শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি সংরক্ষণ জরুরি

শনিবার , ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:০৬ পূর্বাহ্ণ

একাত্তরে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিজয় যখন দ্বারপ্রান্তে, একে একে বিভিন্ন জেলা থেকে আসছিল বিজয়ের খবর, ঠিক সেই সময় পরাজয় নিশ্চিত জেনে নতুন জাতি যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে তারই ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীরা। শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ দেশের মেধাবী সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতাসংগ্রামের সূচনা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বিজয়ের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা হারিয়েছি অধ্যাপক জি সি দেব, মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশীদুল হাসান, ড. আনোয়ার পাশা, সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, নিজামুদ্দীন আহমদ, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, সেলিনা পারভীনসহ আরও অনেককে। তাঁরা সবাই ছিলেন চিন্তা ও মানবতার দিশারী। আজ সেই বিশেষ দিবস। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। প্রতি বছরেই ১৪ ডিসেম্বর দিনটিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭১ সালের দশ থেকে চৌদ্দ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদেশের প্রথম শ্রেণির সকল বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। এমন কর্মকাণ্ডের মধ্যে এদেশের রাজাকার, আল বদর, আল শামস, বাহিনীর অসংখ্য লোকেরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল।
আজকের এই দিবসটিকেই বেদনা-জর্জরিত গৌরবের ইতিহাস মনে করে স্মরণ করা হয়। আর ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সব অবিচার ও সকল প্রকার মানবিক নিগ্রহ অবশ্যাম্ভাবী রূপেই বিদ্রোহ, বিপ্লব কিংবা অভ্যুত্থানের সঙ্গে এমন কি দেশপ্রেম সমূহকে বিখণ্ডিত করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে। সুতরাং- এই বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শুধু কয়েকটি প্রাণ নেওয়া হয়নি, পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল পুরো একটি জাতিকে। জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে সেই শূন্যতা আমরা আজও অনুভব করে চলেছি। তাঁদের হারিয়ে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাঁদের স্বজনেরাও বয়ে চলেছেন এক খণ্ডিত জীবনের ভার। আমরা তাঁদের শোকের সমব্যথী, আমরা তাঁদের ত্যাগের উত্তরাধিকারী।
ইতিহাসবিদদের মতে, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্তিম আঘাত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতা অর্জনের পর গত ৪৮ বছরেও জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা যায়নি। ফলে বাঙালি আজো জানতে পারলো না, জাতির কতজন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হত্যা করেছে পাকিস্তানীরা।
শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার শেষ হয়েছে, বাংলাদেশ আজ কলঙ্কমুক্ত হলেও এখনো দায়মুক্ত নয়। সেই সব মেধাবী মানুষেরা বেঁচে থাকলে আজ হয়তো বাংলাদেশকে আমরা একটি উচ্চতর জায়গায় দেখতে পেতাম। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হয়তো এখন বাংলাদেশের নামও উচ্চারিত হতো। তাদের অস্তিত্ব অনুভব করবে জাতি বার বার, তাদের নাম প্রতিধ্বনিত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর, তাঁদের উপস্থিতি থাকবে কাল থেকে কালান্তর। ইতিহাসবিদদের মতে, পাকিস্তানী শাসক ও শোষক চক্রের অন্যায় অত্যাচার ও শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাঁরা ছিলেন দিক নির্দেশক এবং সোচ্চারকণ্ঠ। ১৯৬৭ সালের আগস্ট মাসে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হামুদূর রহমান আরবি হরফে বাংলা ও উর্দু লেখার সুপারিশ করলে সেটার তীব্র প্রতিবাদ জানান বুদ্ধিজীবীরা। পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের সংহতি বৃদ্ধির অজুহাতে রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করা হলে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তৎক্ষণাৎ এই ভাষা সংস্কারের কঠোর প্রতিবাদ জানান। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সাহিত্যের ওপর আসে সামপ্রদায়িক আঘাত; তখন প্রতিবাদে ফেটে পড়েন বুদ্ধিজীবীরাই। বুদ্ধিজীবী মহলের এমন সাহসী প্রতিবাদ জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশে তুমুলভাবে সাহায্য করেছিল। তাঁদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলেই জনগণ ধীরে ধীরে নিজেদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে থাকে। যা পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। এ কারণে বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন। জাতি লক্ষ করেছে, যুদ্ধের শুরু থেকেই মেধাবী ধীমান ব্যক্তিবর্গের প্রতি পাকবাহিনীর ছিলো সীমাহীন ক্ষোভ।
আমরা জাতির সেই দিকনির্দেশক শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই ও তাঁদের স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণের দাবি জানাই। পাশাপাশি প্রত্যাশা করছি, তাঁদের অনুসৃত পথেই দেশকে পরিচালনায় সচেষ্ট থাকবে বর্তমান সরকার।

x