শঙ্খতীরে চলছে নৌকা তৈরির কাজ

মুহাম্মদ এরশাদ, চন্দনাইশ

বৃহস্পতিবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ

বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সময় এখনো অনেক বাকি। এখন চলছে শীতকাল। শুস্ক মৌসুমের এসময় বাংলাদেশের প্রায় নদী ও খালে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। অনেক নদী ইতিমধ্যে শুকিয়ে গেছে। তেমনি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান নদী শঙ্খনদীতে পানি কমে অনেক স্থানে জেগে উঠেছে চর। তাই এসময় নদীতে নৌকা চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। বিপরীতে বর্ষা মৌসুমে এই শঙ্খনদী আগ্রাসী রূপ ধারণ করে। তখন শঙ্খ উপকূলবর্তী নৌকার মাঝি, জেলে ও কৃষকদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠে নৌকা। তাই এই শুকনো মৌসুমে শঙ্খতীরবর্তী শত শত নৌকার মাঝি, জেলে ও কৃষকরা পুরোদমে তাদের পুরোনো নৌকা মেরামতে নেমে পড়েছেন। আবার অনেকই তৈরি করে নিচ্ছেন নতুন নৌকা।
শঙ্খতীরবর্তী ধোপাছড়ি, দোহাজারী পৌরসভা, বৈতরণী, পুরানগড়, বাজালিয়া, ধর্মপুর, আলমগীর, মাইঙ্গ্যাপাড়া, কালিয়াইশ, পূর্ব কাটগড়, মৈশামুড়া, মরফলা, নলুয়া, ঢেমশা, চাগাচর, লালুটিয়া, খাগরিয়া, বৈলতলী, জাফরাবাদ, বরমা, আমিলাইশ এলাকাসমূহে এখন পুরাতন নৌকা মেরামত ও নতুন নৌকা তৈরির ধুম পড়েছে। সবাই শুস্ক মৌসুমের এ সময় অলস বসে না থেকে আগেভাগে নিজেদের নৌকা মেরামত অথবা নতুন নৌকা তৈরি করে প্রস্তুত রাখছেন। কারণ বর্ষা মৌসুমে নৌকা মেরামত কিংবা নতুন তৈরি করা যায়না।
শঙ্খতীরবর্তী নৌকার মাঝি, জেলে ও কৃষকদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, প্রতিবছরই পুরাতন নৌকা মেরামত করতে হয়।
অন্যথায় বর্ষা মৌসুমে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। এছাড়া স্থানীয় লোকজন নৌকা নিয়ে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ মূল্যবান গাছ, বাঁশ ও লাকড়ি আহরণেও মেতে উঠেন। তাছাড়া বর্ষা মৌসুমে নৌকা প্রস্তুত থাকলে মাসিক ভিত্তিতে অনেকেই নৌকা ভাড়ায় নিয়ে যায়। নৌকা বড় ছোট হিসেবে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
শঙ্খনদীর ধোপাছড়ি ঘাটের ইজারাদার মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বাবুল জানালেন, প্রতি শীত মৌসুমে পুরোনো নৌকাগুলো মেরামত করতে হয়। চলতি মৌসুমে তিনি ইতিমধ্যে ১টি বড় নৌকা মেরামত সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া ছোট-বড় আরো ৩টি নৌকা মেরামত করে বর্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, ছোট অর্থাৎ ৫০/৬০ মন ধারণ ক্ষমতার নৌকা মেরামতে বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। সমপরিমাণ নৌকা নতুন তৈরি করতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রয়োজন হয় বলে জানালেন তিনি। এছাড়া বড় অর্থাৎ ২শ মনের অধিক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন নৌকা তৈরিতে লক্ষাধিক টাকা এবং মেরামতে ৩০ হাজার টাকার পর্যন্ত প্রয়োজন হয় বলে জানালেন তিনি। এখন নৌকা কারিগরদের দামও অনেক বেড়ে যায়।
“হাত” হিসেবে নৌকা মেরামতের মজুরী নির্ধারণ হয়। প্রতি হাতে ১০০ টাকা প্রদান করতে হয়। এভাবে প্রতিটি বড় নৌকা মেরামতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার উপরে কারিগরদের মজুরী দিতে হয়। এমনকি চলতি মৌসুমে নৌকা মেরামত করে যাওয়ার সময় কারিগরদের আগামী মৌসুমের জন্য অগ্রিম টাকাও প্রদান করতে হয়। অন্যথায় ঠিক সময়ে কারিগর পাওয়া কষ্ট হয়ে পড়ে।
নৌকা তৈরি ও মেরামতের কারিগর মনোরঞ্জন দাশ জানালেন, তিনি ৪০ বছর ধরে নৌকা মেরামত ও তৈরী করে আসছেন। প্রতি মৌসুমে তার ভালই ইনকাম হয়। এতে কম করে হলেও ছোট বড় প্রকারভেদে ১০টি নৌকা মেরামত ও তৈরি করতে পারেন। ছোট নৌকা তৈরিতে ১০ থেকে ১৫ দিন এবং বড় নৌকা তৈরিতে ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে।
তিনি জানালেন নৌকা তৈরিতে বিশেষ করে সুরুচ, পিত্তরস, ছামালিশ গাছ বেশি ব্যবহার হয়। এসব গাছের নৌকা দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাছাড়া মেহগনি গাছ দিয়েও নৌকা তৈরি হয়। তবে তা বেশিদিন স্থায়ী হয়না। তিনি ছোট নৌকা তৈরিতে ১০ থেকে ১২ হাজার এবং বড় নৌকা তৈরিতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরী পান বলেও জানালেন।

x