লোডশেডিংয়ের স্থায়ী সমাধান চাই

শুক্রবার , ২৫ মে, ২০১৮ at ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
73

গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতেই বাড়তে শুরু করেছে লোডশেডিং। একদিকে চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান, অন্যদিকে ঝড় বৃষ্টির কারণে সঞ্চালন লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বিঘ্ন ঘটছে বিদ্যুৎ সরবরাহে। দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে লোডশেডিং বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে। জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১৬ হাজার ৪৬ মেগাওয়াট। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে গত ১৯ মার্চ। ওই দিন ১০ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ আবার ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায়। এর বাইরে রয়েছে সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ের সিস্টেম লস। ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের পুরোটা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যমতে, গত ১৮ এপ্রিল বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৯ হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদনও হয়েছে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ। অর্থাৎ ওইদিন কোনো লোডশেডিং হয় নি বলে দাবি বিপিডিবির। এর পরবর্তী দু’দিনও একই তথ্য দিয়েছে বিপিডিবি। জাতীয় গ্রিডভুক্ত সঞ্চালন লাইন ও উপকেন্দ্রের ক্ষমতাও আগের চেয়ে বেড়েছে অনেক। ১৩২ ও ২৩০ কেভি সঞ্চালন পর্যায়ক্রমে ৪০০ কেভিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। বিপিডিবির তথ্যমতে, বর্তমানে গ্রিডের ৪০০/২৩০ কেভি উপকেন্দ্রের ক্ষমতা ১ হাজার ৫৬০ এমভিএ, ৪০০/১৩২ উপকেন্দ্রের ক্ষমতা ৬৫০ এমভিএ, ২৩০/১৩২ উপকেন্দ্রের ক্ষমতা ১০ হাজার ৮২৫ এমভিএ এবং ১৩২/৩৩ উপকেন্দ্রের ক্ষমতা ১৬ হাজার ৯৮০ এমভিএ। তবে গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও তা বিদ্যমান ক্ষমতার বিদ্যুতের পুরোটা সঞ্চালনের উপযোগী নয় বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় লোড ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের (এনএলডিসি) সঙ্গে গ্রিডে যুক্ত বিদ্যুৎগুলো সার্বিক সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত ডিজেল ভিত্তিক অনেকগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত নয়। এসব কেন্দ্র থেকে ৩৩ কেভি বিতরণ লাইনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। পত্রিকান্তরে এসব তথ্য সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

গ্রীষ্মের দাবদাহ এখনো শুরু না হলেও দেশজুড়ে যে চিত্র দেখা দিয়েছে, তাতে আসন্ন রমজান ও পরবর্তী সময়ে লোডশেডিংয়ের কারণে দুর্ভোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এখনো চাহিদাও উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান বিদ্যমান, সঙ্গে তো রয়েছেই অবকাঠামোগত দুর্বলতা। লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রায় যেমন দুর্ভোগ বাড়ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প ও কৃষি উৎপাদন। সবচেয়ে বেশি লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। বর্তমান সরকারের অধীনে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, তবে সংকট নিরসনে তা যথেষ্ট নয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে অনেক কম। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে গত ১৯ মার্চ। ১০ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট। কিন্তু চাহিদা এর চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালন, সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে সিস্টেম লসের মধ্যে দিয়ে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে আরো কম। ফলে হয় লোডশেডিং। বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা বার বার স্থায়ী ব্যবস্থার কথা বলে আসছেন। কিন্তু সরকারের আগ্রহ কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতি। অথচ এতে যতটা সুফল পাওয়ার কথা, ততটা পাওয়া যাচ্ছে না। বেসরকারি খাতে আরো বেশ কিছু রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন পাচ্ছে বলে জানা গেছে। তেলভিত্তিক এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করলে স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হলেও, তার জন্য উচ্চমূল্যও দিতে হয়।

এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হয় বিপিডিবিকে। এতে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বাড়ছে। তাই বার বার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয় বিপিডিবিকে। এতে জনদুর্ভোগ আরো বাড়ে। কেননা বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব জীবনযাত্রার সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন বা বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতার উন্নতি না ঘটিয়ে কুইক রেন্টালের সংখ্যা বাড়িয়ে তুললে তা এক সময় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য। তাই এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারের উচিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করতে জোর পদক্ষেপ নেওয়া। যেসব কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তার সমাধান করা। অন্যদিকে নির্মাণাধীন বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো যেন নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে আসতে পারে, তা নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী দিনের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ছাড়া সম্ভব হবে না। এছাড়া আগামী দিনের সংকট মোকাবেলায় কীভাবে সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী উপায়ের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে অবকাঠামোগত দুর্বলতা রেখে দিলে উৎপাদন বাড়লেও গ্রাহক এর সুফল ভোগ করতে পারবে না। বর্তমানে লোডশেডিংয়ের পেছনে অবকাঠামো দুর্বলতা অন্যতম কারণ। গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও তা বিদ্যমান ক্ষমতার বিদ্যুতের পুরোটা সঞ্চালনের উপযোগী নয়। জাতীয় লোড ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের সঙ্গে গ্রিডে যুক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সার্বিক সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত ডিজেলভিত্তিক অনেকগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত নয়। দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে চাইলে এসব বিষয়েও নজর দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জোর দিতে হবে সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থার ওপর। সামনে রোজা ও বিশ্বকাপ ফুটবল রয়েছে। এ সময় স্বাভাবিকভাবেই শহর ও গ্রামাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রত্যাশা বাড়বে। এটি পূরণে এবং গ্রীষ্মের সময় লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কর্তৃপক্ষের উচিত এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে খুঁজতে হবে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান।

x