লেখকের দেশ দেখা

এমদাদ রহমান

মঙ্গলবার , ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
53

‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’ বইটি এমন–পড়তেই হয়, না পড়লে বহুকিছুই ঠিক মতো দেখা যায় না, সে দেশ হোক কিংবা কাল; ভালো করে কিছুই দেখা যায় না। সাহিত্যে তো খণ্ডিত আর মৃত এক জীবন পাই আমরা, দেশের মানুষ তাতে যথার্থ ভিড়টি তৈরি করতে পারে না। কিন্তু কিছু কিছু এমন লেখাও থাকে, যে লেখায় লেখক আমাদেরকে প্রকৃত মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন। লেখকের আত্মজীবনের অংশ বলেই হয়ত সেইসব লেখায় মানুষ দেখার জন্য আমাদেরকে দূরবীনের ভেতর দিয়ে তাকাতে হয় না, সরাসরিই তাদেরকে দেখা হয়ে যায়; পৃষ্ঠাজুড়ে কালো সার সার শব্দে অজস্র মানুষের মুখই শুধু, এই মুখগুলোই লেখকের গল্পে উপন্যাসে নাট্যে বারবার ফিরে আসে।
জীবনে হয়ত খুব বেশি পড়ার দরকার হয় না কিংবা একই বই পুনর্পাঠেরও দরকার পড়ে না, কিন্তু হাসান আজিজুল হকের এই বইটি, যারা তার পাঠক এবং সেইসব পাঠক যারা প্রবীণ এই লেখককে কিছুটা গভীরে নেমেই পড়তে চান, বইটি তাদের জন্য এক নতুন জগৎ নির্মাণ করবে, তাতে সন্দেহ নেই। একজন লেখক তার দেশকে দেখতে বের হয়েছেন। চাক্ষুষ করছেন অন্তর্ভেদী চোখে। এই দেখার সঙ্গে আমরাও শামিল হই, দেশকাল দেখতে গিয়ে আমরা পাঠকরাও দেখে ফেলি একদম কঙ্কালসুদ্ধ একটি দেশ। আমরা ধরেই নিই যে কেবল আমাদের দেখাবেন বলেই লেখাগুলি লিখতে বসেছেন তিনি। দেখানোই তো লেখকের কাজ।
বইয়ের একটি লেখার সঙ্গে আরও আগেই আমার পরিচয় হয়েছিল। সেই যে-বছর তার ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পটি প্রথম পড়েছিলাম, তারপর যে বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তার লেখাপত্রের প্রতি, যে-ঘোর জন্মেছিল তাকে সমগ্রভাবে পড়বার, সেই ঘোর কিংবা টানে সিলেটের উত্তর জিন্দাবাজারের ‘বইপত্র’ থেকে একের পর এক বইগুলি কিনে পড়তে শুরু করেছিলাম। তখন আমার দেখা স্বপ্নগুলোও আর সাধারণ ছিল না, স্বপ্নরা দারুণ হিংস্র হয়ে উঠছিল।
ইউপিএল থেকে বের হওয়া ‘রাঢ় বঙ্গের গল্প’ বইটিতে, ভূমিকা হিসেবে একটি গদ্য ছিল- ‘গল্পের জায়গা জমি মানুষ’ নামে, সেই লেখাটি প্রথম পাঠের পর, আরও বার’কয়েক পড়েছি; লেখাটির কিছু কিছু কথা তো মনে গেঁথে গেছে, পাকাপাকিভাবেই। অন্তত এই কথাটি বলতে পারি জোর দিয়েই। ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’তেও সেই গদ্যটি আমরা পাই। সেই সঙ্গে পাই আরও কিছু এমনধারা গদ্য, মেজাজের দিক থেকে গল্পের জায়গা জমি মানুষের সঙ্গে যাদের অন্তর্গত মিল রয়েছে।
এই বইয়ের যে সংস্করণটি আমাদের কাছে আছে, তার পেছনের প্রচ্ছদে কিছু কথা আছে, যা বইটির মেজাজ বুঝতে আমাদেরকে সাহায্য করে। ‘গল্প নয়, প্রবন্ধ নয়, ভ্রমণকাহিনীও নয়, অন্যরকম এক প্রেক্ষণে দেশ, মাটি আর মাটি-লাগা মানুষকে দেখার অন্তর্ভেদী ও প্রচণ্ড কলমের হলকর্ষণ থেকে জাত এই লেখাগুলি।’ সে আমরা পড়তে পড়তেই বুঝতে পারি যে এই বই হচ্ছে লেখকের ‘লেখার মাটি, লেখার মানুষ’ দেখবার এক নিরন্তর ভ্রমণ। বইয়ের শুরুতে, ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’ লেখাটিতে তিনি আমাদের জানাচ্ছেন- ‘চরিত্রের সন্ধানে নয়, কাহিনির খোঁজেও নয়, খুব কাছ থেকে নজর করে মানুষ, তার জীবিকা আর যে জগতে সে আষ্টেপৃষ্টে আটকে আছে তা দেখার জন্য উত্তরাঞ্চলের একটি এলাকায় গিয়েছিলাম।’ পরের লেখাটিতে (শ্যামল ছায়া নাই বা গেলে) বলছেন- ‘বাংলাদেশের জনপদের যে ছবি আছে মনের মধ্যে তাকে খুঁজে বেড়াই। বরেন্দ্রভূমির গ্রামে গ্রামে ঘুরি। আত্রাই নদীর কূলে কূলে, পদ্মার চরে, মহানন্দার ওপারে দিকহীন সমতলভূমিতে।’ এই কথাটুকু বলেই তিনি একটি সত্য কথা বলেন- ‘কোথাও তার খোঁজ মেলে না।’
বরেন্দ্রভূমি! এ যেন ভিন্ন দেশ। ভিন্ন মাটি। ভিন্ন মানুষ। সব যেন আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরের। বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী ও বগুড়া জেলা জুড়ে বরেন্দ্রভূমি, যেখানে গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম, শীতকালে অত্যধিক ঠাণ্ডা। এখানে গ্রীষ্মে রাজশাহী অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রিতে উঠে যায়, নাটোরের কোথাও কোথাও এই মাত্রাও ছাড়িয়ে যেতে পারে; আবার শীতে, রংপুর, দিনাজপুরে তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে।
লেখক আমাদের জানাচ্ছেন- ‘আমাদের দেশ ছিল রুখো কর্কশ। গাছপালা প্রায় নেই। খুব বড়ো বড়ো মাঠ। তেপান্তর যাকে বলে। গরমের দিনে ঘাস জ্বলে যায়। মাটির রং হয় পোড়া তামাটে। শরতে সেই মাটিকেই দেখি হাড়ের মতো শাদা। তবে বর্ষায় কুচকুচে কালো রং-এর মাটিও দেখেছি। তিন মাইল চার মাইল লম্বা মাঠ ন্যাড়া। মহীরুহ। তাদের প্রায় সবাই শতাব্দী পেরিয়েছে। এদেরও অবশ্যি নতুন প্রজন্ম আছে। কচি বট অশ্বত্থ। কেউ তাদের গায়ে হাত না দিলে অবলিলায় শত বছর পরমায়ু পাবে। এই রকম বিরল কিছু বড়ো গাছ বাদ দিলে খোলা মাঠে বনফুল, শেয়াকুল, ভয়ানক রাগী জাতের ফণীমনসা কিছু কিছু দেখা যায়, তাদের গায়ে তামাটে ধুলোর পুরু আস্তর, বোশেখ জষ্টির রোদে ওৎ পাতা ভালুকের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। …এই হলো রাঢ়। কি নির্দয় শুকনো কঠিন রাঢ়। আমাদের দেশ মধ্যরাঢ়। পশ্চিমে মঙ্গলকোট। গায়ে আগাগোড়া পুরনোর ছাপ। মজা দিঘি, পোকায় খাওয়া দাঁতের মতো ক্ষয় পাওয়া বটগাছ, পাতলা পাটালির মতো ইটে গাঁথা বাড়িঘর; দালান-কোঠা মাটির তলায় সেঁধিয়েছে।…রাঢ়ের কথা মনে পড়লেই গরমকালের কথা আগে মনে পড়ে। মরুভূমির মতো। তীব্র শাদা কটকটে রোদে সব জ্বলে যায়। ধুলো ওড়ে। গাছপালা ঝোপঝাড় ধুলোয় ঢেকে যায়। জমিতে এই বড়ো বড়ো ফাটল দেখা দেয়। এইসব ফাটলে চোখ দিয়ে উবু হয়ে কতো দিন অন্ধকার পাতালরাজ্য দেখতে চেয়েছি।’
এই পাতালরাজ্যেই হাসান আজিজুল হক আজীবন থাকবেন, লিখবেন; এখানেই রচিত হবে তার অসামান্য বইগুলো- আত্মজা ও একটি করবী গাছ, সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য, আমরা অপেক্ষা করছি, জীবন ঘষে আগুন, নামহীন গোত্রহীন, পাতালে হাসপাতালে, মা মেয়ের সংসার, বিধবাদের কথা, রাঢ় ঙ্গের গল্প, অতলের আধি, একাত্তর : করতলে ছিন্নমাথা, বৃত্তায়ন, আগুনপাখি, শামুক। বইগুলোয় থাকবে- তৃষ্ণা, আত্মজা ও একটি করবী গাছ, ঘর গেরস্থি, সরল হিংসা, পাতালে হাসপাতালে, শকুন, গুনিন, পরবাসী, শোণিত সেতু, আমৃত্যু আজীবন, খাঁচা, নামহীন গোত্রহীন, অচিন পাখি, সাক্ষাৎকার নামের মাইলস্টোন গল্পগুলি।

x