লুসি ফ্রানসিস হল্ট

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৫৫ পূর্বাহ্ণ
25

“তোমরা যার যেখানে সাধ চলে যাও
আমি এই বাংলার পাড়ে
রয়ে যাব, দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে
ভোরের বাতাসে
দেখিব খয়েরি ডানা শালিকের হিম
হয়ে আসে
ধবল রোমের নীচে তাহার হলুদ ঠ্যাং
ঘাসে অন্ধকারে ”
জীবনানন্দ দাশ
ভোরের বাতাসে কাঁঠালপাতা ঝরার দৃশ্য অথবা শালিকের খয়েরি ডানা ফেলে কতজন নিজ দেশটাকে পিছনে ফেলে চলে যায়। বাংলার রূপ আটকাতে পারে না ভাগ্য অন্বেষনের তাগিদ ভালো থাকার তাগিদ, নিরাপদ জীবনের তাগিদ উন্নত জীবনের তাগিদকে। প্রতিটি মানুষই চায় ভাল থাকার জন্য। উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের জীবন যাত্রা সমস্যা বহুল। ভেজাল ওষুধ, ভেজাল খাওয়ার খেয়ে নিজেরাই ঝুঁকির মধ্যে থাকি। নির্দয়তা ও বঞ্চনার ক্লান্তিকর দৃশ্য দেখতে দেখতে যখন হাঁফিয়ে উঠি তখন উন্নত বিশ্বের কাউকে যদি বলতে শুনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। আমি এদেশ এবং এদেশের মানুষকে ভালবাসি। তখন বিস্ময়ের সীমা থাকে না! যুগে যুগে কালে কালে কিছু মানুষের জন্ম হয় সৃষ্টিকর্তার অপার মমতা বুকে নিয়ে। তারা মানুষের পাশে দাঁড়াল মানুষের জন্যই উৎসর্গীত হন। তেমনি একজন বৃটিশ নাগরিক লুসি হেলেন ফ্রানসিস হল্ট। ১৯৩০ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর যুক্ত রাজ্যের সেন্ট হেলেন্সে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা জন হল্ট। মা ফ্রান্সিস হল্ট। ১৯৬০ সালে তরুণ বয়সে অক্সফোর্ড মিশনে একজন কর্মী হিসেবে এসেছিলেন। এসেই তিনি আজীবন মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পড়েন এদেশের সাথে। ভালবেসে ফেলেন এদেশের মানুষকে। দরিদ্র মানুষের শিশুদের শিক্ষা ও সেবার দায়িত্ব নেন বরিশালের নিভৃত পল্লীতে। উন্নত জীবন উন্নত খাওয়ার উন্নত চিকিৎসার সুযোগ উপেক্ষা করে একেবারে সাদাসিধে জীবন বেছে নেন। তাঁর বয়স এখন ৮৯ বৎসর। চলনে বলনে পোশাকে তিনি পুরোটাই বাঙালি। ২০০৪ সালে অবসরে গেলেও লুসি হল্ট এখনো দুঃস্থ শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তরুণ বয়সে অক্সফোর্ড মিশনে একজন কর্মী হিসেবে শিশুদের ইংরেজি শিক্ষার দায়িত্ব নেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় চার্চটি বন্ধ করে মিশনের সবাই খুলনায় নিরাপদ জায়গায় চলে যায়। কিন্তু লুসি যাননি। তিনি তাঁর জীবনকে বিপন্ন করে ছুটে যান পাশের হাসপাতালে।
সেখানে অসংখ্য আহত বেসামরিক নারী পুরুষ শিশুর কান্না আহাজারীতে তাঁর হৃদয় কেঁদে উঠে। তিনি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের কাছে স্বেচ্ছা শ্রমের আবেদন জানান। চিকিৎসকরা ভিন দেশি এক নারীর এমন আগ্রহ দেখে বিস্মিত হন। এবং সানন্দে সম্মতি দেন। এরপর থেকে পুরা মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে তিনি যুদ্ধাহত মানুষের সেবা করেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তার বন্ধু বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনের কাছে চিঠি লেখে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন।
বহু বিদেশি নাগরিক মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের কাউকে কাউকে সম্মান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে বহির্বিশ্বের অনেক নাগরিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা ও নির্যাতনের খবর কেউ পৌঁছে দিয়েছিলেন, কেউ কলম হাতে, কবিতা, কেউ গান, কেউ এখান থেকে চিঠি লিখে। নিজেদের মানবিক তাড়না থেকেই তাঁরা কাজগুলো করেছেন। লুসি হেলেন ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকার জন্য গর্ব অনুভব করেন।
তিনি বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসেন। বঙ্গবন্ধুর যাদুকরী নেতৃত্বে মানুষকে জাগিয়ে তোলার অবিস্মরণীয় স্মৃতি তিনি হৃদয়ে আজও ধারন করে আছেন।
মুক্তযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য গত বছরের ১৬ ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে লুসিকে সম্মাননা দেয় বরিশাল মহানগরের পুলিশ।
লুসি হল্ট এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন এদেশের সঙ্গে আমার জীবনের একটা যোগসূত্র আছে। কারণ বাংলাদেশের জন্ম ১৬ ই ডিসেম্বর আর আমার জন্মও একই দিনে। এটা কাকতালীয় হলেও বিষয়টি আমাকে খুব ভাবায়। হয়তো এটা ঈশ্বরের খেয়াল। অবসর গ্রহণের পর সবাই ফিরে যায়। কিন্তু এদেশকে এত ভালবেসে ফেলেছি, এর মায়া ছেড়ে যেতে মন সায় দেয়নি। তাই জীবনের সেরা সময়গুলো কাটানোর জন্য এই বরিশালে ফিরে এসেছি। মৃত্যুর পর এখানেই সমাহিত হতে চাই।
বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনের দক্ষিণের দিকটার টিনের ছোট্ট জরাজীর্ণ ঘরেই তিনি বাস করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে সম্মান জানানো না হলেও তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের ৮ ই ফেব্রুয়ারি বরিশালের বঙ্গবন্ধু উদ্যানের জনসেবা মঞ্চে লুসি হল্টের হাতে ১৫ বছরের ভিসা ফি মুক্ত পাসপোর্ট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর কয়েকদিন পরেই তাঁকে নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
৫৭ বছর ধরে ঘুরে ফিরে তিনি কাজ করেছেন যশোর, খুলনা, নওগাঁ, ঢাকা ও গোপালগঞ্জে। ২০০৪ সালে অবসরে যান লুসি। ওই বছরেই তিনি ফিরে আসেন বরিশালের অক্সফোর্ড মিশনে। এই অবসর জীবনে দুস্থ শিশুদের মানসিক বিকাশ ও ইংরেজি শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি এসব শিশুর জন্য দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের কাজ করেন। অদম্য এই মানব দরদীকে বয়স বেঁধে রাখতে পারেনি। তিনি নিজেই বলেন বয়স কাউকে বেঁধে রাখতে পারে না, যদি ইচ্ছে থাকে একজন মানুষ, সমাজ ও দেশের জন্য অনেক অবদান রাখতে পারেন। লুসি ফ্রানসিস হল্ট এক নি:স্বার্থ মানুষের নাম। মানব কল্যাণই যার একমাত্র উদ্দেশ্য ও আদর্শ। বাংলাদেশকে তিনি ভালবাসেন তাই এখানেই তার অন্তিম শয্যা পেতে চান। বাংলাদেশ তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করে তাঁর স্বপ্ন পূরণ করেছে। ভাল থাকুন লুসি ফ্রানসিস হল্ট। অপার ভালবাসা আর শ্রদ্ধা এমন মানব দরদী মানুষটির জন্য।

x