লাভজনক করতে ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করা জরুরি

লোকসানের ঘূর্ণিপাকে বিজেএমসি

সোমবার , ২৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
37

সংকটের অতলে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে পাট শিল্পের রাষ্ট্রায়ত্ত অংশটি। প্রতি বছরই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে দূরে থাকে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি)। একইভাবে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা থেকেও অনেক পিছিয়ে সংস্থাটি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে এর দায় দেনা। প্রতিবছরই বাড়ছে লোকসানের পরিমাণ। বিজেএমসি চালু থাকবে না বন্ধ করা হবে, সেটি নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বলা হয়, বিজেএমসিকে টিকিয়ে রাখার জন্য গৃহীত সব উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখছে না মূলত অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে। গত ১৬ মে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিজেএমসির ওপর প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী কাঁচা পাট ক্রয়, পাট পণ্য উৎপাদন এবং বিদেশে ও স্থানীয় বাজারে ওই পণ্য বিক্রি- সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে বহু দূরে বিজেএমসি। প্রতিবেদনটি নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ধারাবাহিক লোকসানের কারণ হিসেবে বিজেএমসি অর্থ সংকট ও মজুরিজনিত ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছে। তবে কমিটির একাধিক সদস্য বলেছেন, পাট খাতের উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্যোগ নিয়ে চলেছে সরকার। তবে দুর্নীতি ও অদক্ষতার জন্য সেসব উদ্যোগ কাজে আসছে না। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি বৈঠকে বলেন, বিজেএমসি চালু থাকবে না বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিজেএমসি বন্ধ করতে গেলেও তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে, আবার লোকসান থেকে ব্রেক ইভেনে আসতেও কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগবে। বিজেএমসি বন্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিজেএমসি জন্মলগ্ন থেকেই লোকসান দিয়ে আসছে। তার পরও বেসরকারি খাতের একচেটিয়া ব্যবসা ও স্বেচ্ছাচারী মনোভাব বন্ধ করা সর্বোপরি পাট ও কৃষকের স্বার্থে বিজেএমসিকে টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই বিজেএমসির আজকের এ লোকসানি ও বিপর্যস্ত অবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী অব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা এবং অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রতিষ্ঠানটির অধীন কারখানাগুলোয় প্রাণ সঞ্চার করতে হলে এসব অনিয়ম, দুর্নীতি অদক্ষতা দূর করাটাই জরুরি। স্বাধীনতার আগে ও এরপর দীর্ঘদিন ছিল দেশে প্রধান অর্থকরী পণ্য পাট। আর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিজেএমসি ছিল দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রধান প্রতিষ্ঠান। স্বভাবত পাটের সে গৌরব তথা বিজেএমসির হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে অদক্ষতা অনিয়ম ও দুর্নীতি দূরীকরণে। আলোচ্য প্রতিবেদনটিতে দেখা যাচ্ছে, ধারাবাহিক লোকসানের কারণ হিসেবে বিজেএমসি অর্থ সংকট ও মজুরিজনিত ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছে, কিন্তু দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিষয়টি এড়িয়ে গেছে কর্তৃপক্ষ। সরকার সংস্থাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি বছর ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে; অথচ দুর্নীতি প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে সংস্থাটির লোকসান বেড়েই চলেছে। স্বল্প সম্পদের দেশে বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো হলে তার বিরূপ প্রভাব জাতীয় অর্থনীতির ওপর পড়ে এবং পরিণামে ভর্তুকির অর্থের বোঝা জনগণের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে। দুঃখের বিষয়, সংশ্লিষ্টরা এটিকে গভীরভাবে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না। এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। বিজেএমসি ক্রমাগত লোকসান দিয়ে যাবে আর সরকার পাটকলগুলো টিকিয়ে রাখতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যাবে সেটি জনগণ মোটেই সমর্থন করতে পারে না। বিজেএমসির কর্মকর্তাদের নিজের আয়েই চলতে হবে। ব্যয় কমানো ও আয় বাড়ানোর পথ খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে একটি নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে এ লোকসানের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর লোকসানের অন্যতম কারণ। যখনই যে দলের সরকার ক্ষমতায় এসেছে রাজনৈতিক কারণে সে দলের বাড়তি শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ খাতের ৬০-৭০ হাজার শ্রমিক রয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ হাজার স্থায়ী শ্রমিক। বিভিন্ন সময়ে অবিবেচনা প্রসূত অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিয়োগ দেওয়া শ্রমিকের ব্যাপারে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। পাশাপাশি মাথা ভারি প্রশাসন ঢেলে সাজিয়ে ব্যবস্থাপনা উন্নত করাও দরকার। বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে কিছুদিন পাটের চাহিদা কমেছিল বটে, কিন্তু পাট পরিবেশবান্ধব হওয়ার ফলে এর চাহিদা আবার বাড়ছে। সে বিচারে পাট খাতের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে বিজেএমসিকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। সংস্থাটিকে কাজে লাগাতে হবে। বিজেএমসি বন্ধ করে দিয়ে পাট খাতকে এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করে আরো এগিয়ে নেওয়ার উপায় ও পথ খুঁজতে হবে। তাছাড়া পাট শিল্প পুনরুজ্জীবনে সরকার যেভাবে উদ্যোগ নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে বিজেএমসি বন্ধ করা সমাধান নয়। বরং প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড়াতে কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়াটাই উচিত। পাট ও পাটজাত অভ্যন্তরীণ বাজারও কম নয়। সরকারের দাবি হলো, বর্তমানে ১৯টি পণ্যে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার হচ্ছে। কৃত্রিম পলিথিনের বদলে দেশে পাট থেকে উৎপাদিত পলিথিন সদৃশ পচনশীল ও পরিবেশ বান্ধব ‘সোনালী ব্যাগের’ বাণিজ্যিক উৎপাদন এবং সকল ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দুর্ভাগ্য, পাট খাতের সব কাজ এখনও চলছে অস্থায়ী ভিত্তিতে। সরকারি পাটকলগুলোর সংস্কার ও লোকবল প্রয়োজনের বাইরে মোটেই না নেওয়া ছাড়া লোকসান কমানো যাবে না। কাজেই জরুরি ভিত্তিতে সরকারকে এদিকেও নজর দিতে হবে।
বিজেএমসির লোকসান কমিয়ে সংস্থাটিকে লাভজনক করে তুলতে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, দুর্নীতি পুরোপুরি উচ্ছেদ করা, অপচয় ও অব্যবস্থাপনা রোধ করা। দ্বিতীয়ত, পাটকলগুলোতে পুরনো যন্ত্রপাতির স্থলে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন। তৃতীয়ত, ভরা মৌসুমে পাট ক্রয়ের অর্থ ছাড় করা। চতুর্থত, পাটের বহুমুখী পণ্য তৈরি করে নতুন বাজারের সন্ধান। সর্বোপরি পাট ও পাট শিল্পের উন্নয়নে সময়োপযোগী নীতি নির্ধারণ। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বিজেএমসিকে লাভজনক সংস্থা করা মোটেই কঠিন হবে না।

x