লোকসাহিত্যে চট্টগ্রাম ও আবদুস সাত্তার চৌধুরী

ড. ইলু ইলিয়াস

শুক্রবার , ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:২৬ পূর্বাহ্ণ
33

আবদুস সাত্তার চৌধুরী তথা চট্টগ্রামের সংগৃহীত লোকসাহিত্যের অংশ বিশেষ প্রকাশিত হলেও পরিকল্পিত কোন গবেষণা আজও শুরু হয়নি। চট্টগ্রামের পূর্ণাঙ্গ সামাজিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মাণে আবদুস সাত্তার চৌধুরী সংগৃহীত সমস্ত লোক সাহিত্যের প্রকাশনা ও গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু এই ব্যয়বহুল কাজ ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে সম্ভব নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা। চট্টগ্রামের ও চট্টগ্রামে অবস্থানরত লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, চিত্তবান শিল্পপতি ও অনুরাগী ব্যক্তিরা সম্মিলিত হয়ে আন্তরিকভাবে তৎপর হলে চট্টগ্রামে একটি লোকসাহিত্য গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা কঠিন কাজ হবে না।
প্রথম বাঙালি লোকসাহিত্য সংগ্রাহক লাল বিহারী দে-র পূর্বে ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের বাংলাভাষা শিক্ষাদানের অভিপ্রায়ে ঊনিশ শতকের তিরিশ দশকে ইউলিয়ম মর্টনের বাংলা প্রবাদ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে বাংলা লোকসাহিত্য সংগ্রহ শুরু হয়। উইলিয়াম মর্টন দশ/ বারোটি এবং জেমস লং ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সংগ্রহ কার্য চালিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলা প্রবাদ সংগ্রহ করেন। অতঃপর ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ প্রকাশিত হয় লাল বিহারী দে-র ‘ঋধষশঃধষবং ড়ভ ইবহমধষ’ তবে তারও পূর্বে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ভাষাতাত্ত্বিক গ্রিয়ার্সন উত্তরবঙ্গ থেকে লোকসাহিত্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা হিসেবে নয়, ভাষাতত্ত্ব আলোচনা সূত্রে সংগ্রহ করেন বাংলা লোকসংগীত-মানিক চাঁদের গান। লাল বিহার দে-র ‘ঋধষশঃধষবং ড়ভ ইবহমধষ’ প্রকাশের এক দশক পরে ১৩০১ বঙ্গাব্দে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলার ছেলে ভুলানো ছড়া। বস্তুতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের এই ছড়া সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে লোকসাহিত্যের উজ্জীবন ঘটে- বাংলা লোকসাহিত্য সংগ্রহে আগ্রহী ও উদ্যোগী হয়ে ওঠেন অনেকেই। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ও আরো অনেকের ন্যায় রবীন্দ্রনাথের আহবানে অনুপ্রাণিত হয়ে লোকসাহিত্য সংগ্রহে উদ্যোগী হন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদও। এইভাবে বিশ শতকের সূচনায় সাহিত্যবিশারদের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের লোকসাহিত্য সংগ্রহ শুরু হয়।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা অঞ্চল থেকে কিছু ছড়া ও ধাঁধা সংগ্রহ করেন- যা আলোচনাসহ চট্টগ্রামী ছেলে ভুলানো ছড়া ও চট্টগ্রামী ছেলে ঠকান ধাঁ ধাঁ শিরোনামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা, ১০ম বর্ষ ২য় সংখ্যা, ১২শ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা ও ১৩শ বর্ষ ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে সাহিত্য বিশারদের এই সংগ্রহের একাংশ- চট্টগ্রামী ছেলে ভুলান ছড়া’-১৯৯৪ খিস্টাব্দে অধ্যাপক ভূঁইয়া ইকবাল সম্পাদিত নির্বাচিত রচনা: আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ” গ্রন্থে এবং অপরাংশ- “চট্টগ্রামী ছেলে ঠকানো ধাধা- অধ্যাপক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ জীবন ও কর্ম” গ্রন্থে প্রকাশিত হয়।
সাহিত্যবিশারদের পর বিশ দশকে একাজে ব্রতী হন আশুতোষ চৌধুরী। তিনি ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে দীনেশচন্দ্র সেন কর্তৃক কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লোকসাহিত্য সংগ্রাহক পদে নিযুক্ত হন। আশুতোষ চৌধুরী এগারোটি লোকগীতিকা সংগ্রহ করেন- যার মধ্যে নয়টি গীতিকা দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য় প্রকাশিত হয়।
আশুতোষ চৌধুরীর সংস্পর্শে এসেই লোকগীতির প্রতি ভীষণ অনুরক্ত হয়ে তিরিশ দশকের মধ্যপর্বে লোকসাহিত্য সংগ্রহে সম্পৃক্ত হন ওহীদুল আলম। তিনি বেশ কিছু লোকগীতি, ধাঁ ধাঁ ও প্রবাদ প্রবচন সংগ্রহ করেন। তাঁর এই সংগ্রহের ফসল “চট্টগ্রামের লোক সাহিত্য” গ্রন্থ- যা প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে।

ওহীদুল আলম ও আশুতোষ চৌধুরী সম্পাদিত ‘পূরবী’ পত্রিকা থেকে জানা যায় তিরিশ দশকের আরেক লোকগীতি সংগ্রাহক ফকির আহমদের কথা। ফকির আহমদ সংগৃহীত লোকগীতিসমূহ ‘পূরবী’ পত্রিকায় ছাপানো হয়। তাঁর সংগ্রহের কোন সংকলন প্রকাশের কথা জানা যায়নি। চট্টগ্রামের লোক সাহিত্য সংগ্রহে অতঃপর এগিয়ে আসেন আবদুস সাত্তার চৌধুরী। আবদুস সাত্তার চৌধুরী ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ মার্চ পটিয়া থানার হুলাইন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পটিয়া আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের নিবিড় সান্নিধ্য লাভ করেন এবং সাহিত্যবিশারদের কাছে দীক্ষিত হন পুঁথিপাঠ ও পাঠ-উদ্ধারে। সাহিত্যবিশারদের যোগ্যতম শিষ্য আবদুস সাত্তার চৌধুরী বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ আলী আহসান কর্তৃক ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে একাডেমির পুঁথি সংগ্রাহক এবং একই সঙ্গে লোকসাহিত্য-সংগ্রাহক পদেও নিযুক্ত হন। অতপর ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ অর্থাৎ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পুঁথি সংগ্রহ ও সংগ্রহশালা গড়ে তোলার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই বাইশ বছরের বিরামহীন শ্রমসাধ্য ঘনিষ্ঠ সাধনায় তিনি উদ্ধার করেন প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের বিশাল এক রত্নভাণ্ডার সংগ্রহ করেন বিপুল পরিমাণ লোকসাহিত্য-বাংলা, সংস্কৃতি, পালি, বর্মি, উর্দু, আরবি, ফার্সি পুঁথি-পাণ্ডুলিপি, দুষ্প্রাপ্য সাময়িকী, গ্রন্থ, লোকসাহিত্য- যাতে নিহিত আছে বাঙালির অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্যের অজানা সব তথ্য-সত্য এমনকি জাতিসত্তার মৌলিক পরিচয়ও।
তবে আজকের আলোচ্য বিষয় তাঁর সমগ্র সংগ্রহ নয়, কেবল লোকসাহিত্য সংগ্রহ। আবদুস সাত্তার চৌধুরী বাংলা একাডেমির নিয়োজিত সংগ্রাহক ছিলেন ১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ প্রায় ছয় বছর। এই সময়ের পূর্বে ও পরেও তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু সে সব সংগ্রহের সঠিক পরিসংখ্যান আজো অজানা। জানা যায় কেবল বাংলা একাডেমির নিয়োজিত সংগ্রাহক হিসেবে ছয় বছরের সংগৃহীত লোকসাহিত্যের পরিসংখ্যান এবং এই পরিসংখ্যান সন্নিবেশিত হয়ে আছে আবদুল হাফিজ সম্পাদিত বাংলা একাডেমি ফোকলোর ‘আরকানাইভস’-এর পাঁচটি খণ্ডে।
আবদুস সাত্তার চৌধুরী বাংলা একাডেমির নিয়োজিত সংগ্রাহক হিসেবে সংগ্রহ করেন ১০৪টি লোককাহিনী, ১৬৪৬টি লোকগীতি, ২৬টি লোকগীতিকা এবং বহুসংখ্যক ছড়া, ধাঁধাঁ লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কার। তার সংগৃহীত ১০৪টি লোককাহিনী বাংলা একাডেমির বাঁধাইকৃত (হস্তলিখিত) ৪২টি খণ্ডে, ১৬৪৬টি লোকগীতি ৫২ খণ্ডে ২৬টি লোকগীতিকা ১৯ খণ্ডে- মোট ১১৩ খণ্ডে সংরক্ষিত আছে।
১০৪টি লোককাহিনীর মধ্যে মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম সম্পাদিত লোকসাহিত্য সংকলন: ষষ্ঠ খণ্ডে ৪টি কাহিনী শোলোক কিসসা, অষ্টম খণ্ডে ৩টি কাহিনী- (১) যুইগ্যা যুগিনীর কিসসা, (২) দুই বেকুপের কিসসা, (৩) দুই বেকুপের কিসসা, দশম খণ্ডে ৬টি কাহিনী কিংবদন্তী- (১) কর্ণফুলী নদী, (২) খাঁ মসজিদের পুরাতত্ত্ব, (৩) চাছর দীঘি, (৪) নশরত শাহার দীঘি, (৫) বাইশ্যার ডোবা, (৬) শুক্লাম্বর দীঘি, ত্রিশতম খণ্ডে একটি কাহিনী শিয়ালের কিসসা, মোহাম্মদ আশরাফ আলী সম্পাদিত চৌত্রিশতম খণ্ডে দুটি কাহিনী কিংবদন্তী- (১) চোর আর বাঘের কিসসা, (২) বাদরির কিসসা, মফিজুল ইসলাম সম্পাদিত ঊনচল্লিশতম খণ্ডে ৫টি কাহিনী (১) তিন বেকুপের কিসসা, (২) বেকুপ বঅনীর কিসসা, (৩) বেকুপ আর দাগাবাজ বুড়ির কিসসা, (৪) দুই বেকুপের কিসসা, (৫) বেকুপ বাদশার কিসসা মোট ২১টি লোককাহিনী প্রকাশিত হয়। মোমেন চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমি ফোকলোর সংকলন ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬০তম খণ্ডে প্রকাশিত হয় ২৬টি লোকগীতিকার মধ্যে ১৩টি লোকগীতিকা। এই লোকগীতিকাগুলো যথাক্রমে-১. সূর্যমনি কন্যা, ২. চানমনি ও সূর্যমনি, ৩. মানিক সওদাগর, ৪. খুলানা কন্যা, ৫. পাঁচ ভোলা কন্যা, ৬. দুঃখরাজ ও সুখরাজ, ৭. হীরালাল পদ্মমনি, ৮. আছফা কন্যা, ৯. সুতমনি আর কাপাসপতি, ১০. সোনাই কন্যা, ১১. সৈয়দ আমীন বাদশার পালা, ১২. দেলবর কুমারের পালা, ১৩. ফরিদ মৌলবীর পালাগান। ১৬৪৬টি লোকগীতির মধ্যে প্রায় দু’শত লোকগীতি- যাতে রয়েছে মেয়েলীগীত, বিরহ সংগীত, মাইজভাণ্ডারিগান, মারফতি গান, জারি ও বারমাসী- সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত লোকসাহিত্য সংকলন চতুর্থ খণ্ডে, কবীর চৌধুরী সম্পাদিত নবম খণ্ডে, মোমেন চৌধুরী সম্পাদিত অষ্টাদশ খণ্ডে, মোমেন চৌধুরী ও খোন্দকার রিয়াজুল হক সম্পাদিত বিশ ও তেইশতম খণ্ডে এবং মোমেন চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমি ফোকলোর সংকলন ৫৮ ও ৫৯তম খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এছাড়া প্রকাশিত হয় লোকসাহিত্য সংকলন দ্বাদশ খণ্ডে কিছু সংখ্যক ছড়া ষোড়শ খণ্ডে ধাঁ ধাঁ; সপ্তদশ ও ছাব্বিশতম খণ্ডে লোক বিশ্বাস সাতাশতম খণ্ডে লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কার। তবে এসব প্রকাশনা আবদুস সাত্তার চৌধুরীর সংগ্রহের সিকি ভাগ মাত্র।
আবদুস সাত্তার চৌধুরী সংগৃহীত পুঁথিসাহিত্য সম্পর্কে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন, “এই শ্রমসাধ্য কাজে তিনি ব্রতী না হলে অনেক রচনাই শুধু লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে যেত তা নয়, একেবারে বিলুপ্ত হতো।” অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের এই মন্তব্য সাত্তার চৌধুরী সংগৃহীত লোকসাহিত্য সম্পর্কেও প্রযোজ্য। বাংলা একাডেমির সংগ্রাহক হিসেবে আবদুস সাত্তার চৌধুরীর লোকসাহিত্য সংগ্রহের অর্ধ শতাব্দীর অধিক সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা তাঁর শ্রম, সাধনা ও স্বপ্নের কতটুকু মূল্য দিয়েছি? কতটুকু মূল্যায়ন করেছি তাঁর সংগৃহীত লোকসাহিত্যের? এ সমস্তকে কেন্দ্র করে আমাদের আত্মপরিচয়ের কোন আকুতি, তমসাবৃত ঐতিহাসিক অতীতের আলোকোজ্জ্বল পুনর্গঠন প্রয়াস, ব্যঞ্জনাময় জাতীয়তাবাদী অভিলাষ ব্যঞ্জিত হয়েছে কি?
বহির্বিশ্বের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে ফিনল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফিনিস লিটারারি সোসাইটি’। এই সোসাইটির লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণার মধ্য দিয়ে ফিনল্যান্ডে গড়ে ওঠে জাতীয় ঐতিহ্যবাদ জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে ফিনল্যান্ডবাসী। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ফিনল্যান্ড সরকার গঠন করে লোকসাহিত্য সংগ্রহ কমিশন’ হেলসিঙ্কিতে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশাল লাইব্রেরি ও গবেষণাগার। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয় ফোকলোর বিভাগ।
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বহু জাদুঘর, প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফোকলোর’ পত্রিকা। লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণার মধ্য দিয়েই জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মীলনে জার্মানিরা ফরাসি সংস্কৃতির আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান ফোকলোর সোসাইটি, প্রকাশিত হয় জার্নাল অব আমেরিকান ফোকলোর পত্রিকা। আমেরিকার শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচ্চ শ্রেণিতে ব্যাপকভাবে পড়ানো হয় লোকসাহিত্য। লোকসাহিত্যের ব্যাপক পঠন, পাঠন ও গবেষণার মধ্য দিয়ে আমেরিকানরা ইউরোপের প্রতি তাদের মানসিক দুর্বলতা থেকে মুক্তিলাভ করে।
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আইরিশ সরকার প্রতিষ্ঠা করে ফোকলোর ইনস্টিটিউট ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে গঠন করে আইরিশ ফোকলোর কমিশন এবং লোক-সম্পদ সংরক্ষণের বিজ্ঞান সম্মত প্রশিক্ষণ লাভের জন্যে লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞদের পাঠিয়ে দেয় সুইডেনে। ১৯৪২ খৃস্টাব্দে ও সুলিভান প্রকাশ করেন লোকসাহিত্য সংগ্রহ প্রণালী সম্পর্কিত গ্রন্থ “অ ঐধহফ ইড়ড়শ ড়ভ ওৎরংয ঋড়ষশষড়ৎব” গ্রন্থের হাজার হাজার কপি পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশের স্কুল-কলেজসমূহে-সংগ্রাহক নিযুক্ত করা হয় প্রায় সব অঞ্চলে। ঘুমন্ত আইরিশ জাতি এভাবে লোকসাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে জেগে ওঠে জাতীয় চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে স্বাধীনতার মন্ত্রে।
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে টোকিওতে প্রতিষ্ঠিত হয় লোকসংস্কৃতি গবেষণাকেন্দ্র। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মুমূর্ষু জাপান নব জীবনের ছন্দিত স্পন্দন খুঁজে পায় তাদের লোকসাহিত্যের ভিতর। বাংলাদেশেও লোকসাহিত্য কম সংগৃহীত হয়নি। কিন্তু এসবের সম্পাদনা প্রকাশনা ও গবেষণা? সম্পাদনা ও প্রকাশনা তবু কিছুটা হয়েছে, কিন্তু পরিকল্পিত ও পূর্ণাঙ্গ গবেষণা? আমাদের একথা ভুলে থাকলে চলবে না যে, লোক সাহিত্য গবেষণা মানে নিছক সাহিত্য রসাস্বাদন ও নর-নারীর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ নয়- নৃতত্ত্ব, জাতিতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, সংস্কৃতিতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্ব প্রভৃতির স্বরূপ উন্মোচন, সর্বোপরি, জাতির ঐতিহাসিক অতীতের পুনর্গঠন, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ব্যঞ্জনাময় জাতীয়তাবাদী ইতিহাস নির্মাণের প্রয়াস। কিন্তু আমাদের লোকসাহিত্যের এই গবেষণা কোথায় এবং কিভাবে হবে? এবং কারাইবা করবে? লোকসাহিত্য গবেষণার জন্যে বাংলা একাডেমির ফোকলোর বিভাগ ব্যতীত স্বতন্ত্র কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কি আমাদের আছে? আমাদের মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কি লোকসাহিত্য বিভাগ চালু আছে? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি চালু হলেও তাতে কি লক্ষিত হচ্ছে কোন স্বপ্ন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন প্রয়াস? অর্থাৎ পরিচালিত হচ্ছে কি পরিকল্পিত কোন গবেষণা কার্যক্রম? তার চেয়ে বড় কথা লোকসাহিত্য গবেষণার জন্য আমাদের বাজেটের পরিমাণ কত? আসলে বাংলাদেশ বড় দুঃখি হলেও বড় বেশি বেদনাহীন। রাষ্ট্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা ব্যতীত লোকসাহিত্যের পরিকল্পিত ও পূর্ণাঙ্গ গবেষণা- যে গবেষণায় ব্যঞ্জিত হবে বাঙালির অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের ব্যঞ্জনাময় জাতীয়তাবাদী ইতিহাস নির্মাণের অভিলাষ- যে অভিলাষ ব্যঞ্জিত হয়েছে জয়নুল আবেদীন, এসএস সুলতান ও কামরুল হাসানের কাজে- তা সম্ভব নয়। কাজেই কেবল লোকসাহিত্যের সংজ্ঞা ও অভিধা নিয়ে আর অধিক কালক্ষেপণ না করে এ বিষয়ে আমাদের ভাবনা চিন্তা করা জরুরি।’
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের পুঁথিসাহিত্য সংগ্রহের পূর্বে চট্টগ্রামকে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অত্যন্ত দীন মনে করা হতো। প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যের ব্যাপক সংগ্রহের মধ্য দিয়ে সাহিত্যবিশারদ জানিয়ে দিলেন সাহিত্য সংস্কৃতিতে চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক কাল থেকেই সমৃদ্ধ, সমুজ্জ্বল। পরবর্তীতে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আশুতোষ চৌধুরী ও ওহীদুল আলম প্রদর্শিত পথ অনুসরণে আবদুস সাত্তার চৌধুরী আবিষ্কার করে দিলেন চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যের বিশাল ভুবন। বস্তুতঃ তার ব্যাপক সংগ্রহের মধ্যদিয়ে আমরা জেনে যাই। বাংলাদেশের লোকসাহিত্যে চট্টগ্রামের অবস্থান যথার্থই গৌরবোজ্জ্বল।
পরিতাপের বিষয় তাঁর এই বিপুল সংগ্রহের কথা আজও ইতিহাসের তথ্যমাত্র। দেশের বিশেষভাবে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে তার অধিকাংশই অজানা। কারণ অধিকাংশ সংগ্রহই অপ্রকাশিত, আর প্রকাশিত সংগ্রহও তেমন প্রচার ও পরিচিতি পায়নি। ‘ঢাকার লোককাহিনী যশোরের লোককাহিনী’ রংপুরের গীতিকা’ সিলেট গীতিকার মতো স্বতন্ত্র গ্রন্থরূপে প্রচার ও পরিচিতি বহুল কোন প্রকাশনা আবদুস সাত্তার চৌধুরীর সংগ্রহের তথা চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যের হয়নি। ক’বছর পূর্বে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে মোমেন চৌধুরীর সম্পাদনায় সাত্তার চৌধুরী সংগৃহীত ২৬টি লোকগীতিকার মধ্যে ১৩টি লোকগীতিকা “চট্টগ্রাম গীতিকা” নামে পাঁচটি খণ্ডে প্রকাশিত হলেও “চট্টগ্রাম গীতিকা” নামটি সংকলনসমূহের প্রচ্ছদে স্থান পায়নি- প্রচ্ছদ শোভিত হয়ে আছে কেবল বাংলা একাডেমি ফোকলোর সংকলন’ নামটিতেই উল্লেখ্য যে, বাংলা একাডেমি ফোকলোর সংকলন ৫২তম খণ্ডের ভূমিকায় সিরাজগঞ্জ ও ঝিনাইদহের ধূয়াগানের সঙ্গে চট্টগ্রামের ধূয়াগান প্রকাশের উল্লেখ থাকলেও চট্টগ্রামের কোন ধূয়াগান সংকলনটিতে প্রকাশিত হয়নি। এতোদিন আমরা জানতাম, কাজীর গরু গোয়ালে পাওয়া না গেলেও কিতাবে পাওয়া যায়। এখন দেখা যাচ্ছে কিতাবে পাওয়াও মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। কাজেই লোকসাহিত্য প্রেমী ও বিশেষজ্ঞদের এ বিষয়ে অধিক সচেতনতা জরুরি। আবদুস সাত্তার চৌধুরী সংগৃহীত ১৬৪৬টি গানের রয়েছে ভাটিয়ালী, বারমাসী, মারফতি, মাইজভাণ্ডারি, মুর্শিদি, বাইলান্তি, কীর্তন, চাষির গান, পল্লীগান, বর্গগান, প্রশ্নগান, কবিগান, বৈঠকি গান, জারি গান, বন্ধুয়া গান, বিচ্ছেদগান, ধূয়া গান, বিলাপ গান, বন্দনাগান, য়োটনগান, নারী-পুরুষের চারিত্রিক গান, প্রেম সংগীত প্রভৃতি ৩০টি বিষয় ও আঙ্গিক। তাঁর সংগৃহীত সব লোকগীতি, লোকগীতিকা, লোককাহিনীর বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশিত হলে লোকসাহিত্যে চট্টগ্রামের প্রকৃত অবস্থান ও অবদানের স্বরূপ-প্রকৃতি পূর্ণরূপে উন্মোচন সম্ভব হবে। আবদুস সাত্তার চৌধুরী তথা চট্টগ্রামের সংগৃহীত লোকসাহিত্যের অংশ বিশেষ প্রকাশিত হলেও পরিকল্পিত কোন গবেষণা আজও শুরু হয়নি। চট্টগ্রামের পূর্ণাঙ্গ সামাজিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মাণে আবদুস সাত্তার চৌধুরী সংগৃহীত সমস্ত লোক সাহিত্যের প্রকাশনা ও গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু এই ব্যয়বহুল কাজ ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে সম্ভব নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা। চট্টগ্রামের ও চট্টগ্রামে অবস্থানরত লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, চিত্তবান শিল্পপতি ও অনুরাগী ব্যক্তিরা সম্মিলিত হয়ে আন্তরিকভাবে তৎপর হলে চট্টগ্রামে একটি লোকসাহিত্য গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা কঠিন কাজ হবে না। এই কেন্দ্রের কাজ হবে আবদুস সাত্তার চৌধুরী সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ লোকসাহিত্যসহ প্রায় শতবর্ষব্যাপী সংগৃহীত সকল সংগ্রাহকের সংগ্রহের এবং নতুন করে সংগ্রহ কাজ শুরু করে সে সবের সংরক্ষণ, প্রকাশনা ও বহুমাত্রিক গবেষণার ব্যবস্থা করা।
হ্যাঁ, গবেষণার বহুমাত্রিকতাই কাম্য। নৃতত্ত্ব, জাতিতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব সব বিষয়ে গবেষণার এক কার্যকর মাধ্যমে এই লোকসাহিত্য। আধুনিক ভাষাতত্ত্বের মৌল উপাদান লোকভাষা। আধুনিক ভাষা বিজ্ঞানীরা মনে করেন, লোকভাষার ভিতরেই নিহিত আছে ভাষার অরিজিন (ঙৎরমরহ)। সুতরাং বাংলা ভাষার উৎস আদি ইতিহাস ও বিকাশের মৌলিক সূত্ররাশি সন্ধান ও বাংলা ভাষার প্রকৃত ব্যাকরণ রচনায়- যে ব্যাকরণ রচনার স্বপ্ন দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যা মুদ্রিত হয়ে আছে তাঁর “বাংলা শব্দতত্ত্ব” গ্রন্থে- নিঃসন্দেহে ফলবান হতে পারে এই লোকসাহিত্য গবেষণা। তেমনি ফলবান হতে পারে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক, জাতিতাত্ত্বিক, সামাজিক সঠিক ইতিহাস বিনির্মাণে। এভাবে প্রস্তাবিত গবেষণাকেন্দ্রকে ঘিরে কষ্টার্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের গড়ে উঠতে পারে জাতির অগ্রসর চৈতন্যের প্রতিভূ ভাবুক-বুদ্ধিজীবীদের মেধা ও মননাশ্রিত জাতীয়তাবাদী এক ঘরানা। যে ঘরানায় ধ্বনিত হবে আমাদের। আত্মপরিচয়ে আকুতি, স্ফুরিত হবে ব্যঞ্জনাময় জাতীয়তাবাদী অভিলাষ।

x