লোকায়ত জীবন শিল্পী কবিয়াল রমেশ শীল

অধ্যাপক এ ওয়াই এম জাফর

শুক্রবার , ১ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
37

শৈশব-কৈশোর : বাঙালি সামাজিক সাংস্কৃতিক ও মরমী জীবনকে লালন করে যে ক’জন লোককবি উদারনীতিক অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী সমাজ গঠন করার অঙ্গীকারে কাজ করে গেছেন তাঁদের মধ্যে কবিয়াল রমেশ শীলের অবস্থান নিঃসন্দেহে অনন্যতার দাবি রাখে। চট্টগ্রাম পটিয়া অঞ্চলের গ্রাম্য কবিরাজ চন্দ্রীচরণ শীল বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদন্ডির রাজকুমারী দেবীকে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি চলে আসলে, তাদের ঘরে জন্ম নেন কবিয়াল রমেশ শীল ১৮৭৭ সালে। সাত বছর বয়সে স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়ে একটু বড় হয়ে উঠতে তাঁর গানের প্রতি ঝোঁক দেখে পিতা তাঁকে কিছু গানের বই এনে দিলে ‘তর্জার লড়াই’ বইটি তাঁর কিশোর মনকে আকর্ষণ করে এবং সন্ধ্যায় পিদিমের আলোয় বাবার উৎসাহে তর্জার চর্চাও শুরু করেন সাথী বন্ধুদের নিয়ে। কিন্তু পিতার হঠাৎ মৃত্যু তাঁর সে আনন্দ দিনের সমাপ্তি শুধু ঘটায় না চতুর্থ শ্রেণিতে তাঁর পড়ারও ইতি ঘটায়। উপরন্ত বাড়ির একমাত্র পুরুষ হিসেবে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে বর্তালে দিদিমা মা তিন বোনকে নিয়ে এগার বছরের কিশোর শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে, পালিয়ে বার্মা চলে যান এবং সেখানে সাত বছর অবস্থান করে ১৯ বছর বয়েসে ১৮৯৫ সালে চট্টগ্রামে ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাসের সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন দেশে।
কবিয়াল সত্ত্বর উন্মেষ: দেশে এসে উপান্তর না দেখে এবার রমেশ পৈত্রিক পেশা বাতফোঁড়া কাটার কবিরাজী ও ফকিরী ওষুধের ব্যবসা দিয়ে সংসার চালানো শুরু করেন। বন্ধুদের সাথে ‘তর্জার লড়াই’র সেই চঞ্চল স্মৃতি তাঁকে ছাড়ে না। তাই সন্ধ্যা হলেই পূর্বের মতো বন্ধুদের নিয়ে তর্জার আদলে ছন্দ পদ মিলিয়ে গান শুরু করেন। তখন বয়স ২১, সময় ১৮৯৭। সদর ঘাটের জগদ্ধাত্রী পূজায় কবিগানের খবরে সাথী বন্ধুসহ ছুটে যান। জনপ্রিয় কবি চিন্তাহরণ আর মোহন বাঁশীর লড়াই। মঞ্চের আলোয় অপলক চেয়ে থাকেন। মন দিয়ে শোনেন বাক্য। নিজেকে মেলাতে চেষ্টা করেন। আসে ১৮৯৮ সাল। সদরঘাটে এ বছরও জনপ্রিয় সে দুই কবির লড়াই। কুয়াশার রাতে শীতের প্রকোপে জড়োসরো দর্শক। মেন্থল লাইটের আলোও কুয়াশার চাদরে অনেকটা ফিকে। মঞ্চের নায়ক চিন্তাহরণ সরকারের গলা শীতের তীব্রতায় বসে গেলে মাইকবিহীন কণ্ঠ দর্শকমাঝে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। উদ্যোক্তারা কেউ কবিগান গাইতে পারলে মঞ্চে উঠে আসতে অনুরোধ করলে বন্ধুরা রমেশকে সাহস দিয়ে ঠেলে মঞ্চে তুলে দেয়। মোহনবাঁশী অপরিণত অপরিচিত রমেশকে দেখে পরিচয়ের পালাতেই ‘পুঁচকে ছোঁড়া’ ‘নাপিত’ সম্বোধন করে তার মনোবল ভেঙ্গে দিতে চাইলেও রমেশ স্থির দাঁড়িয়ে শুরু করেন-
পুঁচকে ছোড়া সত্য মানি
শিশু ধ্রুব ছিল জ্ঞানী
চেনা জানা হোক না এ আসরে’
তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞাভরে রমেশকে নিলেও রমেশের বাক্যালাপ, যুক্তিবান, শব্দ প্রয়োগ সচেতন হয়ে উঠেন মোহনবাঁশী। কিন্তু রাত যায় ভোর হয়, সকাল গড়িয়ে বিকেল, শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তারা আপোষী জোটক করিয়ে গানের সমাপ্তি ঘটালে রমেশ রাতারাতি বনে যান নতুন কবির সরকারে। আসে ১৮৯৯ সাল। চট্টগ্রামে কিছু তরুণ তিন কবির বিরুদ্ধে একক রমেশের লড়াই’র আয়োজন করে আর রমেশ তিনজনের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন। হয়ে উঠেন জনপ্রিয়। আর এ জনপ্রিয়তা তাঁর অপরিহার্যতাও এনে দেয়। এ সময়ের কথা বলতে কবি বলেন-
‘উৎসব কি পাল পার্বনে
নানা রকম বাদ্য গানে
আনন্দে কাটাতাম দিবারাতি’
এই ভাবে রমেশের সময় যখন কাটছিলো তখন শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৮১৪। চার বছর স্থায়ী এ যুদ্ধ বিশ্বমানবতাকে ভুলুণ্ঠিত করে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় মানুষের সুখ শান্তি আনন্দ উল্লাস। তৈরি হয় সুবিধাভোগী নতুন জমিদার ফরিয়া শ্রেণী আর জনগণের আনন্দ উল্লাস তাদের ঘেরাটোপে হয় বন্দী। মানুষের জীবন ধারণ যেখানে অসহনীয় সেখানে কবিগানের আয়োজন তো বিলাসীতা। রমেশ ও কবিকুল অসহনীয় দুর্দশায় পতিত হন। উদ্ধারের কোন পথ নেই। এই অবস্থায় রমেশের মনে পড়ে ভান্ডারী ভক্ত সারদার কাছে শোনা বিপথতাড়িনী, মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক, মানবসাম্যের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নাকি মাইজভান্ডার, সেখান থেকে কেউ খালি হাতে ফিরে না। তাই বিপর্যস্ত রমেশ ৪৬ বছর বয়সে ১৯২৩ সালের ২২ জানুয়ারি ৯ই মাঘ মাইজভান্ডার বড় ওরস ১০ই মাঘের আগের দিন যান বন্ধু সারদার সাথে। তখন এ দরবারের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান পুরুষ গাউসূল আযম মাইজভান্ডারী স্রষ্টার দিদারপ্রাপ্ত ১৯০৬ সালে। দরবারে সমাসীন তাঁরই ভ্রাতৃষ্পুত্র ও ফয়েজপ্রাপ্ত গাউসূল আযম বিল বিরাসত হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভান্ডারী। চারিদিক আলো করে করুণা বিতরণ করে চলেছেন। রমেশ নিজের জবানীতে বলেন- “গদীর উপর….. অতি উজ্জ্বল এক পুরুষ নির্বাক। সিদ্ধ বলে মেনে নিলাম। ….. কে যেন কানে কানে বলল এই মাইজভান্ডারের ভক্তগণকে গান শোনা।”
রমেশ এখন দোয়াত কলম কালি বিহীন সিনায় লেখা পড়ার হেকমতি ডিগ্রিধারী। বিদ্যুত চমকে ঐশী জ্ঞান ভাবের অধিকারী। নিজে নয় কে যেন তাঁকে চালায় লেখায়। এ কী ‘ইলমে লুদুনি’ সঞ্চারিত তাঁর মাঝে? রমেশের কলম লিখে চলে-
রমেশের পাপ নয়নে ফুল দেখেছে ভাগ্যের গুণে
ডালপালা তার ত্রিভূবনে শূন্যেতে তার মূল ॥
কে যেন বলে শ্রদ্ধা জানা-
প্রণমি চরণে দ্বীনহীন সন্তানে
বিশ্বপতি তুমি পরম দয়াল ॥
তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন, যদি সেবা তাঁর ভাগ্যে জুটে!
জুড়িয়া অনন্ত রাজ্য করিতেছ খেলার কার্য্য
আমার ভাগ্যে সেবার কার্য হইলনা ॥
ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানী রমেশ বুঝতে পেরেছিলেন- সে ঐশী ইস্কুলের ছাত্র হতে প্রক্রিয়া রপ্ত করতে হবে। তাই শুদ্ধ প্রক্রিয়ায় ভান্ডারীর সেবায় নিবেদন-
তুমিত দয়ার সিন্ধু আমিত পতিত জন
দান দাসে কৃপা বিন্দু, নিয়েছি তোমার স্মরণ
মনের মধ্যে মওলার চরণ স্মরণে রেখে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হন-
মাওলা তুইরে তুই
আউয়ালে আখেরে মাওলা তুইরে তুই ॥
তাই মুনিবের পাককদমে বার বার ফরিয়াদ জানান-
মুর্শিদ ও নিদানের মুর্শিদ এই দাসে কবুল করলানি ॥
প্রায় দু’দশক ধরে রমেশের মাইজভান্ডারী গান পাওয়া যায় আটটি গ্রন্থে ‘আশেক মালা’, ‘শান্তি ভান্ডার’, ‘মুক্তির দরবার’, ‘নুরে দুনিয়া’, ‘জীবন সাথী’, ‘সত্য দর্পণ’, ‘এস্‌কে সিরজিয়াকে’ ধরলে চারশ’র মতো গান পাওয়া যা আর মরমী গানকে হিসেবে নিলে তা অর্ধ সহস্রাধিক হয়। তাছাড়া তিনি কবি গান, দেশের গান, আঞ্চলিক গান, পল্লীগীতি, কবিতা রচনা করে এ দেশের লোক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
রমেশের পূর্বে হযরত গাউসূল আযম ১৮২৬-১৯০৬ এর মধ্যবর্তী সময় থেকে তাঁকে কেন্দ্র করে সৈয়দ আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী, আব্দুল গণি কাঞ্চনপুরী, আব্দুস সালাম ভুজপুরী, মাইজভান্ডারী গান, গজল, কাওয়ালী মাইজভান্ডারী মাহফিলকে নিবেদনে উজ্জীবিত করে রাখতো দরবারী পরিমন্ডলে। রমেশ সে গানকে লোকায়ত জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
রমেশের দেশপ্রেম
দেশের প্রতি মমতায় তার দেশগীতিগুলো রচিত। বৃটিশ চক্রান্তে (১৯০৬) বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তার বেদনা-
বঙ্গভঙ্গ করোনা হিন্দু মুসলিম ভাই
মিলে মিশে চল সবে অভিযানে যাই ॥
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দুর্বিষহ ছবি ফুটে উঠে তাঁর এ লেখায়-
পাঁচ গজ ধুতি সাত টাকা
দেহ টেকা হয়েছে কঠিন
রমেশ কয় আঁধারে মরি
পাইনা কেরোসিন ॥
মূলত: রমেশ শীলের দেশাত্মবোধক গানগুলো লেখা শুরু ১৯১৯/১৯২১ সালের বৃটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন সময় থেকে-
বিভেদ আগুন দিয়া জ্বালি, ভাইয়ে ভাইয়ে ঘর ভাঙ্গালি
শোষণ করিস পোষণ ভুলি, তোকে পোষণ করা যায় না ॥
১৯৩০ সালের বীর প্রসবিনী চট্টলার সূর্য সন্তান মাষ্টার দা সূর্য সেনের পরাজয় এবং তারই প্রেরণায় চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে প্রথম স্বাধীন ভারতের পতাকা উড্ডয়ন মানুষের মনে যে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে তারই প্রতিভাস-
জালালাবাদ। জালালাবাদ।
শহীদ খুনে রাঙ্গা তুমি জালালাবাদ। জালালাবাদ।
৭০ এর দশকে, ৭০ এর উত্তাল দিনগুলোতে এ গান শিকল ছেঁড়ার গানগুলোর একটি ছিল। ২য় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) মানবতার বিরুদ্ধে তার পরিহাস এবং ৪৩’ এর মন্বন্তরের করুণ চিত্র ফুটে উঠে, কবির লেখায়-
পুত্র কন্যা বেচে পিতা
ছেলের আহার খাচ্ছে মাতা
দয়া নেইকো কাহারো পরানে ॥
ওদিক ৪৩’ এর দুঃখের দিনে কমিউনিস্টদের সোচ্চার কণ্ঠ অন্যান্য শিল্পী সাহিত্যিকদের সাথে রমেশকে কাছে টানে। এ সময়ই চট্টগ্রামের বাইরে ১৯৪৫ সালে সদলবলে বর্ধমান গিয়ে ‘কৃষক সম্মেলনে’ গান করেন। মুগ্ধ দর্শকরা একই বছর কলকাতার ফ্যাসিস্ট বিরোধী সম্মেলনে তাঁকে আমন্ত্রণ জানালে রবীন্দ্রনাথের পুরস্কারধন্য কবি শেখ গোমানীকে আপোষী জোটকে হারিয়ে রাতারাতি শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হন। তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিক সহ সে বাংলার মানুষের কাছে পছন্দের কবি দুঃখের সাথী হয়ে যান তিনি।
অসাম্প্রদায়িক রমেশ: ১৯৪৭। বৃটিশ ভারত ভাগ হয়ে ভারত পাকিস্তান হলে প্রতিবেশী অনেক হিন্দু ও কিছু কবি দলবলসহ ভারত চলে যান। কিন্তু রমেশ নিজদেশ ফেলে যান না। এ সময় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা তাঁর অনুভূতি এভাবে প্রকাশ পায়-
আর এ ঘর বাড়ি কারে দিতাম
আরে কন ভুতে পাইয়ে হিন্দুস্থান যাইতাম ॥
অথচ রমেশ তখন শেখ গোমানীকে হারিয়ে ৪৬’ ও ৪৭’ এ কলকাতা ও আশপাশের অসম্ভব প্রিয় ও সম্মানিত মানুষ।
তদুপরি কলকাতায় ৪৬’ এ দাঙ্গা শুরু হলে কলকাতার অলি গলিতে শেখ গোমানীকে নিয়ে সম্প্রীতির গান করেন এবং নোয়াখালী অঞ্চলে দাঙ্গা শুরু হলে তিনি সোচ্চার কণ্ঠে লিখেন-
মোদের এক গ্রামে বাস, করি এক মাঠে চাষ
আছে ভাষার মিলন মানবিক গঠন, কিসের ব্যবধান ॥
কিংবা
হিন্দু আর মুসলমান, বাংলা মায়ের দু’সন্তান
পাশাপাশি বাস করি দু’জনে।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার এত জীবন্ত রূপ এবং দেশের প্রতি এত মমত্ব সে সময়ের ক’জন লেখকের লেখায় উদ্ভাসিত? মূলতঃ তাঁর এ চিন্তা চেতনার সাথে মাইজভান্ডারী দর্শনের মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা বিশেষভাবে কার্যকর। ধর্মের জিগিরে সদ্য বিভাজনে প্রাপ্ত স্বাধীনতা অভাব অনটন হতাশায় পর্যুদস্ত হয়। তখন কমিউনিষ্ট মতাদর্শে যুক্ত সেই চিরপরিচিত অত্যন্ত জোরালো স্লোগান ‘এ আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ রমেশের বাস্তব জীবনকে নাড়া দেয়। বুঝতে পারেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা ধর্মের ঘেরাটোপেই বন্দী। সাধারণ মানুষের কল্যাণ গৌণ, মূল্যহীন। আর তার বাতাবরণ মাত্র ধর্ম। তাই রমেশ লিখেন-
সাদা চামড়া চলে গেছে
এখনও তার দালাল আছে
বুঝতে বাকী নাই কিছু আর ॥
আসে ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন। তাঁর কলমে ঝরে বাঙালির স্বাধীকারের প্রাধান্য, প্রায় পুরো দশক। লিখেন-
ভাষার জন্য জীবন হারালি বাঙালি ভাইরে
রমনার মাটি রক্তে ভাসালি ॥
(বাঙালি ভাইরে) বাঙালিদের বাঙলা ভাষা জীবনে মরণে
মুখের ভাষা না থাকিলে জীবন রাখি কেনে ॥
বায়ান্নের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, হৃদয় প্রথিত করা সুর ও বাণীর মতো এ গানের সুর ও বাণী বাঙালি প্রাণের মর্মমূলে আঘাত করে।
চুয়ান্ন সালের যুক্তফ্রন্টের সেই বিখ্যাত নির্বাচন। সবদল একাট্টা হয়ে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের থানায় থানায় তৎকালীন জাতীয় নেতারা যেমন ভোট চেয়ে বেড়িয়েছেন, সব নির্বাচনী সভায় বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে রমেশের গানও তেমন অপরিহার্য ছিল। ভোটে জিতলে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে অনেক নেতাকে জেলে পাঠায়, ৭৭ বয়সে রমেশও বাদ যান না। তাঁর ভোট রহস্যের ‘পুস্তকটি বাজেয়াপ্ত হয়, তাঁর ‘সাহিত্যিক’ ভাতা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং পূর্বেপ্রাপ্ত সমূদয় ভাতা ফেরত দেওয়ার নোটিশ প্রদান করা হয়। জেলে বসেই রমেশ লিখেন- আমি বাংলার বাংলা আমার ওতপ্রোত মেশামিশি
……… বাংলার জন্য জীবন গেলে হব স্বর্গবাসী।
শ্রমিক কৃষক জনতার প্রতি তাঁর ভালবাসা অকৃত্রিম-
চাষী করে মাছের চাষ, চাষী পালে মুরগী হাঁস
ছাগল ভেড়া সকল চাষীর ঘরে ॥

শ্রমিকদের প্রতি তাঁর দরদ কৃত্রিম, পোষাকী নয়-
রক্ত ঢালী শক্তিশালী করে যারা কারখানা
দুর্দিনে বেতন তাদের পেটের খোরাক পোষেনা ॥

কবির শেষ সময়ের দেশাত্মবোধক গানগুলোতে প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন এবং সে সময়ের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুুজিবুর রহমানের (তখনো বঙ্গবন্ধু হননি) ৬ দফার প্রতি জোরালো বাণী বহন করে-
সার্বজনীন ভোটে ভাই, প্রত্যক্ষ নির্বাচন চাই
আরো চাই আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ॥
এ মহান কবি দীর্ঘ ৬০ বছরের অধিক সময় কবি গানের সাথে থেকে কবি গানকে অশ্লীলতা মুক্ত করে, আদি রসাত্মক কাহিনী থেকে সরিয়ে বাস্তববাদী যুগোপযোগী ও সমাজ উন্নয়ন করে বোদ্ধা শ্রেণীর আগ্রহের অঙ্গন বানিয়ে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। তাই ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন’ ‘পূর্ব পাকিস্তান সংস্কৃতি সম্মেলন’ , ‘বুল বুল ললিত করা একাডেমি’ ‘লোক ও শিল্প উৎসবে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব তাকে সম্মানিত করেন। ১৯৪৬ সালে চট্টগ্রামে কবিকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয় সাহিত্যিক আবুল ফজলের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন কবি জসীম উদ্দিন। তাঁর প্রিয় দেশ তাকে ২০০২ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।
রমেশের অসাম্প্রদায়িকতা: এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় রমেশ যখন আত্মিক কোন যাতনায় বা মানসিক কোন চাপে থাকতেন বা বেশি আবেগ তাড়িত হতেন তখন অনেক সময় তাঁর লেখায় মায়ের মূল ভাষা, তথা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা প্রাধান্য পেত এবং সেই সময় তাঁর লেখায় মুসলমানের উপস্থিতিও বেশী প্রাধান্য পেত। তা’তে এটাই বুঝা যায় তিনি হিন্দু মুসলমানকে কখনো পৃথক ভাবেননি বরঞ্চ সে সময়ের লেখায় তাদের সাথে অধিক মাখামাখির ছাপ স্পষ্ট যা সে সময়ের স্বনামখ্যাত অনেক লেখকের লেখায় দুঃখজনক ভাবে অনুপস্থিত। যেমন-
রস্যার বাপরে রস্যার বাপ উপায় কি ভাই রস্যার বাপ
বুদ্ধি দে ভাই কোন প্রকারে এবার জান বাঁচাই।
একেত বরিষার কাল দারুন আষাঢ় মাস
পোয়া ছা লই হইলাম তিন অক্তর উয়াস।।
বা
এই বরিষাত আমার তালাস লইয়রে হাছন্যার বাপ
(হাছন্যার বাপরে) হালর গরু বেচি খাইলাম দারুণ ভাতর জ্বালা
বৌয়র গঅনা বেচি খাইলাম বৌয়র সোনামুখ কালা
কিংবা
হুইন্ননিরে গুইন্যার বাপ,
ভোট দিবাল্যাই কই পাডাইয়ে-
তা ছাড়া সেই জনপ্রিয় গান
আঁধার ঘরত রাইত কাডাইয়ম কারে লই
বন্ধু গেলে গই,
খাইল্যা ঘরত রাইত কাডাইয়ম কারে লই।।
১৯৬৭ সালের দিকে কবির অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাগেরহাটের ভান্ডারী ভক্ত ফকির আরশাদ আলী তালুকদার স্বপ্নে কবির শেষ সময়ের সংবাদ পেলে তাঁকে দেখার জন্য রমেশের বাড়ি চলে আসেন এবং স্বপ্নের কথা কবিকে বর্ণনা করেন। কিন্তু কবি বলেন, “বন্ধু, আজ ২২ চৈত্র, বাবা ভান্ডারী গেছেন, আমার দেহত্যাগের সময় আজ নয়।” দু’বন্ধু একে অপরকে গভীর মমতায় চোখের জলে মুখে তুলে বিস্কিট খাওয়ান। পরদিন ২৩ চৈত্র দরবার থেকে আতর গোলাপজল নিয়ে পুনরায় আরশাদ আলী ফকির দরবার থেকে ফিরে এসে দেখেন বন্ধু দেহত্যাগ করেছেন, শবাসনে উপবিষ্ট। রমেশ কী করে জানলেন তিনি বাবা ভান্ডারীর ওফাতের দিন ২২শে চৈত্র মৃত্যুবরণ করবেন না। ভান্ডারী ভক্ত হয়ে তিনি কী সে ঐশী ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে তিনি দাহ করতে নিষেধ করেছিলেন, কবর দিতে বলেছিলেন।
উপরোক্ত ঘটনা এবং তাঁর জীবনের চলমানতার প্রতিটি ধাপ কি মাইজভান্ডার দরবারে করুণা নির্ভর! এ মহান কবির লেখা কবিতা গানসমূহ ইংরেজিতে অনুবাদ করে বিশ্ব বোদ্ধাজনে প্রকাশিত হলে এবং তার জীবন বিম্বিত হলে দেশের শিল্প সাহিত্যের একটি বিশাল চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হবে বলে ধারণা করা যায় এবং মরণোত্তর সম্মাননা নয় জীবনকালীন সম্মাননাই শ্রেয়।

x