রোহিঙ্গা সংকট ও উত্তরণের উপায়

রতন কুমার তুরী

বৃহস্পতিবার , ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ at ২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

রোহিঙ্গা সংকট যেনো দিন দিন ব্যাপক আকার ধারণ করছে। মানবিক কারণে প্রায় দশ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সরকার ঠাঁই দিলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে এদের জরুরি হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই এখন ভুলে যাচ্ছে এটা তাদের দেশ নয় এটা ত্রিশ লাখ শহীদ আর দুই লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে গড়া দেশ। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে থেকে রোহিঙ্গারা চোরাই পথে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে এখন পরিস্থিতি এতো উদ্বেগজনক ছিলনা হয়তো গুটি কয়েক পরিবার বিভিন্ন কারণে সময়ে সময়ে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ঢুকে বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যেতো। এটা তারা সহজে করতে পারতো একারণে যে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভাষার সাথে বৃহত্তর চট্টগ্রামের কয়েকটি অঞ্চলের ভাষার মিল রয়েছে। পরবর্তীতে রোহিঙ্গাদের এদেশে আসার পথ করে দেয়ার জন্য স্থানীয় কিছু দালালও যোগ দেয় এবং রাতের আঁধারে তারা রোহিঙ্গা নরনারীদের বিভিন্নভাবে এদেশে এনে স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে মিশিয়ে দিতে থাকে। বিষয়টা সরকারের নজরে পরলে সরকার মায়ানমার সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করতে থাকে এবং তারপর থেকে রোহিঙ্গারা আসা প্রায় বন্ধু হয়ে যায়। কিন্তু গত দু’বছর আগে মায়ানমার সেনাবাহিনীর সেনাচৌকিতে রোহিঙ্গা সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আক্রমণ করে মায়ানমার সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যদের হত্য করলে তারাও পাল্টা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার শুরু করে এ অত্যাচারের মাত্রা সহ্য করতে না পেরে ব্যাপক সংখ্যক রোহিঙ্গা নরনারী টেকনাফের নাফ নদীর ওপারে অবস্থান করে আহাজারি করতে থাকে। এইসব রোহিঙ্গাদের প্রথমে বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত দিয়ে ঢুকার অনুমতি না দিলেও পরবর্তীতে মানবিক দিক বিবেচনা করে টেকনাফ সীমান্ত খুলে দেয় আর এসুযোগে প্রায় দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। এসব রোহিঙ্গাদের স্থান দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার টেকনাফ এবং কঙবাজারের কিছু জায়গা নির্ধারণ করে। বর্তমানে রোহিঙ্গারা টেকনাফ এবং কঙবাজারের ছোট ছোট পাহাড়ের পাদদেশে ছাড়াও বেশ কয়েকটি ক্যাম্পে বসবাস করছে। বলতে গেলে রোহিঙ্গারা কোনো অভাব ছাড়াই এদেশে রাজার মতো দিনযাপন করছে। এদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার ছাড়াও একাধিক এনজিও রয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কর্মকর্তারাও তাদের দেখভাল করছেন। রোহিঙ্গাদের উন্নত বসবাসের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার তাদের কীভাবে মিয়ানমারে পাঠানো যায় সেব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেনদরবার করে আসছিল আর এই বিষয়টি বারবার মায়ানমান অগ্রাহ্য করে আসছিল। এক পর্যায়ে মায়ানমার সরকার পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নিতে রাজি হয় এবং এ সংক্রান্ত একটি তালিকাও তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করে যে তালিকা অনুযায়ী সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থীকে তারা ফেরৎ নেয়ার দিনক্ষণ ঠিক করে দেয়। উক্ত দিন দুদেশের কর্মকর্তা এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কিছু কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় উক্তদিন একজন রোহিঙ্গাও নিজ দেশে ফেরৎ যাওয়ার জন্য সীমান্তে আসেনি। পরবর্তীতে রোহিঙ্গারা এক জনসমাবেশের মাধ্যমে জানিয়ে দেয় যে তাদের পাঁচ দফা নামানলে তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবেনা। এখন প্রশ্ন হলো কোনো শরনার্থী এদেশে এসে জনসমাবেশ করতে পারে কিনা? তাছাড়া তারা দাবি দেয়ার কে? তাদের তো যেতেই হবে। তারা তো যুগ যুগ ধরে এদেশে বসবাস করতে পারবে না। তাদেরকে তৎকালীন সময়ের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার স্বল্প সময়ের জন্য জায়গা দিয়েছে মাত্র এটাকে যদি রোহিঙ্গারা দুর্বলতা মনে করে তাহলে তারা ভুল করবে। ইতিমধ্যেই রোহিঙ্গাদের এমন আচরনে ক্ষুব্ধ হয়েছেন বাংলাদেশের জনগণ। বিশেষ করে টেকনাফ এবং কঙবাজারের স্থানীয় জনগণ তাদের অত্যাচারে রুষ্ট। তারা অচিরেই এসব রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারকে বার বার অনুরোধ করছে। এখন প্রশ্ন হলো কেনো রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেনা? সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করা কিছু কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে নিরুৎসাহিত করছে কারন তারা চলে গেলে তাদের এনজিও ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে তাছাড়া কিছু কিছু এনজিও সরকারের বিরুদ্ধেও কাজ করছে এতে করে সরকার যাতে বেকায়দায় পড়ে। এসব বিষয় স্পষ্ট হয়েছে সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সমাবেশে। এনজিও সংস্থাগুলো টাকার যোগান না দিলে এত অধিক সংখ্যক রোহিঙ্গা একই ধরনের টিশার্ট পরে এবং নানান রঙের ব্যানার নিয়ে সমাবেশ করতে পারতোনা।তাছাড়া সেদিন প্রত্যেক রোহিঙ্গার হাতে হাতে নতুন প্রযুক্তি সমৃদ্ধ মোবাইল ফোন দেখা গেছে। যে রোহিঙ্গারা মায়ানমারে দুবেলা খাওয়ার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেও খেতে পারতোনা তাদের হাতে দামি মোবাইল আসলো কোথা থেকে তা প্রশ্ন থেকে যায়। ইতিমধ্যে সরকার রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে না যাওয়ার মদদ দাতা কিছু এনজিও সনাক্ত করেছে এবং তাদের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেছে। প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরৎ পাঠানোর জন্য সরকারকে আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে কারণ মায়ানমার খুব সহজে এদের গ্রহন না করলে কিংবা এরা ফিরে না যেতে চাইলে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করে ঠিক করে নিতে হবে মিয়ানমার এবং রোহিঙ্গারা কি করবে। এতোবড় জনগোষ্ঠীর ভার সরকার সাময়িকভাবে নিতে পারলেও ভবিষ্যতে যে এর ফলাফল ভালো হবে না তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে ইতিমধ্যে অনেকেই নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়েছে যা আমাদের জন্য বেশ অস্বস্তিকর এবং ভবিষ্যতে এরা আরো ভয়ংকর কিছু করবে কিনা তার গ্যারান্টিও কেউ দিতে পারবেনা। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের লাগাম টেনে না ধরলে সরকর ভবিষ্যতে এদেরকে খুব সহজে আটকাতে পারবেনা তবে লক্ষণীয় যে, সরকার বিষয়টা বুঝতে পেরেছে। ইতিমধ্যে সরকার রোহিঙ্গাদের মধ্যে মোবাইলে কথা বলার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং বেশ কিছু এনজিওকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর বাইরে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে কোনো অবস্থাতেই বের হয়ে লোকালয়ে আসতে না পারে মতো ক্যাম্পের চারিদিকে কয়েক স্তরের কাটা তারের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে হচ্ছে এতে করে তারা ক্যাম্পের মধ্যেই অবস্থান করবে এবং বাইরের কোনো উসকানী তাদের কানে আসবেনা। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি মিয়ানমার অবশ্যই রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদেরও উচিত হবে তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া।
লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী

x