লাজুক, অন্তর্মুখী ও নিঃসঙ্গ প্রতিভা কাফকা

ছন্দা দাশ

শুক্রবার , ১ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ
16

প্রিয়তম ফ্রাউলি বাউয়ার,
আপনার চিঠি পড়ে আজ মেঘের বুক চিরে আমার ওপর পুষ্পবৃষ্টির মতো ঝরছে। এ হলো সেই চিঠি যে
চিঠির জন্য আমি অধীর আগ্রহ, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে গত তিন” সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করছি”। কী আবেগতপ্ত হৃদয়ের গহনলোক থেকে উঠে আসা ভাষা! কে লিখেছেন এই চিঠি? প্রাপক যিনি নামতো চিঠির শুরুতেই উৎকীর্ণ হয়ে আছে। কিন্তু প্রেরক কে–সুলুকসন্ধান করলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয় (কাফকার প্রেম, ভাষান্তর-মাসুদুজ্জামান)।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,”ওরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মিলেনা।
শুধু সুখ চলে যায়,একি মায়ার ছলনা।
কবির এ লেখার সবটুকু সত্যতা মিলে যায় নন্দিত এবং নিন্দিত এক লেখকের জীবনের সাথে। কে এই লেখক? তাঁকে জানতে চাইলে, পড়তে হবে সাহিত্যের আধুনিকতায় যিনি সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন যিনি, নতুন ধরনের গল্প আর ন্যারোটিভের সুবাদে সবচেয়ে আলোচিত কথাসাহিত্যিক ফ্রানৎসে কাফকোর জীবনী। এই বিশ্বনন্দিত কথাসাহিত্যিক বিশ্বসাহিত্যের চেহারা ই বদলে দিয়েছিলেন। গভীর আলোকে তাঁর প্রাজ্ঞ দৃষ্টি দিয়ে তিনি ছিঁড়ে খুঁড়ে তুলে এনেছেন মানুষের জীবন তাঁর লেখার অপূর্ব নির্মাণে। অথচ তাঁর নিজের জীবন ছিল নানারকম সঙ্কটে জীর্ণ, রক্তাক্ত,ক্ষত-বিক্ষত। কিন্তু কেন ?
তারই অনুসন্ধানে আমরা দেখতে পাই এই সাহিত্যিক আগাগোড়াই একজন লাজুক, অন্তর্মুখী, নিঃসঙ্গ একজন বিরল প্রতিভার মানুষ। প্রেমের জন্য তাঁর তৃষ্ণার্ত হাহাকার।একইসঙ্গে একাকিত্ব তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা।এই একাকীত্ব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি বারবার নারীর প্রতি ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। সেই প্রেম তাঁকে দিতে পারেনি তৃপ্তি। তাই আবার ফিরে এসেছেন নিঃসঙ্গতার কাছে। সমস্যার মূলে তিনি নিজেই।এই কারণেই বিশ্ববাসীর কাছে তিনি যেমন নন্দিত তেমন আবার নিন্দিত।
তাঁর সমস্ত জীবনের দিকে তাকিয়ে শেষ সীদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয় না কোনটা তাঁর কাছে সত্য প্রেম না একাকীত্ব? প্রেমের জন্য শুধু সামাজিক , ভদ্র, শালীন নারীরাই নয় যৌন কর্মীদের ও ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এই কাফকা কোনদিন শারীরিক কারণে তাদের সাথে প্রেম করেননি। তাঁর প্রেম ছিল একান্তভাবেই মানসিক। প্রেমের জন্য তাঁর এই তীব্র হাহাকার তা তাঁকে কখনোই প্রশান্তি দেয়নি।
‘কাফকার’ এই প্রেম কাতরতা সম্পর্কে গবেষকরা বলেছেন তিনি এক অদ্ভুত ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বোধের দ্বারা মথিত ছিলেন। তিনি তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা, একাকিত্ব, নৈঃসঙ্গ আর হতাশায় ভুগতেন।কাফকার চরিত্রের অন্যতম বৈশাদৃশ্য ছিল প্রেম কাতরতা তেমনি যৌন বিতৃষ্ণা।এই পরস্পর বিরোধী চরিত্র কাফকাকে করছে আলাদা এক বিস্ময়কর চরিত্র।এত প্রেম করার পর ও তিনি কখনো বিয়ের কথা ভাবতে পারেন নি। এমনকি দু দুবার বাগদান করে ও সে বাগদান ভেঙে তিনি মুক্তির পথে বেরিয়ে এসেছেন।
তাঁর অসংখ্য প্রেমিকাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চারজন যাদের সাথে তাঁর মধুর সম্পর্ক তাঁরা ছিলেন ফেলিস বাউয়ার, গ্রোত ব্লক,মিলেনা য়েসেনেস্কা এবং ডোরা ডায়মন্ট। এঁদের সাথে তাঁর মূলত চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ হতো।আর সেই প্রেমের মধ্য দিয়েই তাঁর সৃজনী প্রতিভার স্ফুরণ।এলিসের সাথে তাঁর প্রেমের প্রধান মাধ্যম চিঠি।কাফকা এলিসকে জানিয়েছিলেন
চিঠিতে,”কেবল লেখালেখির জন্যই আমার জন্ম হয়েছে। সময় খুব কম, শক্তিও সীমিত।ফেলিসের সাথে তাঁর প্রেমের আয়ুুষ্কাল পাঁচ বছর।এই পাঁচ বছরে কাফকা এলিসের প্রেমে এতটাই আচ্ছন্ন ছিলেন যে তাকে সাড়ে তিনশ চিঠি লিখেছিলেন। কোন কোনদিন দুইটি চিঠি ও লিখতেন। পাঠক হিসেবে আমাদের সৌভাগ্য প্রেমে ব্যর্থ হলেও ফেলিস সেই চিঠিগুলো নষ্ট করেন নি। বরং পরবর্তীকালে চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে সুদূর আমেরিকায় যখন স্থায়ী হলেন সঙ্গে নিয়ে গেলেন সেসব চিঠি।পরে সেগুলো তুলে দিয়েছেন ব্রডের হাতে।আর তারই সুবাদে সেসব আমাদের পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। কাফকা উইল করে গিয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর যেন তাঁর সেসব চিঠি যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়।
কাফকার প্রেম, নিঃসঙ্গতা দুটোই কিন্তু তাঁর লেখকসত্তার এক অপূর্ব অনুষঙ্গ। এইযে ফেলিসের সাথে প্রেম সে যেন এক তাঁর লেখার প্রেরণা হয়ে এসেছিল তাঁর জীবনে।ফেলিসের সাথে প্রেম চলাকালীন সময়েই তিনি লিখেছেন সেই অবিস্মরণীয় গল্প “রায়”।আর তাই তো গল্পটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ফেলিসকেই।এই সময়েই তিনি আরও লিখেছিলেন”রূপান্তর আর শুরু হয়েছিল আমেরিকার পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন। “তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেশি সৃষ্টিশীল সময় ফেলিসের সাথে প্রেম চলাকালীন।
শুধু কি ফেলিস? না, অসংখ্য নারীর প্রেমে পড়েছিলেন তিনি।কাফকার এসব প্রেম কাহিনী পড়লে মনে হবে লেখকদের জন্য প্রেম বুঝি এক অনিবার্য অনুসঙ্গ।কাফকা শুধু চিঠিই না, দিনপঞ্জি ও লিখতেন। কাফকার সৃষ্টিশীল রচনার পরিপূরক এই চিঠি ও দিনপঞ্জি পাঠ না করলে তাঁর লেখক সত্তাটি কখনই সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যাবে না।
ফেলিসের সাথে প্রেমের শুরুতেই কাফকা তাঁর প্রথম চিঠিতেই লিখেছিলেন “চিঠি লেখার মেজাজ না থাকলেও আমার আঙুল সবসময় লেখালেখির জন্য উশখুশ করতে থাকে।এ থেকেই বোঝা যায় লেখার প্রতি কাফকার ছিল গভীর টান।আর লেখার কারণেই তাঁর গভীর প্রেম এবং নিঃসঙ্গতা।ফেলিসের প্রেম কাফকার দিনগুলো সৃষ্টিশীলতার উজ্জ্বল সোনালী শষ্যে ভরে উঠেছিল। এভাবে চলতে চলতে ১৯১৩ সালের জানুয়ারি থেকে হঠাৎ তাঁর চিঠি লেখার হার কমে আসছে। আর তখন থেকেই সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে ও নেমে এল একধরনের বন্ধ্যাত্ব। প্রচলিত অর্থে ফেলিস ও কাফকার লেখা চিঠিগুলোকে প্রেমের চিঠি বলা যাবে না।কারণ সেখানে শুধু উচ্ছল প্রেমাবেগের
প্রকাশই ঘটেনি, ঘটেছে প্রেমের ব্যক্তিত্বের উন্মোচন। কাফকা যত উৎসাহের সঙ্গে ফেলিসকে তাঁর লেখনির
মতামত প্রত্যাশা করতেন আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি ফেলিস ঠিক সেভাবে মন্তব্য করেন নি। নিজের লেখা সম্পর্কে প্রিয়জনের কাছ থেকে একজন লেখক যে ধরনের প্রতিক্রিয়া আশা করেন
ফেলিস সেই ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান নি। ধীরে ধীরে ফেলিস সম্পর্কে তাঁর প্রদীপ্ত উৎসাহ ক্ষীণ হতে হতে একসময় নিভে গেল।ফেলিস একবার চিঠিতে লেখার সময় কাফকার পাশে থাকতে চেয়েছিলেন বলে ফেলিসের সাহিত্য বোধ সম্পর্কে কাফকা সন্দিহান হয়ে পড়েন।ফেলিস এক মূর্তিমান সমস্যা হিসাবে আবির্ভুত হন কাফকার জীবনে। নিঃসঙ্গ রাত ,যে রাতের জন্য কাফকা আকুল হয়ে অপেক্ষা করেন তাঁর প্রিয়তমা লেখার জন্য, সে রাতের সঙ্গী কোন নারী হবে ভাবতেই শঙ্কিত হয়ে পড়েন কাফকা।
লেখালেখির জন্য আসলে তাঁর চাই অখণ্ড নিঃসঙ্গতা রাতের পর রাত কোন নারী নয়। তিনি সেদিন থেকে ফেলিসকে অগ্রাহ্য করা শুরু করলেন।ফেলিসের সাথে পত্রালাপ বন্ধ।লেখাই তাঁর একমাত্র ধ্যান, জ্ঞান। আর এসময় তিনি লিখেছেন “পেনাল কলোনীতে” গল্পটি। কাফকা দিনপঞ্জিতে লিখেছেন লেখালেখির কারণে কোন নারীর সঙ্গে বাস করা তাঁর সম্ভব হবে না, বিয়ে তো নয়ই। এতেই বোঝা যায় লেখাই ছিল একমাত্র প্রেম।সে প্রেমের জন্যই তাঁর নারীসঙ্গ এবং নিঃসঙ্গতা। বিরল এবং অদ্ভুত চরিত্র আজো একমাত্র কাফকা এক জ্যোতিস্ক হয়ে বিরাজ করছে সাহিত্য আকাশে। এরপর যে নারী কাফকার জীবনে প্রভাব বিস্তার করেছে তিনি হচ্ছেন মিলেনা জেসেনেস্কা।কাফকা ও জেসেনেস্কার মধ্যে গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধিক সাহিত্যিক সম্পর্ক। তাদের মধ্যে চিঠি লেখালেখি যা হত তা ছিল লেখালেখি ও জগৎবীক্ষা নিয়ে।
কাফকার জীবনের শেষ নারী ছিল ডোরা ডায়মন্ট। কাফকা তখন যক্ষা রোগে ভুগছিলেন। তাঁর জীবনের অন্যতম সময় তখন। কাফকার বয়স চল্লিশ, ডোরার পঁচিশ। ১৯২৪ সালের ৩রা জুন ডোরার কোলেই কাফকার মৃত্যু হয়। কাফকার জীবন আজো বিস্ময়কর রহস্যে ভরা। তার অনেক কিছুই অজানা যেন।

x