লোডশেডিং : বাঁশখালীতে জনজীবন বিপর্যস্ত 

বাঁশখালী প্রতিনিধি

মঙ্গলবার , ৮ মে, ২০১৮ at ৩:৪২ পূর্বাহ্ণ
93

বাঁশখালীতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও অফিস আদালতে কাজকর্মে নেমে এসেছে স্থবিরতা। হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অবস্থার আরো অবনতি হচ্ছে। গরমে অতিষ্ঠ শিশু ও বৃদ্ধদের মাঝে বাড়ছে রোগবালাই। উপজেলার প্রায় ৬২ হাজার গ্রাহক দৈনিক গড়ে কয়েক ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে বারবার অভিযোগ করা হলেও মিলছে না কোনো প্রতিকার। এছাড়া কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও একটু ঝড় বৃষ্টি হলেই তা আবারো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। এদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে লাইট, টিভি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে বলে জানা গেছে।

পল্লী বিদ্যুৎ বাঁঁশখালী জোনাল অফিস সূত্রে জানায়, বাঁশখালীতে বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৬২ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৫২ হাজার, বাণিজ্যিক ৫ হাজার, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ১ হাজার, বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিল্প প্রতিষ্ঠান ৪ শতাধিক এবং সেচ সংযোগ ৪৮৩টি। এছাড়া রয়েছে পৌরসভার অধিকাংশ সড়ক বাতি। এখানে ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র ১টি (২০ এমভিএ)। বর্তমানে ৩টি সাবস্টেশন চালু করা হয়েছে। আরেকটি সাবস্টেশন চালু প্রক্রিয়াধীন। তবে এসব সাবস্টেশনের সর্বোচ্চ লোড ক্ষমতা ১৭.৫০ মেগাওয়াট। ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলার প্রায় ১৫০টিরও অধিক গ্রামকে ইতোমধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা হয়েছে। গত জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রায় ৬ হাজার নতুন সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

তবে বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, সাধারণ গ্রাহকরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করে বিদ্যুৎ না পেলেও বিদ্যুৎ বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় দালাল চক্র মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন বাসাবাড়ি, দোকান ও খামারে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ প্রধান করেছে। এছাড়া চক্রটি বিভিন্ন ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রেখে নিয়মিত শেখেরখীলের একটি বরফ মিলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলার খানখানাবাদ, কালিপুর, বৈলছড়ি, কাথরিয়া, ছনুয়া, সাধনপুর, গণ্ডামারা, শেখেরখীল ও শীলকূপসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরে নতুন মিটার বসানো হয়েছে; তবে এখনো সংযোগ দেয়া হয়নি। অনেকে অভিযোগ করে বলেন, সরকারিভাবে প্রতি কিলোমিটার নতুন সংযোগ ও মিটার বাবদ ৮৫০ টাকা ধার্য থাকলেও অনেকের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অনেক গ্রাহক শহর বা অন্য কোনো স্থানে অবস্থান করার ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও তাদের ‘ভুতুড়ে বিল’ ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও উঠেছে।

এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর থাকলেও সরকারি ভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি তেলের ব্যবস্থা না থাকায় লোডশেডিংয়ে স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত এবং হাসপাতালের মূল্যবান অনেক মেশিনারিজ নষ্ট হচ্ছে বলে জানা গেছে। অনেক সময় রোগীকে অপারেশন করার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে তার মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া রক্ত, প্রসাব ও কফসহ বিভিন্ন কিছুর পরীক্ষানিরীক্ষা সময় মত করাতে না পারায় রোগীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

লোডশেডিং ও বিভিন্ন অনিয়মের ব্যাপারে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি১ বাঁশখালী জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. নাইমুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি ভাবে মিটার নিতে মাত্র ৮৫০ টাকা লাগে, কেউ যদি অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে তাহলে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের বর্তমান সমস্যা আমাদের সৃষ্ট না। এটি চন্দনাইশ গ্রিডের সমস্যা। কারণ দোহাজারী থেকে সাতকানিয়া হয়ে দীর্ঘ ৪৫ কিলোমিটার অতিক্রম করে বাঁশখালীতে বিদ্যুৎ আসে। এর মধ্যে পাহাড়ি রাস্তা ও বিভিন্ন দুর্যোগে লাইন নষ্ট হলে জনবল সংকটের কারণে তা মেরামত করতে দেরি হয়ে যায়। এছাড়া এই গ্রিড ৩০ মেগাওয়াট লোড নিতে পারে। এর মধ্যে ইনকামিং ব্রেকারে কারিগরি সমস্যার কারণে তা সম্পূর্ণ লোড নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে আমরা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছি। এতে লোডশেডিং হচ্ছে অতিরিক্ত।’ তিনি আরো বলেন, ‘৩৯৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই বাঁশখালীতে চাহিদা অনুসারে দৈনিক ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন। সেখানে আমরা পাচ্ছি প্রায় ১৮ মেগাওয়াট। আমাদের উপজেলা সদরের জোনাল অফিস ও সাবস্টেশনসহ ৫টি অফিসে মাত্র ৬০ জন কর্মকর্তা কর্মচারী আছেন। এই অল্প সংখ্যক জনবল দিয়ে পুরো বাঁশখালীতে বিদ্যুৎ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য আমাদের আরো ১২ থেকে ১৫ জন লোক দরকার।’ নাইমুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের লাইনম্যান আছে মাত্র ২২ জন। স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে গেলে আরো ৮ থেকে ১০ জন লাইনম্যান প্রয়োজন। এছাড়া ইলেকট্রেশিয়ান রয়েছে মাত্র ২৪ জন। আরো ২৬ জন ইলেকট্রেশিয়ানের প্রয়োজন। জনবল ঘাটতি থাকার কারণে একটু সমস্যা হচ্ছে।’ ইলেকট্রেশিয়ান আরো বাড়নো গেলে দালালের সংখ্যা কমে আসত বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘আনোয়ারা শাহমীরপুর থেকে তৈলারদ্বীপ ব্রিজ সংলগ্ন সাঙ্গু নদী ক্রস করে আরেকটি ৩৩ হাজার কেভির নতুন লাইন বাঁশখালীতে আনার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর ডিজাইনের কাজও চলছে। এটা যদি হয়ে যায় তাহলে খুব শীঘ্রই বাঁশখালীবাসীর বিদ্যুৎ সমস্যা অনেকটা সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্থানীয় সাংসদ আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বাঁশখালীবাসী যাতে নিয়মিত বিদ্যুৎ পায় সেজন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আশা করছি অচিরেই বাঁশখালীবাসী শতভাগ বিদ্যুৎ সুুবিধা পাবে।’

x