।একজন মানুষের মধ্যে ন্যূনতম মানবিক গুণাবলী থাকলে তারা এমন আচরণ করতে পারে না।এটা একদিনে হয় নি। বুয়েটে এধরনের ঘটনা বছরের পর বছর চলেছে কিন্তু দায়িত্ব প্রাপ্ত শিক্ষকগণ তা তেমন গুরুত্ব না দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ও নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে ছাত্রদেরকে ব্যবহার করেছেন।এতে হয়ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন কিন্তু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। শিক্ষক হচ্ছেন একটি দেশের শ্রেষ্ঠ বিবেকবান মানুষ। শিক্ষকতাকে শুধু একটি চাকরি হিসাবে নিলে তা হবে সবচেয়ে বড় ভুল।একজন শিক্ষক তার ছাত্রদের শিক্ষার সাথে মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ হিসাবে গড়ার তালিম দেন। তাই যারা শিক্ষকতা করেন তাদের কাছে দেশ জাতি অনেক কিছু প্রত্যাশা করে।
প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের ছাত্রসংগঠনের কর্তৃত্ব দেখতে চায়, এজন্য তারা শিক্ষকদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে।এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই হয়ত ১৯৭৩ এ্যাক্ট অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা কারো ওপর নির্ভরশীল না হন। তাই শিক্ষকদের সদিচ্ছা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে পারেন এবং মেধা মনন ও সৃজনশীলতা দিয়ে দেশ ও জাতিকে আলোকিত করতে পারেন। আমার মাথায় একটা বিষয় ঢোকে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে হবে কেন? তাঁরা হচ্ছেন জাতির বিবেক। তাঁরা কি আগেকার দিনের শিক্ষকদের মত নির্দলীয় চরিত্র প্রদর্শন করতে পারেন না। একজন শিক্ষক যে কোনো মতের অনুসারী হতে পারেন কিন্তু তা প্রদর্শন করতে গিয়ে নিজের মর্যাদা নষ্ট করবেন কেন? তাঁর কাছে সব মত ও দলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণের জন্য আসে। ছাত্র জীবনে যেকোন শিক্ষক কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী হতেই পারেন কিন্তু শিক্ষক হওয়ার পর তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি শিক্ষক। তাই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পাশাপাশি শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করা দরকার।একটু ভেবে দেখুন তো, আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগেও যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিশেষত ভিসি প্রোভিসি প্রক্টর প্রভোস্ট ছিলেন তাঁরা কেমন ছিলেন বা তাঁদের ব্যক্তিত্ব কেমন ছিল। তাঁরা এক একজন ছিলেন দেশ ও জাতির কাছে অনুকরণীয়। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসাবে নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত, তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আর এখন ভিসি হওয়ার জন্য শিক্ষকরা রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গিয়ে ধরনা ও তদবির করেন। তাইতো একজন ভিসি রাজনীতিবিদদের মত আচরণ করেন ও তাঁর ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য ছাত্র হত্যার পরেও দেখতে যান না বা জানাজায় অংশগ্রহণ করতে যান না। রাজনীতি করার অধিকার দেশের সব মানুষের রয়েছে, কেউ যদি রাজনীতি করতে চায় তা করতে পারে। কিন্তু ছাত্রদের প্রধান কাজ হচ্ছে শিক্ষাগ্রহণ করা। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটে এমন রাজনীতি বর্জন করা ও প্রয়োজনে নিষিদ্ধ করা উচিত। কারণ কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে সে দেশের আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। তাই আমাদেরকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভবিষতে আমরা কেমন জাতি চাই।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

x