লকডাউনের পথে দেশ

চলবে না ট্রেন-লঞ্চ, উড়বে না বিমান ।। কাল থেকে বন্ধ গণপরিবহনও ।। কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ, নগর না ছাড়তে পুলিশের সতর্কবার্তা

ঋত্বিক নয়ন

বুধবার , ২৫ মার্চ, ২০২০ at ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ
163

সারা দেশে ছুটি ঘোষণার পর সড়ক, নৌ ও আকাশপথে সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মত ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশও কার্যত অবরুদ্ধ দশার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। জনসমাগমে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে বলে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা এসেছিল আগেই। আক্রান্তের সংখ্যা ত্রিশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সোমবার সরকার ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সব অফিস-আদালতে ছুটি ঘোষণা করে। এরপর গতকাল বিকেল থেকে ট্রেন, মধ্যরাত থেকে বিমান ও লঞ্চ চলাচল এবং আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে গণপরিবহণ চলাচলেও জারি করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এরপর রাত থেকেই বাস ও রেলস্টেশনে বাড়তে শুরু করে গ্রামমুখো মানুষের ভিড়। গতকাল মঙ্গলবার বিকালেও চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে গিয়ে বহু মানুষকে চট্টগ্রাম ছাড়ার জন্য রেলের টিকেট কিনতে দেখা যায়। এছাড়া বহাদ্দারহাট বাস টার্মিনালেও লোকজনকে ভিড় করতে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে প্রথম প্রয়োজন সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। সরকারসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এ বিষয়টির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি, বিনোদন স্পট বন্ধ, ধর্মীয় সামাজিক রাজনৈতিক সবধরনের অনুষ্ঠান বন্ধের পর একে একে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। এর ফলে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে প্রতিটি জেলা; কার্যত লকডাউনের পথে যাচ্ছে দেশ।
গণপরিবহন চলাচল বন্ধ : করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সকল ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি এক ঘোষণায় ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাস, ট্রেন, নৌযান ও ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল ২৪ মার্চ মঙ্গলবার থেকে লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আন্তঃনগর ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ হবে ২৬ মার্চ থেকে। মঙ্গলবার সকালে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক ভিডিও বার্তায় গণপরিবহন বন্ধের কথা জানিয়েছেন। ভিডিও বার্তায় ওবায়দুল কাদের বলেন, দেশের মানুষ, যাত্রীসাধারণ, গাড়ির মালিক শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার জ্ঞাতার্থে জানানো যাচ্ছে, আগামী ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে গণপরিবহন লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ওষুধ, জরুরি সেবা, জ্বালানি, পচনশীল পণ্য পরিবহন নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। পণ্যবাহী যানবাহনে কোনও যাত্রী পরিবহন করা যাবে না।
এরই মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে গতকাল মঙ্গলবার থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সিটি স্পেশাল সার্ভিস। সকালে মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপ এ ঘোষণা দেয়। নগরীর কাপ্তাই থেকে পতেঙ্গা সড়কে ৫৫টি স্পেশাল বাস চলাচল করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চালক, হেলপারদের ঘরে অবস্থানের জন্য অনুরোধ করা হয়। এছাড়া যানবাহন মালিকেরা সার্ভিস বন্ধ ঘোষণার সাথে চালক, হেলপার, টিকেট কাউন্টার ম্যনাজার ও সহকারীকে তিন ও পাঁচ হাজার টাকা করে আপদকালীন ভাতা প্রদান করা হয়। নগরীতে গণপরিবহন হিসেবে প্রায় ১২০০ বাস, মিনিবাস হিউম্যান হলার চলাচল করলেও বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি গণপরিবহন চলাচল করছে।
বন্ধ হলো ট্রেন চলাচল : গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের ট্রেন চলাচল। সেই হিসেবে মঙ্গলবার দুপুর ৩ টায় মহানগর গোধূলী এঙপ্রেস চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ ট্রেন এবং পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সকল ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমে ২৪ মার্চ থেকে অভ্যন্তরীণ মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এতে চালু রাখা ট্রেনে যাত্রী জনসমাগম বেড়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় আন্তঃনগর সহ সকল ধরণের ট্রেন চলাচল বন্ধের এমন নির্দেশনা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পূর্বাঞ্চল রেলের বিভাগীয় ব্যাবস্থাপক সাদেকুর রহমান বলেন, আজকে (মঙ্গলবার) রেল মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সন্ধ্যা থেকে কোন ট্রেন চলবে না। ট্রেন চলাচল বন্ধের দিনগুলোতে যাত্রীদের অগ্রিম বিক্রি হওয়া টিকেটের ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম স্টেশন ম্যানেজার রতন কুমার চৌধুরী বলেন, স্টেশনে যোগাযোগ করলে যাত্রীরা টিকেটের টাকা ফেরত পাবেন। এর আগে রেলপথ মন্ত্রণালয় ২৬ মার্চ থেকে আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল এবং সব ধরনের ট্রেনের টিকিট বিক্রি বন্ধের কথা জানিয়েছিল।
উড়বে না বিমান, চলবে না লঞ্চ
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, গতকাল মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে অভ্যন্তরীণ সব রুটে বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে।
এছাড়া দেশের সব রুটে গতকাল ২৪ মার্চ মঙ্গলবার থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ। করোনার বিস্তার রোধে সারা দেশে যাত্রীবাহী নৌ চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে পণ্যবাহী নৌ চলাচল করবে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিকাল থেকে দেশের নদী বন্দরে চলাচলকারী সব যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে।
নিজ কর্মস্থলে অবস্থানের নির্দেশ
২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ঘোষিত ছুটিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবশ্যই নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল ২৪ মার্চ মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ ছুটি বা বন্ধ সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালতের জন্য প্রযোজ্য। স্বাস্থ্যসেবা, সংবাদপত্রসহ অন্যান্য জরুরি কার্যাবলীর ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা প্রযোজ্য নয়। এতে আরও বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ ছুটি বা বন্ধকালীন অবশ্যই নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন। এ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে জনগণকে ব্যাপকহারে পারস্পরিক সংস্পর্শে এসে রোগ বিস্তার করা থেকে বিরত রাখার জন্য। সেজন্য সর্বসাধারণকে এ সময়ে বাইরে যাওয়া বা ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। ওষুধ বা খাদ্য প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয়সহ অন্যান্য শিল্প কারখানা, প্রতিষ্ঠান, বাজার, দোকানপাট নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলবে। গণপরিবহন ছাড়া অন্যান্য জরুরি পরিবহন যেমন, ট্রাক, কার্গো, অ্যাম্বুলেন্স ও সংবাদপত্রবাহী গাড়ি ইত্যাদি যথারীতি চলবে বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নগর না ছাড়তে পুলিশের বার্তা
দেশে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ১০ দিনের ছুটিতে নাগরিকদের গ্রামের বাড়ি বা নিজ নিজ জেলায় যাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছে বাংলাদেশ পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার এক বার্তায় এ কথা জানায় পুলিশ সদর দফতর। ২৩ মার্চ সোমবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সব প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণার পরপরই বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে নগরবাসীর বাড়ি ফেরার হিড়িক শুরু হয়।
পুলিশ সদর দফতর জানায়, ছুটিতে অনেকেই হয়তো সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য না বুঝে বা সচেতনতার অভাবে অথবা অতি উৎসাহের কারণে পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ছুটবেন। এতে দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি ফিরতে বারণ করেছে পুলিশ। করোনাভাইরাসের প্রভাবে গত সোমবার থেকে নগরীর সড়কগুলো জনশূণ্য হয়ে পড়ে।