শান্তনু বিশ্বাসের ফিরে-ফিরে আসা ‘স্মৃতির শহরে’

ফারহানা আনন্দময়ী

বৃহস্পতিবার , ৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ
9

মাত্র সাড়ে তিন মাস পূর্বে রূপ-অপরূপের অজানা দেশের বাসিন্দা হয়েছেন গুণী শিল্পী শান্তনু বিশ্বাস। শান্তনু বিশ্বাসের মতো কীর্তিমান মানুষের মহাপ্রস্থান মানেই চলে যাওয়া নয়; বরং বিপুল আয়োজনে ফিরে-ফিরে আসা তাঁরই এঁকে যাওয়া সৃষ্টিপথ ধ’রে। একটা গানে তিনি লিখেছিলেন, “পাতার কুচকাওয়াজে ভোরের পাখিরা দল বেঁধে উড়ছে আকাশে,তোমাদেরও সাথে নেবে,বিপুল বিশাল হবে আমিও থাকবো পাশে পাশে…”যেমনটা তিনি লিখেছিলেন “আমিও থাকবো পাশে পাশে…”; তেমনটাই আছেন, তেমনটাই তিনি রইলেন সেদিন, চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারি মিলনায়তনে। গত ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাঁরই প্রতিষ্ঠিত নাটকের দল ‘কালপুরুষ নাট্য সমপ্রদায়’এর আয়োজনে ‘স্মৃতির শহরে’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের শিল্পানুরাগী মানুষেরা শান্তনু বিশ্বাসকে এবং তাঁর শেষ সৃষ্টিকে উদযাপন করলেন গভীর শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় আর স্মরণে। আর সেদিনই ছিল তাঁর জয়ন্তী। তিনি সবসময় চাইতেন, এই জন্মতারিখটা তাঁরই সৃষ্টিকর্ম দিয়ে সাজিয়ে বিশেষ ক’রে তোলা হোক। তিনি অন্তরাল থেকে নিশ্চয়ই দেখলেন, কালপুরুষ তাঁর ইচ্ছের সম্মান জানালো সুনিপুণ আয়োজনে।
‘স্মৃতির শহরে’ হলো শান্তনু বিশ্বাসের রেখে যাওয়া সর্বশেষ সৃষ্টি আটটি গানের সংকলন, যে গানগুলো তিনি বছর দুই আগে কলকাতায় একটি মিউজিক স্টুডিওতে রেকর্ড করে রেখে গিয়েছেন; তাঁর সেই সৃষ্টি সত্যরূপ পেল সিডি অ্যালবাম আকারে প্রকাশিত হয়ে। শান্তনু বিশ্বাসের লেখা কথায়, সুরে এবং তাঁরই কণ্ঠে গাওয়া মূলতঃ ভালোবাসার গানগুলো নিয়ে এই সিডি অ্যালবামটি সাজানো হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর ঢাকায় জি-সিরিজ কার্যালয়ে কণ্ঠশিল্পী বাপ্পা মজুমদার, জি-সিরিজ কর্ণধার নাজমুল হক ভুঁইয়া, অ্যাক্টিভিস্ট সাগর লোহানী আর শান্তনু বিশ্বাসের স্ত্রী শুভ্রা বিশ্বাসের উপস্থিতিতে ‘স্মৃতির শহরে’ গানের অ্যালবামটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং একই সাথে ইউটিউব রিলিজ করে দেশের খ্যাতনামা অডিও-ভিডিও প্রতিষ্ঠান জি-সিরিজ। এই পরিক্রমায় গত ২৫ অক্টোবরের আয়োজনে ‘স্মৃতির শহরে’ অ্যালবামটির মোড়ক উন্মোচন করা হয় চট্টগ্রামে শিল্প ও সাহিত্যের খ্যাতিমান মানুষের উপস্থিতিতে। গুণী বংশিবাদক ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম অতিথি হিসেবে অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন করেন। সেই সময়ে মঞ্চে আরো উপস্থিত ছিলেন কামরুল হাসান বাদল, অভীক ওসমান, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, বাদল সৈয়দ, সাহিদ আনোয়ার, আকতার হোসাইন, হোসাইন কবির, মনিরুল মনির, ফারহানা আনন্দময়ী এবং অধ্যাপক কুন্তল বড়ুয়া। এঁরা সকলেই সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণের সাথে সাথে শান্তনু বিশ্বাসের গানের শেষ সিডি অ্যালবামের সফলতার জন্য শুভকামনা জানান।
মোড়ক উন্মোচনের মূলপর্বের আগে অনুষ্ঠানটি শুরু হয় শান্তনু বিশ্বাসের একটি গান প্রজেক্টরে দেখিয়ে ও শুনিয়ে। এরপর কালপুরুষ’এর পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য রাখেন অভিনেতা সাহিদউদ্দিন আহমেদ। মোড়ক উন্মোচনের পরের পর্বের পুরো অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় শান্তনু বিশ্বাস রচিত গান আর কবিতা-গদ্য দিয়ে; যা পরিবেশন করেন এই প্রজন্মের শিল্পীরা। ছয়জন কণ্ঠশিল্পী, ছয়জন বাচিকশিল্পী আর নরেন আবৃত্তি একাডেমির সদস্যশিল্পীরা তাঁদের পরিবেশনা দিয়ে শান্তনু বিশ্বাস’এর সৃষ্টিকর্মকে উদযাপন করেন। বিশেষ একটি পাঠ নিয়ে মঞ্চে আসেন শুভ্রা বিশ্বাস আর শিমুল সেনগুপ্ত… শান্তনু বিশ্বাসের রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বহুল অভিনীত নাটক ‘ইনফরমার’ থেকে কিছু নির্বাচিত সংলাপ দুজনে পাঠ করেন। আর এই পর্বেই নরেন আবৃত্তি একাডেমির শিল্পীরা শান্তনু বিশ্বাস রচিত নাটকের তিনটি গান গেয়ে শোনান উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদেরকে।
এই প্রজন্মের শিল্পীদের অংশগ্রহণে গান আর গদ্য-কবিতাপাঠের পর্বটি শান্তনু বিশ্বাসের গানের যারা মুগ্ধ আর মনযোগী শ্রোতা, শান্তনু বিশ্বাসের কণ্ঠেই যারা দীর্ঘদিন শুনে আসছেন, তাদের হৃদয়কেও ছুঁয়ে গেছে। শুভ্রতা দাশ তার দরদীকণ্ঠে গাইলেন ‘স্মৃতির শহরে’ অ্যালবামের গান ‘আমার সকালবেলার পাখি’ আর এর সাথেই ‘পোস্টম্যান’ গীতিকাব্যটি পাঠ করলেন জাভেদ হোসেন। পূরবী বড়ুয়া এরপরে গাইলেন ‘মনের কথাটাকে মনে রেখে দিলে’ গানটি আর পাঠে ছিলেন এহতেশামুল হক, ‘প্রতিদিন দেখা হয় না’ কবিতাটি সাথে নিয়ে। ‘এমন বরষা তাও নদী হলো না’ এই গানটি গেয়ে শ্রোতাদেরকে মুগ্ধ করেন দীপ্ত সেন। পাঠে তার সাথে ছিলেন তৈয়বা জহির আরশি, তিনি আবৃত্তি করেন, ‘তুমি এখন এসো না’ গীতিকাব্যটি। সঞ্জয় পাল গাইলেন শান্তনু বিশ্বাসের জনপ্রিয় গান ‘চিরকুটে দেখি ছোট্ট ক’রে লেখা’ আর এর পরপরই ‘স্মৃতির শহরে’র ‘দেখছি আর ভাবছি’ গানটি পরিবেশন করেন উলফাত এষা। লুবাবা ফেরদৌস সায়কার ‘যে আকাশ ধরতে চায়’ আবৃত্তির সাথে ‘পাখি আমার একলা থাকে’ গান নিয়ে মঞ্চে আসেন অজয় চক্রবর্তী। করবী দাশ ‘দিনের যত কাজ’ গানটি গেয়ে শোনাবার পর দেবাশীষ রুদ্র ‘শোন গল্পটা এখানে শেষ নয়’ গীতিকাব্যটি আবৃত্তি করেন। গান ও পাঠের শেষ পর্যায়ে প্রবীর পাল আবৃত্তি করেন ‘তার রোদ্দুর ধোয়া গালে’ গানটি।
শান্তনু বিশ্বাস যতবার তাঁর গান নিয়ে মঞ্চে উঠেছেন গত এক যুগেরও বেশি সময় ধ’রে, প্রত্যেকবার যে গানটি গেয়ে অনুষ্ঠান শেষ করতেন, সেই গানটি ছিল ‘কাঠালচাঁপার গন্ধে বিভোর বাতাস’। এই গানটিকে তাঁর মুগ্ধ শ্রোতারা চেনেন, শান্তনু বিশ্বাসের ঝরমহধঃঁৎব ঝড়হম’’ হিসেবে। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁরই কন্যা পৃথা বিশ্বাস ওর বাবার পছন্দের পথ ধ’রে এই গানটি গেয়েই গানের পর্বের সমাপ্তি টানেন। পৃথা বিশ্বাস হয়তো শখের শিল্পী হিসেবেই গানের চর্চা করেন, তবে সেদিন ‘কাঠালচাঁপার গন্ধে…’ গানটি যেন শুধু তার কণ্ঠনিঃসৃত নয়, হৃদয় থেকে উৎসারিত হলো। পুরো মিলনায়তনভর্তি শ্রোতা-দর্শক তার আবেগকে অনুভব করতে পেরেছিলেন; খুব কম সংখ্যক শ্রোতাই তার গান শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এভাবেই শান্তনু বিশ্বাসের গান গীত হোক, চর্চিত হোক তাঁর কন্যাদের কণ্ঠে, এ প্রজন্মের অন্যান্য শিল্পীদের কণ্ঠে। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন প্রবীর পাল। মিলনায়তনে অনুজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা থাকলে শিল্পীদের সাথে দর্শক-শ্রোতার পরিবেশনগত যোগাযোগটি আরেকটু ক্রিয়াশীল হতো। এর বাইরে পুরো অনুষ্ঠানটিতে আন্তরিকতা আর শান্তনু বিশ্বাসের প্রতি আবেগ-ভালবাসার ছাপ স্পষ্টতই দৃশ্যমান ছিল।
জন্মতারিখ আর মৃত্যুতারিখের মধ্যিখানে যে ‘ড্যাশ’টুকু থাকে, সব ছাপিয়ে ওটুকুই মুখ্য। এই নাতিদীর্ঘ ‘ড্যাশ’টুকু যাঁর যতবেশি ঋদ্ধ থাকে, তাঁর অমরত্ব ততবেশি দীর্ঘায়ত হয়।’ড্যাশ’এর উজ্জ্বলতার কাছে মৃত্যুতারিখ আবছায়া হয়ে যায় আর জন্মতারিখটা আরেকটু আলো পায়। তাই তারিখ নয়, সেদিন সন্ধ্যায় কীর্তিমান শান্তনু বিশ্বাস’এর ওই ‘ড্যাশ’টুকুই উদযাপন করলাম আমরা সকলে, যারা তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসি গভীরভাবে। অন্তরালে তিনি আছেন আপাতত…গান আর নাটকের সিঁড়ি বেয়ে হেঁটে উঠছেন প্রিয় কোনো প্যাশন অভিমুখে, তবে তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে শান্তনু বিশ্বাস বারবার ফিরেফিরে আসবেন এই ‘স্মৃতির শহরে’।

x