রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় সহযোগিতার আশ্বাস

মঙ্গলবার , ৩ জুলাই, ২০১৮ at ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
60

জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তাঁরা ১০ লাখেরও বেশী রোহিঙ্গাকে আশ্রয় প্রদানে বাংলাদেশের মহানুভবতার প্রশংসা করেন এবং এই বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে রয়েছে বলে জানান।

সারা বিশ্ব আজ অবগত যে, শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করতে গিয়ে বাংলাদেশ এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আগমন, তাদের নিরাপত্তা বিধান ও পরিচর্যার জন্য বড় ধরনের কর্মযজ্ঞের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সীমাবদ্ধতা, সম্পদের স্বল্পতা, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দারিদ্র্যের মাত্রা ও পরিকাঠামোগত স্বল্পতা এবং একই সঙ্গে শরণার্থী মোকাবেলার প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের উচ্চতম পর্যায় থেকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে বেশ কিছু সেক্টর চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই চাপ মোকাবেলায় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, যার সাড়া ইতিমধ্যে মিলছে।

যদিও আমরা জানি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অনেক রকম ঝুঁকির মধ্যে আছে। তন্মধ্যে খাদ্যঝুঁকি একটি। দেশবিদেশ থেকে খাদ্যের সহায়তা আসছে। কিন্তু তা শরণার্থীদের চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ফলে খাদ্যের অভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে শিশুরা অপুষ্টি এমনকি অকালমৃত্যুর শিকার হতে পারে। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে এ বছর নানা কারণে ইতিমধ্যে প্রচুর খাদ্যশস্য নষ্ট হয়েছে। তদুপরি রোহিঙ্গাদের খাদ্য সংস্থানের চাপ যোগ হয়ে তা বাংলাদেশের খাদ্য মজুতেরও নতুন সংকট তৈরি করছে, যেটা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে ধরা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সুদূরপ্রসারী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, একই সময়ে ৯১০ লাখ শরণার্থীর জন্য ত্রাণ এবং সুরক্ষা প্রদান করার গুরুদায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর বর্তেছে, এমন এক পরিস্থিতিতে এই সম্ভাব্য প্রলম্বিত শরণার্থী সমস্যা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সে ক্ষেত্রে শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের যথেষ্ট বিচক্ষণতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। মানবিকতার সঙ্গে প্রয়োজন বিরাজমান বাস্তবতার সঠিক মূল্যায়ন। এ ক্ষেত্রে জরুরি হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আমরা কীভাবে আখ্যায়িত করছি, তা নির্দিষ্ট করা এবং সরকারের উদ্যোগকে যথাযথভাবে প্রতিপূরণ (সাপ্লিমেন্ট) করতে পারে, এমন সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া যার শরণার্থী সমস্যা মোকাবেলায় অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে।

জাতিসংঘ হচ্ছে এমন একটি জায়গা, একমাত্র যে সংগঠন যারা মিয়ানমারকে রাজি করাতে পারে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং নাগরিকত্বের ব্যাপারে। মিয়ানমার কাউকে কোনও পরোয়া করে না। কিন্তু জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে তার একধরনের দায়বদ্ধতা আছে। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন লেভেলে এবং এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে জাতিসংঘের মাধ্যমে জিনিসটা সমাধানের চেষ্টা করা। জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্টকে একসাথে পাওয়া এবং তাঁদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা খুব বড় একটি সুযোগ বলে আমাদের মনে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে একটি দ্বীপে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে যেখানে তারা জীবনযাপনের জন্য আরো ভালো অবস্থা পাবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার এটার বাস্তবায়নে এখনও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তিনি বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবাসহ রোহিঙ্গাদের সকল প্রকার মানবিক সহযোগিতা প্রদান করছে, বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আগমনে স্থানীয় জনগণ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মিয়ানমার আসলে কী করতে চায় সে বিষয়টি অনুধাবনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আরো চাপ প্রয়োগের ওপরও জোর দেন। তিনি একই সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সেইসাথে সন্ত্রাস দমন কর্মকাণ্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির প্রশংসা করেন। বাংলাদেশকে তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্যতম সেরা দেশ হিসেবেও অভিহিত করেন।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশে এসে যে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন, আমরা প্রত্যাশা করবো তিনি ফিরে গিয়ে যেন তা ভুলে না যান।

x