লালদীঘি সোনালী ব্যাংক ভবন পরিদর্শনে সদর দপ্তরের কমিটি

‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কি না দুয়েকদিনের মধ্যে রিপোর্ট

হাসান আকবর

শুক্রবার , ২৭ জুলাই, ২০১৮ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
65

লালদীঘি সোনালী ব্যাংক ভবন রহস্যজনক কারণে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করার চেষ্টার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। ব্যাংকের সদর দপ্তর থেকে বিষয়টি তদন্ত করে একটি রিপোর্ট দেয়ার জন্য শীর্ষ পর্যায়ের তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে এসে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। কমিটির সদস্যরা গ্রাহক এবং ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথেও কথা বলেছেন। অচিরেই এ ব্যাপারে রিপোর্ট প্রদান করা হবে। দৈনিক আজাদীতে গত ২১ জুলাই ‘রহস্যজনক কারণে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লালদীঘি সোনালী ব্যাংক ভবন, মেথরপট্টির ছোট স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে অফিস, নানা প্রশ্ন শঙ্কা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে সোনালী ব্যাংক সদর দপ্তর থেকে এই কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি পুনরায় যাছাই বাছাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীর অন্যতম একটি ব্যস্ত ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত সোনালী ব্যাংক লালদীঘি কর্পোরেট শাখাটি নিজস্ব ভবনে অবস্থিত। ১৯৪৯ সালে নির্মিত তিন তলা ভবনটিতে ১৯৮৩১৯৮৪ সালের দিকে এসে চতুর্থ তলা নির্মাণ করা হয়। চারতলা ভবনের প্রায় বিশ হাজার বর্গফুট আয়তন নিয়ে সোনালী ব্যাংকের বিস্তৃত কার্যক্রম চলে। এই শাখায় ছোট বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির ৫০ হাজারেরও বেশি একাউন্ট রয়েছে। ব্যাংকের এই চেস্ট শাখায় শুধু আলমারী রয়েছে ১৪৮টি। ব্যাংকের এই শাখায় সঞ্চয়ী, চলতিসহ সকল ধরণের আমানত, ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, সরকারি চালান, সঞ্চয়পত্র ক্রয়বিক্রয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের লেনদেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতনভাতা, মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, বিধবা ও বয়স্ক ভাতাসহ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৬৫টি শাখার ক্যাশ আদানপ্রদান ও ক্লিয়ারিং হাউজ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ কারণে প্রতিদিন ওই শাখায় হাজার হাজার গ্রাহকের সমাগম ঘটে, যার মধ্যে অসংখ্য বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও বিধবা নারীও রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ভবনে ব্যাংকটির কার্যক্রম চলছে।

সূত্র বলেছে, অরজিন্যাল কাঠামোর উপর এঙটেনশন হিসেবে চতুর্থ তলা নির্মাণ করা হলেও ঠিকাদার যাচ্ছেতাই ভাবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। এতে করে মাত্র বছর কয়েকের মাঝে চতুর্থ তলার এঙটেনশন অংশটিতে নানা ধরনের ‘ডেমেজ’ দেখা দেয়। আর চতুর্থ তলার এই কিছু কিছু ডেমেজকে পুঁজি করে হঠাৎ করে ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার তোড়জোড় শুরু হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। চতুর্থ তলা দেখিয়ে কয়েকজন প্রকৌশলীকে দিয়ে ইতোমধ্যে পুরো ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে একটি রিপোর্টও করিয়ে নেয়া হয়েছে। এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৬৩টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের যেই তালিকা রয়েছে তাতে এই ব্যাংক ভবনের নাম নেই। লালদীঘি পাড় এলাকাতে একই সময়ে নির্মিত আরো বিভিন্ন ভবনে ব্যাংকসহ নানা বাণিজ্যিক কার্যক্রম চললেও সোনালী ব্যাংক ভবন নিয়ে হঠাৎ এই তোড়জোড় ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারী এবং গ্রাহকদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ইতোমধ্যে ব্যাংকের দেয়ালে দেয়ালে ডিজিটাল ব্যানার টানিয়ে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একটি বিশেষ মহল ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করিয়ে বিশেষ ফায়দা হাসিল করতে মরিয়া বলেও ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

এই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ দেখিয়ে মেথরপট্টিতে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি স্থানে ব্যাংক সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মাত্র পাঁচ হাজার ফুট আয়তনের একটি স্থানে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনা অসম্ভব বলেও ব্যাংকের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন। তারা বলেন, বিশ হাজার ফুটের কার্যক্রম পাঁচ হাজার ফুট এলাকায় সমাধা করা অসম্ভব। এই ব্যাংকের আলমারিগুলো আগ্রাবাদে পাঠিয়ে দেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছিল।

গত ২১ জুলাই দৈনিক আজাদীতে এ সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশিত হলে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করে। সোনালী ব্যাংকের এমডি এই কমিটি গঠন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরে রিপোর্ট প্রদানেরও নির্দেশ দেন।

সোনালী ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামরুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের এই কমিটির অপর দুই সদস্য হচ্ছেন সোনালী ব্যাংক রাজশাহী অঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আলা উদ্দিন এবং সোনালী ব্যাংকের বোর্ড ডিভিশনের সচিব এবং জেনারেল ম্যানেজার আতাউর রহমান। কমিটির সদস্যরা গত বুধবার চট্টগ্রামে এসে দিনভর সরজমিনে সবকিছু পরিদর্শন করেছেন। এই সময় তারা ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারী, বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহক, বিভিন্ন ভাতা ভোগী, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকলের সাথে কথা বলেন, মতামত নেন। গ্রাহকরা ব্যাংকটিকে মেথরপট্টিতে স্থানান্তর করা হলে নিরাপত্তাজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন সংকট তৈরি হবে বলেও কমিটির সদস্যদের জানান। তারা ব্যাংকটি স্থানান্তর না করতে আবেদন জানান। আর স্থানান্তর করা হলেও মেথরপট্টির মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না নিয়ে বর্তমান ভবনের ধারে কাছে কোন ভবন ভাড়া নেয়ার আহবান জানান। তদন্ত কমিটির তিন সদস্য সকলের বক্তব্য শুনেন। তারা অচিরেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলেও গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেন।

তদন্ত কমিটির সদস্য এবং সোনালী ব্যাংক রাজশাহী অঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আলাউদ্দীন দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে সরজমিনে সবকিছু দেখার কথা স্বীকার করে বলেছেন, আমরা সবকিছু দেখেছি। পুরো ভবনটি আমরা দেখেছি। আমাদের মনে হয়েছে ভবনটির চতুর্থ তলার এঙটেনশন অংশ কিছুটা নষ্ট হয়েছে। অরজিন্যাল ভবনের উপর নির্মাণ করা এই ভবন নির্মাণে কোনরূপ নীতি নৈতিকতা মানা হয়নি। যাচ্ছেতাই ভাবে করা হয়েছে। এতে করে চতুর্থ তলা নষ্ট হলেও তৃতীয় তলা পর্যন্ত অরজিন্যাল ভবনটির অবস্থা খুবই ভালো। প্রকৌশলীদের যেই রিপোর্টটি করা হয়েছে সেটি চতুর্থ তলার বিষয়ে করা হয়েছে বলেও আমাদের মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকার বুয়েট থেকে প্রকৌশলী পাঠিয়ে ভবনটির ব্যাপারে পুনরায় যাছাই করানোর প্রস্তাব করবো। যদি এঙটেনশন অংশ ভেঙে ফেলে অরজিন্যাল তিন তলা ভবনে ব্যাংকিং করা যায় তাতেও আমরা খুশী হবো। আমাদের ব্যাংকের লাভ হবে। আর যদি বুয়েটের প্রকৌশলী পুরো ভবনটিকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেন সেক্ষেত্রে আমাদের শিফট করতে হবে। তাতেও আমরা ধারে কাছে কোন নতুন ভবন পাওয়া যায় কিনা তা খুঁজতে বলবো। একেবারে কোন উপায় না থাকলে আমাদেরকে মেথরপট্টির ওই ভবনে যেতে হবে। ব্যাংকিংতো আর বন্ধ করা যাবে না।

তদন্ত কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা তিনজনই পুরো বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করেছি। আমরা তিনজনই বিভিন্ন বিষয়ে পুরোপুরি একমত হয়েছি।’ দুয়েকদিনের মধ্যে ব্যাংকের এমডি বরাবরে তারা রিপোর্ট প্রদান করবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

x